দীর্ঘদিন ধরে সমাজে একা থাকা নারীকে নিয়ে প্রচলিত কিছু স্টেরিওটাইপ প্রচলিত রয়েছে। যেমন- ‘বৃদ্ধা কুমারী’, ‘বিড়ালপ্রীত একা মহিলা’ কিংবা ‘অসহায় নারী’। সিনেমা, উপন্যাস এমনকি জনপ্রিয় কথাবার্তাতেও এই চিত্রই বেশি দেখা যায়- সোফায় বসে আইসক্রিম খেতে খেতে কাঁদছেন বা একা একা টিভি দেখছেন। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এ সময়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন গল্প। গবেষণা বলছে, আজকের একক নারীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সুখী, আত্মনির্ভরশীল এবং মানসিকভাবে পরিপূর্ণ জীবনযাপন করছেন।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে একক নারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০১৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে অবিবাহিত নারীর সংখ্যা প্রতি বছর প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ হারে বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে, যা পুরো জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার থেকেও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে শিক্ষা, পেশা ও আত্মনির্ভরতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠা।
একসময় নারীর বেঁচে থাকার নিরাপত্তা নির্ভর করত বিয়ের ওপর। অথচ ১৯৭৪ সালের আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে নারীরা নিজেদের নামে ক্রেডিট কার্ড পর্যন্ত নিতে পারতেন না। সেই সীমাবদ্ধতা আজ নেই। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আর্থিক স্বাধীনতা এখন নারীদের এমন অবস্থানে নিয়ে গেছে যেখানে বিয়েকে তারা জীবনের ‘অপরিহার্য ধাপ’ বলে মনে করেন না।
মনোবিজ্ঞানী বেলা ডিপাওলো বলেন, ‘আজ একা থাকা অনেক সহজ ও আনন্দের। আপনি রান্না না করতে চাইলে খাবার পেয়ে যান হাতে, ঘর পরিষ্কার রাখতে সাহায্যকারী আছে, এমনকি বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেও প্রযুক্তি আপনাকে এক মুহূর্তের জন্যও একা রাখে না।’
সম্পর্কের জটিলতা ও নারীর বাস্তবতা
আধুনিক ডেটিং বা সম্পর্কের দুনিয়া আজ অনেক নারীকে হতাশ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টিন্ডার কিংবা বাম্বল- সবখানেই সুযোগ প্রচুর, কিন্তু সম্পর্কগুলো অধিকাংশ সময়ই হয় উপরের দিকের, গভীরতা হারায় দ্রুত। সাইকোথেরাপিস্ট লিয়া আগুইরের ভাষায়, ‘নারীরা এখন চায় এমন সম্পর্ক যেখানে সমতা, পারস্পরিক সম্মান এবং আবেগিক বোঝাপড়া থাকবে। কিন্তু এই মানের সঙ্গী খুঁজে পাওয়া কঠিন।’
এজন্য অনেক নারী একা থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। একা থাকলে নিজের সময়, পছন্দ ও মানসিক শান্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে। গবেষণায়ও দেখা যাচ্ছে, নারীরা ক্রমেই আত্মমর্যাদা ও মানসিক ভারসাম্যকে সম্পর্কের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, একক নারীরা গড়ে একক পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি সুখী। তাদের জীবনে আত্মতৃপ্তি, মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি, এমনকি যৌন সন্তুষ্টিও বেশি। নারীবিষয়ক গবেষক ইলেইন হোয়ান বলেন, ‘এই ফলাফল সমাজে প্রচলিত ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। নারীরা একা মানেই দুঃখী- এই ধারণা এখন ভাঙছে।’
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, নারীরা সাধারণত পুরুষদের তুলনায় শক্তিশালী সামাজিক নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারেন। তাদের আবেগিক সহায়তার উৎসও বহুমুখী- বন্ধু, পরিবার, সহকর্মী এমনকি অনলাইন কমিউনিটি। অন্যদিকে অনেক পুরুষের একমাত্র আবেগিক আশ্রয় হয় প্রেমিকা বা স্ত্রী। ফলে সম্পর্ক ভেঙে গেলে বা একা থাকলে তারা বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।
অন্য এক গবেষণায় দেখা যায়, একক নারীরা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি সুখী হন। কারণ সময়ের সঙ্গে তারা নিজের চাহিদা, সীমা ও জীবনের লক্ষ্য পরিষ্কারভাবে বুঝে ফেলেন। নিউইয়র্কের একক নারী জেসিকা (৩৯) বলেন, ‘আগে ভাবতাম, ৪০ বছর বয়সে নিশ্চয়ই আমার বিয়ে হয়ে যাবে। কিন্তু আজ আমি বুঝি, আমি নিজেকে যেমন পেয়েছি, তাতে অন্য কারও অনুমোদনের দরকার নেই।’
স্বাধীনতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক
কানাডার গবেষক কিম্বারলি মার্টিনেজ ফিলিপস তার ২০২৪ সালের গবেষণায় দেখিয়েছেন, একক নারীরা মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে অধিক সচেতন। তারা একা সময় কাটাতে জানেন, নিজের মনের শান্তি রক্ষা করতে জানেন এবং প্রয়োজনে থেরাপি বা কাউন্সেলিংয়ের সাহায্য নিন। তার ভাষায়, ‘এই নারীরা নিজেদের জন্য একটি মানসিক দুর্গ তৈরি করেছেন- যেখানে শান্তি ও স্বাধীনতাই তাদের পরম সম্পদ।’ এই স্বাধীনতা অনেক সময়ই সম্পর্কের চেয়ে বেশি স্বাস্থ্যকর প্রমাণিত হচ্ছে। কারণ, নারী তার নিজের প্রয়োজন ও মানসিক প্রশান্তিকে অগ্রাধিকার দিতে পারছে।
একক নারীরা সমাজকে শিখিয়ে দিচ্ছেন- সুখ মানে শুধু প্রেম বা সংসার নয়। সুখ মানে নিজের সঙ্গে ভালো থাকা, বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং নিজের সময়টুকু নিজের মতো করে উপভোগ করা। মনোবিজ্ঞানী ফিলিপস বলেন, “বিমানে যেমন বলা হয়, ‘প্রথমে নিজের অক্সিজেন মাস্ক পরুন’ তেমনি নারীরা এখন বলছেন, ‘প্রথমে আমি নিজেকে গুরুত্ব দেব।’ এতে স্বার্থপরতা নয়, বরং আত্মসম্মানের প্রকাশ ঘটে।”
শেষ পর্যন্ত, বিবাহিত হোন বা না হোন, নারীর মূল্য তার সম্পর্কের অবস্থানে নয়- তিনি কীভাবে সমাজে অবদান রাখছেন, কীভাবে নিজেকে ভালো রাখছেন, সেটাই মুখ্য। একক নারীদের এই নতুন জীবনদর্শন আমাদের শেখায়- সম্পূর্ণতা কারও সঙ্গে নয়, নিজের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়।
তথ্য সূত্র: উইমেন্স হেলথ ম্যাগাজিন
/এস লুপিন
.jpg)