শেখ আলী আকবর একজন চারণ কবি। ছোটবেলা থেকেই কবিতা ছায়া হয়ে তার সঙ্গে ঘুরপাক খেতে থাকে। বাবা-মা মাদরাসায় ভর্তি করিয়েছিলেন। পড়াশোনায় মন বসেনি। কবিতার ঝিঁঝিঁ পোকারা তার মাথার ভেতর ভন ভন করতে থাকে। কবিতার ছন্দরা বাঁশ বাগানে এসে জোনাক হয়ে জ্বলতে থাকে। তাকে ডাকে- আয় আয়। বন্দিজীবন ছেড়ে আমাদের কাছে ছুটে আয়। মেঘেরা ডাকে। বর্ষার বজ্র তাকে নিয়ে যায় মেঠোপথের নির্জন প্রান্তরে। সে বর্ষার জলে অবগাহন করতে থাকেন। এভাবেই প্রকৃতির ছন্দরূপ রস আস্বাদন করতে করতে হারিয়ে যায় এক সময়ের চারণ কবি শেখ আলী আকবর। কাঁধের পেছনে একটি খেরো খাতার ব্যাগ ঝুলছে। সেটাই একমাত্র সহায়-সম্বল তার।
গ্রাম থেকে গ্রামে। পল্লির সোনালি মাঠের আড়ালে জোছনার মায়া ভরা আলোয় তিনি নিজেকে হারিয়ে ফেলেন। শৈশবকে তিনি এভাবেই পথে পথে হারাতে থাকেন। কিন্তু বৈরাগ্য তাকে ছাড়ে না। যৌবন আসে। রংপুরের এক অজানা গাঁ ঘেষা গ্রামে সংসার পাতেন বৈরাগ্য কবি। সংসারের বোঝা বইতে ট্রেনে ট্রেনে এটা-সেটা বিক্রি করেন। নতুন বউয়ের আলতা-ছুনো-পাউডার এবং আহার জোগাতে ট্রেনেই কাটাতে হয় কয়েক দিন। এদিকে পথ চেয়ে নতুন বউ বসে থাকে। চারণ কবি আসেন। নতুন বউয়ের জন্য এটা-সেটা নিয়ে আসেন। ভাঙা ঘরে জোছনার আলোয় বউয়ের চাঁদপানা মুখ দেখে দেখে কবিতার খেরো খাতা শব্দ-ছন্দে ভরে ওঠে।
তার ছনের জীর্ণ কুঠিরে বেড়া গলিয়ে যখন রাতের জোছনা তার পুষ্প নয়না যৈবতী স্ত্রীর কপাল স্পর্শ করে তা কবিতার পঙ্তিই হয়ে খেরো খাতায় জমা হয়। এভাবেই ধীরে ধীরে নব জীবন পূর্ণ করতে তার দুটি ফুটফুটে ছানা আসে। কিন্তু খেরো খাতা তাকে আবারও দেশান্তরী করতে থাকে। জোছনারা তার ঘর-সংসার পছন্দ করে না। নদীর বয়ে যাওয়া স্রোত তাকে কাছে ডাকে। কাশফুলের মৃদু বাতাস তাকে বিগলিত করে তোলে। সংসার থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন হতে বলে। কবি ট্রেনে ট্রেনে এটা-ওটা বিক্রি করেন সংসারের জন্য, ছেলেমেয়েদের জন্য অন্ন জোগান। কিন্তু না। কবির এ বৈরাগ্যে তার সুন্দরী স্ত্রী মেনে নিতে পারেননি। তিনি ভোগ বিলাসে মত্ত হতে থাকেন।
বাচ্চাদের তার মায়ের কাছে রেখে সিনেমা দেখতে যায় কবির অগোচরে। মায়াবী জোছনার লোভে পড়তে থাকে চারণ কবির স্ত্রী। হাত বাড়ায় ভুল পথে। সিনেমার প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ায় সেখানে পরিচয় ঘটে টিকিট চেকারের সঙ্গে। তাকে লোভী করে তুলে। এটা-সেটা খাওয়ায় হলের টিকিট চেকার। চারণ কবি যেটা পারেনি সেটাই পূরণ করেন টিকিট চেকার। এদিকে চারণ কবি কয়েক দিন পর বাড়িতে এসে দেখে তার সুনয়না স্ত্রী ঘরে নেই। ঘরে অবুঝ বাচ্চারা নানির কাছে ঘুমাচ্ছে। যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহ মন নিয়ে ঘরে ফিরে দেখেন স্ত্রী সিনেমা দেখতে গেছে। চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকারা চারণ কবিকে বলতে থাকে তুমি এখান থেকে সরে যাও। কবি সরে না। তার স্ত্রী বাড়ি ফেরে রাত করে। কাপড় এলোমেলো। চুলগুলো এলোমেলো। নিশাচর পাখির মতো এলোমেলো লাগে তাকে। চারণ কবির সামনে এসে দাঁড়ায়। কোথায় গিয়েছিল জানতে চাইলে নিরুত্তর থাকে। ঘরের কাঠের চকিতে নিষ্পাপ বাচ্চাদের দেখে কবিও চুপ হয়ে যায়। কৈফিয়ত চায় না। শাসায় না। ক্ষমা করে। কিন্তু মধুলোভী নিশাচর যে ঘরে থাকতে পছন্দ করে না। ঘুরে বেড়ায় শহরের অলিগলিতে। টিকিট চেকার তাকে নতুন নতুন