মহান জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে যা ঘটল তা কি সমর্থন যোগ্য? মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতীয় সংগীতের অবমাননা করে কি দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব? মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস দেশে স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা করার জন্য পাকহানাদার বাহিনী ইতিহাসের নির্মম, নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। যারা রাজাকার, আলবদর, আল শামস নামে পরিচিত। তারাই মূলত স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের জল্লাদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সহজ প্রশ্ন- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানুষ মারার দায়ে যদি কোনো রাজনৈতিক দলের বিচার হতে পারে, তাহলে সে সময়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দলটির কেন বিচার হবে না?
একটি ছোট্ট ঘটনা বলি। বাসে যাচ্ছেন একজন প্রবীণ ব্যক্তি। তার পাশের সিটে বসেছে একজন যুবক। সে তার ডানে বসা অন্য দুই যুবকের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় ব্যস্ত। তাদের কথাবার্তায় স্পষ্ট, তারা একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য। একপর্যায়ে তারা দেশের রাজনীতি, জাতীয় নির্বাচনের পর দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, মহান জাতীয় সংসদের অধিবেশনের শুরুর দিন মহামান্য রাষ্ট্রপতির বক্তৃতা এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলাপ শুরু করে দিল। তারা বেশ গর্বের সঙ্গেই বলতে লাগল- সময় কিন্তু এখন আমাদেরই। সূক্ষ্ম কারচুপি না হলে আমরাই ক্ষমতায় যেতাম। তবে হ্যাঁ, জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে আমরা জানিয়ে দিয়েছি, আমাদের কথা না শুনলে দেশ পরিচালনা করা সহজ হবে না। রাষ্ট্রপতি এইটা কী বললোরে ভাই। এক মুখে দুই কথা। শেখ হাসিনার আমলে শেখ মুজিবের কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলেছিল। এখন তারেক রহমানের আমলে জিয়ার কথা বলতেছে। জাতীয় সংগীত এইটা কীরে ভাই? হিন্দুর লেখা জাতীয় সংগীত মুসলমান গাইবে? আমাদের নেতারা ঠিক কাজ করেছে। সংসদে জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় দাঁড়ায়নি। কেন দাঁড়াবে? জাতীয় সংগীত নতুন করে লিখতে হবে। কথার মাঝখানে প্রবীণ ব্যক্তিটির পাশে বসা যুবকটি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলল- আমি খুব খুশি হয়েছি আমাদের যে নেতাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী বলে জালিম হাসিনা সরকার অন্যায়ভাবে ফাঁসি দিয়েছিল তাদের মহান সংসদ শহিদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বীকৃতিটা কে দিল? খেতাবপ্রাপ্ত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। যিনি এখন সংসদের স্পিকার। ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’ এ কথাটাই সত্য ভাই। ইসলামি হুকুমত কায়েম করার এখনই সময়। তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ফেতনা এখন আর কাজ করবে না।
যুবকরা বাসের ভেতর বসে এমনভাবে কথা বলছিল যাতে বাসের অন্য যাত্রীরাও শুনতে পায়। প্রবীণ ব্যক্তিটি খুব অসহায় বোধ করছিলেন। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের ‘চেতনা ফেতনা’ কথাটা তার মনে দারুণভাবে আঘাত করেছে। তিনি মৃদু প্রতিবাদ করলেন। পাশে বসা যুবকটিকে প্রশ্ন করলেন, বাবা তোমার বয়স কত?
যুবকটি একটু অবাক হলো। তবে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল- আমার বয়স জেনে কী করবেন?
প্রবীণ ব্যক্তিটি বললেন, তোমার বয়স নিশ্চয়ই ৩০-এর বেশি হবে না?
আমার বয়স ২৭।
ও। মুক্তিযুদ্ধের বয়স ৫৪ পার হয়েছে। তার মানে তোমার বয়সের চেয়ে মুক্তিযুদ্ধের বয়স ডাবল। তুমি তো মুক্তিযুদ্ধ দেখনি। দেখছ?
না। যুবক বিরক্ত হয়ে উত্তর দিল।
প্রবীণ ব্যক্তি বললেন, তাহলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এরকম আপত্তিকর কথা বলতেছ কেন? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফেতনা... চেতনা তো বুঝলাম। ফেতনা কী? মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেছ কেন? আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার সামনে তোমরা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটাক্ষ করতেছ। এটা ঠিক না...
