আন্তর্জাতিক রাজনীতির রূপরেখায় বিভিন্ন সংঘাত নানা সময়ে দৃশ্যমান হলেও কিছু সংঘাত এমন থাকে, যা দুই দেশের সম্পর্কের সীমানা পেরিয়ে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে উন্মোচিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোর দ্বন্দ্ব ঠিক এমনই একটি অধ্যায়। এখানে শুধু দুই নেতার ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা পররাষ্ট্রনীতির মতপার্থক্যই নেই; বরং রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক উত্তেজনা, মতাদর্শগত বিরোধ, আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের হিসাব-নিকাশ। তাই প্রশ্ন উঠছে- এ দ্বন্দ্ব সামনে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? ভবিষ্যৎ কি আরও উত্তেজনাপূর্ণ, নাকি কোনো সমঝোতার দরজা খুলতে পারে?
ট্রাম্প তার প্রেসিডেন্ট-জীবনের শুরু থেকেই পররাষ্ট্রনীতিতে নাটকীয়তা, ব্যক্তিগত শৈলী ও আক্রমণাত্মক বার্তাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। মাদুরো সম্পর্কে তার ভাষা ছিল কঠোর ও তাচ্ছিল্যপূর্ণ। মাদুরোকে তিনি ‘স্বৈরশাসক’ বলেছেন, তার সরকারকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়েছেন এবং প্রকাশ্যে ভেনেজুয়েলায় বিকল্প নেতৃত্বকে সমর্থন করেছেন। অন্যদিকে মাদুরোও ট্রাম্পকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, তার প্রতিটি কৌশলকে লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে দেখিয়েছেন। রাজনৈতিক আদর্শের দিক থেকেও দুই নেতার অবস্থান বিপরীত মেরুতে।
এ সংঘাতের শিকড় অবশ্য অনেক গভীরে- বলিভার বিপ্লব (এটি ভেনেজুয়েলায় প্রয়াত নেতা হুগো শ্যাভেজ-এর সময়ে শুরু হওয়া একটি রাজনৈতিক- অর্থনৈতিক আন্দোলনের নাম।) থেকে শুরু করে শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী লাতিন আমেরিকার বামঘেঁষা ঢেউ পর্যন্ত। চাভেজ-উত্তর ভেনেজুয়েলাও সেই ধারার ওপর দাঁড়িয়ে আমেরিকাবিরোধী অবস্থানকে রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করত- এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রবিরোধিতা নয়; বরং চীন, রাশিয়া ও ইরানের মতো শক্তিগুলোর কৌশলগত অগ্রযাত্রার অংশ। তাই মাদুরোর ওপর চাপ বাড়ানো ট্রাম্পের কাছে ছিল ভেনেজুয়েলা-কেন্দ্রিক লড়াইয়ের চেয়ে বড় কিছু- এটি ছিল বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা।
এখনকার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন হলো- এ দ্বন্দ্বের পরবর্তী ধাপ কী হতে পারে? মার্কিন রাজনীতিতে ট্রাম্প এখনো শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করছেন। আবার হোয়াইট হাউসে ফেরার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি ক্ষমতায় ফিরলে তার ভেনেজুয়েলা-নীতি আরও তীব্র হতে পারে- নতুন নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা সামরিক চাপের ইঙ্গিতসহ। অপরদিকে মাদুরোও ক্ষমতার কাঠামো দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন। অর্থনৈতিক বিপর্যয়, স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়া কিংবা অভ্যন্তরীণ বিরোধীর দুর্বলতা- কিছুই তার অবস্থান টলাতে পারেনি। রাশিয়া, চীন, ইরান- এ জোট তার রাজনৈতিক অস্তিত্বকে সমর্থন দিচ্ছে।
এ বাস্তবতায় ভবিষ্যতের সংঘাত নির্ধারণ করবে আরও কয়েকটি বড় উপাদান। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা। লাতিন আমেরিকায় চীনের বিনিয়োগ ও প্রভাব বাড়া ওয়াশিংটনের জন্য উদ্বেগের বিষয়। ভেনেজুয়েলাও সেই প্রভাব বিস্তারে এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলা নিয়ে ট্রাম্পের যেকোনো কঠোর অবস্থান বৃহত্তর শক্তির সংঘাতে নতুন ‘ফ্রন্টলাইন’ খুলে দিতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অভিবাসন সংকট। ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক পতনে লাখো মানুষ দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে ঢুকছে। অভিবাসন ইস্যু ট্রাম্পের রাজনৈতিক অস্ত্র- এটি আবার সক্রিয় হলে ট্রাম্প- মাদুরো বিরোধ আরও প্রচণ্ড রূপ নিতে পারে। ট্রাম্প ভেনেজুয়েলাকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে তুলে ধরবেন; মাদুরো এটিকে ‘সাম্রাজ্যবাদী অপপ্রচার’ বলবেন- এতে দুই দেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আরও কঠিন হবে।