শাড়ি কিনে দেয়। ভালো ভালো খাবার হোটেলে নিয়ে খাওয়ায়। সময়-সুযোগে রাতে হলের গোপন কুঠুরিতে নিয়ে দরজা ভেজায়। বাতি বন্ধ করে দেয়। শাড়ির আঁচল এলোমেলো হয় তখন। এদিকে চারণ কবি আলী আকবর ট্রেনে ট্রেনে ঘুরতে থাকে খেরো খাতা নিয়ে। এটা-ওটা বিক্রি করে। কয়েক দিন ট্রেনে থাকার পর কিছু পয়সা জমা হলেই বাড়ির খেতের আইল দিয়ে জোছনা যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে তখন বাড়িতে আসে। নাহ্, বাড়িতে নেই চারণ কবির যৌবনা স্ত্রী।
অন্যদিন রাত হলেও বাড়ি ফেরে। কিন্তু আজ রাত গেছে। মধ্য রাত শেষ হয়ে এখন জোছনা পুব আকাশে হেলে পড়েছে। না, তিনি ফেরেননি। চারণ কবি বাড়ীতে এসে স্ত্রীকে না পেয়ে সবাইকে জাগায়। কেউ কিছু বলতে পারে না। সকালের আলো ফোটে। না, তখনো ফেরে না। অবুঝ বাচ্চারা মা মা বলে কাঁদতে থাকে। বাবা কোলে নেন। খেরো খাতার ব্যাগ থেকে বের করে বাচ্চাদের এটা-ওটা মুড়ি-মুড়কি খেতে দেন। কিন্তু অবুঝ বাচ্চাদের কান্না থামে না। অসহায় বোধ করতে থাকেন চারণ কবি। সকালে বাচ্চাদের খাইয়ে একজনকে কোলে অপরজনকে হাঁটিয়ে রেলস্টেশনের দিকে পা বাড়ান । রংপুর থেকে দ্বিচারিণী স্ত্রীকে ফেলে তার নিজ জেলা মুন্সীগঞ্জের গোয়ালঘূর্ণিতে চলে আসেন। এসে একটি বাসা ভাড়া করেন। ছেলেটি বড় বুলবুল। বয়স ৬। মেয়েটি জুঁই। বয়স ৪। বাড়ির মালিকের স্ত্রীর কাছে অবুঝ বাচ্চাদের রেখে তাকে খাবার জুটাতে ছুটতে হয় কাঠপট্টি লঞ্চ ঘাট থেকে ঢাকায়।
পুরান ঢাকা থেকে হরেক রকমের জিনিস কিনে দোকানে দোকানে বিক্রি করতে থাকেন। অবসর পেলেই খেরো খাতা বের করে জীবনের উপাখ্যান রচনা করতে থাকেন। রাতে বাড়ি ফেরেন। ততক্ষণে বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়েছে। তিনি আসার সময় চাল, ডাল, ডিম, আলু, মরিচ, পেঁয়াজ নিয়ে আসেন। রান্না হলে বাচ্চাদের ডেকে তুলে খাবার খাওয়ান। বাচ্চারা বাবাকে দেখতে পেয়ে উল্লসিত হন। আবেগে বাবাকে জড়িয়ে ধরেন। সারা দিন বাবার জন্য অপেক্ষা করতে করতে তারা ঘুমায়। কিন্তু রাতে বাবাকে পেয়ে যেন সারা দিনে সব দুঃখ-কষ্ট তারা ভুলে যায়। এভাবে মা ছাড়া শেখ আলী আকবরের বাচ্চারা বড় হতে থাকে। আর খেরো খাতা শূন্যতায় ভরতে থাকে। ঠিক সে সময়ই চারণ কবির সন্ধান পাই আমি। তাকে আমার কবিতা দেখাই। সন্ধ্যার পরপরই তার কাছে আসি। কাছ থেকে তার জীবনযুদ্ধ দেখি। আমার কবিতা নিয়ে পত্রিকায় পাতায় তিনি ছাপান। শনিবারের পত্রিকা দেখার জন্য ছটফট করতে থাকি।
এদিকে মধু খাওয়া শেষে দ্বিচারিণীকে টিকিট চেকার ছুড়ে নর্দমায় ফেলে দিয়েছে। প্রকৃতি তার নিষ্ঠুরতার কঠিন প্রতিশোধ নিয়েছে। সবকিছু হারিয়ে খুঁজতে খুঁজতে মুন্সীগঞ্জে আসেন চারণ কবির স্ত্রী। না। তাকে গ্রহণ করেননি আর। জোছনা রাতের গল্পে ভরা চারণ কবি জীবনযুদ্ধে হাল ছেড়ে দেননি। তার খেরো খাতা নিয়ে মাঝে মাঝে আমি পড়তাম। ছোট্ট ডায়েরি। তাতে জীবন যন্ত্রণার তীব্র কষ্টবোধে ভরা ছিল। খেরো খাতার গল্প পড়তে পড়তে আমার চোখ গলিয়ে অবচেতন মন থেকে কখন যে দু’ফোটা অশ্রু গলে পড়ে তা টের পেতাম না।
চারণ কবির ছেলেমেয়েরা এখন বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন। তিনি তার খেরো খাতা শূন্য করেই নদীর ওপারে নিবিড় অনন্ত জোছনালোকে পাড়ি জমিয়েছেন।
পরপারে ভালো থাকবেন শেখ আলী আকবর। আমার কবিতার গুরু।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ।
তারেক/
.jpg)
.jpg)