প্রবীণ ব্যক্তিটির পরিচয় পাওয়ার পর মনে হচ্ছিল যুবকরা তাকে একটু সমীহ করবে, সম্মান দেখাবে। কিন্তু ঘটল তার বিপরীত। খুনের অপরাধীকে পাওয়া গেছে এমন উত্তেজনায় যুবকরা তার ওপর রুষ্ট হলো। পাশে বসা যুবক একজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে অযৌক্তিক তর্ক শুরু করে দিল-
আংকেল কেন আপনারা মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিলেন? পাকিস্তান ভাঙার জন্য।
আমরা পাকিস্তান ভাঙতে চাইনি। পাকিস্তানিরাই পাকিস্তান ভেঙেছে। তোমরা কি জানো তারা আমাদের বাঙালিদের ওপর কী নির্যাতনই না শুরু করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা আমাদের লাখ লাখ মা-বোনকে ধর্ষণ করেছে। ৩০ লাখ মানুষ শহিদ হয়েছে...
প্রবীণ ব্যক্তিকে থামিয়ে দিল তার পাশে বসা যুবকটি। অবজ্ঞার ভঙ্গিতে বলল- এই যে ৩০ লাখের কথা বললেন, গুনে দেখেছেন? আংকেল এসব ফালতু বয়ান দেবেন না তো। তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধ টুদ্ধ নিয়ে আর মাতামাতি করবেন না। একই গানের ক্যাসেট আর কত বাজাইবেন? আমরা নতুন গান বানাইছি। নতুন বাংলাদেশে নতুন গান...
যুবকরা সমস্বরে হাসতে থাকল। প্রবীণ ব্যক্তিটি ভেবেছিলেন বাসের ভেতর এত মানুষ। কেউ না কেউ যুবকদের কথার প্রতিবাদ করবে। তেমন কেউ প্রতিবাদ করল না। তিনি নামবেন ফার্মগেটে। কিন্তু কারওয়ান বাজারের পাশে বাস থামলে অপমান আর কান্না লুকিয়ে বাস থেকে নেমে গেলেন।
প্রিয় পাঠক একবার চোখ বন্ধ করে ’৭১ সালে ফিরে যান তো। যারা ’৭১ দেখেননি, গল্প শুনেছেন, তারাও গল্পটাকে মনের আয়নায় তুলে ধরুন তো। কী দেখছেন? নিজের ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি ছেড়ে প্রাণের ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে দেশের অসহায় মানুষ। খাকি পোশাকধারী জল্লাদরূপী হায়েনারা মা-বোনের ইজ্জত লুটছে, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে। দেশটা যেন আগুনের নদী হয়ে উঠেছিল। দেশ বাঁচাতে জীবনকে বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই সময়ে তরুণ, প্রবীণরা। কিশোরদেরও অংশগ্রহণ ছিল। নারীরাও পিছিয়ে ছিল না। দীর্ঘ ৯ মাস তারা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছে। খাবার ছিল না। এক বেলা খেয়ে বুকে পাথর চেপে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছে। পরনের কাপড় ছিল না। প্রচণ্ড শীতে নদী সাঁতরাতে হয়েছে। জঙ্গলে থাকতে হয়েছে। তার পর না দেশের স্বাধীনতা এসেছে। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধারাই তো এ দেশের শেকড়। অথচ শেকড়কেই উপড়ে ফেলতে চাইছি আমরা? যারা ৭১ সালে দেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল তারাই এখন সাচ্চা দেশপ্রেমিক সেজেছে। জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান দিতে তাদের অনীহা। মার্চ, মহান স্বাধীনতার মাসেই স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ভূমিকা পালনকারী যুদ্ধাপরাধীরা শহিদের মর্যাদা পেল। তাদের শহিদের স্বীকৃতি দিলেন একজন খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। যিনি এখন মহান সংসদের স্পিকার। কথাটা আবারও উল্লেখ করলাম এজন্য যে, মুক্তিযুদ্ধ সম্মান না পেলে, যথাযোগ্য মর্যাদা না পেলে দেশের প্রকৃত ইতিহাসের কী হবে? যারা নতুন করে দেশের ইতিহাস লিখতে চাইছেন তারাই কি জয়ী হবে?
আসুন ’৭১ সালে আবার ফিরে যাই। মহান মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস দেশে স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা করার জন্য পাকহানাদার বাহিনী ইতিহাসের নির্মম, নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। তাদের সাহায্য, সহযোগিতা করেছে এ দেশেরই কিছু মানুষ। যারা রাজাকার, আলবদর, আল শামস নামে পরিচিত। তারাই মূলত স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের জল্লাদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সহজ প্রশ্ন- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানুষ মারার দায়ে যদি কোনো রাজনৈতিক দলের বিচার হতে পারে, তাহলে সে সময়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দলটির কেন বিচার হবে না?
একটি সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন গণতান্ত্রিক সরকার দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছে। দেশের মানুষের অনেক আশা, নতুন সরকার দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনবে। কিন্তু মহান জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে যা ঘটল তা কি সমর্থন যোগ্য? মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতীয় সংগীতের অবমাননা করে কি দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব? কার কাছে এ উত্তর চাইব?
লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার
সম্পাদক, আনন্দ আলো