তৃতীয়ত, আলোচনার সম্ভাবনা। কেউ কেউ মনে করেন- ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরলে তার ‘ডিল মেকার’ স্বভাব আলোচনার পথও খুলে দিতে পারে। তবে দুই দেশের সম্পর্ক এত ভরসাহীন হয়ে গেছে যে, এ ধরনের উদ্যোগ উভয় পক্ষের জন্যই রাজনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণ। মাদুরো আলোচনায় গেলে ক্ষমতার ভিত্তি দুর্বল হতে পারে; ট্রাম্প আলোচনায় গেলে তার রক্ষণশীল ভোটাররা বিভক্ত হতে পারে।
চতুর্থত, সামরিক হস্তক্ষেপের প্রশ্ন। ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন- যদিও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ভবিষ্যতেও তিনি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ রাশিয়া-চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি ডেকে আনে, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোও সেটা সমর্থন করবে না। তাই সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা রাজনৈতিক বক্তৃতায় যতই শোনা যাক, বাস্তবে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং অসম্ভবের কাছাকাছি।
ভবিষ্যতের হিসাবকে আরও জটিল করে তুলবে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও। বহু বছর ধরে বিরোধীরা দুর্বল ও বিভক্ত- যারা কখনো ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে জনগণের আস্থাও হারিয়েছে। যদি নতুন কোনো অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার কথা ওঠে, বিরোধীরা তা গ্রহণ করতে পারে; তবে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের ছায়া বড় হলে তারা আবার বিতর্কিত হয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার বৃহত্তর রাজনৈতিক মানচিত্রও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ব্রাজিল, কলম্বিয়া, চিলি- অনেক দেশেই রাজনৈতিক দোলাচল সৃষ্টি হয়েছে। এ অস্থির অঞ্চলে ভেনেজুয়েলা-ইস্যু আরও অনির্দেশ্য প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। ট্রাম্পের ডানপন্থি রেটোরিক (ডানপন্থি রেটোরিক হলো এমন রাজনৈতিক বয়ান, যা ঐতিহ্য, জাতীয়তাবাদ, শক্ত রাষ্ট্র ও বাজারমুখী নীতিকে এগিয়ে নিতে আবেগী বা কৌশলগত ভাষা ব্যবহার করে।)
আবারও সমর্থন পেতে পারে, কিংবা তার কঠোর অবস্থান আঞ্চলিক দেশগুলোকে মাদুরোর দিকেই ঠেলে দিতে পারে।
মূলত এ দ্বন্দ্ব আপাতত কোনো স্বাভাবিক সমাপ্তির পথে যাচ্ছে না। বরং দুই নেতা তাদের নিজ নিজ রাজনৈতিক শক্তি-সংহতির জন্য এ বিরোধকে কাজে লাগাচ্ছেন। ট্রাম্পের কাছে এটি ব্যর্থ সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক; মাদুরোর কাছে এটি বহিঃশক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বয়ান। এই প্রতীকী রাজনীতি চলতে থাকলে উত্তেজনা আরও বাড়বে, কমবে না।
দুঃখজনক সত্য হলো- এ সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ ভেনেজুয়েলানরা। দারিদ্র্য, মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য ও ওষুধের সংকট, বেকারত্ব- সব মিলিয়ে তারা এক অন্তহীন মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে আটকে আছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা যেমন তাদের কষ্ট বাড়ায়, তেমনি মাদুরোর কর্তৃত্ববাদী নীতিও রাজনৈতিক মুক্তির দরজা বন্ধ করে রাখে। ভবিষ্যতে এ সংকট আরও গভীর হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়- ট্রাম্প-মাদুরো দ্বন্দ্ব সামনে যে বাস্তবতা তৈরি করছে, তা আশাবাদের নয়; বরং আরও অনিশ্চিত, বিভাজিত ও উত্তপ্ত এক ভূরাজনৈতিক পরিবেশের ইঙ্গিত দেয়। আঞ্চলিক স্থিতি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার- সবই এতে ঝুঁকির মুখে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা ও মানবিক বিবেচনা ছাড়া এ দীর্ঘায়িত সংঘাত থামার সম্ভাবনা নেই।
এ অনিশ্চয়তাই আজকের বিশ্বরাজনীতির নির্মম ও সত্য প্রতিচ্ছবি।
লেখক: প্রকাশক ও কলাম লেখক


