নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড শহরঘেষা সমুদ্রতীরবর্তী ছোট্ট শহর পিহা। পর্যটন, সার্ফিং আর কালো বালুর সৈকতের জন্য পরিচিত গত তিন দশকে নিখোঁজ হয়েছেন অন্তত ছয়জন মানুষ! নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে এই ধরনের ঘটনা খুবই বিরল।
আলোচিত ও অস্বাভাবিক এসব নিখোঁজ রহস্য আজও সমাধান হয়নি। একারণে এই অঞ্চকে ঘিরে আজকাল ডালপালা মেলছে নানান ভৌতিক গল্প।
২০০৪ সালে এক ঝড়েড় রাতে নিখোঁজ হন ২৫ বছরের ইরেয়না অ্যাশার। নিখোঁজ হওয়ার আগে তিনি পুলিশকে ফোন করে সাহায্য চেয়েছিলেন।
পুলিশ তাকে ট্যাক্সি পাঠানোর কথা জানালেও তিনি বারবার অনুরোধ করেন, ‘আমি একা এটা পারব না, দয়া করে অফিসার পাঠান।’ কিন্তু সেদিন পুলিশের পাঠানো ট্যাক্সি ভুল ঠিকানায় চলে যায়। এরপর স্থানীয় এক পরিবার তাকে আশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু রাতের আঁধারে হঠাৎই তিনি বেরিয়ে যান, আর শেষবার তাকে দেখা যায় সৈকতের দিকে হাত উঁচু করে দৌড়ে যেতে। তারপর থেকেই তিনি নিখোঁজ।
পিহা বা এর আশপাশে এলাকা থেকে অ্যাশারের ঘটনার আগে-পরে আরও পাঁচজন এভাবে হারিয়ে গেছেন। এর মধ্যে ১৯৯২ সালে ১৮ বছরের কুয়েন্টিন গডউইন মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফেরেননি। ২০১২ সালে মের্সার বে ট্রেইলে হাঁটতে গিয়ে হারিয়ে যান ৪২ বছরের শেরি ভউসডেন। ২০১৫ সালে একই ট্রেইলে দৌড়াতে গিয়ে হারিয়ে যান কিম ব্যাম্বাস নামে ২১ বছরের বছরের এক নার্স। অনেক খুঁজেও তার কোনো হদিস মেলেনি।
২০১৯ সালে লরেন্স উ নামের এক তরুণের গাড়ি সৈকতের কাছে পাওয়া যায়, কিন্তু তাকে আর পাওয়া যায়নি। ২০২০ সালে ১৮ বছরের ফরাসি ছাত্র এলোই রোলানকে পিহার পথে হেঁটে যেতে দেখা গিয়েছিল শেষবার।
অদ্ভুত বিষয় হলো—এই ছয়জনের কোনো পোশাক, জুতো কিংবা দেহাবশেষ কখনোই পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন ধরে পিহার মানুষদের মনে প্রশ্ন রয়ে গেছে—একই অঞ্চলে ছয়জন মানুষ কেন এমনভাবে নিখোঁজ হবে?
এই প্রশ্নকে সামনে রেখেই ২০২৪ সালে মুক্তি পায় চার পর্বের সত্য-অপরাধ বিষয়ক ডকুমেন্টারি ‘ব্ল্যাক কোস্ট ভ্যানিশেজ’। এই চলচ্চিত্রটি ভুক্তভোগীদের পরিবার, স্থানীয় মানুষ ও বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব হাজির করে।
কেউ বলে থাকেন ওই এলাকায় গোপন অপরাধচক্রের ছায়া আছে, আবার কারও ধারণা—একজন সিরিয়াল কিলার সক্রিয় ছিল সেখানে। সাবেক মেয়র ও লাইফগার্ড স্যার বব হার্ভি জানান, তারা সবাই অপহৃত হয়েছেন। কোনো চিহ্ন না রেখে ছয়জনের হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক নয়।
পিহার সৌন্দর্যের সঙ্গে বিপদও লুকিয়ে আছে। এটি নিউজিল্যান্ডের দ্বিতীয় সর্বাধিক বিপজ্জনক ডুবোজলে মৃত্যুর স্থান। বিশাল ঢেউ, বিপজ্জনক স্রোত ও দুর্গম পাহাড়ি পথ অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
স্থানীয় সার্ফ ক্লাবের স্বেচ্ছাসেবকেরা প্রায়ই নিখোঁজদের খোঁজে বের হন। তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—কীভাবে ছয়জন মানুষ একেবারে উধাও হয়ে যায়, কোনো চিহ্ন ছাড়াই?
সম্প্রতি পিহা নিয়ে নির্মান করা ডকুমেন্টারি ‘ব্ল্যাক কোস্ট ভ্যানিশেজ’-এর নির্মাতারা স্বীকার করেছেন—তারা প্রমাণ করতে চাননি যে, সিরিয়াল কিলার ছিল। বরং তারা দেখাতে চেয়েছেন, কীভাবে ছোট্ট এক সম্প্রদায় অমীমাংসিত রহস্যের ছায়ায় বেঁচে থাকে।
তবে সিরিজে স্থানীয় নারীদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। তারা নাকি প্রায় সময়ই অনুসরণের শিকার হন। তাদের সঙ্গে মাদক প্রয়োগ বা যৌন সহিংসতার ঘটনাও ঘটে।
সুলতানা দিনা/