মানুষের জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যার ব্যাপ্তি হয়তো বেশি থাকে না, কিন্তু রেশ রয়ে যায় চিরকাল! আমারও তেমনি কিছু মজার স্মৃতি আছে, যা আজও ভুলতে পারিনি! ছোট্ট ঘটনা, কিন্তু আজও আমায় আনন্দ দেয়। আজও মনে পড়ে পুরোনো সেই দিনের কথা।
তখন আমি ক্লাস টুতে পড়ি। আমরা সে সময় চট্টগ্রামের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় থাকতাম। ওখানকারই এক স্কুলে পড়তাম। নাম ছিল, ‘ব্রাইট ফোর টিউটোরিয়াল হোম’। স্কুলে ‘নাহিদ’ নামে আমার এক বন্ধু ছিল। ওরা ছিল আবার চাটগাঁইয়া। নাহিদ ছিল বেশ সহজ-সরল, একেবারেই সাদামাটা। কথায় কথায় হাসি যেন ওর মুখে লেগেই থাকত। দাঁত কেলিয়ে দাঁতের ফাঁকে যা আছে সব দেখিয়ে হাসত সে! একবার স্কুলে এক ম্যাডাম পড়া পারিনি বলে আমাকে বকা দিয়েছিলেন। ম্যাডাম আমাকে শাস্তি দিলেন যেন স্কুল ছুটি হলেও আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি এবং আমার নাকি সেদিন বাড়ি যাওয়া চলবে না। কিন্তু তার সে কথায় নাহিদ ঘোর আপত্তি করে বসল। প্রথমে ম্যাডামকে ভীষণ অনুনয় করলেও, খানিকবাদেই সে শুরু করল সিনেম্যাটিক কান্না। সেকি কান্না তার! চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা দায়। বাংলা সিনেমায় নায়কের বিরহে নায়িকাও বোধহয় এভাবে কাঁদে না। পুরো ক্লাস তখন অবাক। সবাই চেয়ে চেয়ে দেখছে নাহিদের ম্যারাথন কান্না। চলছে তো চলছেই, থামার নাম নেই। সেই বেচারি ম্যাডামের কথা আর কী বলব, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তার মুখখানা তখন দেখার মতো। অন্যদিকে আমার অবস্থাও খুব একটা সুবিধার নয়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রীতিমতো থ বনে গেছি আর ভাবছি, আরে এই ছেলের হলোটা কী। ম্যাডাম বকলেন আমায় আর কেঁদে ভাসাচ্ছে নাহিদ। যেন কেউ পানির লাইন খুলে দিয়েছে আর অঝোর ধারায় ঝরছে চোখের পানি।
ম্যাডাম অবস্থা বেগতিক দেখে খানিক বাদে আমায় বললেন, ‘থাক, অনেক হয়েছে। তোমার আর শাস্তি পেয়ে কাজ নেই। তোমরা দুজনেই বরং এবার বাড়ি যাও। ঘাট হয়েছে আমার।’ সেদিন বাড়ি ফেরার পথে বারবার এ কথা মনে করে আমার হাসি যেন থামতেই চাইছিল না। শেষমেশ নাহিদকে বলেই বসলাম, ‘তুই কি পাগল রে! ম্যাডাম শাস্তি দিলেন আমায় আর চোখের পানি খরচ করলি তুই!’ আমার কথা শুনে সে একগাল হেসে ফেলল। তবে কিছু বলল না। তার কান্নাভেজা চোখ আর ফরসা গাল ফুলে লাল হয়ে গেছে ততক্ষণে! পরে বাড়ি ফিরে পুরো কাহিনি বলতেই সবার হেসে গড়াগড়ি খাওয়ার জোগাড়! এরপর সেই ম্যাডাম অবশ্য আর কোনোদিন আমায় কিছু বলেননি। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন যে, একে কিছু বললে তো আবার কেঁদেকেটে একাকার করবে আরেকজন।
বন্ধু নাহিদ কলা খেতে ভীষণ ভালোবাসত। তবে তার খাওয়ার ধরন ছিল ভিন্ন। পুরো খোসা ছাড়িয়ে গোটা কলা হাতে নিয়ে তারপর সে খাওয়া শুরু করত! আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতাম তার এই রঙ্গ! মনে মনে ভাবতাম, এটা নির্ঘাত কলা খাওয়ার চাটগাঁইয়া স্টাইল! তবে এ নিয়ে তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে সে শুধুই হাসত! তার সেই ট্রেডমার্ক দাঁত কেলানো হাসি!
পরে অবশ্য ওই এলাকায় আমরা আর বেশিদিন ছিলাম না। বাসা পাল্টে ফেলেছিলাম। এখন নাহিদের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ নেই আমার। আজ বহু বছর হয়ে গেছে আমাদের শেষবার দেখা হয়েছিল! জানি না সে এখন কেমন আছে! ওর কথা এখনো আমার মাঝে মাঝেই মনে পড়ে! মনে পড়ে তার সেদিনের কান্নাভেজা সরল মুখচ্ছবি! স্মৃতিতে আজও জ্বলজ্বল করে স্কুলের সেই দৃশ্য, আমি শাস্তি পেয়েছি বলে একটি ছেলের চোখ ছলছল করছে!
অন্য এলাকায় চলে আসার পর যথারীতি স্কুল পাল্টে যায়। নতুন স্কুলে নতুন বন্ধুবান্ধবও জুটে গিয়েছিল আমার। তবে কারও মাঝে নাহিদের ছায়া দেখেনি আর। বড় স্কুলে সবকিছুই যেন বড় ছিল। বড় ক্লাসরুম, বড় খেলার মাঠ। এমনকি লাইব্রেরিটাও ছিল বিশাল। আবার ছাত্রছাত্রীও ছিল অনেক। কিন্তু সব থেকেও যেন কোথাও কিছু একটার খামতি ছিল সব সময়। মনে হতো যেন বিশেষ কেউ একজন নেই। এত সবের মাঝেও আমি খুঁজে ফিরতাম আমার আগের সেই ছোট্ট স্কুল। বড্ড মিস করতাম ছোট্ট ক্লাসরুমে টিফিন পিরিয়ডের সেই হইচই আর একে অপরের টিফিন নিয়ে কাড়াকাড়ি। মিস করতাম স্কুল ভবনের সামনে বিছানো ছোট্ট সেই বালুকাবৃত খেলার মাঠ। অবিচল খুঁজে বেড়াতাম মায়া ভরা ছোট্ট মুখের সেই সাদাসিধে ছেলেটাকে। সেই নাহিদকে। আমার বন্ধু নাহিদকে।
১০৪/০৫, রেলওয়ে হাউজিং সোসাইটি
আকবরশাহ মাজার, পাহাড়তলী
চট্টগ্রাম।
তারেক/
.jpg)
.jpg)