মানবসক্ষমতা বিনির্মাণে বঞ্চিত শিক্ষা খাত । খবরের কাগজ
ঢাকা ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

মানবসক্ষমতা বিনির্মাণে বঞ্চিত শিক্ষা খাত

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৪, ১০:০৭ এএম
মানবসক্ষমতা বিনির্মাণে বঞ্চিত শিক্ষা খাত
রাশেদা কে চৌধূরী

শিক্ষাক্ষেত্রে বড় অর্জন হলো সর্বস্তরের মানুষের চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। যার ফল আমরা ইতোমধ্যে দেখতে পাচ্ছি। আমাদের মেয়েরা পড়ালেখায় ভালো ফল করছে। তবে এটিও সত্যি যে, শিক্ষাক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। আমাদের শিক্ষাটা জ্ঞানকেন্দ্রিক না হয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার আগে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এত পাবলিক পরীক্ষা নেই। শিক্ষাক্ষেত্রে ফিনল্যান্ড বিশ্বের অন্যতম রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত। সেখানে শ্রেণিকক্ষভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়। পাবলিক পরীক্ষার মূল যে লক্ষ্য দক্ষতা ও যোগ্যতা যাচাই, সেটি আমাদের পরীক্ষায় হয় না। পরীক্ষায় ব্যাপক হারে পাস করিয়ে দেওয়ার পরও গবেষণায় ছাত্রছাত্রীরা ভালো করতে পারে না। তার মানে পাবলিক পরীক্ষা তাদের কোনো কাজে আসে না। আমাদের শিক্ষকরা হলেন শিক্ষাব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি। শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। যুগের চাহিদা মেটাতে দেশের শিক্ষকরা কতটা দক্ষ এবং সেটি তারা প্রয়োগ করতে পারছেন কি না দেখতে হবে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের দক্ষ শিক্ষক তৈরির বিকল্প নেই। সরকার সম্প্রতি কারিকুলাম সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। আশা করি, সেখানে মুক্তবুদ্ধির বিকাশ হবে। নতুন শিক্ষাক্রমের যে রূপরেখা আমরা দেখেছি, তাতে আমাদের দীর্ঘদিনের শিক্ষককেন্দ্রিক, মুখস্থনির্ভর শিখন-শেখানো প্রক্রিয়া এবং পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়নব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও পারদর্শিতানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় রূপান্তর ঘটানোর উপাদান রয়েছে।
 
তবে দেশে শিক্ষাব্যয়ের চিত্র যথেষ্ট উদ্বেগজনক। এটিই এখন প্রবণতা হয়ে উঠেছে। অভিভাবকদের পকেট থেকে শিক্ষাব্যয়ের ৭১ শতাংশ যাওয়ার বড় কারণ, শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ কম। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ যেখানে যেভাবে হওয়া দরকার সেভাবে হচ্ছে না। শিক্ষাব্যবস্থা প্রধানত পরীক্ষানির্ভর হয়ে উঠেছিল। বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই কম। দীর্ঘদিন ধরে বরাদ্দ জিডিপির দুই থেকে আড়াই শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ এ খাতে বরাদ্দ জরুরি। 

ইউনেসকোও শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করেছে। শিক্ষা খাতে কম বরাদ্দ আমরা প্রায়ই দেখে থাকি। করোনার কারণে শিক্ষা খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই সময়ে শিক্ষকদের সামান্য কিছু ভাতা দেওয়া ছাড়া এ খাতে বিশেষ কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি বললেই চলে। অথচ অন্য প্রায় সব খাতে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষায় কেমন ক্ষতি হলো, তা যেমন নির্ণয় হয়নি; তেমনি ক্ষতি পোষাতেও বিনিয়োগ দৃশ্যমান ছিল না। মানবসক্ষমতা বিনির্মাণের খাত এভাবে অবহেলিত থাকলে ভবিষ্যতে গার্মেন্টের মতো অন্য খাতেও দেশের বাইরে থেকে দক্ষ জনশক্তি এনে চালাতে হবে। এটি বাঞ্ছনীয় নয়।

করোনা মহামারির সময় বড় একটি জনগোষ্ঠী খাদ্য ও আয় নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়ে। ওই সময় অনেক অবস্থাপন্ন পরিবারও আর্থিক সংকটে পড়ে। দরিদ্র পরিবারের কথা বলা বাহুল্য। সে জন্য দরিদ্র পরিবারের অনেকেই তাদের সন্তানদের কাজে লাগিয়ে দিয়েছে। স্কুলপড়ুয়া অনেক মেয়ের এ সময়ে বিয়ে হয়ে গেছে। যারা শ্রমবাজারে যুক্ত হয়েছে, প্রণোদনার মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে আনা হয়তো কঠিন হতো না, কিন্তু সেটি করা হয়নি। 

এলাকাভেদে শিক্ষার চাহিদা একেক জায়গায় একেক রকম। মহানগরগুলোতে শিক্ষার যে অবকাঠামো রয়েছে, চর-হাওর বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের অবকাঠামো এক রকম নয়। এসব এলাকায় যে ধরনের চাহিদা রয়েছে, সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মিড-ডে মিল’ বা দুপুরের খাবার বড় সহায়ক হতে পারে। মিড-ডে মিলের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ২০২৪ সালের মধ্যে সর্বজনীন করার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর করোনা চলে এল, ফলে সেটি বাস্তবায়নে আর অগ্রগতি হয়নি। বিনামূল্যের পাঠ্যবই নিঃসন্দেহে শিক্ষার্থী ও পরিবারগুলোর জন্য স্বস্তির বিষয়। প্রতিবছর শিক্ষার্থীরা নতুন বই পাচ্ছে, সেটিও তাদের পড়াশোনার জন্য বড় প্রণোদনা।

শিক্ষার উন্নয়নে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। এ পর্যায়ে শিক্ষা সরকারি নিয়মনীতির আওতায় থাকার ফলে এক ধরনের শৃঙ্খলাও রয়েছে। তবে মান নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। শিক্ষার্থীদের যে দক্ষতা অর্জন করার কথা, তা পুরোপুরি অর্জিত হচ্ছে না। বিষয়ভিত্তিক দক্ষতায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। নতুন কারিকুলাম যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে হয়তো সে সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ না হওয়ায় এখানে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলাও রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করার শুধু খরচ নয়, এ পর্যায়ে নানা ধরনের বাণিজ্য চলমান। এখন অবশ্য এনটিআরসির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে বলে সে ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে জাতীয়করণই একমাত্র সমাধান নয়, পাশাপাশি প্রশাসনিক সমন্বয়ও অত্যন্ত জরুরি। 

প্রাথমিক স্তরে হঠাৎ করে বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলো। নতুন শিক্ষাক্রমে যেখানে আমরা ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সরে আসার প্রয়াস দেখা গেছে। সেখানে এটা কেন হলো? এতে শিক্ষার্থীদের কোচিং কিংবা গাইড বইয়ের দিকেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা কেবল শিক্ষাব্যয়ই নয়, আরও সংকট তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট কিংবা কোচিং সেন্টারমুখী হওয়ায় পরিবারগুলোর ওপর চাপ পড়েছে। ২০১০ সালে শিক্ষানীতি হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে এখানে লাগাম টেনে ধরা যেত। শিক্ষানীতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য আইন দরকার ছিল। সেই আইনি কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। পরীক্ষানির্ভর হওয়ার কারণে শিক্ষার ঢালাও বাণিজ্যিকীকরণ অব্যাহত রয়েছে। 

তাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং রাষ্ট্র সবারই ক্ষতি হয়েছে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা আকর্ষণীয় নয় বলে শ্রেণিকক্ষের পঠন-পাঠনে তাদের মনোযোগ কম থাকে। উন্নত বিশ্বে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা-মর্যাদা বেশি হওয়ার কারণে মেধাবী, দক্ষ শিক্ষক আকৃষ্ট করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু সে রকম বেতন তো আমরা এখনো দিতে পারছি না।

নতুন শিক্ষাক্রমের যে রূপরেখা দেখা যাচ্ছে তাতে আমাদের দীর্ঘদিনের শিক্ষককেন্দ্রিক, মুখস্থনির্ভর শিখন-শেখানো প্রক্রিয়া এবং পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়নব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও পারদর্শিতানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় রূপান্তর ঘটানোর উপাদান রয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করে নতুন শিক্ষাক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে পরিবারের শিক্ষাব্যয়ের চাপও কমবে। পরীক্ষানির্ভরতা হ্রাস পাওয়ার কারণে গাইড বই কিংবা কোচিংয়ের ওপর শিক্ষার্থীদের আর নির্ভর করার প্রয়োজন হবে না।

নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে ইতোমধ্যে নানা ধরনের কথা উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে এক নিয়মে আবদ্ধ হওয়ার পর সেখান থেকে নতুনভাবে উত্তরণের পথে চলার সময় নানামুখী বিরোধিতাসহ সংকট তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে মোটাদাগে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, শিক্ষকদের দক্ষতা কতটুকু। যেহেতু এ শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়নে শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই শিক্ষকের দক্ষতা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষক কীভাবে শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করবেন, সেই প্রশিক্ষণ লাগবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণে ঘাটতি থাকলে নতুন শিক্ষাক্রম পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। এর আগে আমরা দেখেছি এ কারণে সৃজনশীল পদ্ধতি হোঁচট খেয়েছে। 

আরেকটি বিষয় হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক অবস্থা ও সক্ষমতা। মহানগরে যেমন অবকাঠামো রয়েছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে তেমনটি না থাকলে সেখানকার শিক্ষার্থীরা তো একই সুফল পাবে না। তৃতীয় বিষয় মনিটরিং। শিক্ষাক্রম কীভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে, তার নিয়মিত মনিটরিং না হলে বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। শিক্ষকরা খাপ খাইয়ে নিতে পারছেন কি না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন শিক্ষাক্রম কীভাবে চলছে, শিক্ষা প্রশাসনকে সেটি নিয়মিত তদারক করতেই হবে। তদারকিতে ঘাটতি থাকলে সুফল পাওয়া যাবে না। মনে রাখা প্রয়োজন, আমাদের সর্বস্তরের জনমানুষের মধ্যে শিক্ষার চাহিদা তৈরি হয়েছে। সবাই চায় তাদের সন্তানরা পড়াশোনা করুক। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহে যদি ঘাটতি থাকে তাহলে আমরা এগোতে পারব না। সে জন্য সঠিক সময়ে সঠিক তথ্যনির্ভর পরিকল্পনা, যথাযথ বিনিয়োগ ও সঠিক বাস্তবায়ন দরকার। সময়ে সময়ে যথাযথ তদারকির মাধ্যমে আমাদের ঘাটতি চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত হতে পারে।

লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

উত্তেজনা-অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হবে

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৪, ১১:৩১ এএম
উত্তেজনা-অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হবে
মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার

দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা, সেটি এখনো পরিষ্কার না। এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বর্তমানে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যে রকম সম্পর্ক, তাতে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা- মোসাদের প্রতি অনেকের সন্দেহ হতে পারে। কারণ মোসাদ বিভিন্ন সময়ে ইরানের রাজনীতিক, বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যা করেছে। এর আগে সিরিয়ায় ইরানি কনস্যুলেটে হামলা চালিয়ে ইরানের ছয়-সাতজন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে। তাই মোসাদ জড়িত থাকতে পারে, এমন সন্দেহ করা অমূলক নয়। 

যদি ইরানের গোয়েন্দারা বুঝতে পারেন যে এটি নাশকতা, তাহলে তারা স্বাভাবিকভাবেই প্রতিশোধ নিতে চাইবে। সেটি হলে এই অঞ্চলে নিশ্চিতভাবে উত্তেজনা বাড়বে। সে ক্ষেত্রে ইরান পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নেবে। সেটি তারা কীভাবে নেবে, তা দেখার বিষয়। এমনকি সেটি সরাসরি যুদ্ধের পর্যায়েও চলে যেতে পারে। 

এমনিতেই ওই অঞ্চলে নানা সংঘাতপূর্ণ ইস্যু রয়েছে। গাজা হত্যাকাণ্ড, হুথি বিদ্রোহীদের হামলা, হিজবুল্লাহ, হামাসের গেরিলা যুদ্ধ; তার ওপর এমন ঘটনা নিঃসন্দেহ অঞ্চলটিতে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করল।

লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক

ক্ষমতা কাঠামোতে পরিবর্তন হয়নি

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৪, ১১:২৯ এএম
ক্ষমতা কাঠামোতে পরিবর্তন হয়নি
এম হুমায়ুন কবির

দুর্ঘটনার কারণে ইরানের ক্ষমতাকাঠামোতে পরিবর্তন ঘটেনি। খামেনি সাহেব সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যমণি। কাজেই নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত তেমন নেই। 

দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট রাইসি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মৃত্যুতে প্রতিবেশীরাও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কোনো কোনো প্রতিবেশী তো সহযোগিতাও করছে, যেমন তুরস্ক। ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রও নেতিবাচক কিছু বলেনি বা করেনি। তাই আমার মনে হয় না, এই অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা বাড়বে। 

দুর্ঘটনার পর অনেক ধরনের স্পেকুলেশন দেখছি। অনেকে বলছেন, নাশকতাও হতে পারে। তবে বিষয়টি এখনো পরিষ্কার না। নাশকতার বিষয়টি উড়িয়েও দেওয়া যায় না, আবার ঘটনা না জানা পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তেও আসা যাবে না। শেষ পর্যন্ত যদি নাশকতা বা অন্য কোনো দেশের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তাহলে পরিস্থিতি অবশ্যই অন্য রকম হবে। তবে এখন পর্যন্ত তেমন লক্ষণ নেই।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত

পরিস্থিতি ভিন্ন হবে, নাশকতা হলে

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৪, ১১:২৬ এএম
পরিস্থিতি ভিন্ন হবে, নাশকতা হলে
মুন্সি ফয়েজ আহমেদ

এটি এখন পর্যন্ত একটি নিছক দুর্ঘটনা। ফলে এ নিয়ে তেমন প্রতিক্রিয়া হবে না। পরবর্তী সময়ে যদি কোনোভাবে প্রমাণিত হয় যে বিদেশি সম্পৃক্ততায় এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে; সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অন্য রকম হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। 

তবে এখন পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকেও সন্দেহ করার মতো এমন কিছু বলা হয়নি। ইসরায়েলের পক্ষ থেকেও কিছু বলা হয়নি। এই অবস্থায় উত্তেজনাকর কিছু হবে বলে মনে হয় না। 

ইরান খুব সুশৃঙ্খল একটি দেশ। দুর্ঘটনার পর পরই ভাইস প্রেসিডেন্টকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে মুরুব্বিরা সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। তাই ইরানের অভ্যন্তরেও উত্তেজনাকর কিছু হবে না। তবে ইব্রাহিম রাইসির অনুপস্থিতি ন্যূনতম হলেও ইরানের এগিয়ে যাওয়ার পথকে বাধাগ্রস্ত করবে। এর বেশি কিছু আপাতত মনে হচ্ছে না।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত

পুরো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়াবে

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৪, ১১:২০ এএম
পুরো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়াবে
অধ্যাপক এম শহীদুজ্জামান

অবশ্যই পুরো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়াবে এই দুর্ঘটনা। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন। দুজনই অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। এটা নাশকতা কি না, যদিও সেটা এখনো প্রমাণিত নয়।

নিহত পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনেক নতুন নতুন পরিবর্তন এনেছেন ওই অঞ্চলে। যেমন, ইরান-সৌদি আরব সম্পর্ক স্থাপন বা ইরান-তুরস্ক সম্পর্কের কথাও বলা যায়। এগুলো ইসরায়েলকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। 

ঘটনা দেখে মনে হচ্ছে নাশকতা হতেও পারে। সঙ্গে আরও দুটো হেলিকপ্টার ছিল প্রোটেকশনের জন্য। তারা অ্যাটেম্পট নিলে বাঁচাতেও পারত হয়তো, কিন্তু তারা সেটা করেনি। তা ছাড়া আমেরিকা-ইসরায়েল বিশেষ ধরনের ডিভাইস তারা ব্যবহার করে এমন ঘটনা আগেও ঘটিয়েছে।

লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

বাংলাদেশের স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রয়োজন

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৪, ১১:০৪ এএম
বাংলাদেশের স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রয়োজন
মো. তৌহিদ হোসেন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু দুই দিনের বাংলাদেশ সফরে আসেন গত ১৪-১৫ মে। সফরকালে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন এবং পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় মিলিত হন। এ ছাড়া  তিনি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের দেওয়া নৈশভোজে অংশ নেন। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন ডোনাল্ড লু। 

বাংলাদেশে গত ৭ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে মানবাধিকার ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারের গভীর মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল। অবাধ, নিরপেক্ষ ও নির্বিঘ্ন নির্বাচনের স্বার্থে ভিসানীতিতে কড়াকড়ি আরোপের ঘোষণা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। নির্বাচনের পরও নির্বাচন সুষ্ঠু ও মানসম্পন্ন হয়নি বলে যুক্তরাষ্ট্র বিবৃতি দিয়েছিল। এমতাবস্থায়, নির্বাচনের পাঁচ মাসের মাথায় ডোলান্ড লুর এবারের সফর দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে এক ধরনের উত্তরণের প্রয়াস বলেই সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হচ্ছে।

লুর বক্তব্যেও সেটির আভাস পাওয়া যায়। অস্বস্তি কাটিয়ে দুই দেশের মধ্যে পুনরায় আস্থা স্থাপনের চেষ্টা করছেন বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন ডোনাল্ড লু। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অনেক বিষয়ে মতভেদ ছিল। আমরা অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন (বাংলাদেশে) অনুষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলাম। এতে কিছু টেনশন তৈরি হয়েছিল। তবে আমরা সামনে তাকাতে চাই, পেছনে নয়। কাজেই সম্পর্ক উন্নয়নের উপায় খুঁজে বের করতে হবে বলেও মনে করেছেন লু। বিষয়গুলো দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

লু বলেন, এই সম্পর্কের পথে অনেকগুলো কঠিন বিষয় রয়েছে, যথা র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার। এসবকে পাশে রেখে ব্যবসার পরিবেশের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরও বেশকিছু বিষয়কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে সাংবাদিকদের বলেন মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। 

ডোনাল্ড লুর সফরে সার্বিক সুর অনেকটাই ইতিবাচক ছিল। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছিল যে, এবারের সফরের মাধ্যমে র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসতে পারে। কিন্তু ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্টতই বলা হয়েছে যে, তা হচ্ছে না। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেশটার নৈশভোজের সময় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের অব্যাহত পতনের বিষয়টি লু উল্লেখ করেছেন, এবং মার্কিন বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলো যে তাদের লভ্যাংশ ফেরত নিতে পারছে না এনিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পক্ষান্তরে নাগরিক সমাজের সঙ্গে মতবিনিময়ে লু বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জনগণ এবং তাদের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি তাদের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করে।

নির্বাচন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী পর্যায়ে বহিঃরাষ্ট্রগুলোর প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নির্বাচনের আগে চীন, রাশিয়া এবং বিশেষ করে ভারত, সরকারের পক্ষে খুব শক্ত অবস্থান নিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশগুলো একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য তাদের চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছিল। নির্বাচনের পর পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর অনেকটা স্থিমিত হয়ে আসে। অনুমান করা যায় যে, সরকারের পক্ষে ভারতের শক্ত অবস্থানের কারণে, বাংলাদেশের নির্বাচন ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে সংঘাতময় সম্পর্কে জড়ানো যুক্তরাষ্ট্র নিজ স্বার্থের অনুকূল মনে করেনি। ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য চীনের আধিপত্যরোধ, যাতে ভারত তার সহযোগী।

বাংলাদেশের নির্বাচন যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আশানুরূপ হয়নি, দেশ দুটির মধ্যে পরস্পরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তো শেষ হয়ে যায়নি। ডোনাল্ড লুর সাম্প্রতিক সফরকে এই প্রেক্ষিত থেকে দেখতে হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে যে বহুমাত্রিক সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের আছে, সে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা তারা রক্ষা করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের স্বার্থ হয়তো বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তবে বিভিন্ন ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থও বিদ্যমান। আগামী সময়গুলোতে যে বিষয়গুলো আমাদের সামনে আছে তার মধ্যে অন্যতম নিরাপত্তা ইস্যু। যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা ইস্যুতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেবে বলে মনে করা হচ্ছে । 

অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটা আশঙ্কা সবসময় ছিল যে, নির্বাচনের পর পশ্চিমা দেশগুলো থেকে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা আসে কি না! এ ক্ষেত্রে ভিসা নিষেধাজ্ঞা কিছু কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও অর্থনীতির ওপর এখন পর্যন্ত কোনো বিরূপ প্রভাব দেখা যায়নি। আগামী দিনগুলোয় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে উভয় পক্ষকেই। যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কোনো বিকল্প নেই বাংলাদেশের জন্য। একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যখন টানাপোড়েন থাকে তখন ব্যবসায়ীরাও তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে শঙ্কিত থাকেন। বাংলাদেশ আশা করবে, এই সফরের প্রেক্ষিতে সে আশঙ্কা দূরীকরণের পরিবেশ সৃষ্টি হবে। 

আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে আরও কয়েকটি দেশ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত আছে, যেমন ভারত, চীন, মায়ানমার ইত্যাদি। ভারতের সঙ্গে বর্তমান সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান থাকার পরিপ্রেক্ষিতে মনে করা যায় যে, ভারতের নিরাপত্তার প্রয়োজনগুলোকে সরকার হয়তো বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে অন্যান্য দেশের তুলনায়। তবে ভারতের স্বার্থ যে সবসময় বাংলাদেশের সঙ্গে একইরকম হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। লক্ষ্য রাখতে হবে যে, ভারতের স্বার্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বার্থ যেন বিঘ্নিত না হয়। 

নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশের অন্যতম উদ্বেগের বিষয় মায়ানমার পরিস্থিতি। ইতোমধ্যে মায়ানমারের গৃহযুদ্ধ এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। রোহিঙ্গা সমস্যায় আমাদের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে অতীতে প্রকৃত প্রস্তাবে ভারত বা চীন কোনো ধরনের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি। প্রত্যাশিতভাবে, নিজেদের স্বার্থের নিরিখেই তারা তাদের কার্যক্রমকে সীমিত রেখেছে। ভারত, চীন ছাড়াও মায়ানমারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে ভারত, চীনের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা লাভের চেষ্টা বাংলাদেশের স্বার্থে অপরিহার্য।

রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় পশ্চিমের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে  ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য জরুরি। রপ্তানি পণ্যের বাজার, বিদেশি বিনিয়োগের উৎস, রেমিট্যান্স ইত্যাদি সব বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্য অপরিসীম। এ ছাড়া আছে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। এসব কথা মাথায় রেখেই সামনের দিনগুলোতে আমাদের বৈদেশিক সম্পর্কের অগ্রাধিকারগুলোকে নির্ধারণ করতে হবে।

লেখক: সাবেক পররাষ্ট্র সচিব