ঢাকা ২ বৈশাখ ১৪৩১, সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪
Khaborer Kagoj

অপরাজনীতি চলতে পারে না

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৩৬ পিএম
অপরাজনীতি চলতে পারে না
আইনুন নিশাত

বুয়েটে এখন যা চলছে, তা খুবই দুঃখজনক। আমি রাজনীতির পক্ষে। কিন্তু তথাকথিত রাজনীতির নামে অপরাজনীতি চলতে পারে না। বেশির ভাগ শিক্ষাঙ্গনে এখন যা চলে, তা অপরাজনীতি। আমি বলব, বুয়েটে যদি জঙ্গিবাদী কেউ থাকে, রাষ্ট্রবিরোধী বা অপরাধী কেউ থাকে, তাদের শনাক্ত করে ধরা হোক। কিন্তু এমন কোনো পরিস্থিতি চাই না, যাতে মেধাবীদের দুর্বৃত্তায়নের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়। 

বুয়েট আর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অন্যদের চেয়ে আলাদা বা বিশেষায়িত শিক্ষাঙ্গন বলেই বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে এই দুটিকে রাজনীতির বাইরে রাখতে বলেছিলেন। এই শিক্ষাঙ্গনের শিক্ষার্থীরা যদি নির্বাচন, ভোটাভুটি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তবে তারা মেধার চর্চা করবেন কীভাবে!

এমনিতেই বুয়েটের শিক্ষার্থী এখান থেকে পাস করে ৮০ শতাংশই বিদেশে চলে যান। এখানে তাদের উপযুক্ত চাকরি হয় না। রাষ্ট্র তাদের ধরে রাখতে পারে না। রাষ্ট্রের উচিত, তাদের অপরাজনীতির মধ্যে ঠেলে না দিয়ে বরং তাদের মেধাকে দেশে সম্মানজনকভাবে কাজে লাগানোর পথ তৈরি করা।

ইমেরিটাস অধ্যাপক, সাবেক উপাচার্য, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় 

ঈদ শুধু স্মৃতির উৎসব নয়, এ উৎসবের দায়ও আছে

প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৪, ১১:৩৯ এএম
ঈদ শুধু স্মৃতির উৎসব নয়, এ উৎসবের দায়ও আছে
সেলিনা হোসেন

ঈদ মানেই অনাবিল আনন্দে দিন উদযাপন। শৈশব-কৈশোরের সময়ের ঈদ ছিল শুধুই উৎসব। নতুন জামা কখন কেনা হবে, মাংস-পোলাও কখন রান্না হবে-এসবই ছিল ছোটবেলার ঈদ। তখন সমাজ-বাস্তবতা বোঝার বয়স ছিল না। ধনী-দরিদ্রের শ্রেণিবৈষম্যের তাত্ত্বিক ধারণা লাভ করার প্রশ্নই ছিল না। তবে ধর্মীয় উৎসব হলেও হিন্দু-মুসলমান মিলেমিশে পালন করার ধারণা তখন থেকে পেতে শুরু করি। এটাই আমার ঈদের স্মৃতির সবচেয়ে বড় অর্জন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বুঝেছি ঈদ আমার শুধু স্মৃতির উৎসব নয়, এ উৎসবের দায়ও আছে। এখন যখন দুই ঈদের সাম্যের জায়গা চিন্তা করি তখন ঈদ আমার কাছে শুধু স্মৃতিমাত্র থাকে না। বাঙালি মুসলমানের দুটো প্রধান ধর্মীয় উৎসব। ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা। পরেরটি আমাদের ত্যাগের শিক্ষা দেয়। এর মহিমা অপার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমরা সেই শিক্ষা থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছি। এই আয়োজন যেন দেখানোর বিষয় হয়ে উঠেছে। এমনকি অনেক সময় এটি প্রতিবেশীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার বিষয়ও বটে! অথচ ঈদুল আজহা আমাদের সেই শিক্ষা দেয় না।

আমাদের প্রিয় নবিকে শুধু একজন নবি হিসেবে নয়, একজন প্রকৃত জ্ঞানী মানুষ হিসেবে আমি তার তুলনা খুঁজে পাই না। তিনি অদ্বিতীয়। একই সঙ্গে অতুলনীয়। আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে কন্যাসন্তান হলেই তাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। এই করুণ বাস্তবতার বিপরীতে আমাদের নবি কঠিন অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন। নবি বলেছেন, তোমার প্রতিবেশীর থালায় ভাত আছে কি না তার খোঁজ নাও। নবি আরও বলেছেন, দুটি পয়সা থাকলে ফুল কিনো। কী সুন্দর নান্দনিক বোধ! তিনি বলেছেন, জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীন দেশে যাও। সেই সময়ে এত বড় একজন জ্ঞানী মানুষ ছিলেন আমাদের নবি। তিনি আমাদের শিক্ষক, তিনি সচেতন মানুষের কাছে প্রাজ্ঞ-বিজ্ঞ। তার জীবনদর্শন, তার ব্যক্তিজীবন বিষয়ে হাদিসে অজস্র কথা বলা আছে। সেখানে মানুষের সমতাসহ সব বিষয়ে বলা আছে।

এই লেখাটি লিখতে গিয়ে মনে পড়ছে, নবিজির চলার পথে যে বুড়ি কাঁটা বিছিয়ে রাখতেন সেই ঘটনার কথা। পরপর কয়েকদিন পথে কাঁটা না দেখে নবিজি চিন্তিত হলেন। তিনি উদ্বিগ্ন হলেন এই ভেবে যে, আজ আমার চলার পথে কাঁটা নেই কেন? তাহলে সেই বুড়ি মা কি অসুস্থ হলেন? নবি বুড়িমার খোঁজ নিলেন। এবং এই ঘটনায় নবি যে মানবতার পরিচয় দিলেন তা পৃথিবীতেই বিরল। ধর্মের সত্যের এই বিষয়গুলো আমাদের ধারণ করা উচিত।

আমাদের ইসলাম শান্তির ধর্ম, সত্যের ধর্ম। এই কথাটা সবাই মানেন, কিন্তু ধর্মের তাৎপর্যময় অর্থ কেউ বুঝতে চান না। ধর্মকে সবার আগে বুঝতে হবে। এই উপমহাদেশে যখন ইসলাম প্রচার শুরু হয়, তখন মানুষ গরিব, নিম্নবর্গের ছিল। হিন্দু ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে মানুষ নিপীড়িত ছিল। যে কারণে ইসলামের সুন্দর মানবিক মর্যাদার জায়গাটা মানুষ প্রাণ ভরে গ্রহণ করেছিল। না হলে এই অঞ্চলে এত মানুষ কীভাবে মুসলমান হলো? এই দেশে তো মুসলিম শাসন পরে এসেছে। ইসলাম শান্তির ধর্ম, সাম্যের ধর্ম বলেই মানুষ তা গ্রহণ করেছে। আর এই শান্তি, সাম্য ত্যাগের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। ঈদ আমাদের সেই ত্যাগের শিক্ষা দেয়। মানুষে মানুষে সমতার জায়গাটা হচ্ছে ইসলাম ধর্মের সবচেয়ে বড় সত্য।

রোজার ঈদে নতুন জামা, জুতো... এটাই ছিল একমাত্র আকর্ষণ। ঈদের দিন আব্বা-আম্মাকে সালাম করতাম। তারপর খাওয়া-দাওয়া আর মেহমানদারি। ঈদে বিটিভিতে ঈদের অনুষ্ঠান দেখতাম। সারা দিন বাসাতেই কেটে যেত। ভাইদের বন্ধুরা, আমার বন্ধুরা বাসায় আসত। 

ঈদের স্মৃতিচারণের শুরুতেই আমি ঈদকে সোনা ঈদ বলব- যখনই বুঝেছি ঈদ হলো শুধুই আনন্দ, খাওয়া-দাওয়া, নতুন জামাজুতো পরা, ঘুরে বেড়ানো আর সালামি পাওয়া, তখন হতেই প্রতিবার ঈদের অপেক্ষা করতাম, কবে আবার সোনা ঈদ আসবে।

আহা কী আনন্দ কী খুশি, রোজার শুরুতেই ভাবতাম কেমন জামা কিনব, কেমন করে সাজগোজ করব- বান্ধবীদের দেখতেই দেব না নতুন জামাজুতো, ওরা কতভাবেই না দেখতে চাইত। আমিও কোনোভাবেই দেখতে দিতাম না জামাজুতো, সেই যে মার্কেট থেকে এসে স্টিলের আলমারিতে লুকিয়ে রাখতাম, কেউ যেন কোনোভাবেই খুঁজে না পায়, যদি তেমন জামাজুতো কিনে ফেলে এই ভেবে। 

ঈদের আগের দিন রাতে মেহেদি লাগানোতে যে কি আনন্দ। মেহেদি বেঁটে সেটাতে মসজিদের মাটি মিশিয়ে দিতাম। শুনেছিলাম রংটা বেশি লাল হওয়ার জন্য এই মাটি মেশানো হতো। মেহেদি শুকিয়ে গেলে লেবুর রস দিতাম, রংটা অনেকদিন হাতে থাকবে রাঙা হয়ে। এখন মনে হয় এসবই ছোটবেলার মিষ্টি পাগলামি।

ঈদের ভোরে কে কার চেয়ে আগে উঠবে সেই ভেবে ভাইবোনেরা না ঘুমিয়ে জেগেই থাকতাম। ভোরের আলো ফুটতেই কে কার আগে স্নান সেরে নতুন জামাজুতো পরে সেজেগুজে বন্ধুদের দেখানোর সেই ইচ্ছেটা প্রবল হয়ে উঠত।

সেজেগুজে আম্মা-আব্বাকে সালাম করার জন্য কি যে আগ্রহ শুধুমাত্র সালামি পাওয়ার জন্য, সালামি দিয়েই আম্মা বলত, সেমাই খেয়ে যাস আর বেশি দূরে যাসনে- ওই যে বের হলাম বান্ধবীরা সবাই মিলে পাশের বাড়ির খালাম্মাদের থেকে সালামি নিয়ে ফিরতাম আর বারবার গুনতাম কার কত টাকা হলো।

সেই দিনগুলো খুব মনে পড়ছে। বেশ ছিলাম, কেন যে বড় হলাম। তেমন মজার ঈদ আর সেভাবে মনে দোলা দেয় না। নতুন জামাজুতো বারবার ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে জাগে না। রান্নায় স্পেশাল আইটেম এসেছে। দুই টাকা পাঁচ টাকা সালামির জায়গায় দুই হাজার পাঁচ হাজার টাকা হয়েছে। কিন্তু সেই আনন্দ, খুশি যেন আর নেই। ভোরের আলো ফোটার আগে প্রথমে সালাম করার তাড়া নেই। আছে শুধু কর্তব্য আর বছরের নিয়মের ঈদ, সোনা ঈদের সোনা নেই, নেই সেই ঈদের ভালোবাসা।

এক ঈদের সময় আব্বা আমাকে লাল রঙের ফ্রক কিনে দিলেন। আমি তো ভীষণ খুশি। ঈদের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কোনোরকম নাস্তা সেরে আব্বার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম সেলামি পাওয়ার জন্য। আব্বা ঈদগাহ থেকে যথাসময়ে এলেন এবং সেলামি দিলেন। আরও অনেক বেশি খুশি হয়ে মনের আনন্দে ছোট ফুপুর বাড়িতে গেলাম। ফুপুকে সালাম করলাম। ফুপুর বাড়িতে নাস্তা খেয়ে আমরা বের হয়ে এলাম। রাস্তায় বেরিয়ে পরিকল্পনা করলাম নানি বাড়ি যাব। নানি বাড়ি ছিল নদীর ধারে। তাই আমরা নদীর পাড় দিয়ে নানি বাড়ি যাওয়া শুরু করলাম।

শৈশবের ঈদের দিনটি নিয়মছাড়া বাঁধভাঙা আনন্দ। আরেকটু বড় হওয়ার পর ঈদের আনন্দের সঙ্গে সালামি যোগ হলো আর সালামি ইচ্ছেমতো খরচ করার স্বাধীনতা ঈদের আনন্দ বাড়িয়ে দিল। ধীরে ধীরে আরও বড় হওয়ার পর সবার আনন্দ ভাগাভাগি করায় বড়দের ত্যাগ আস্তে আস্তে উপলব্ধি করতে শিখলাম। কৈশোরে টিভির একটি মাত্র চ্যানেলে আনন্দমেলা শেষ হওয়ারর সঙ্গে সঙ্গে আমার ভীষণ মন খারাপ হয়ে যেত। এত্তো স্বপ্নের ঈদের দিনটি শেষ হয়ে গেল বলে। পরদিন সকালে ঈদের দিনটির জন্য রীতিমতো কান্না পেত।

রোজার ঈদে জাকাত, ফিতরা আর কোরবানি ঈদে গরিব ও আত্মীয়ের মধ্যে গোস্ত বিতরণ। ত্যাগ ও দায়িত্বের জ্ঞান হতে থাকল। ঈদ শুধু আনন্দ উৎসব নয়, এক মেলবন্ধন। তা বুঝতে বুঝতে নিজেই সংসারি হলাম। রাতে জাঁকজমকপূর্ণ সাজ আর পোশাক পরিবর্তন। আনন্দের চেয়ে আয়োজনে প্রাধান্য বেশি। আর প্রতিযোগিতা- কার পোশাক কত মূল্যাবান, এসব নিয়ে প্রতিযোগিতা। এরপর একজন দরিদ্র শিশুকে একটা ঈদের জামা হাতে তুলে দিয়ে তার হাসিমুখ দেখার আনন্দ নেওয়ার মন এখনো অনেকের আছে বরং দিন দিন বাড়ছে এটা দেখলে ভালো লাগে। তরুণ সমাজের অনেককে দেখি ঈদের সকালে ভালো খাবার নিয়ে পথশিশুদের সঙ্গে ঈদ করে, তখন আশার আলো দেখি।

ঈদ শব্দের মধ্যে যে আনন্দ, সে আনন্দ কখনো একা অনুভব করা যায় না। সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে আনন্দ শত গুণ বেড়ে যায়। ঈদ বছর বছর আমাদের সেই শিক্ষা দেয়। সামর্থ্যবানরা প্রতিদিন আনন্দে মেতে থাকার ক্ষমতা রাখে। ঈদের দিন যেন ধনী-গরিব সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে আনন্দ পালন করা যায় সেটাই হওয়া উচিত। উচ্চবিত্তের ছকে সম্পূর্ণ দেশ নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, সহজ-সরল গ্রাম আর দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করা মানুষের মুখে যেন ঈদের দিন খাবার ওঠে, চোখে জল মুছে আনন্দের হাসি যেন তারা সেই দিনটিতে হাসতে পারে, এই শিক্ষাই যে ঈদ তা ভুলতে পারি না এখনো।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও বাংলা একাডেমির সভাপতি 

মুক্তিযুদ্ধ ও ঈদ: স্মরণীয় কিছু কথা

প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৪, ১১:৩৪ এএম
মুক্তিযুদ্ধ ও ঈদ: স্মরণীয় কিছু কথা
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

যখন গ্রামের স্কুলে নিচু ক্লাসে পড়তাম, তখনই পবিত্র রমজান মাসে ইফতার খাওয়ার জন্য স্কুলের আশপাশে অপেক্ষা করতাম। স্কুল কর্তৃপক্ষ রুটিন করে দিয়েছিল। কোন ক্লাসের ছাত্ররা কবে ইফতার করতে পারবে। সেই ছয় দশক আগেকার কথা। আবার খুশির ঈদ এসেছে।

মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ঈদের সম্পর্কের কথা শুরুতেই বলছি। তখন পশ্চিমবঙ্গে চলছে মুক্তিযুদ্ধের উন্মাদনা। এমনই একদিন অধ্যাপক ইউসুফ আলি, যিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সারির নেতা ছিলেন, আমাকে ফোন করে বললেন, চলে আসুন। হেনা ভাই (আবু হেনা কামারুজ্জামান), নজরুল সাহেব আমরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছি। যত তাড়াতাড়ি পারেন, চলে আসুন।

কামারুজ্জামান সাহেব প্রশ্ন করলেন, কলকাতায় ঈদের নামাজ কোথায় হয়। আমি বললাম কলকাতার সব মাঠেই হয়। তিনি বললেন, তুমি আমাদের নিয়ে যাবে। আমি উত্তরে বললাম, আপনারা ভারত সরকারের অনুমতি নিয়েছেন। সবাই বললেন- না, আমরা অনুমতি নিইনি। আপনারা তো কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে আছেন। কী করে নামাজ পড়তে যাবেন? সোজা পার্কস্ট্রিট ধরে আমরা সেখানে উপস্থিত হলাম। গাড়ি থেকে নামিয়ে নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের নামাজস্থলে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমার স্কুলের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। স্কুলের ছেলেরা নতুন জামাকাপড় পড়ে খুশির মেজাজে কোলাকুলি করছে।

এবার ফেরার পালা। গাড়িতে উঠতে যাব, তখন ইউসুফ আলি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আর কোথায় কোথায় নামাজ পড়া হয়, আর ঈদের উৎসব পালন করা হয়। বিশ্বের ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা এই দিনটিকে মহাসমারেহে পালন করেন। ইউসুফ আলি বললেন, আরও দু-একটা জায়গায় আমাদের নিয়ে চলুন। আমরা শুধু দেখব। আমি তাদের প্রথমে পার্ক সার্কাস ময়দান, তারপর মৌলালী ময়দানে নিয়ে গেলাম। এবার ওরাই বললেন, আর দেখব না। এবার ফিরে চলুন।

গাড়িতে বসে ক্যাপ্টেন মনসুর আলি বললেন- আরে, আমরা স্বাধীনতার পর থেকে শুনে আসছি পশ্চিমবঙ্গে ঈদের নামাজ হয় না। এবার তো স্বচক্ষে দেখলাম। এতদিন পাকিস্তান আমাদের মিথ্যে কথা বলে এসেছে। কামারুজ্জামান উত্তেজিত হয়ে বললেন, আমি তো দীর্ঘদিন পাকিস্তান জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলাম। আমি করাচি, ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি সব দেখেছি। ওরা বাঙালিদের নামই শুনতে চাইত না। ভারত সম্পর্কে ঘৃণা ছাড়া কোনো কথাই বলত না। ওদের কথার কোনো মূল্য আছে? 

সবচেয়ে বড় নামাজ হয় রেড রোডে। সেখানে লাখ লাখ লোক আসেন। তার বর্তমান নাম ইন্দিরা গান্ধী সরণি। সৈয়দ সাহেবের নির্দেশেই ইউসুফ আলি গোলক মজুমদারের কাছে গিয়ে বিষয়টি জানালেন।

গোলক মজুমদার তাদের সরাসরি বলে দিলেন, নিরাপত্তার দিকটি আমি দেখব। কিন্তু দিল্লির অনুমতি চাই। দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ করে সেদিন রাতেই গোলক মজুমদার জানিয়ে দেন, আপনাদের চারজনকে দিল্লি অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু তাজউদ্দিন সাহেবকে অনুমতি দেয়নি।

বিষয়টি নিয়ে কামারুজ্জামান, সৈয়দ সাহেবরা তাজউদ্দিনের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বললেন। তাজউদ্দিন সাহেব বাকি নেতাদের রেড রোডে নামাজ পড়তে যাওয়ার সম্মতি ছিলেন। তার নামাজের জন্য মুজিবনগর দফতরে সব ব্যবস্থা করা হলো। আমি কলকাতার সুরেন্দ্রমোহন এভিনিউয়ে যেখানে থাকতাম, তার পাশেই একটি বাড়িতে এই নেতারা থাকতেন।

ঈদের দিন আমাকে সকালে ওই বাড়িতে যেতে বলা হয়েছিল। নিরাপত্তার জন্য সেখানে সাত-আটটি পুলিশের গাড়িও উপস্থিত ছিল। ওদের একটি বড় গাড়িতে তোলা হলো। আমিও সেই গাড়িতে ছিলাম। প্রায় তিন ঘণ্টা পর আমরা যখন সুন্দরী মোহন এভিনিউয়ে এলাম, গাড়ি থেকে নেমে চারজন এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, মিষ্টি না খেয়ে যাবে কোথায়? আমি স্থির করে তিনজনের বাড়ি গিয়ে মিষ্টি খেলাম। আর কামারুজ্জামানের বাড়ি গিয়ে বিরিয়ানি খেয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।

বাড়িতে ঢুকতেই গোলক মজুমদারের ফোন- সব ঠিকঠাক আছে তো? আমি বললাম, আপনি তো খবর পেয়েই গেছেন। আর আমি আনন্দবাজারে খবরটা আজ করব। করেওছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ ও ঈদ। ঈদ সবার। আনন্দের উৎসব। আমার ছোটবেলায় যা ছিল, আজও তাই।

লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক 

গাজায় বিশ্বের নৈতিক ব্যর্থতা

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৪, ১১:২৮ এএম
গাজায় বিশ্বের নৈতিক ব্যর্থতা
গ্রাসা মাচেল

গাজায় এখনো চরম অবস্থা বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে ন্যায্য এবং স্থায়ী শান্তির আশায় বিশ্বের জোটবদ্ধ দেশগুলো নীরবে-নিভৃতে ক্রন্দন করে যাচ্ছে। অবিলম্বে পদক্ষেপ না নিলে গাজায় আরও ভয়াবহ অবস্থা হতে পারে।…

গাজায় নিরলসভাবে অবরোধ করা হলো মানবতার জন্য অন্ধকার প্রতিফলন। গত ছয় মাসে ১ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত, আহত বা নিখোঁজ ঘোষণা করা হয়েছে। এদের বেশির ভাগই নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিক, যারা ৭ অক্টোবর ২০২৩-এ হামাসের ভয়ংকর হামলার জন্য কোনো দায় বহন করে না।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ অবশেষে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং হামাসের হাতে জিম্মিদের মুক্তির আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করেছে। এখন জাতিসংঘের সব সদস্যরাষ্ট্রকে বিশেষ করে ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সামরিক মিত্রদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রেজল্যুশনটি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

ইসরায়েলের সামরিক হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া গাজাবাসী চরম দুর্ভোগে আছে। বাস্তুচ্যুতি, ক্ষুধা এবং রোগের মারাত্মক সংমিশ্রণ অপেক্ষা করছে অদূর ভবিষ্যতে। ইসরায়েলের গাজায় মানবিক সরবরাহ, খাদ্য এবং বিশুদ্ধ পানির অবরোধের কারণে গাজাবাসীর জীবনকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। 

এইড এজেন্সিগুলো প্রতিবেদন করেছে, মায়েরা চেতনানাশক ছাড়াই বাচ্ছা জন্ম দিচ্ছেন। শিশুরা পানিশূন্যতা ও অপুষ্টিতে মারা যাচ্ছে এবং অসুস্থতা পুরো সম্প্রদায়কেই ধ্বংস করে দিয়েছে। গণহত্যা থেকে গাজায় কেউ নিরাপদ নয়। জনসংখ্যার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছি আমরা।

ট্রমা এখন গোটা অঞ্চলে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। গাজাবাসী পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে আতঙ্কিত। এক মিলিয়নের বেশি শিশুর মানসিক ও সামাজিক সহায়তার বিশেষ প্রয়োজন। গাজায় ইসরায়েলের ১৮ বছর ধরে অবরোধ করে রাখার কারণে ভোগান্তি আরও বেড়েছে। পশ্চিম তীরেও ফিলিস্তিনিরা একাধিক হুমকির সম্মুখীন হয়। নিরবচ্ছিন্ন বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি থেকে শুরু করে নির্বিচারে আটক রেখে নির্যাতন করেছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করে ১০০ জনের বেশি ইসরায়েলি এখনো হামাসের হাতে জিম্মি রয়েছে। 

আরও খারাপ হতে পারে যদি ইসরায়েল তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সতর্কতা অস্বীকার করে। ইসরায়েল আরও ভুল করবে যদি রাফায় হামলার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যায়। যেখানে বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ শিশুসহ ১.৫ মিলিয়ন লোক রয়েছে। এই সীমান্ত শহরে যারা আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের অনেকেই একাধিক বাস্তুচ্যুতির ট্রমা সহ্য করে যাচ্ছেন। রাফায় পূর্ণমাত্রায় ইসরায়েলি সামরিক অনুপ্রবেশ ঘটতে দেওয়া উচিত নয়।

আমি এই কথাগুলো এমন একজন লোকের হয়ে লিখছি, যিনি ১৯৯৬ সালে জাতিসংঘের শিশুদের ওপর সশস্ত্র সংঘাতের সময় তরুণ ফিলিস্তিনিদের চোখের দিকে তাকিয়েছিলেন। শরণার্থী শিবিরে শিশুদের সঙ্গে কথা বলার সময় আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে, তাদের দুর্ভোগ শেষ হবে। আমরা শুধু সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে ব্যর্থ হইনি; আমরা ফিলিস্তিনি জন্মগ্রহণকারী শিশুদের জন্য আরও বেশি প্রতিকূল বিশ্ব তৈরি করে দিয়েছি। আমি এই ভূতুড়ে ব্যর্থতা আমার সঙ্গে বহন করে যাচ্ছি।

আমি আমার প্রয়াত স্বামী নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে সহপ্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বিশ্বনেতাদের গ্রুপ ‘দ্য এল্ডার্স’-এর একজন সদস্য হিসেবেও এই কথাগুলো লিখছি। এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম সভাপতিত্ব করেছিলেন আর্চ বিশপ ডেসমন্ড টুটু এবং জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান। মাদিবা (ম্যান্ডেলা) বিশ্বব্যাপী শান্তি, ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকারে কাজ করতে আমাদের জন্য আদেশ দিয়েছেন। তিনি সর্বদা ফিলিস্তিনের মুক্তিকে সবার জন্য একটি ন্যায়সংগত এবং মুক্ত বিশ্ব অর্জনের চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচনা করেছেন। আমরা যখন কয়েক দশক ধরে বর্বরতা ও দখলদারত্ব চালিয়ে যেতে দিই, তখন কীভাবে আমাদের মধ্যে কেউ বিশ্বজনীন মানবাধিকার এবং আইনের আন্তর্জাতিক শাসন সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্যভাবে কথা বলতে পারে?

এ ধরনের হতাশা এবং গাজায় বর্তমান গণহত্যা বন্ধ করার ক্ষমতা ও নৈতিক সাহসের খুবই অভাব দেখা দিয়েছে। আমি গর্বিত যে, ব্যতিক্রমী নেতৃত্ব নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের জন্য ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। ২৬ জানুয়ারি  আইসিজের প্রাথমিক রায় এবং ২৮ মার্চের আদেশে গাজায় সংঘটিত নৃশংসতার স্পষ্ট নিন্দা করে। নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষার জন্য ইসরায়েলের যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা উচিত সে সম্পর্কে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয়েছে। 

ইসরায়েল এবং যে দেশগুলো সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে তাদের অবশ্যই আদালতের সম্মুখীন হওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তাদের বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে। কিন্তু এই চরম দুর্ভোগের মুখে আমরা অসহায় নই। একটি মানব পরিবারের সদস্য হিসেবে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার নৈতিক দায়িত্ব আমাদের রয়েছে। আমরা আমাদের নিজস্ব এবং সম্প্রদায়ের সক্রিয়তার মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারি। ভোট এবং প্রতিবাদের মাধ্যমে আমরা আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে জবাবদিহি দাবি করতে পারি। অবশ্যই আমরা সেটা চাই।

এখানে আমরা কী দাবি করতে পারি। প্রথমত, জীবন রক্ষাকারী সাহায্যের জন্য অতিরিক্ত মানবিক স্থল পথগুলো জরুরিভাবে খুলে দেওয়া দরকার। গাজায় সাহায্য বিতরণের নিরাপত্তা সর্বদা নিশ্চিত করা আবশ্যক। এয়ার ড্রপ এবং সম্প্রতি প্রস্তাবিত সামুদ্রিক করিডর এখনো অপর্যাপ্ত। গাজার নাগরিকদের স্বার্থে ইসরায়েলকে তার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া উচিত হবে না। 

দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলকে তার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বন্ধ করতে এবং আইসিজের আদেশ মেনে চলতে বাধ্য করতে বিশ্বনেতাদের সামরিক ও আর্থিক সুবিধা ব্যবহার করতে হবে। ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা প্রদানকারী দেশগুলোকে অবিলম্বে এসব বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করা উচিত এবং ভবিষ্যৎ বিধানের জন্য নতুন শর্তাদি নির্ধারণ করা উচিত। যারা অস্ত্র সরবরাহ চালিয়ে হত্যাকাণ্ডকে সহযোগিতা করেছে, তারাও যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত হতে পারে।

তৃতীয়ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের অবশ্যই ফিলিস্তিন শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের ত্রাণ ও কর্মসংস্থাকে সম্পূর্ণ আর্থিক ও রাজনৈতিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। অনেক দাতা সংস্থা তহবিল স্থগিত করার জন্য ছুটে এসেছে। ইসরায়েলের অভিযোগের তদন্তে উল্লেখ আছে যে, ইউএনআরডব্লিউএর কিছু কর্মী ৭ অক্টোবরের হামলায় অংশ নিয়েছিল। এই  অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া এখন লাখ লাখ ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের অধিকার ও মঙ্গলকে বিপন্ন করে তুলেছে। ইসরায়েল সরকার ইউএনআরডব্লিউএ ভেঙে দেওয়ার তার ইচ্ছা ও কোনো গোপনীয়তা প্রকাশ করেনি। আমরা কি এটাকে আরেকটি যুদ্ধে হতাহতের ঘটনা হতে দেব?

এমন পরিস্থিতিতে ন্যায্য এবং স্থায়ী শান্তির জন্য বিশ্বের জোটবদ্ধ দেশগুলো সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে উন্মুখ হয়ে আছে। সবার আকাঙ্ক্ষা যে, ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনিদের পারস্পরিক সম্মান, আত্মসংকল্প, মর্যাদা ও নিরাপত্তার শর্তে সহাবস্থান করতে পারে। ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের জীবন ও নিরাপত্তা সমান মূল্যের। যদি এই মৌলিক সত্য রাজনৈতিক নেতা এবং সাধারণ নাগরিকদের ওপর প্রাধান্য না পায়, তাহলে আমরা নিষ্পাপ শিশুদের প্রজন্ম থেকে অনেক দূরে চলে যাব। 

লেখক: মোজাম্বিকের সাবেক শিক্ষা ও সংস্কৃতিমন্ত্রী এবং নেলসন ম্যান্ডেলার স্ত্রী
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: সানজিদ সকাল

ছাত্ররাজনীতি থাকা না থাকা

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৪, ১১:২৫ এএম
ছাত্ররাজনীতি থাকা না থাকা
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্ররাজনীতি থাকবে কি থাকবে না, তা নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক। বুয়েটকে ছাত্ররাজনীতিবিহীন রাখতে এখনো অনড় অবস্থানে বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়কে ছাত্ররাজনীতিমুক্ত রাখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বরাবর খোলা চিঠি দিয়েছেন তারা। যাতে প্রয়োজনে আইন সংস্কার করে হলেও বুয়েটকে ছাত্ররাজনীতির বাইরে রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রলীগের দাবি, ছাত্ররাজনীতি থাকতে হবে। অবশ্য অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের ভিন্ন ভিন্ন মতামত রয়েছে এ বিষয়ে। এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাত্ররাজনীতির যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এক পক্ষ বলছে, এই মুহূর্তে দেশে ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজনীয়তা নেই। আরেক পক্ষ যুক্তি দিচ্ছে ছাত্ররাজনীতির অপরিহার্যতা নিয়ে। বিশেষ করে ছাত্রলীগ ছাত্ররাজনীতির ন্যায্যতা নিয়ে যুক্তি উপস্থাপন করে যাচ্ছে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে। তাদের অসংখ্য যুক্তি গ্রহণযোগ্য। অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এক বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাত্ররাজনীতি না থাকার বিষয়ে যে মতামত দিচ্ছে সেগুলোরও বেশ কিছু গ্রহণযোগ্য।

ইতিহাসের পাতায় ছাত্ররাজনীতি হলো বড় বড় রাজনৈতিক নেতা তৈরির সূতিকাগার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, পরবর্তীকালের তোফায়েল আহমেদ, আব্দুর রাজ্জাক, কাজী জাফর, রাশেদ খান মেনন প্রমুখ ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে গড়ে উঠেছেন। কিন্তু বর্তমানের ছাত্ররাজনীতি কি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক নেতা তৈরি করতে পারছে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে অনেক মতদ্বৈধতার পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ এ বিষয়ে একমত হওয়া কঠিন হবে। 

ক্ষমতার আধিপত্য, বড়াই-লড়াই, হল দখল, সিট বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, চাটুকারিতা, পকেট নেতা তৈরি, প্রশাসনের অন্যায্য সমর্থন প্রভৃতি কারণে ছাত্ররাজনীতির যথাযথ বিকাশ হচ্ছে না। ইদানীং গণমাধ্যমে প্রায়ই সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের কতিপয় নেতা-কর্মীর নামে অন্যায়-অপকর্মের খবর পাই। পরক্ষণেই আবার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কর্তৃক সংশ্লিষ্টদের বহিষ্কারসহ নানাবিধ শাস্তিমূলক আয়োজন দেখে অভীভূত হই। মনটা ভরে যায়। মনে হয় আবার যেন ছাত্ররাজনীতি তার পুরোনো রূপ ফিরে পাচ্ছে। 

একসময়ে দেখেছি ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের ভয়াবহ তাণ্ডব এবং বাড়াবাড়ি। শিবিরের ইয়ানতের নামে চলেছে ব্যাপক চাঁদাবাজি। হলগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ইয়ানত (চাঁদা) দিতে বাধ্য করা হতো। কোনো শিক্ষার্থী সেটি দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে কথিত টর্চার সেলে নিয়ে টর্চার করা হতো। এখন ওই সব ইতিহাস পেছনে পড়ে গেছে। কারণ বিগত ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। আর এখন যারা ছাত্র তাদের বয়স বিবেচনা করলে স্পষ্ট ধারণা করা যায় যে, তারা সেই ইতিহাস দেখেননি। খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই বর্তমানের প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনের কর্মকাণ্ড নিয়েই প্রশ্ন উঠবে, সেটি স্বাভাবিক। বিগত সময়ের ঘটনা শুধুই ইতিহাস। যারা সেই ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী নয় তারা এর ভয়াবহতা অনুমান করতে পারবে না।

এখনো কতিপয় ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের বেশ কিছু নেতা-কর্মীর নেতিবাচক কর্মকাণ্ড বিতর্ক তৈরি করেছে। অনেকেই ক্ষমতার দাপটে অপকর্মে লিপ্ত হয়ে নিজেদের প্রিয় সংগঠনকে কলুষিত করে ফেলছে। প্রায়ই গণমাধ্যমে দেখি, ছাত্রলীগের অনেক শীর্ষ পর্যায়ের নেতা নির্বাচিত কিংবা মনোনীত হচ্ছে, যাদের পারিবারিক প্রেক্ষাপট মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে না। বরং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সংগঠনের সক্রিয়দের পারিবারিক উত্তরসূরিরা ছাত্রলীগের পদ ধারণ করছে। আর এতে সহযোগিতা করছেন আওয়ামী লীগের অনেক হাইব্রিড নেতা। এ কারণে গণমাধ্যমের বদৌলতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে বিব্রত হয়েছেন অনেক নেতা।

আমার প্রায় দেড় দশকের শিক্ষকতা জীবনে বেশ কিছু সাধারণ শিক্ষার্থীর নির্যাতন কিংবা অসহায়ত্বের অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করেছি। বড় বড় রাজনৈতিক ইস্যুর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের কতিপয় নেতা-কর্মী কর্তৃক এমন ঘটনা সামাল দিতেই অনেক সময় সরকারকে হিমশিম খেতে হয়। বর্তমান সরকারের শুরু থেকে ছাত্রলীগের বহু বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে বিব্রত হয়েছেন। 

প্রায়ই শুনে থাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে সাধারণ ছাত্র নির্যাতন, অতঃপর হুমকি-ধমকি ও হল থেকে বিতাড়নের ঘটনা। অভিযোগ শুনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ছাত্ররাজনীতি নিয়ে শঙ্কিত হই। লজ্জায় মাথা নুয়ে পড়ে যে বঙ্গবন্ধু তো এমন রাজনৈতিক আদর্শকে প্রশ্রয় দেননি, কখনো শেখাননি। তাহলে কেন এগুলো ঘটছে? ধরে নিতে পারি যে, যারা এমন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত, তারা কোনোভাবেই প্রকৃত অর্থে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নয়। শুধু ছাত্রলীগের রাজনীতিতে নয় এমন নেতিবাচক প্রশ্রয় ওপরতলার রাজনীতিতেও আছে। আর এ কারণে বলা যায় ছাত্ররাজনীতির বর্তমান দশার জন্য শুধু ছাত্ররাই দায়ী নয়। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্ররাজনীতি থেকে আগাছা উপড়ে ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন বারবার। দেশের মূল রাজনীতি, এক কথায় বড় রাজনৈতিক দলগুলো আগাছামুক্ত না হলে তাদের লেজুড়বৃত্তি করছে যে ছাত্রসংগঠনগুলো তাদের আগাছামুক্ত করা যাবে না। দলের কমিটি গঠন ও শাখা গঠনের জন্য এখন যোগ্যতার পাশাপাশি চলে লাখ লাখ টাকার রাজনৈতিক বাণিজ্য। এই অপরাজনীতির দাপটে ক্রমেই ছাত্ররাজনীতি হয়ে উঠছে অসৎ ও অশুভ। আর এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ ছাত্রদের ওপর।

আমি বিভিন্ন সময়ে প্রত্যক্ষ করেছি, অনেক ছাত্রই বঙ্গবন্ধুকে পছন্দ করেন, শেখ হাসিনাকে পছন্দ করেন। আর এই পছন্দ থেকেই একজন সাধারণ ছাত্র তার পরিবারকে যথাযথ আদর্শের মাধ্যমে প্রভাবিত করতে সক্ষম হন। সব শিক্ষার্থীই যে সক্রিয় ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে থাকবে, আবার সবাই যে মিছিল-মিটিংয়ে যাবে এমনটি কোনোভাবে প্রত্যাশিত নয়। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখন সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয় তখন এর প্রভাব কেমন হতে কিংবা কতদূর পৌঁছাতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। 

ইদানীং যারা ছাত্ররাজনীতি করে তাদের অধিকাংশই রাজনৈতিক কোনো আদর্শ ধারণ করে করে না। মূল বিষয় হচ্ছে হলে থাকা, রাজনৈতিক বড় ভাইদের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে সুবিধা আদায় করা। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেকেই ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। এ কারণে ক্ষমতার রদবদল হলে এদের অনেককেই খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং রং বদলে মিশে যায় অন্য দলে। এত কিছুর পরেও বিশ্বাস করি, ছাত্ররাই পারে অপার শক্তি ও সাহস নিয়ে জাতির পাশে দাঁড়াতে, ছাত্রদের ওপরই সেই আস্থা রাখা যায়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ইতিহাসের প্রত্যেকটি সফলতায় ছাত্রদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু এমনও শিক্ষার্থী আছে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে রাজনীতি করে নিজের জীবন বলি দিয়ে লাশ হয়ে ফিরেছে। আবার অনেকেই ছাত্রত্বকে বলি দিয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরেছে। দেশের ছাত্ররাজনীতি যদি কলুষমুক্ত না হয়, আগাছামুক্ত না হয়, তাহলে জীবন বলিদান ও ছাত্রত্ব বলিদানের ঘটনা অনবরত ঘটতেই থাকবে। 

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

মানবসক্ষমতা বিনির্মাণে বঞ্চিত শিক্ষা খাত

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৪, ১০:০৭ এএম
মানবসক্ষমতা বিনির্মাণে বঞ্চিত শিক্ষা খাত
রাশেদা কে চৌধূরী

শিক্ষাক্ষেত্রে বড় অর্জন হলো সর্বস্তরের মানুষের চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। যার ফল আমরা ইতোমধ্যে দেখতে পাচ্ছি। আমাদের মেয়েরা পড়ালেখায় ভালো ফল করছে। তবে এটিও সত্যি যে, শিক্ষাক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। আমাদের শিক্ষাটা জ্ঞানকেন্দ্রিক না হয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার আগে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এত পাবলিক পরীক্ষা নেই। শিক্ষাক্ষেত্রে ফিনল্যান্ড বিশ্বের অন্যতম রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত। সেখানে শ্রেণিকক্ষভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়। পাবলিক পরীক্ষার মূল যে লক্ষ্য দক্ষতা ও যোগ্যতা যাচাই, সেটি আমাদের পরীক্ষায় হয় না। পরীক্ষায় ব্যাপক হারে পাস করিয়ে দেওয়ার পরও গবেষণায় ছাত্রছাত্রীরা ভালো করতে পারে না। তার মানে পাবলিক পরীক্ষা তাদের কোনো কাজে আসে না। আমাদের শিক্ষকরা হলেন শিক্ষাব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি। শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। যুগের চাহিদা মেটাতে দেশের শিক্ষকরা কতটা দক্ষ এবং সেটি তারা প্রয়োগ করতে পারছেন কি না দেখতে হবে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের দক্ষ শিক্ষক তৈরির বিকল্প নেই। সরকার সম্প্রতি কারিকুলাম সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। আশা করি, সেখানে মুক্তবুদ্ধির বিকাশ হবে। নতুন শিক্ষাক্রমের যে রূপরেখা আমরা দেখেছি, তাতে আমাদের দীর্ঘদিনের শিক্ষককেন্দ্রিক, মুখস্থনির্ভর শিখন-শেখানো প্রক্রিয়া এবং পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়নব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও পারদর্শিতানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় রূপান্তর ঘটানোর উপাদান রয়েছে।
 
তবে দেশে শিক্ষাব্যয়ের চিত্র যথেষ্ট উদ্বেগজনক। এটিই এখন প্রবণতা হয়ে উঠেছে। অভিভাবকদের পকেট থেকে শিক্ষাব্যয়ের ৭১ শতাংশ যাওয়ার বড় কারণ, শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ কম। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ যেখানে যেভাবে হওয়া দরকার সেভাবে হচ্ছে না। শিক্ষাব্যবস্থা প্রধানত পরীক্ষানির্ভর হয়ে উঠেছিল। বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই কম। দীর্ঘদিন ধরে বরাদ্দ জিডিপির দুই থেকে আড়াই শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ এ খাতে বরাদ্দ জরুরি। 

ইউনেসকোও শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করেছে। শিক্ষা খাতে কম বরাদ্দ আমরা প্রায়ই দেখে থাকি। করোনার কারণে শিক্ষা খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই সময়ে শিক্ষকদের সামান্য কিছু ভাতা দেওয়া ছাড়া এ খাতে বিশেষ কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি বললেই চলে। অথচ অন্য প্রায় সব খাতে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষায় কেমন ক্ষতি হলো, তা যেমন নির্ণয় হয়নি; তেমনি ক্ষতি পোষাতেও বিনিয়োগ দৃশ্যমান ছিল না। মানবসক্ষমতা বিনির্মাণের খাত এভাবে অবহেলিত থাকলে ভবিষ্যতে গার্মেন্টের মতো অন্য খাতেও দেশের বাইরে থেকে দক্ষ জনশক্তি এনে চালাতে হবে। এটি বাঞ্ছনীয় নয়।

করোনা মহামারির সময় বড় একটি জনগোষ্ঠী খাদ্য ও আয় নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়ে। ওই সময় অনেক অবস্থাপন্ন পরিবারও আর্থিক সংকটে পড়ে। দরিদ্র পরিবারের কথা বলা বাহুল্য। সে জন্য দরিদ্র পরিবারের অনেকেই তাদের সন্তানদের কাজে লাগিয়ে দিয়েছে। স্কুলপড়ুয়া অনেক মেয়ের এ সময়ে বিয়ে হয়ে গেছে। যারা শ্রমবাজারে যুক্ত হয়েছে, প্রণোদনার মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে আনা হয়তো কঠিন হতো না, কিন্তু সেটি করা হয়নি। 

এলাকাভেদে শিক্ষার চাহিদা একেক জায়গায় একেক রকম। মহানগরগুলোতে শিক্ষার যে অবকাঠামো রয়েছে, চর-হাওর বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের অবকাঠামো এক রকম নয়। এসব এলাকায় যে ধরনের চাহিদা রয়েছে, সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মিড-ডে মিল’ বা দুপুরের খাবার বড় সহায়ক হতে পারে। মিড-ডে মিলের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ২০২৪ সালের মধ্যে সর্বজনীন করার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর করোনা চলে এল, ফলে সেটি বাস্তবায়নে আর অগ্রগতি হয়নি। বিনামূল্যের পাঠ্যবই নিঃসন্দেহে শিক্ষার্থী ও পরিবারগুলোর জন্য স্বস্তির বিষয়। প্রতিবছর শিক্ষার্থীরা নতুন বই পাচ্ছে, সেটিও তাদের পড়াশোনার জন্য বড় প্রণোদনা।

শিক্ষার উন্নয়নে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। এ পর্যায়ে শিক্ষা সরকারি নিয়মনীতির আওতায় থাকার ফলে এক ধরনের শৃঙ্খলাও রয়েছে। তবে মান নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। শিক্ষার্থীদের যে দক্ষতা অর্জন করার কথা, তা পুরোপুরি অর্জিত হচ্ছে না। বিষয়ভিত্তিক দক্ষতায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। নতুন কারিকুলাম যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে হয়তো সে সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ না হওয়ায় এখানে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলাও রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করার শুধু খরচ নয়, এ পর্যায়ে নানা ধরনের বাণিজ্য চলমান। এখন অবশ্য এনটিআরসির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে বলে সে ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে জাতীয়করণই একমাত্র সমাধান নয়, পাশাপাশি প্রশাসনিক সমন্বয়ও অত্যন্ত জরুরি। 

প্রাথমিক স্তরে হঠাৎ করে বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলো। নতুন শিক্ষাক্রমে যেখানে আমরা ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সরে আসার প্রয়াস দেখা গেছে। সেখানে এটা কেন হলো? এতে শিক্ষার্থীদের কোচিং কিংবা গাইড বইয়ের দিকেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা কেবল শিক্ষাব্যয়ই নয়, আরও সংকট তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট কিংবা কোচিং সেন্টারমুখী হওয়ায় পরিবারগুলোর ওপর চাপ পড়েছে। ২০১০ সালে শিক্ষানীতি হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে এখানে লাগাম টেনে ধরা যেত। শিক্ষানীতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য আইন দরকার ছিল। সেই আইনি কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। পরীক্ষানির্ভর হওয়ার কারণে শিক্ষার ঢালাও বাণিজ্যিকীকরণ অব্যাহত রয়েছে। 

তাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং রাষ্ট্র সবারই ক্ষতি হয়েছে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা আকর্ষণীয় নয় বলে শ্রেণিকক্ষের পঠন-পাঠনে তাদের মনোযোগ কম থাকে। উন্নত বিশ্বে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা-মর্যাদা বেশি হওয়ার কারণে মেধাবী, দক্ষ শিক্ষক আকৃষ্ট করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু সে রকম বেতন তো আমরা এখনো দিতে পারছি না।

নতুন শিক্ষাক্রমের যে রূপরেখা দেখা যাচ্ছে তাতে আমাদের দীর্ঘদিনের শিক্ষককেন্দ্রিক, মুখস্থনির্ভর শিখন-শেখানো প্রক্রিয়া এবং পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়নব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও পারদর্শিতানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় রূপান্তর ঘটানোর উপাদান রয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করে নতুন শিক্ষাক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে পরিবারের শিক্ষাব্যয়ের চাপও কমবে। পরীক্ষানির্ভরতা হ্রাস পাওয়ার কারণে গাইড বই কিংবা কোচিংয়ের ওপর শিক্ষার্থীদের আর নির্ভর করার প্রয়োজন হবে না।

নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে ইতোমধ্যে নানা ধরনের কথা উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে এক নিয়মে আবদ্ধ হওয়ার পর সেখান থেকে নতুনভাবে উত্তরণের পথে চলার সময় নানামুখী বিরোধিতাসহ সংকট তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে মোটাদাগে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, শিক্ষকদের দক্ষতা কতটুকু। যেহেতু এ শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়নে শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই শিক্ষকের দক্ষতা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষক কীভাবে শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করবেন, সেই প্রশিক্ষণ লাগবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণে ঘাটতি থাকলে নতুন শিক্ষাক্রম পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। এর আগে আমরা দেখেছি এ কারণে সৃজনশীল পদ্ধতি হোঁচট খেয়েছে। 

আরেকটি বিষয় হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক অবস্থা ও সক্ষমতা। মহানগরে যেমন অবকাঠামো রয়েছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে তেমনটি না থাকলে সেখানকার শিক্ষার্থীরা তো একই সুফল পাবে না। তৃতীয় বিষয় মনিটরিং। শিক্ষাক্রম কীভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে, তার নিয়মিত মনিটরিং না হলে বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। শিক্ষকরা খাপ খাইয়ে নিতে পারছেন কি না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন শিক্ষাক্রম কীভাবে চলছে, শিক্ষা প্রশাসনকে সেটি নিয়মিত তদারক করতেই হবে। তদারকিতে ঘাটতি থাকলে সুফল পাওয়া যাবে না। মনে রাখা প্রয়োজন, আমাদের সর্বস্তরের জনমানুষের মধ্যে শিক্ষার চাহিদা তৈরি হয়েছে। সবাই চায় তাদের সন্তানরা পড়াশোনা করুক। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহে যদি ঘাটতি থাকে তাহলে আমরা এগোতে পারব না। সে জন্য সঠিক সময়ে সঠিক তথ্যনির্ভর পরিকল্পনা, যথাযথ বিনিয়োগ ও সঠিক বাস্তবায়ন দরকার। সময়ে সময়ে যথাযথ তদারকির মাধ্যমে আমাদের ঘাটতি চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত হতে পারে।

লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা