প্রাণিজগতে একমাত্র মানুষই কথা বলতে পারে। মনের ভাব প্রকাশ করার এই ক্ষমতা আর কোনো প্রাণীর নেই। তাদের স্বরযন্ত্র থাকলেও মস্তিষ্কের যে অংশ চিন্তাভাবনার কাজ সম্পন্ন করে, তার সঙ্গে স্বরযন্ত্রের সংযোগ নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, বানর গোত্রের প্রাণীদের স্বরতন্ত্র অর্থবহ শব্দ তৈরির জন্য উপযুক্ত। কিন্তু তার পরও কথা বলতে না পারার কারণ স্বরযন্ত্রের সঙ্গে মস্তিষ্কের সংযোগ ব্যবস্থার অভাব। এই সংযোগসাধন মানুষের থাকলেও কথা বলা বা ভাষা আয়ত্ত করা কিন্তু একদিনে সম্ভব হয়নি। মানুষ আদিম যুগে পাহাড়ের গুহায় থাকত। সেখানে গুহাচিত্র এঁকে দলের অন্য সদস্যদের বুঝিয়ে দিত, শিকারের সময় কে কোথায় থাকবে, কার ভূমিকা কী হবে ইত্যাদি। তখনো মানুষ ভাষা পুরোপুরি রপ্ত করতে পারেনি।
বর্তমানে পৃথিবীতে মানুষ প্রায় সাত হাজার ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলে। কিন্তু ঠিক কবে কোন প্রাচীনকালে ভাষার প্রচলন শুরু হয়েছিল তা জানা সম্ভব হয়নি। তবে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে ভাষার উৎপত্তি পাঁচ লাখ বছরের পুরোনো। নৃবিজ্ঞানীরা মনে করেন, ভাষার উৎপত্তির ঘটনা ইতিহাসে এক জায়গায় শুরু হয়ে বিশ্বময় ছড়িয়েছে। বিশ্বের সব জায়গায় প্রচলিত মানব ভাষাগুলোর মধ্যে গাঠনিক সাদৃশ্য থেকেই বিজ্ঞানীদের এমন অনুমান। জীববিজ্ঞানের বিবর্তনের ইতিহাসের সূত্র ধরে জিন-বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, পৃথিবীর প্রাচীনতম মানুষেরা বসতি গেড়েছিল আফ্রিকায়। তার মানে ধরে নেওয়া যায় আফ্রিকা হতেই সব ভাষার উৎপত্তি। ভাষার এই তালিকার বাইরেও হয়তো অন্যান্য ভাষাও থাকতে পারে। কিন্তু আজকের দিনে যেসব ভাষায় কথা বলতে শোনা যায়, সেগুলোর সবই সম্ভবত এই এক ভাষা থেকে বিবর্তিত হয়েছে।
আধুনিক গবেষণায় জানা গেছে, শিশুর ভাষার বিকাশ শুরু হয় মাতৃগর্ভ থেকেই। গর্ভের শিশু মা-বাবার কণ্ঠস্বর শুনতে পায় ও বুঝতে চেষ্টা করে এবং তখন থেকেই তার শব্দভাণ্ডারে শব্দ সঞ্চয় করতে থাকে। শিশু জন্মের পর থেকেই মায়ের হাসি, কথা বলার ভঙ্গি, মনের ভাব প্রকাশের পদ্ধতি দেখে শেখে। কথা বলতে শেখার আগে থেকেই স্বপ্ন দেখা শেখে। তাই মায়ের ভাষা শিশুর মনোজগতের বিকাশে বিশেষ অবদান রাখে। মা ও শিশুর মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এভাবে মাতৃভাষা মানুষের মেধা শাণিত করে।
মাতৃভাষার পাশাপাশি অন্য এক বা একাধিক ভাষা জানার অনেক সুফলের কথা জানিয়েছেন গবেষকরা। দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যেসব শিশু মাতৃভাষার পাশাপাশি অন্য এক বা একাধিক ভাষা শেখে, তারা অন্যদের চেয়ে যেকোনো বিষয়ে গভীর মনোযোগ দিতে পারে। সমস্যার সমাধানে এ ধরনের শিশুদের মস্তিষ্ক দ্রুত কাজ করে। শিশু ছাড়াও প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে একাধিক ভাষা জানা লোকদের মস্তিষ্কে স্বয়ংক্রিয় মেরামত পদ্ধতি শক্তিশালী হয়। জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ থাকে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, একাধিক ভাষা জানা থাকলে মানসিকভাবেও সুস্থ থাকা সহজ হয়।
জাহ্নবী