জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। এই পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ইনটেনসিটি এবং ফ্রিকোয়েন্সি বাড়তে থাকে। আগামীতে এটি আরও বেশি তীব্রতর হবে এবং এর ঘনত্ব বাড়বে। বিশ্বের বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ইত্যাদি গ্যাসের পরিমাণ বেড়েই চলেছে এবং বিশ্ব ক্রমান্বয়ে আরও উষ্ণ হচ্ছে। এ বিষয়ে বিশ্বের প্রতিটি দেশ বিজ্ঞানসম্মত সমীক্ষার ভিত্তিতে উষ্ণতা বাড়ার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে একমত হয়েছে।
বাংলাদেশ যেহেতু প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ, আমরা বহুলাংশে এটি মোকাবিলা করার ক্ষমতা অর্জন করেছি। আমাদের যেমন উপকূলজুড়ে বেড়িবাঁধ আছে, পৃথিবীর অনেক দেশেই তা আছে। যদিও আমাদের এগুলোকে সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা যাচ্ছে না- সরকার খেয়াল রাখলেই এ ব্যাপারে উন্নতি করা যেতে পারে। প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশকে আরও বেশি অগ্রগামী হতে হবে। বাংলাদেশ নিজেদের অর্থ ব্যয় করে যে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, সেগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মিল রেখে অতিরিক্ত যে খরচ লাগবে- এতে সরকারিভাবে খরচ বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে, তা মোকাবিলা করার লক্ষ্যে সক্ষমতা অর্জন করা দরকার।
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের প্রতিটি খাতকেই প্রভাবিত করবে। একই সঙ্গে প্রতিটি খাতের কর্মকাণ্ডে জলবায়ু পরিবর্তনকে যোগ করতে হবে। কিন্তু আমরা এ ধরনের কোনো লক্ষণ দেখছি না।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘থ্রি জিরো’ নামে বই লিখেছেন। এর একটা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে কাজ করা। জলবায়ু পরিবর্তন ড. ইউনূসের তিনটি শূন্যের একটি শূন্য। বাকি দুটি শূন্য হলো সবার জন্য উপযুক্ত জীবিকার ব্যবস্থা করা এবং দেশে দারিদ্র্য যেন না থাকে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। জীবিকার ব্যবস্থা, দারিদ্র্য হ্রাস আর জলবায়ু পরিবর্তন- এই তিনটি যদি আমরা একসঙ্গে দেখি, তাহলে বলব, আমরাই মূলত এই ফরমুলা তৈরি করছি। কিন্তু তার জন্য আমাদের বসে না থেকে, কারও দিকে আঙুল না তুলে আমাদের যা করণীয় এবং যা আমরা করতে পারি- সেটা করা উচিত। আমাদের স্থানীয় সরকার, কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য মন্ত্রণালয়, ইভেন্ট অ্যাফেয়ার্স, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়- প্রত্যেককেই জলবায়ু পরিবর্তনকে তাদের কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে। আমাদের দেশে এখনো প্রতিটি মন্ত্রণালয় তার জগতে বাস করে। বাকি মন্ত্রণালয় যেমন- স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সব মন্ত্রণালয়কে জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারে দায়বদ্ধতা মেনে নিতে হবে। সবকিছুতে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দিকে আঙুল তুললে হবে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরামর্শ দিতে পারে এবং তারা বিদেশের সঙ্গে কথা বলতে পারে।
বর্তমানে ঢাকা শহর মারাত্মক বিপদের সম্মুখীন। কারণ, যেকোনো সময় ২০০, ২৫০, ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে। ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেই ঢাকার ৮০ ভাগ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাবে। এ জন্য কি সরকার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় তথা সিটি করপোরেশন কিছু করেছে? ভবিষ্যতে শুধু ঢাকা শহর নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি শহরের একই অবস্থা হবে। এসব বিষয়ে আমাদের ভাবতে হবে। জলাবদ্ধতার পাশাপাশি বলব, বায়ুদূষণে ঢাকার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। বায়ুদূষণের প্রধান উৎস চিহ্নিত হয়েছে এবং পরিমাণটাও নির্ধারিত হয়েছে। আমার অভিযোগ হচ্ছে, নির্মাণসামগ্রী ব্যবস্থাপনা। দেশ বড় হচ্ছে। মানুষের অবস্থা পরিবর্তন হচ্ছে। ভবন নির্মাণ প্রয়োজন, বাড়িঘর নির্মাণ প্রয়োজন, রাস্তাঘাট নির্মাণ প্রয়োজন। এই কাজে বালু, ইট ও সিমেন্ট ব্যবহার হয়। এগুলোকে আমরা যথাযথভাবে ঢেকে রাখি না। সামান্য বাতাসেই এগুলো থেকে প্রচুর ধুলা ওঠে। এই সূক্ষ্ম বালুকণা যদি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে, সেখানে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। যেখানে রাস্তা নির্মাণ হচ্ছে, সেখানে মাটি শুকাতে দেওয়া যাবে না। পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখতে হবে। যেখানে বালু রাখা আছে- বালুকে ভিজিয়ে রাখলেই হলো। যেখানে ইট স্তূপ করে রাখা আছে- সেটাকে ভিজিয়ে রাখলেই কিন্তু এই ক্ষুদ্র ধূলিকণার উৎপত্তি হয় না। এটা অবশ্যই সহজ কাজ। এটার জন্য যারা নির্মাণ করছেন, সরকারি নির্মাণকাজ বা বেসরকারি নির্মাণকাজ, ব্যক্তিগত নির্মাণকাজ- তারা এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের নানা ধরনের অবহেলার কারণে কাজগুলো সঠিকভাবে হয় না। ফলে ঢাকার বায়ুদূষণ ক্রমাগত বাড়ছেই। জলবায়ু পরিবর্তনের এটি একটি বড় কারণ। কাজেই আমি মনে করি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিটি বিরূপ ক্রিয়া বিবেচনায় এনে বাংলাদেশের উচিত অভিযোজনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা। পৃথিবীর প্রতিটি দেশ তার অবস্থানের ভিত্তিতে নিজের দেশের জন্য অভিযোজনের লক্ষ্য ঠিক করে নিতে পারে এবং পরে সব দেশের লক্ষ্যমাত্রা মিলিয়ে একটি বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। কাজেই এই ক্ষতি মোকাবিলায় অভিযোজনের কাজে সক্ষমতা অর্জন অত্যন্ত জরুরি। এ কাজে জাতীয় মহাপরিকল্পনা তৈরি হয়েছে। সেক্ষেত্রে সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের যথোপযুক্ত ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে এ কাজে বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করা জরুরি।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ


