জাতীয় সংসদে গত ৩০ জুন বাজেট অনুমোদন হয়েছে। আলোচনা, বিরোধী দলের আপত্তি এবং জনমতের প্রতিফলনে অর্থ বিলের বিতর্কিত কয়েকটি প্রস্তাবে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনা হয়েছে। ফলে এবারের বাজেট একদিকে নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে, অন্যদিকে জনমতের প্রতি সংবেদনশীলতারও বার্তা দিয়েছে। ফলে এটি অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনীতির বার্তাও বহন করছে।
> বাজেটের আকার: ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা (দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ)
> বাজেট ঘাটতি: ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ৩.৬%)
> উল্লেখযোগ্য দিক: ব্যয়ের কাঠামোতে স্থিতিশীলতা, করনীতি ও প্রশাসনিক বিধানে নমনীয়তা
> টিআইএন বাধ্যতামূলক, অপ্রদর্শিত বিনিয়োগ ও নামজারির বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহার
> করদাতাদের স্বস্তি: করমুক্ত আয়ের সীমা ৩.৭৫ লাখ থেকে বেড়ে ৪ লাখ টাকা
> সর্বোচ্চ বরাদ্দ: অর্থ বিভাগ, ইআরডি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রাথমিক শিক্ষা
> মূল চ্যালেঞ্জ: ৭.৫% মূল্যস্ফীতি অর্জন ও ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়
কী বদলাল, কী বদলাল না
সংসদে বাজেট পাসের পর সাধারণভাবে ধারণা তৈরি হয় যে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দে কাটছাঁট হয়েছে। কিন্তু সরকারি নথি ও সংসদীয় কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এবারের বাজেটে সেই অর্থে তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। প্রস্তাবিত বাজেটে যে মন্ত্রণালয়গুলোর জন্য যে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা-ই বহাল রয়েছে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকারও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। সংসদে ৫৯টি মঞ্জুরি দাবির বিপরীতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ৪৩ জন সদস্য মোট ১ হাজার ৩৪৩টি ছাঁটাই প্রস্তাবের নোটিশ দিলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলো প্যাকেজ আকারে প্রত্যাহার করা হয়। ফলে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দে কোনো সংশোধন আনার প্রয়োজন পড়েনি।
বাজেট বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বাজেটে ব্যয় কাঠামোর চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে নীতিগত সংশোধন। অর্থাৎ, বাজেটের ব্যয় কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলেও পরিবর্তন এসেছে অর্থ বিলের বিভিন্ন কর ও প্রশাসনিক প্রস্তাবে। অর্থ বিল পাসের আগে ৬৪টি সংশোধনী সংসদে গ্রহণ করা হয়।
জনমতের প্রতি সাড়া
সংসদে পাস হওয়া অর্থ বিলে চারটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, জমি বা সম্পদে অপ্রদর্শিত/কালো টাকা বিনিয়োগের বিশেষ সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, এ নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ও ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হওয়ায় জনমতের প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রস্তাবটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে। সংসদীয় আলোচনায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তির আশঙ্কা তুলে ধরা হলে সরকার অবস্থান পরিবর্তন করে।
তৃতীয়ত, জমির বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন ও নামজারির ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার বিধানও বাতিল করা হয়েছে। একই যুক্তিতে এটিকেও জনবান্ধব সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চতুর্থত, ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। সংসদীয় আলোচনার পর গৃহীত এই সিদ্ধান্ত মধ্যবিত্ত করদাতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা বহন করছে।
এসব পরিবর্তন থেকে স্পষ্ট যে, সরকার করনীতি ও প্রশাসনিক বিধানে নমনীয়তা দেখালেও ব্যয় পরিকল্পনায় স্থিতিশীল অবস্থান বজায় রেখেছে।
বহাল থাকল মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দ
এবারের বাজেটে সরকার উন্নয়ন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। সংশোধিত বাজেটের তুলনায় উন্নয়ন ব্যয় প্রায় ৪৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয়ের অনুপাত কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই বাস্তবতায় বাজেট অনুমোদনের শেষ মুহূর্তে কোনো মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমানো হলে পুরো ব্যয় পরিকল্পনা, উন্নয়ন কর্মসূচি ও অর্থায়নের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা ছিল। ফলে সরকার ব্যয় কাঠামো অপরিবর্তিত রেখেই কেবল নীতিগত সংশোধনের পথ বেছে নিয়েছে।
যে খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ
বাজেট বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থ বিভাগই সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে। এরপর রয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, খাদ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়। এ থেকে স্পষ্ট, সরকার আগামী অর্থবছরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও কৃষিকে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে।
বাজেটে কম গুরুত্বপূর্ণ খাত
তুলনামূলকভাবে বিদ্যুৎ বিভাগ এবং বিশেষ করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বরাদ্দ অন্যান্য বড় মন্ত্রণালয়ের তুলনায় অনেক কম। যদিও শুধু বরাদ্দের পরিমাণ দিয়ে সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যায় না, তবুও বরাদ্দের আকার বিবেচনায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতের তুলনায় জ্বালানি খাত অপেক্ষাকৃত সীমিত অবস্থানে রয়েছে।
ঘাটতি ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রাখা হয়েছে, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ওপর সরকারকে নির্ভর করতে হবে। অন্যদিকে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা।
একই সঙ্গে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ করতে হবে, যার মধ্যে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। বিশেষ করে ভ্যাট ও আয়কর থেকে রাজস্ব বৃদ্ধির ওপর সরকারের প্রত্যাশা অনেক বেশি। অন্যদিকে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছানো এবং মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য সহজ হবে না। ফলে উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন–এই দুই ক্ষেত্রেই আগামী অর্থবছরে বিএনপি সরকারকে সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় মুখোমুখি হতে হবে।
এলিস/এএফ