পুরান ঢাকা মানেই ইতিহাস, ঐতিহ্য আর নানা রকমের গল্প। এখানকার অলিগলিতে লুকিয়ে আছে শত বছরের ব্যবসা-বাণিজ্যের স্মৃতি। পুরান ঢাকার একটি বিশেষ এলাকা স্বর্ণপট্টি। এখানে গহনা তৈরির কাজ হয়, গলানো হয় পুরনো স্বর্ণ, তৈরি হয় নতুন অলংকার। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই স্বর্ণপট্টির ময়লা-আবর্জনাই অনেক মানুষের জীবিকার উৎস। কারণ সেই ময়লার ভেতরেও লুকিয়ে থাকে খাঁটি স্বর্ণ!
যেভাবে ময়লা থেকে আসে স্বর্ণ
গহনা বানানোর সময় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বর্ণকণা কারিগরের টেবিল, কাপড় বা মেঝেতে পড়ে যায়। কাজের জায়গা ঝাড়ু দিলে বা কাপড় ধুলে যে ধুলো-ময়লা পাওয়া যায়, সেখানেও জমে থাকে সূক্ষ্ম কণা। বছরের পর বছর ধরে এভাবেই দোকানের মেঝে, চুল্লির ছাই কিংবা ড্রেনের কাদায় অজান্তে জমা হয় মূল্যবান ধাতুটি। এই ময়লা সংগ্রহ করেন দরিদ্র শ্রমিকরা বা খুদে ব্যবসায়ীরা।
শুকিয়ে গুঁড়ো করে, পানিতে ধুয়ে বা রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে তারা আলাদা করেন স্বর্ণকণা। সবশেষে ভাটায় গলিয়ে বের করা হয় আসল ধাতু। অনেক সময় দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম শেষে মাত্র কয়েক গ্রাম স্বর্ণ মেলে, আবার কখনো বহু বছরের নর্দমার কাদা থেকেই বের হয় কয়েক ভরি স্বর্ণ। পুরান ঢাকার অনেক পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে এই কাজ করছে। যারা এ কাজে যুক্ত স্থানীয় ভাষায় তাদের বলা হয় ‘নেহারওয়ালা’। ময়লা, নোংরা পানি থেকে নেহারওয়ালারা স্বর্ণ ও রূপার মতো মূল্যবান ধাতু খুঁজে বের করেন। বিশেষ করে নর্দমা, ড্রেনের পাশে রাখা ময়লা, রাস্তার ধূলাবালি থেকে তারা এ সকল মূল্যবান বস্তু খুঁজে বের করেন।
পুরান ঢাকার পান্নিটোলা ও ধলপুর এলাকায় নেহারওয়ালাদের বিচরণ। শুধু তাঁতীবাজারেই ৫০ জনেরও বেশি নেহারওয়ালা কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এরা শুধু যে রাজধানীর মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছেন তা নয়, বাইরেও যান মাঝেমধ্যে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বরিশাল, নরসিংদী ও ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যেখানে জুয়েলারির দোকান বেশি সেখানেও তারা কাজ করতে যান।
পুরান ঢাকার স্বর্ণপট্টির মনিষা জুয়েলার্স নামের একটি দোকানের কর্মচারী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘গহনা বানানোর সময় অনেক কণা ঝরে পড়ে। টেবিল, কাপড় বা চুল্লির পাশে যে ময়লা জমে, তাতেই থেকে যায় এই কণাগুলো। পরবর্তী সময়ে দোকান ঝাড় দেওয়ার সময় এগুলো চলে যায় ড্রেনে। এই ময়লার ভেতর থেকে সংগ্রহ করা হয় মূল্যবান স্বর্ণ।’
প্রায় দুই দশক ধরে এই কাজ করেন শাহাবুদ্দিন। তিনি বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর ধরে পারিবারিক ভাবে আমি এই কাজের সাথে জড়িত। দোকানের ঝাড়ু দেওয়া ময়লা বা নর্দমার কাদা আমি সংগ্রহ করি। এগুলো শুকিয়ে গুঁড়ো করি, তার পর পানিতে ধুই। কখনো রাসায়নিকও ব্যবহার করতে হয়। আবার কখনও হয় না। আমরা যারা এ কাজ করি তাদের প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার টাকার মতো ইনকাম হয়।
তবে এই প্রক্রিয়াটি মোটেও নিরাপদ নয়। স্বর্ণ আলাদা করতে ব্যবহৃত অ্যাসিড ও অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্য স্বাস্থ্যের জন্য ভয়ংকর ক্ষতিকর। অনেক সময় সঠিক সুরক্ষা ছাড়া কাজ করায় শ্রমিকদের শ্বাসকষ্ট, ত্বকের সমস্যা, এমনকি মারাত্মক অসুস্থতাও হয়।
মানুষ বেঁচে থাকার জন্য কত অদ্ভুত পথ বেছে নেয়। স্বর্ণের ঝলকানি যেখানে সবাইকে টানে, সেখানে ময়লার ভেতরও মানুষ খুঁজে নেয় সেই ঝলক। হয়তো এ কারণেই পুরান ঢাকার অলিগলির বাতাসে সব সময় মিশে থাকে এক রহস্য, যেখানে প্রতিদিনকার সাধারণ ধুলোতেও লুকিয়ে থাকে অমূল্য সম্পদ।
তারেক/
.jpg)
.jpg)