মেট্রো থেকে নেমে সোহরাওয়ার্দী প্রাঙ্গণে ঢুকছি। প্রবেশের ডান দিকে শিশুচত্বর। সেদিকে এগুতে গিয়েই হোঁচট খেলাম। পুরো চত্বরটার কোথাও ইটবিছানো, কোথাও ঘাসহীন ধূসরতা। উঁচু-নিচু অসমান এলাকা বলে হোঁচট খেতে হলো। শিশুদের বইপ্রেম কতটা সেটা বোঝার জন্যই প্রথমবারের মতো সরাসরি শিশুচত্বরে ঢুকেছি। অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের বইপাঠে কতটা আকৃষ্ট করছেন, সেটাও বুঝতে চাইছিলাম। কিন্তু আমাকে হতাশ হতে হলো। অধিকাংশ স্টলেই শিশুদের অনুপস্থিতি পীড়া দিল।
ঢুকলাম শিশুচত্বরের কিন্ডার বুকসে। বইয়ের প্রচ্ছদ কতটা নান্দনিক, দেখতে কতটা সুন্দর, স্টলের বাইরে থেকে চোখ দিয়ে পরখ করে তারপর আমার কিন্ডার বুকসে ঢোকা। এদের বইকেই মনে হলো শিশুদের উপযোগী করে প্রকাশ করছে। বিক্রয়কর্মী মেয়েটি দেখালেন নতুন প্রকাশিত কয়েকটি বই। চার্লস ডিকেন্সের ‘আ ক্রিসমাস ক্যারল’, ‘হেইডি’, ‘রবিন হুড’, ‘রবিনসন ক্রুসো’, ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’, ‘গালিভার্স ট্রাভেল’। এসব বই বাংলাদেশে কিশোর পাঠকদের উপযোগী করে বিভিন্ন প্রকাশনী প্রকাশ করে আসছে। নতুন করে কিন্ডার বুকসও করল। নতুনত্ব তেমন নেই, তবে যা আছে সেটা হলো এদের বইয়ের অলঙ্করণ বেশ সুন্দর। শিশুরা হাতে নিয়ে আনন্দ পাবে। প্রলুব্ধ হবে পড়তে। শিশু-কিশোরদের বই তো এমনই হওয়ার কথা। আমি স্টলটিতে থাকতেই এক কিশোরী একটা বই আছে কি না জেনে কিনলো। বইটির নাম ‘সাইবার বন্ধুর ফাঁদ’। সাইবার জগৎ যে কখনো কখনো শিশুদের জন্য ফাঁদ হয়ে উঠতে পারে, বইটা তাই নিয়ে লেখা। বিষয় সময়োপযোগী। কিন্তু অন্য বই ছাপিয়ে নাসরিন জাহানের ‘ভাল্লুক কন্যার পিঁপড়ে বন্ধু’ বইটি আমাকে বেশ আকৃষ্ট করল।
কিন্ডার বুকসের ঠিক উল্টো দিকে ময়ূরপঙ্খির স্টল। এরা কেবল যারা পড়া শিখছে, লেখা শিখছে, সেই শিশুদের জন্য বই প্রকাশ করে। প্রতিবছর মেলায় স্টল দেয়। এবারও দিয়েছে। তাদের প্রকাশিত দুটো নতুন বইয়ের হদিস মিললো- ‘শিমুল তুলার দেশ ভ্রমণ’ এবং ইংরেজিতে প্রকাশিত ‘ওয়ান লাস্ট ট্রাই’। আরও দু-তিনটি স্টলে উঁকিঝুকি দিলাম, কিন্তু দৃষ্টিনন্দন ভালো বই চোখে পড়ল না। শিশুচত্বর থেকে যখন বেরুবো তখন এই চত্বর ঘেঁষে ডেটল ও হারপিকের হাইজিন কারিকুলামের একটা খোলা স্টলের দেখা পেলাম। সেখানে বই নেই, আছে ডেটল আর হারপিকের প্রচার। কিডস্ জোন, যেখানে শিশুদের খেলার ব্যবস্থা আছে।
শিশুচত্বর প্রায় পাঠকশূন্য দেখলেও সোজা হাঁটতেই একসারি প্যাভিলিয়ন পেয়ে গেলাম। সব প্যাভিলিয়নের সামনেই পাঠকের ভিড়। অনন্যার কোন বইগুলো ভালো বিক্রি হচ্ছে জিজ্ঞেস করতেই উত্তর পেলাম- ইমদাদুল হক মিলনের নতুন আসা উপন্যাস ‘রহস্যময় জঙ্গলবাড়ি’, মোস্তফা কামালের ‘গুপ্তধন ও অপু’, শাহ আলম সাজুর ‘চার গোয়েন্দা ভয়ংকর জঙ্গলে’, নাহিদ নার্মের ‘ডেকেছিল তাহারা যখন’, তৌহিদুর রহমানের ‘স্বপ্নকথন’।
পাশেই ঐতিহ্যের প্যাভিলিয়ন। সেখানেও পাঠক সমাগম চোখে পড়ার মতো ছিল। আমার চোখ গেল একজন পুলিশ অফিসারের দিকে। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বই কিনছেন?’ বললেন, ‘হ্যাঁ’। ‘কী ধরনের বই পছন্দ?’ উত্তর: ‘ইতিহাসের বই পড়তে ভালোবাসি।’ আমার কৌতূহল দেখে সদ্য কেনা একটা বই দেখালেন- ‘ট্রাভেলস অব ইবনে বতুতা’। সঙ্গে স্ত্রী ও কন্যা কি না জিজ্ঞেস করতেই হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলেন। কন্যার নাম ওয়াইজা, নার্সারিতে পড়ে। দেখলাম সঙ্গে থাকা একজনের হাতে কন্যার জন্য কেনা বইয়ের বেশ কয়েকটি ব্যাগ/প্যাকেট। কন্যাকে, ‘এগুলো তোমার বই’ জিজ্ঞেস করতেই বেশ উৎফুল্ল হয়ে ব্যাগ ছুঁয়ে দেখালো। বইগুলো তারই সম্পদ। আমার মনটা ভরে গেল। এই পুলিশ অফিসারের নাম তারিকুজ্জামান। ধানমন্ডি জোনের এসি হিসেবে কর্মরত আছেন। মেলায় এসেছেন বই কিনতে। প্রতিবছর তিনি অনেক বই কেনেন। নিজের ভিজিটিং কার্ড দিয়ে আমন্ত্রণ জানালেন তার অফিসে। ঐতিহ্যে নতুন এসেছে আনোয়ার হোসেইন অনূদিত দ্বিপদী কবিতার সংকলন, ‘মির্জা গালিবের রক্তের অশ্রু’।
দুই পা এগোতেই আদর্শের প্যাভিলিয়ন। সেখানে তিনটি বই বেশ নজরকাড়া অবস্থায় রাখা- ‘খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব, উন্নয়ন ও কৌশল’, ‘বিএনপির ৩১ দফা’ ও ‘তারেক রহমান: সংগ্রাম ও রাজনৈতিক যাত্রা’। বই তিনটির লেখক ও সম্পাদনায় মারুফ মল্লিকের নাম মুদ্রিত রয়েছে। ইতি নামে বইমেলায় লেক ঘেঁষে জাতীয়তাবাদী প্রকাশনা সংস্থার একটি নান্দনিক প্যাভিলিয়ন আছে। সেই প্যাভিলিয়নের চারপাশে দেখলাম অনেকেই নানা ভঙ্গিতে ছবি তুলছেন।
আদর্শের কাছেই কথাপ্রকাশের প্যাভিলিয়ন। এখন পর্যন্ত মেলায় তাদের বেশি বিক্রি হওয়া বই হচ্ছে দুটো- হরিশঙ্কর জলদাসের ‘শূর্পণখা’ ও বিশিষ্ট চিন্তক ও লেখক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘উন্নতি, উত্থান ও অভ্যুত্থান’।
বইমেলায় যতই পরিভ্রমণ করছিলাম, ততই পাঠকের দেখা পাচ্ছিলাম। গতকাল যারা এসেছেন তাদের অধিকাংশই ছিলেন পাঠক। প্রকৃত পাঠক। বিগত কুড়ি দিনে মেলায় বিচিত্র ধরনের পাঠক দেখেছি। নিম্নবিত্ত শ্রেণির দম্পতি থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত তরুণের হাত ধরে চলা তরুণী, বোরকা পরিহিতি নারী ও শশ্রুমণ্ডিত পুরুষ থেকে আধুনিক পোশাকের অনেক তরুণ-তরুণীসহ কিশোর-কিশোরীদের চোখে পড়েছে। তবে গতকালই দেখলাম, প্রকৃত পাঠকের বেশ আগমন ঘটেছে। বইমেলার আবহও ছিল অন্যরকম। স্টল ও প্যাভিলিয়নগুলোতে উৎসুক পাঠকের ভিড়। সর্বত্রই এটা চোখে পড়েছে।
কুড়িতম দিনে বইমেলা তার আসল মেজাজ ফিরে পাচ্ছে। কিন্তু এর মাঝেও কীসের যেন অভাব। পাঠক সমাবেশের প্যাভিলিয়নে দেখা হলো বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত অনুবাদক আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়ার সঙ্গে। তিনি সে কথাটাই বললেন, ‘আমরা সবসময় বইমেলাকে এক ধরনের উচ্ছ্বাস ও প্রাণবন্ত মেজাজে দেখে আসছি। কিন্তু এবার সেরকম দেখছি না। তবে পাঠক আসছেন, এটাই স্বস্তির। বাংলাদেশের মানুষ বই পড়ুক, মানবিক হোক, এরকমটাই প্রত্যাশা করি।’