এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির নয়াদিল্লি সফর শুধু আরেকটি সাধারণ কূটনৈতিক সফর ছিল না। এই সফর প্রতিফলিত করে যে, অনিশ্চয়তা এবং বদলে যাওয়া নতুন আঞ্চলিক পরিবেশে কীভাবে পুরোনো সম্পর্ককে আবার কার্যকর করে অগ্রসর হওয়া যায়।
আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম রাষ্ট্র সম্পর্কের একটি। আধুনিক রাষ্ট্রিক পরিসীমা, অর্থাৎ সীমান্ত আবিষ্কারের অনেক আগেই এর সূচনা ঘটেছিল। তবু সাম্রাজ্য, দেশভাগ, স্নায়ুযুদ্ধ এবং আজকের পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতির মধ্য দিয়ে সভ্যতার এই বন্ধন বারবার পরীক্ষার মুখে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির নয়া দিল্লি সফর শুধু নিরীহ কোনো কূটনৈতিক সফর ছিল না। সফরটি বুঝিয়ে দেয়, অনিশ্চয়তা এবং পরিবর্তিত নতুন আঞ্চলিক পরিবেশে কীভাবে পুরোনো সম্পর্ক পুনর্নির্মিত ও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
বাণিজ্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশ এবং আফগানিস্তানের মধ্যে সেই সিন্ধু সভ্যতার কালেই সংযোগ স্থাপিত হয়েছিল। সম্রাট অশোকের অধীনে মৌর্য সাম্রাজ্য কান্দাহার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আফগান শিলাখণ্ডে গ্রিক ভাষায় খোদাই করা অশোকের শিলালিপি থেকে বোঝা যায়, কীভাবে এই অঞ্চলগুলো একসময় ভাগাভাগি করে নেওয়া একই সাংস্কৃতিক বিশ্বের অংশ ছিল। আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের কিছু অংশ জুড়ে বিস্তৃত প্রাচীন গান্ধারা অঞ্চলটি একসময় বৌদ্ধশিল্প এবং শিক্ষার মহান কেন্দ্র ছিল। ২০০১ সালে তালেবানদের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বামিয়ান বুদ্ধমূর্তিগুলো ১৫শ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেই অবিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক অতীতের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল।
উপমহাদেশে সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের আগমন ঘটে, কিন্তু সেই বন্ধন কখনো ছিন্ন হয়নি। আফগান শাসকরা ভারতের ইতিহাসকে নানা ঘটনা পরম্পরায় নির্মাণ করে গেছেন। গজনভি, ঘুরি, লোদি ও মুঘল সবাই দিল্লিতে রাজবংশ প্রতিষ্ঠার জন্য গিরিপথ অতিক্রম করে ভারতে ঢুকেছিলেন। ১৫২৬ সালে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার আগে সম্রাট বাবর কাবুল শাসন করেছিলেন।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এই গতিপথকে বদলে দেয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে সংঘটিত দুটি ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ আফগানিস্তানকে ব্রিটেন ও রাশিয়ার মধ্যে মহাযুদ্ধের দাবার ঘুঁটি করে তোলে। ১৮৯৩ সালের ‘ডুরান্ড লাইন চুক্তি’, যা পশতু ভূমির মধ্য দিয়ে কৃত্রিম একটা সীমান্তরেখা টেনে দিয়েছিল, সেটাই এই অঞ্চলের সবচেয়ে স্থায়ী বিরোধের চিহ্ন রেখে যায়। আফগানিস্তান কখনো এই সীমান্তরেখাকে চূড়ান্ত বলে গ্রহণ করেনি। এই বিভাজনই পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ককে প্রভাবিত করে চলেছে।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি আফগানিস্তান গভীরভাবে সংবেদনশীল ছিল। ‘সীমান্তগান্ধী’ খান আবদুল গাফফার খান ‘খুদাই খিদমতগার আন্দোলনে’ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি অহিংস প্রতিরোধ আন্দোলনে পশতুদের সংগঠিত করেছিলেন এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর আফগানিস্তানই একমাত্র দেশ যারা জাতিসংঘে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে ভোট দেয়। ডুরান্ড লাইনকে কাবুলের অস্বীকৃতি জানানোর বিষয়টি পশতু স্বায়ত্তশাসনের প্রতি তাদের সহানুভূতির প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। একই সঙ্গে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ কেন আফগানিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হলো না, সেই হতাশারও প্রতিফলন বলা যায়। স্বাধীন ভারত এবং আফগানিস্তান ১৯৪৯ সালে একটি বন্ধুত্বের চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যা সন্দেহজনক পরিবেশের মধ্যেও উভয় রাষ্ট্রকে পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ করে।
স্নায়ুযুদ্ধের সময় উভয় দেশ মস্কোর দিকে ঝুঁকে পড়ে। ভারত সোভিয়েত উপস্থিতিকে পাকিস্তানের জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাধা হিসেবে দেখে আর আফগানিস্তান ভারতকে এই আশ্বাস দেয় যে, আফগানিস্তানের মাটি ভারতবিরোধী কাজে ব্যবহার করা হবে না। ইতোমধ্যে মার্কিন-সৌদি সমর্থিত জিহাদের ‘ফ্রন্টলাইন স্টেট’ বা অগ্রগামী রাষ্ট্রে পরিণত হয় পাকিস্তান।
১৯৮৯ সালে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহার করা হলে আফগানিস্তানে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। পুরোনো শাসনামলের বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে সে দেশে ভারতের প্রভাব খর্ব হয়। কিন্তু ১৯৯৬ সালে তালেবানরা কাবুলের ক্ষমতা দখল করলে নয়াদিল্লি আবারও খেলায় ফিরে আসে। ইরান ও রাশিয়ার পাশাপাশি তারা আহমদ শাহ মাসুদের নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থন করে।
এই সমর্থন ভারতকে কৌশলগত দিক থেকে কিছুটা সমস্যায় ফেলে। ভারত বুঝতে পারে, তালেবান-শাসিত আফগানিস্তানের মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পাকিস্তানি প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। ভারত আশঙ্কা করে, তালেবানি আফগানিস্তান ভারতবিরোধী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং সমর্থন দেবে। এই আশঙ্কা বাস্তবে দেখা গিয়েছিল যখন ১৯৯৯ সালে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের একটি বিমান ছিনতাই করে কান্দাহারে নিয়ে যাওয়া হয়।
২০০১ সালে তালেবানরা ক্ষমতাচ্যুত হলে ভারত আফগানিস্তানের অন্যতম বৃহত্তম আঞ্চলিক সহযোগী বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। ২৭৫ মিলিয়ন ডলারের আফগান-ভারত মৈত্রী বাঁধ, যা পূর্বে সালমা বাঁধ নামে পরিচিত ছিল; এবং আফগানিস্তান থেকে ইরানের চাবাহার বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করা জারাঞ্জ-দেলারাম মহাসড়ক ছিল এই অংশীদারত্বের প্রতীক।
কিন্তু ২০০৮ সালে কাবুলের ভারতীয় দূতাবাসে বোমা হামলা, ভারতীয় কনস্যুলেটে আক্রমণ, এমন বিপদকে সামনে নিয়ে আসে যাতে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ ছিল যে, পাকিস্তানি গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সে দেশে ভালোভাবেই জাল বিস্তার করে রেখেছে।
আফগানিস্তান থেকে ২০২১ সালের আগস্টে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ের ফলে তালেবানরা ক্ষমতায় ফিরে আসে। ভারত কাবুল দূতাবাস বন্ধ করে দেয় এবং ভারতীয় কূটনীতিকরা ভারতে ফিরে আসেন। এ সময় দুই দশকের বিনিয়োগ রাতারাতি নষ্ট হয়ে যায় বলে মনে হয়। পাকিস্তানের নেতারা এতে খুশি হন আর আফগানিস্তানে তাদের প্রভাব অক্ষুণ্ণ থাকার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। কিন্তু তালেবানরা দ্রুত তাদের হতাশ করেন। ভারতের জন্য, একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক জানালা খুলে যায়।
২০২৫ সালে উভয় পক্ষই এখন নতুন সম্পর্ক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। অর্থনৈতিক সংকট দূর করার জন্য আফগানিস্তানের প্রয়োজন নতুন উন্নয়ন অংশীদার। ভারত চায় উন্নয়ন, বাণিজ্য এবং মানবিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তার অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে।
২০২১ সালের পর আমির খান মুত্তাকিরের এই সময়ের নতুন দিল্লি সফর সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। তালেবানদের সঙ্গে ভারতের এই যোগাযোগ শুধু সুসম্পর্ক নয়, বরং এর বাস্তবসম্মত প্রয়োজনীয় দিকটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই উদ্যোগ বাস্তবতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘটছে।
আফগানিস্তান ও ভারত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভৌগোলিক, বাণিজ্যিক, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিকভাবে সম্পর্কিত রয়েছে। তারা সাম্রাজ্য, মতাদর্শ এবং নানা ঝড়ঝাপটার মধ্য দিয়ে গভীর বন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু কখনো কখনো তারা সমকালীন রাজনীতির দ্বারা বিকৃতভাবে প্রভাবিতও হয়েছে।
সামনের পথ অনিশ্চিত। নারী-অধিকার এবং সংখ্যালঘুদের প্রশ্নে তালেবানদের ইতিহাস ভয়াবহ। নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। তবে নিশ্চিত হলো যে, ভারত-আফগানিস্তানের ন্যারেটিভ এখনো শেষ হয়নি; বরং প্রবেশ করল নতুন এক অধ্যায়ে। এই পর্বটি এমন যে, পুরোনো বন্ধন এবং নতুন বাস্তবতা পরম্পরাগতভাবে সহাবস্থান করবে।
লেখক: এমএমএজে একাডেমি অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, নিউ দিল্লির পরিচালক।
দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান


