ঢাকা ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, রোববার, ২৬ মে ২০২৪

উপজেলা নির্বাচন: আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে অস্বস্তি

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ১১:০৪ এএম
উপজেলা নির্বাচন: আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে অস্বস্তি
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

বিএনপি উপজেলা নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিলেও দলটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে এখনো স্পষ্ট বিভ্রান্তি বিদ্যমান। দলীয় প্রতীকে যেহেতু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না, সেহেতু নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে বিএনপি অটল থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের অবস্থান কী হবে, এ বিষয়ে এখনো অস্পষ্টতায় রয়েছেন দলের শীর্ষ নেতারা। অন্যদিকে সাধারণ জনগণের মনেও একধরনের ধূম্রজাল রয়েছে। স্বতন্ত্রভাবে দলের কেউ নির্বাচন করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, নাকি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল নেবে, তা নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। যে কারণে অনেকটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে দলের অভ্যন্তরে। দীর্ঘদিন থেকে আমরা লক্ষ করেছি, বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ায় এবং নেতৃত্ব-সংকটে দলের সিদ্ধান্ত নিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে সব সময়ই প্রতিটি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির নেতারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। প্রায় দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে এই দলটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও অনেকটা হারিয়ে ফেলেছে বলে অনুমান করা যায়। 

উপজেলা নির্বাচনকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিএনপির অনকেই মনে করেন, তারা যেহেতু কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে নেই, সেহেতু নেতা-কর্মীদের সক্রিয় এবং ঐক্যবদ্ধ রাখতে কৌশলে হলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা উচিত। তা ছাড়া এ কথাও সত্য যে, অসংখ্য নেতা-কর্মীকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখা এই মুহূর্তে বিএনপির জন্য কঠিন হবে।

গত ৭ জানুয়ারির নির্বাচন বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বর্জনের সিদ্ধান্তকেও অনেকেই ভুল সিদ্ধান্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও চায় বিএনপি উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। উল্লেখ্য, প্রথম ধাপের ১৫০টি উপজেলা নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় শেষ হওয়ার পর বিএনপি নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে জামায়াতে ইসলামীও সিদ্ধান্ত বদল করেছে। দলটির আগের অবস্থান ছিল কেন্দ্রীয়ভাবে ভোটে অংশ নেওয়ার। ঘোষণা না দিয়ে যেসব উপজেলায় জয়ের সম্ভাবনা আছে, সেখানে দলের নেতারা স্থানীয়ভাবে প্রার্থী হবেন। অনেকে গণসংযোগও শুরু করেছেন। সারা দেশে অসংখ্য নেতা-কর্মী পোস্টার-ব্যানার এবং প্রত্যক্ষ জনসংযোগের মাধ্যমে মাঠে রয়েছেন। উল্লেখ্য, জামায়াত বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা বললেও দলটির নেতারা গত ৯ মার্চ অনুষ্ঠিত বিভিন্ন পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন, উপনির্বাচনে অংশ নেন। দুটি ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী জামায়াত নেতা জয়ীও হয়েছেন। উপজেলা নির্বাচন দলীয়ভাবে হলেও এবার দলীয় প্রতীক দিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। এ কারণে আওয়ামী লীগের ভেতর থেকেই অসংখ্য প্রার্থী নির্বাচনে থাকছেন। একইভাবে বিএনপি-জামায়াত থেকেও প্রার্থী থাকবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকেও বলে দেওয়া হয়েছে যে, আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারব্যবস্থার নির্বাচনগুলো আর দলীয়ভাবে হবে না। যেকোনো প্রার্থীর পক্ষে দলের নেতারা ভোট করতে পারবেন। এ কারণে এখন দলের ভেতরেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হবে। যিনি প্রকৃত জনপ্রিয় তিনিই নির্বাচিত হয়ে আসতে পারবেন। সেটি আওয়ামী লীগ হোক আর বিএনপি হোক। 

২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন শুরু হয়। বিএনপি ২০২১ সালের মার্চের পর থেকে সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি। এর আগেও সিটি করপোরেশন নির্বাচন বা ২০১৯ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বর্জন করার ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। তা সত্ত্বেও দলটির তৃণমূলের অনেক নেতা সেসব নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে দেড় শতাধিক প্রার্থী বিজয়ীও হয়েছেন।

এ কথা সত্য যে, দীর্ঘদিন যে দলটি নির্বাচনের বাইরে রয়েছে, সেই দলের সাংগঠনিক শক্তি এবং মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হলে নির্বাচনে গিয়ে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এর মাধ্যমেই তাদের জনপ্রিয়তা তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের তৃণমূলের অনেক নেতার এলাকায় ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা রয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী নির্বাচনে থাকবে। ফলে বিএনপির অনেক নেতার বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আর যদি উপজেলা নির্বাচনও বিএনপি বর্জন করে তাহলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মধ্যেই তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। যেমনটি আমরা দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে লক্ষ করেছি। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে সবার মধ্যে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, কেন্দ্রে নাম পাঠানোর সময় স্বজনপ্রীতি, স্থানীয় রাজনীতিতে গ্রুপিং, লবিং, বিরোধী দলগুলোর নির্বাচনের মাঠে না থাকা এবং দলের চেইন অব কমান্ডের সংকটের ফলে এখন সবাই রাজনীতিতে নিজ নিজ অবস্থানে শক্ত ভূমিকায় থাকছে। ইদানীং আরেকটি বিষয় লক্ষ করা যাচ্ছে, উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থীরা দলের প্রভাবশালী নেতাদের কাছে আসছেন এবং তাদের পক্ষে ভূমিকা রাখার জন্য ম্যানেজ করার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে মাঠে বিএনপি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ এমন প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা চোখে পড়ার মতো আকার ধারণ করেছে। 

এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা যায়, যেসব আওয়ামী লীগার দীর্ঘদিন নৌকা প্রতীকের পক্ষে ভোট করেছেন, তাদের জনসম্পৃক্ততা কমে যাওয়ায় তারা এখন কিছুটা ব্যাকফুটে চলে গেছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশকারীরাই সরকারের নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন মূল দলের নিবেদিতদের তুলনায়। এসব কারণে ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। দলের নেতা-কর্মীদের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব-নিকাশে কিছুটা উদ্বেগ-উত্তেজনা, ক্ষোভ এবং নানাবিধ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সূত্রপাত হয়েছে। সরকারের আত্মবিশ্বাসের মাত্রা যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই এমন পরিস্থিতির সূত্রপাত এবং তা মোকাবিলার বিষয়ে চিন্তার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
 
এ কথা বলার অবকাশ নেই যে, সরকার পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রীর আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে রয়েছে। সাম্প্রতিককালে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য-বিবৃতি, কার্যক্রম এবং অর্জন আত্মবিশ্বাসের বিষয়টি প্রমাণ করছে বারবার। তবে একদিকে যেমন আত্মবিশ্বাস বাড়ছে, অন্যদিকে নিজেদের যথাযথভাবে মজবুত করতে না পারার দীর্ঘশ্বাসও প্রায়ই লক্ষ করা যাচ্ছে। দলের অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা সচেতন মহলকেও যথেষ্ট ভাবিয়ে তুলেছে। সংগত কারণেই আগামী দিনগুলোতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির মাঠে নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ানোর শঙ্কা তৈরি করেছে। এ জন্য এই মুহূর্তে সাংগঠনিক ভিত্তি অটুট রাখতে দলের ভেতরে একটি সুস্পষ্ট চেইন অব কমান্ড তৈরির প্রয়োজন রয়েছে। 

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
E-mail: [email protected]

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে বিশেষজ্ঞ অভিমত

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৪, ১২:৩১ পিএম
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে বিশেষজ্ঞ অভিমত
এম সাখাওয়াত হোসেন, মুন্সি ফয়েজ আহমেদ ও মোহাম্মদ আলী শিকদার

বাংলাদেশ ও প্রতিবেশি দেশ মায়ানমারের একটি অংশ নিয়ে পূর্ব তিমুরের মতো খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের চক্রান্ত করা হচ্ছে বলে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে খবরের কাগজের পাঠকদের যা বলেছেন দেশের বিশ্লেষকরা-

বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা জরুরি
এম সাখাওয়াত হোসেন

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মায়ানমারকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যে ষড়যন্ত্রের কথা বলেছেন, আমারও মনে হয় ওইসব এলাকায় ডিস্টার্ব রয়েছে- ওইসব এলাকায় যে কোনো কিছু একটা হতেও পারে। পাবর্ত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে যে সমস্যা চলমান রয়েছে, সেটার কোনো যোগসূত্রও থাকতে পারে। কাজেই সেটা বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা জরুরি বলে মনে করি। প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন ডেফিনিটলি তিনি ওই বিষয়ে লক্ষ্য রাখছেন, তার নির্দেশে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চয়ই নজরদারি করছেন। কাজেই ওই বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা সরকারকে নির্ধারণ করার বিকল্প নেই মনে করি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার

ভূ-রাজনীতির নতুন একটি দিক
মুন্সি ফয়েজ আহমেদ

এটা ভূ-রাজনীতির নতুন একটি দিক। বিষয়টি অনেকেই ছড়াচ্ছে। এই অঞ্চলে যারা অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে চায় তারা এসব ছড়াচ্ছে।

এখানে একটা গোষ্ঠী আছে যারা খিষ্টান, যারা ভারত, বাংলাদেশ ও মায়ানমারে আছে, যেমন কুকি চিন বা এ রকম আরও আছে তাদের কেউ কেউ উসকাচ্ছে এবং ওগুলো ঢোকাচ্ছে তাদের মাথায়। 

এটা নিয়ে বেশি আলাপ-আলোচনা করাই তো ভালো মনে হয়। আলাপ-আলোচনা যত হবে তত এটা নিয়ে আগ্রহ বাড়বে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত

কেউ হয়তো এমনটা কল্পনা করছেন 
মোহাম্মদ আলী শিকদার 

ভারতের মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুর বা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মায়ানমারে যারা বসবাস করতেন, তারা অত্যন্ত পশ্চাৎপদ জীবনযাপন করতেন। আধুনিকতার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তারা প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতির পূজারী। ধর্মের কোনো বিষয় তাদের মধ্যে ছিল না। তখন খ্রিষ্টান মিশনারিরা এ দেশে আসেন। এটা ব্রিটিশ আমলের কথা। 

কিন্তু মিশনারিরা বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল বা মায়ানমারে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেননি। এসব অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপ্তি ঘটেছিল বেশি। তখন ব্রিটিশরা ও ইউরোপের কিছু দেশ ভেবেছিল খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের মতো একটা আলাদা দেশ হতে পারে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নানা বাস্তবতায় সেটা আর হয়নি। 

এখন পার্বত্য অঞ্চলে যে অশান্তি, বাংলাদেশ বলেন, ভারতের মধ্যে বলেন, মায়ানমারে বলেন- এসব জায়গায় যারা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত, তাদের অনেকেরই যোগসূত্র, যেটাকে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বলি, ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় আছে। নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে তারা বসবাস শুরু করেন। এখন তারা সেসব দেশের নাগরিক হিসেবে সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। 

তারা এখন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন এবং এখনো তাদের কেউ কেউ সে রকম কোনো কল্পনা করতে পারেন। আমার মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী সেই সূত্রে বিষয়টাকে হয়তো সামনে এনেছেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক

বাজেটে উপকূলীয় অর্থনীতি: সুন্দরবনের প্রতি সুদৃষ্টি দিতে হবে

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৪, ১১:১২ এএম
বাজেটে উপকূলীয় অর্থনীতি: সুন্দরবনের প্রতি সুদৃষ্টি দিতে হবে
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

প্রচণ্ড দাবদাহের দৌরাত্ম্যে পেরেশানের পর রাত বারোটার পর তন্দ্রালু ভাবের মধ্যে আছি। হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠল। তা এই মধ্য নিশীথে কে করল এই বেরসিক কল! তন্দ্রালু অবস্থাতেই ধরলাম। ওপাশ থেকে বেশ ভারী গলায় মুরব্বি ও নেতা গোছের কেউ কথা বলছেন মনে হলো- আরও মনে হলো তিনি কোনো যৌথ সভা থেকে সবার পক্ষ হয়েই যেন কথা বলছেন। স্যার, আসসালামু আলাইকুম!

ওয়ালাইকুম আসসালাম, কে আপনি? 

এত রাতে?

: ‘আপনার কাছে হয়তো অবাক লাগবে- আমি বাবাহকুর প্রেসিডেয়াম সদস্য এবং বর্তমান সভাপতি সুন্দর মিয়া বলছি।’

: বাবাহকুটা কী?

: ও তাই তো। আমাকে এত সংক্ষেপ করে বলা উচিত হয়নি। বাবাহকু মানে ‘বাংলাদেশের বাঘ 

হরিণ কুমির’। এটি সুন্দরবনের সব বাসিন্দার কেন্দ্রীয় সংগঠন। আমাদের সুন্দরবনের বাইরে কোনো শাখা নেই- নলিয়ান, চাঁদপাই, কটকা, কচিখালি ও নীল কমলে আমাদের কিছু অঙ্গসংগঠন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। আমরা নির্দলীয়। অরাজনৈতিকও বলতে পারেন।

মনে মনে ভাবলাম ও আওড়ালাম- জীবনে অনেক সমিতি সংগঠন সংস্থার নাম শুনেছি। সেই সুদূর জাপানে থাকার সময় প্রবাসীদের মধ্যে ৪৭টি সংগঠনের নাম শুনেছিলাম। কেউ ফোন করে বলত, ‘আমি অমুক। অমুক দলের জাপান শাখার সভাপতি’ ইত্যাদি। একজন একদিন বলেন- ‘আমি মেজর গনি পরিষদের সভাপতি’। হাজার পনেরোর মতো প্রবাসীর মধ্যে জাপানের মতো দূরপ্রাচ্যেও মেজর গনি পরিষদের শাখা আছে? জিগালাম, ‘তা আপনাদের সংগঠনের সদস্য কতজন’? হেসে বলেন, আমি সভাপতি আর আমার স্ত্রী সহসভাপতি। অন্তর্কলহের অনুপ্রবেশ আশঙ্কায় এবং বেয়াদব-বিদ্রোহের বিবেচনায় আর কোনো সদস্য রাখিনি এই সংগঠনে।

বাবাহকুর সভাপতি সুন্দর মিয়া বলে চলেন- ‘বিদেশনির্ভরতা কমাইতে দেশের ঘরোয়া সম্পদ সংগ্রহের জন্য আপনি একসময় অনেক চেষ্টা করেছিলেন। জেলা-উপজেলা উভয় পক্ষের (করদাতা ও কর আদায়কারী) সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছেন। যারা কর দেয় না, তাদের অনেক ভালো ভালো কথা শুনিয়ে পটাবার চেষ্টা করতেন। কিন্তু দেশের এক বৃহৎ পরিসম্পদ না প্রাকৃতিক সম্পদ কী যেন আপনারা বলেন- সেখানে আমরা আছি জীববৈচিত্র্যে ঠাসা আমজনতা। 

আমাদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করলে আমরাও কৃতার্থ হতাম এবং আপনাকেও ভালো-মন্দ কিছু শোনাতে ও বোঝাতে পারতাম। আমাদের নাম ভাঙিয়ে, আমাদের সংরক্ষণের কথা বলে, আমাদের দেখানোর নাম করে, আমাদের এখানে আগুন লাগল সেদিন, নদীতে আমাদের লাশ ভেসে উঠল সেদিন, আমরা কেমন আছি কী করছি আমাদের স্বার্থ সংরক্ষণ সম্পর্কে আমাদের কী বক্তব্য তা শোনার কথা আপনারা যদি সদয় ও সানুগ্রহসহকারে বিবেচনা করেন, তা হলে আশা করি তা আমাদের তথা দেশের অর্থনৈতিক সুবিচারের শামিল হবে।’

সুন্দর মিয়ার কথা শুনে বেশ ভালো লাগল। তার কথায় যুক্তি আছে, তাৎপর্য আছে। একটা বৈষয়িক ভাব এবং বৈঠকি ঢং আছে। সেখানে চিন্তার খোরাক আছে, অনুভূতির আবেগ আছে। হ্যাঁ, আছে অনেক কিছু। বললাম, ‘সুন্দর মিয়া’ আপনাদের সংগঠন সম্পর্কে আমার আগে কোনো ধারণা ছিল না। বনের বিরাট মামা, বড় পণ্ডিত ভাগ্নে শিয়াল, সুশীল হরিণ আর অভিনয়ে পটু কুমির এ রকম পরস্পর প্রতিপক্ষ প্রকৃতির সবাই সম্মিলিত হয়ে কীভাবে ফেডারেশন প্রকৃতির আইমিন অ্যাপেক্স বডি সংগঠন গড়ে তুললেন তা ভেবে অবাক হই? 

সুন্দর মিয়া আঁতেলপন্থি বাম ছাত্র সংগঠনের সাবেক নেতার মতো বললেন- ‘শোষণে নির্যাতিত নিপীড়িত হতে হতে আমাদের সমাজের সবাই এখন আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠছে। দল, মত, পথ ও ভাবনার মধ্যে সাযুজ্য ও সামঞ্জসীকরণের ক্ষেত্রে সবার মধ্যে ঐক্যবদ্ধ চেতনার প্রকাশ প্রত্যাশা করা হচ্ছে। যার যার প্ল্যাটফর্মে থেকেও এক ঐক্যবদ্ধ জাতীয় ঐক্য চেতনায় আমরা সবাই আজ উদ্বুদ্ধ। এখানে নির্দলীয় একটা চেতনা এভাবে বিকাশ লাভ করছে। নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি এখানে যেন নবজন্ম লাভ করছে।’

তার কথাগুলো এতটা পুষ্টিকর ও প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছিল যে আমি তাকে থামাতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু সে নিজে মনে হয় তার স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞানে ফিরে গিয়ে বলল, ‘আপনাকে এত রাতে এভাবে জাগিয়ে রাখা আমাদের স্বার্থেই সমীচীনবোধ করছি না। আপনি ক্লান্ত, শ্রান্ত।’ আমি বললাম- না, ঠিক আছে! ভালোই লাগছে তোমার কথা। আমি আজকাল যাকে একটু আন্তরিক বা কাছের মনে করি তাকে হঠাৎ তুমি বলে ফেলি। সে বা তিনি আমার চেয়ে বয়সে বা পর্যায়ে বা পদমর্যাদায় বড় কি না, সে বিবেচনা আমার হুঁশ থেকে বেমালুম গায়েব হয়ে যায়। সুন্দর মিয়া মুরব্বি গোছের। 

কিন্তু আমাদের সবার বড় মামাস্থানীয়; তাই মনে হয় মাইন্ড না করে বরং খুশি হয়ে বললেন- আমাদের এলাকায় কবে তশরিফ আনবেন তা জানার জন্য সবাই আমাকে ধরেছে। গত সপ্তাহে আমাদের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে অনেকে এ দাবি তুলেছেন যে আমাদের এখন Public Domain-এ যাওয়া দরকার। আমরা দেশের এক অতিগুরুত্বপূর্ণ সম্পদের সংরক্ষক, বাসিন্দা। আমাদের দেখিয়ে আমাদের ব্যবহার করে, আমাদের কথা বলে সরকার এত রাজস্ব আয় করেন অথচ আমাদের সাথে শহরে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সম্মেলন কেন্দ্রের গোলটেবিলে না হোক, হেতাল বনে, দূর্বাঘাসে, সুন্দর গরান ও কেওড়াবেষ্টিত বন-মঞ্চে তো সরাসরি বাজেট সংলাপ হতে পারে। আপনার বাস আমাদের অঞ্চলে। আপনার পূর্বপুরুষরা হয়তো বনাঞ্চল আবাদ করে গড়ে তুলেছেন জনপদ। সরকারের রাজস্ব আদায়ে আপনার সাবেক দপ্তরের সরাসরি সম্পৃক্ততা এবং আপনার সাথে কথা বলে­ মিডিয়ায় নিউজ হতে সুবিধা- সেহেতু আপনার সাথে মতবিনিময় করলে ভালো হবে এমন অভিমত একপর্যায়ে উঠে এল।’ 

বাজেটের আগে হাতে সময় কম। সুন্দরবনের কচিখালি পৌঁছাই সন্ধ্যার কিছুটা আগে। নিরাপত্তার কারণে নির্ধারিত সভাটি তাৎক্ষণিকভাবে করা গেল না। আমরা সিডর, আইলা, ফণী, আমফানের তাণ্ডব ও অন্যান্য কিছু দেখার জন্য নামলাম। এক বুনোশূকর আমাদের অভ্যর্থনা জানাল। কিছুদিন আগে বাঘের এক থাবায় তার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এক সংসারে থাকতে গেলে খুঁটিনাটি নিয়ে খটমট হতেই পারে। সংসারে সবাই মিয়াভাইসুলভ আচরণ করে, জোর যার মুল্লুক তার এই অবস্থা সেই কৌটিল্যের (অর্থশাস্ত্র রচয়িতা) কাল থেকে আছে। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় বেশিক্ষণ থাকা গেল না। আমার সফরসঙ্গীদের বলিনি ইচ্ছা করেই, সুন্দর মিয়ার পৌরহিত্যে বাবাহকুর সঙ্গে বাজেট মতবিনিময় সভার কথা। নৌযানে ফেরার পর সেটি কটকার উদ্দেশে রওনা দিল। 

সেখানে সভাটি হতে পারে। পথে সফরসঙ্গীরা নানান গান-বাজনায় মেতে থাকল- আমি মনে মনে চিন্তিত থাকলাম- সভাটি হওয়া দরকার। কীভাবে হতে পারে ভাবছি- সারা দিনের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছি। হঠাৎ মনে হলো মোবাইল বাজছে। এখানে নেটওয়ার্ক নেই, তার পরও। সুন্দর মিয়ার কণ্ঠ- ‘স্যার, আপনাকে স্বাগতম আমাদের মাঝে। হঠাৎ দেখি আমি তাদের মাঝে। সুন্দরবন মঞ্চ। সামনে বাঘ হরিণ কুমির শিয়ালের সমাহার। মঞ্চে জনাচারেক নেতৃস্থানীয়। পরিচয় করিয়ে দিল সুন্দর মিয়া প্রথমে ‘শিয়ালেন্দু মামাইয়া’- বিশ্বের স্থানীয় দার্শনিক নামে খ্যাত (HSBC ব্যাংক যেমন)। তাকে বলা হলো সরকারের বেসরকারি (যেমন BASIC Bank) ব্যক্তিত্ব। 

একটু ধূর্ততা, একটু চালাকি ও কূটনৈতিক হাসিতে পটু শিয়াল বাহা সাহেব বাবাহকুর দর্শন ও ভাববাদী শাখার প্রেসিডিয়াম সদস্য, তাদের সংসদ বনে-জঙ্গলের অধ্যক্ষ বা স্পিকার। দ্বিতীয়জন হরিণা হাপান। তিনি শিক্ষা, তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা বাবাহকুর। সাহিত্য শিক্ষা সংস্কৃতি ও প্রচার বিষয়ের দায়িত্বে। কুমিরা কুণ্ডাল তাদের পলিট ব্যুরোর অন্যতম সদস্য। অভিনয়ে পটু। যে কেউ ভুল ও ভালো জানতে পারে তাকে নিয়ে। যিনি শিয়ালের পাঠশালায় ১১টি ছানা শিক্ষার জন্য পাঠিয়ে হিসাব না পাওয়ায় এখনো দুশ্চিন্তায়। কিন্তু তাকে বেশ সেয়ানা ও সাবলীল মনে হলো। চতুর্থজন ইত্যাদি ইকাবর। ইনি অন্য সব ছোটখাটো সংগঠনসমূহের সম্মিলিতভাবে মনোনীত প্রতিনিধি। শালুক, ময়না, বানর, দাঁড়কাক, ধনেশ পাখি, বনমোরগসহ সবার প্রতিনিধি সে। 

প্রায় চল্লিশ লাখের মুখপাত্র। সুন্দর মিয়ার বিবেচনাবোধ চমৎকার। সে বলল, আমরা সরাসরি আলোচনায় যেতে চাই। গৌরচন্দ্রিকা, ভণিতা বা ভূমিকা করে সময় নষ্ট করা ঠিক নয়। আপনারা যেকোনো সভার শুরুতে মাল্যদান, ফুলের তোড়া দেওয়া আর প্রত্যেক বক্তা একই কথা- মাননীয় প্রধান অতিথি, সভাপতি ইত্যাদি আওড়াতে প্রায় এক মিনিট সময় ব্যয় করে। অথচ সে শুরুতে প্রায়ই বলে আমি এক দুই মিনিটের বেশি বলব না। যদিও পাঁচ-দশ মিনিটেও তার কথা শেষ করতে চায় না। এখানে ভ্যাট আরোপ করে লাভ নেই। কেননা তা আদায়েও হয়তো খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি হয়ে যাবে।

সুন্দর মিয়া প্রথমে দার্শনিক শিয়াল বাহাকে বক্তব্য রাখার আহ্বান জানাল। শিয়াল বাহা দেখলাম অনেক খবর রাখে। প্রথমে বলল, আজকাল অর্থনীতিবিদ শান্তিতে পুরস্কার পাচ্ছে। হার্ভার্ডের ডক্টর না হলে নাকি সরকারি অর্থনীতি ভালো বোঝে না- এ ধরনের চল চালু হয়ে গেছে। বিশেষায়িতের যুগে এমনটা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বিদ্যাবুদ্ধি যত বিশেষায়িত হবে তত এক চোখায় এক কুনোয় এক ঘরানায় বন্দি হবে সবার চিন্তাচেতনা। শিয়ালেন্দুর দর্শন ও যুক্তি দেখে বিস্মিত, বিমূঢ় ও বিমুগ্ধ হলাম।

হরিণা হাপান মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, প্রত্যেকের উচিত নিজ নিজ মূল্যাবোধ, আত্মমর্যাদা ও সম্মান সম্পর্কে সচেতন থাকা। এই সুন্দরবনে আমাদের মধ্যে সমাজবদ্ধতা, সহানুভূতি, প্রভুভক্তি সবই আছে। সুতরাং না জেনে ঢালাওভাবে আমাদের উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করা হয়। এটি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সম্পূর্ণ বেমানান। সব সমাজে ভালো-মন্দ সবাই আছে। যে ভালো যার যতটুকু ভালো, তার স্বীকৃতি দিতে হবে- আর যার যা খারাপ, তার প্রতিও অভিসম্পাত জানাতে হবে। দেখা যায় যখন কারোর খারাপ দিকটা তুলে ধরা হয় তখন তার সব খারাপই তুলে ধরা হয়- তার যে ভালো অনেক কিছু আছে সেটা বেমালুম চেপে যাওয়া হয়। সার্বিক ও সার্বত্রিক বিবেচনায় সবকিছুকে না দেখলে পূর্ণতা পায় না কোনো কিছুই। 

সুবিচার আরোপিত হয় না সব ক্ষেত্রেই। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম হরিণার বক্তব্য। সুন্দর মিয়া তার সভাপতির ভাষণে (প্রধান অতিথি আমি। ইদানীং চল হয়েছে প্রধান অতিথির আগে সভাপতির ভাষণ হয়। প্রধান অতিথি অতিমাত্রায় প্রধান হওয়ায় তারপর আর কারও কিছু বলা শোভনীয় ও বরণীয় বলে মনে হয় না- আরোপিত এ রকম ধারণা থেকে।) প্রথমে আমাকে স্বাগত জানালেন। বলেন আপনি এসেছেন- কথা বলতে পারছি আপনার সাথে এটা বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার। 

এর আগে কেউ এভাবে আসেনি। সিডরের পর রিলিফ নিয়ে, তাৎক্ষণিক সহায়তা নিয়ে অনেকে এসেছেন- কিন্তু সিডর ও আইলায় আমাদের যে বৈষয়িক-নৈতিক-সামাজিক ক্ষতি হয়েছে তার যথাযথ শুমার করতে, তা থেকে নিষ্কৃতির স্বল্প বলি আর দীর্ঘমেয়াদি বলি, কোনো কর্মসূচি নিয়ে কোনো কার্যক্রম দেখি না। উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণের কথা একেকবার ঘূর্ণিঝড়ের পর বলা হয়, তারপর আর কোনো খবর থাকে না। স্যার, আমাদের দিকে তাকান- আমাদের আবাস আমাদের বিচরণক্ষেত্রকে নিরাপদ ও সুন্দর করুন- তা হলে আমরাও বাঁচব, আপনাদের রাজস্ব আয় বাড়বে, পর্যটন আসবে। প্রচার হবে।’ 

হঠাৎ কার ধাক্কায় ঘুম ভেঙে গেল। সংলাপ সভার শেষ প্রান্তে পৌঁছাতে পারলাম না। বাইরে তাকিয়ে দেখি কটকার বন তখন ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন।

লেখক: সাবেক সচিব এবং উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি-চিন্তক

ডোনাল্ড লুর বাংলাদেশ সফরের তাৎপর্য

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৪, ১১:০৭ এএম
ডোনাল্ড লুর বাংলাদেশ সফরের তাৎপর্য
মো. সাখাওয়াত হোসেন

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর দুই দিনের বাংলাদেশ সফর বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সফরের নাড়িনক্ষত্র নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে, তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, সফরটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের তৎপরতা বহুল আলোচিত। রাজনৈতিক দলগুলোর এক পক্ষ নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছিল এবং অপর পক্ষ কূটনৈতিক নিয়ম অনুসরণ করে বক্তব্য ও মন্তব্য দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে। 

তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের মতো করেই নির্বাচনের প্রাক্কালে ভূমিকা রেখেছে, যা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ও অবিবেচনাপ্রসূত। উল্লেখ করার মতো ব্যাপার হচ্ছে, অন্য দেশের কূটনীতিকরা কোনোভাবেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করেননি এবং এটি তাদের এখতিয়ারের মধ্যেও পড়ে না; কেবল ব্যতিক্রম ছিল যুক্তরাষ্ট্র। সরকারের তরফ থেকে কূটনৈতিক পরিভাষায় সতর্ক করা হলেও তারা থেমে থাকেনি। তবে নির্বাচনের মাধ্যমে সর্বশেষ রায় দিয়েছে বাংলাদেশের জনগণ। অর্থাৎ এ দেশের জনগণ কোনোভাবেই বিদেশিদের অবৈধ হস্তক্ষেপ মেনে নিতে পারেনি, ভবিষ্যতেও মানবে না। কারণ বাংলাদেশের বিষয়ে সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার এখতিয়ার এ দেশের জনগণের, এ দেশের রাজনীতিবিদদের। এই জায়গায় অন্যদের হস্তক্ষেপ এখতিয়ারবহির্ভূত এবং একটি রাষ্ট্রের জন্য তা অশনিসংকেত।  

নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কেমন হতে পারে, নির্বাচনকে বৈধতা দেবে কি না, এ ব্যাপারেও সাধারণ জনগণের মনে একধরনের দ্বিধা কাজ করছিল। দেখা যায়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে চায় না, যদিও সেটি ভুল সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনের পর যখন অন্যান্য দেশের দায়িত্বশীলরা নবগঠিত সরকারকে স্বাগত জানিয়েছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্রও একই ধারায় হেঁটেছে। নতুন সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে মজবুত করার ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছে এবং নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে ঘোষণাও দিয়েছে। দিন যতই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, ততই যুক্তরাষ্ট্রের সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে চলমান কাজগুলোকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করছে। এ ধরনের পদক্ষেপ মূলত দুই দেশের চলমান সম্পর্ককে আরও সহনীয় ও মজবুত করবে এবং এর ফলে দুই দেশের মধ্যকার ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক আরও বেগবান হবে। 

যুক্তরাষ্ট্রের যে উদ্যোগ সেটিকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতেই হয়, কেননা নির্বাচন-পূর্ববর্তী এবং নির্বাচনোত্তর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে ভূমিকা, সে ব্যাপারে তারা অস্বস্তির কথা জানিয়েছে। বর্তমানে তারা তাদের ভূমিকার কথা ভুলে গিয়ে হৃত সম্পর্ককে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশের যে কূটনৈতিক নীতি সে বিষয়কে সামনে রেখে বাংলাদেশ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিস্থাপন করে থাকে। কাজেই সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক ভূমিকাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। কেননা যুক্তরাষ্ট্র নিজ দায়িত্বে সামনের দিকে এসেছে এবং এটিকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগানো যেতে পারে। বাংলাদেশের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। তারা মনে করেছিল অন্যান্য দেশে যেভাবে তারা প্রভাব রাখার সুযোগ পায় বাংলাদেশেও হয়তো সেভাবে প্রভাব রাখতে পারবে। তা ছাড়া বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল মনে করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র তাদের রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে দেবে।

সে অবস্থান থেকে তারা সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। কেননা, বাংলাদেশের নিয়ামক হচ্ছে এ দেশের জনগণ। জনগণের ইচ্ছাকে পদদলিত করে বাংলাদেশে কোনোভাবেই রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান প্রতিনিয়ত সুসংহত হচ্ছে এবং এই সুসংহত অবস্থানের কারণেই বাকি বিশ্বের নজর রয়েছে বাংলাদেশের ওপর। বাংলাদেশের সঙ্গে নানা গুরুত্বপূর্ণ ইসুতে উদাহরণস্বরূপ দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে সবাই ইতিবাচক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ মনোযোগ দিয়ে থাকে। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে মহাপরাক্রমশালী রাষ্ট্রগুলো তাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ গ্রহণ করবে না। কেননা, বিশ্ব অর্থনীতি ও বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান পর্যায়ক্রমে শক্তিশালী হচ্ছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের এগিয়ে আসার ভূমিকাকে বাংলাদেশকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে হবে। বিশেষ করে গার্মেন্টসপণ্য রপ্তানির একটি বিরাট বাজার যুক্তরাষ্ট্র। এ সুযোগটিকে আরও বৃহৎ পরিসরে কাজে লাগাতে হবে, যাতে অন্যান্য খাতের জন্য সমান বাজার সৃষ্টি করা যায়। কর্মসংস্থান রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুনভাবে বাংলাদেশ সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। ব্যবসায়িক বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের স্বউদ্যোগী ভূমিকাকে প্রায়োগিকভাবে তুলে ধরতে হবে। দুই দেশের জনগণের সেতুবন্ধকে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যতার মিশেলে আরও মজবুত ও বেগবান করার উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। 

এ ছাড়া সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের ব্যবস্থা গ্রহণকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার বরাবরই প্রশংসায় ভাসিয়েছে এবং পারস্পারিক সহযোগিতার হাতকে সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্র গৃহীত একটি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডাকে বাস্তবায়িত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণেই বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদ দমনে রোল মডেলের খেতাব পেয়েছে।  

বিশ্বায়ন ও আধুনিকতার এ যুগে কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক রেখে পথচলা অনেকটা কষ্টকর বটে। এ জায়গা থেকে বাংলাদেশ বরাবরই উদারনীতি মেনে চলার চেষ্টা করেছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে মজবুত করার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু প্রণীত পররাষ্ট্রনীতি মেনে চলছে বর্তমান সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো মাথায় রেখে চলমান সম্পর্ককে কীভাবে সামনের দিকে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক ভূমিকা বাংলাদেশের সাধারণ জনগণকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে তাদের আগের বোঝাপড়াকে (নির্বাচনকালীন ভূমিকা) পরিবর্তন করতে সহায়তা করবে। আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, দুই দেশের জনগণের কল্যাণ হবে এমন শর্তে অংশীদারির ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে এবং এ লক্ষ্যে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জোরদার ভূমিকা পালন করবে। 

কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পারিক সহযোগিতা ও অংশীদারির ভিত্তিতে সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নত রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য। কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব- এ নীতিকে উপজীব্য করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দেশের জনগণের কল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করে যাবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। এদিকে সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের ইতিবাচক ভূমিকাকে এ দেশের সরকার ও জনগণ যৌক্তিকতার আমলেই সাদরে গ্রহণ করবে। গ্লোবাল ভিলেজের এ যুগে পারস্পারিক সহযোগিতা ও সম্প্রীতি ব্যতীত দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকা একটি দুরূহ কাজ। সে জায়গা থেকে হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্ব বহন করে থাকে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বহুমাত্রিক সম্পর্ক পারস্পারিক সহযোগিতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে অর্থবহ ও গভীরতর হয়ে উঠুক, এটিই সবার প্রত্যাশা।  

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও সভাপতি
ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected] 

সামষ্টিক অর্থনীতির কৌশলের সমন্বয় প্রয়োজন

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৪, ১০:৫৩ এএম
সামষ্টিক অর্থনীতির কৌশলের সমন্বয় প্রয়োজন
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

সামষ্টিক অর্থনীতির দুটি মূল স্তম্ভ হচ্ছে রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতি। এই নীতিগুলোর কৌশলগুলো  সমন্বয় স্থাপন করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়। খণ্ডিতভাবে কৌশলগুলো বাস্তবায়ন করলে বেশি সফলতা আসে না। যেকোনো নীতি, যেকোনো কৌশলে আমরা যে ফলটা দেখতে পাই, সাধারণত আমরা অ্যাসেস করি, মূল্যায়ন করি- ব্যবসা, ব্যক্তি এবং পরিবার, বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর এটার কী প্রভাব পড়ে। আমাদের পারিবারিক জীবন, সাংসারিক জীবন এবং ব্যক্তিগত জীবনে কী প্রভাব পড়ে। সুতরাং এটাকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করি। একটা ম্যাক্রো পলিসি, আরেকটা মাইক্রো ইমপ্যাক্ট বা মাইক্রো পলিসি।

মাঝখানে একটা আছে, ম্যাসো বলি আমরা। ম্যাসো পলিসি মানে মধ্যবর্তী কতগুলো স্তর আছে; সেটা যেমন বাজার, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান- এগুলো আমাদের মধ্যবর্তী পর্যায়, যার মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনীতি বা কৌশলগুলো বাস্তবায়িত হয় এবং যার ইমপ্যাক্ট বা ফলটা পড়ে একেবারে নিচের দিকে। যেকোনো জিনিসের মূল বিষয়টা হলো, মানুষ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর কী প্রভাব পড়ে, সেটা দেখা।

এই নিবন্ধে যেটা আমি আলাপ করব, সেটা হলো আমাদের দুটি ম্যাক্রো পলিসি- একটা রাজস্বনীতি, আরেকটা মুদ্রানীতি।
কীভাবে এই দুটির সমন্বয় সাধন হয় এবং এই দুটির সমন্বয় সাধন না করলে কিন্তু দেশের সার্বিক অর্থনীতি উন্নয়ন যেখানে শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, ফরেন রিজার্ভও নয়; সঙ্গে সঙ্গে আয় এবং সম্পদের বৈষম্য দূর করতে পারব, মানুষের জীবনযাত্রার মান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যাতায়াতব্যবস্থা কীভাবে উন্নত করব, সেগুলোর সুফলটা আমরা দেখতে পারব। আমরা যদি শুধু গ্রোথ নিয়ে আলাপ করি, প্রবৃদ্ধি ভালো হচ্ছে, এটার সুফলটা অন্যদের কাছে পৌঁছায় কি না, যদি আমরা মাইক্রো লেভেলে; একেবারে ব্যক্তিপর্যায়ে, পরিবার পর্যায়ে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে যদি আমরা না দেখি, সেটা কিন্তু ধরা পড়বে না। এটা নির্ভর করে মূলনীতি, মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয় সাধনের ওপর। 

বাজেট আসবে কিছুদিনের মধ্যেই। বাজেটে দুটি দিক আছে। একটা সরকারি আয় এবং সরকারি ব্যয়। রাজস্ব আয়-ব্যয় যেটা করব, সেটা দেশের সার্বিক উন্নতি এবং মানুষের উন্নয়ন, মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন, মানুষের বিভিন্ন চাহিদা কীভাবে আমরা পূরণ করতে পারি, সেটা আমাদের দেখতে হবে। সেটা একটা মূল লক্ষ্য।

আরেকটা জিনিস হলো বরাদ্দ। আমরা কোন খাতে কত ব্যয় করব, সেটা আমাদের দেখতে হবে। অতএব, এই দুটি যদি আমরা সঠিকভাবে না দেখি, তাহলে বাজেটের যে লক্ষ্য, সেটা ফলপ্রসূ হবে না।

আমাদের সামনে কিন্তু কতগুলো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। একটা হলো, বাজেটের যে রাজস্ব আমরা আহরণ করব- ট্যাক্স এবং নানা রকম মাধ্যমে কতটুকু সফলতার সঙ্গে তা করা যাবে, সেটা বড় একটা ব্যাপার। আর দ্বিতীয়ত, রাজস্ব বাজেটে আমাদের ঘাটতি হয়। আমরা সম্পদ কোত্থেকে পাব, কীভাবে আহরণ করব। একটা হলো দেশীয় সম্পদ- আমাদের সঞ্চয় এবং নানা রকম ব্যবসা থেকে। আরেকটা হলো দেশের বাইরে থেকে ঋণ গ্রহণ। মানে বৈদেশিক সম্পদ- এই দুটি জিনিস। এটা যদি আমরা মুদ্রানীতিতে মানে আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিক ব্যাংকগুলো কীভাবে অভ্যন্তরীণ ঋণ দিচ্ছে, তারপর অভ্যন্তরীণভাবে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রসার করছে। মুদ্রানীতি যদি ব্যবসা-বাণিজ্য সহায়ক না হয়, মুদ্রানীতি যদি সফলতা লাভ না করে, যেমন- মুদ্রানীতির একটা দিক হলো ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসার করা, কর্মসংস্থান করা। 

সেটা যদি আমরা না করি, এদিকে রাজস্ব বাজেটে ইনকাম ট্যাক্স ধরবে, ভ্যাট ধরবে, সেটার কিন্তু রাজস্বটা আদায় করতে পারবে না। সেটা কিন্তু আমরা বারবার দেখতে পাচ্ছি। বাজেটটা সাধারণত সম্প্রসারণশীল হয়। আমাদের কিছু কাজ হবে, আমাদের চাহিদা অনেক, সম্পদ অনেক বেশি লাগে। মুদ্রানীতি যদি আমরা সংকোচনশীল করি, যেটা এবার করেছে, তাতে মানি সাপ্লাই কমাবে। মানি সাপ্লাই কমানোর মূল উদ্দেশ্য হলো মূল্যস্ফীতিটা কমানো। মূল্যস্ফীতি কিন্তু কমানো যাচ্ছে না। আমরা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি করে ফেলছি, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটছে না। এখন দেখা যাচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্য মন্থর হয়ে গেছে। এমনকি গ্রোথ নাকি এবার তিন-চারের বেশি হবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ওদিকে আবার মুদ্রানীতি আমদানি সংকোচন করছে। আমদানি না হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে না। ইমপোর্ট ডিউটি কমে গেলে সরকারের রাজস্ব আয়ও কমে যাবে।

অতএব, দুটির সঙ্গে দুটির সামঞ্জস্য না থাকলে কিন্তু এই সমস্যাগুলো দেখা দিচ্ছে। এই দুটির সামঞ্জস্য কিন্তু আমরা এখনো দেখি না। প্রায় আমরা বলি যে দুটির সমন্বয় সাধন না করে শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক একদিকে বলল, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে, ফরেন রিজার্ভ বাড়াবে, আর ওই দিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হচ্ছে। ব্যবসার প্রসার হচ্ছে না। কর্মসংস্থান কম হচ্ছে। তখন হচ্ছে কী, গ্রোথ হচ্ছে না। ফরেন রিজার্ভ বাড়ছে না। মানুষের জীবনযাত্রার মানও বাড়ছে না। আমি বলব যে, এটা অনেকটা ভ্রান্ত নীতি এবং ভ্রান্ত কৌশল। এ জন্য বারবার কিন্তু বলা হচ্ছে যে, সমন্বয় সাধন করতে হবে। 

এই সমন্বয় সাধন করার জন্য একটা মনিটারি পলিসি কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল আছে। ধরা যাক, আমাদের মনিটারি পলিসিতে কী থাকে- একটা টার্গেট বা লক্ষ্য থাকে। লক্ষ্য কী- বেসরকারি ঋণ কত হবে, সরকারি ঋণ কত হবে। সুদের হার কত হবে। পলিসি রেট কত হবে। রিফিন্যান্সিং কীভাবে করব। লিক্যুইডিটি সাপোর্ট কীভাবে দেব- কতগুলো পলিসি রেট, কতগুলো টার্গেট থাকে। কিন্তু টার্গেটে অ্যাচিভ করতে হলে দেখতে হবে, আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা আছে কি না। আমাদের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সেভাবে কাজ করছে কি না। বাংলাদেশ ব্যাংকের যে রেগুলেটরি নিয়মগুলো আছে, সেগুলো পরিপালন করা হয় কি না। সবেচয়ে বড় হলো, মনিটরিং- পরিবীক্ষণ এবং সুপারভিশন। সেটা করা হচ্ছে কি না।

আমরা দেখছি যে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। মুদ্রানীতি আমাদের যা দিচ্ছে, সেটা সম্পূর্ণ নয়; আংশিক- কতগুলো টার্গেট ওরিয়েন্টেড। টার্গেট অ্যাচিভ করলেই ভালো হয়ে যাবে, টার্গেট অ্যাচিভ না করলে খারাপ হয়ে যাবে, সেটা তো নয়। আরও বিস্তারিতভাবে আমাদের উদ্দেশ্যগুলো, যেটা আমি বললাম যে প্রবৃদ্ধি বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়বে, মূল্যস্ফীতি কমবে, মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়বে- সেগুলো বাজেটেরও একই উদ্দেশ্য। মুদ্রানীতির একই উদ্দেশ্য। কিছুটা ভিন্ন কৌশলে তারা এগোয়। ব্যাপারটা হলো বাজেট সার্বিকভাবে সব অর্থনীতির ওপর সরকারের রাজস্ব আয়-ব্যয়ের যারা হিসাব করে, পরিচালন করে। 

আর ওই দিকে মুদ্রানীতি হলো, বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রা সরবরাহ, মুদ্রার মান, ফরেন এক্সচেঞ্জের মান, ফরেন রেট- এগুলোর মাধ্যমে করে। উদ্দেশ্য কিন্তু দুটিরই এক। অতএব, এই কো-অর্ডিনেশনটা হচ্ছে না বলে আমার মনে হচ্ছে, আমাদের ম্যাক্রো পলিসি বা সামষ্টিক নীতিগুলোর যথাযথ ফলাফল আমরা পাচ্ছি না।

সরকারের বাজেট প্রাইভেট সেক্টরে অ্যাফেক্ট করে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে সবাইকে অ্যাফেক্ট করে। অতএব, যেটা আমরা বলি যে বাজেট রাষ্ট্র, মার্কেট, প্রাইভেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং এমনকি ব্যক্তিগত সবাইকে অ্যাফেক্ট করে। বাজেটের ব্যাপারটা অনেকাংশে প্রত্যক্ষ। অন্যদিকে মুদ্রানীতিটা সাধারণত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এদের মাধ্যমে কার্যকর করে। সেটার ব্যাপকতা আছে। কিন্তু এটা প্রত্যক্ষের চেয়ে পরোক্ষভাবে বেশি কাজ করে। দুটিরই আমাদের দরকার আছে।

বর্তমান পর্যায়ে আমরা দেখছি দুটি জিনিস। একটা হলো রিসোর্স মোবিলাইজেশন- এই যে বাজেটে এখন হয়তো ভ্যাট বাড়াবে, ইনকাম ট্যাক্স বাড়াবে। আইএমএফ এখন বলছে, সব রকম প্রণোদনা বাদ দাও, ট্যাক্স বসানোর বিষয়ে কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া বন্ধ করো, ট্যাক্সের ছাড় কমিয়ে দাও। সেটা করলে আবার দেখা যাবে যে কিছু ইন্ডাস্ট্রিতে, কিছু সেক্টরে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অতএব, আইএমএফের কথায় আমরা সব ছাড় কমিয়ে দিলাম, আবার হয়তো বলবে কৃষি খাতে সারের ওপর ভর্তুকি, সেচের ওপর ভর্তুকি মানে সেচের জন্য ডিজেলের ওপর ভর্তুকি- সব কমিয়ে দাও। কৃষকরা কীভাবে ব্যয় সংকোচন করবে। কৃষকরা এমনিতেই শস্যের মূল্য পায় না। তখন তো আরও বিপদ হবে। তখন তো তারা উৎসাহটা হারিয়ে ফেলবে। তখন খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়বে। বাজেটে এই জিনিসগুলো নিয়ে চিন্তা করার সময় এখন। প্রণোদনা কাকে দেবে না দেবে, সেগুলো আরও বেশি করে ভাবতে হবে। 

আরেকটা জিনিস হলো ট্যাক্সের ইক্যুইটি বা সমতা। যারা বড়লোক, তারা কি ট্যাক্স সমভাবে দিচ্ছে। নিশ্চয়ই না। আমরা দেখি, প্রত্যক্ষ কর আমাদের কম। পরোক্ষ করের বোঝা বেশি। ভ্যাটের একটা সমস্যা হলো, ভ্যাট গরিব-ধনী সবাইকে সমানভাবে আঘাত করে। যেমন- পাউরুটির ওপর ভ্যাট দিল। বড়লোক পাউরুটি কিনে যত টাকা ট্যাক্স দিচ্ছে, গরিব কিনেও তা দিচ্ছে বা যেকোনো একটা সেবার ওপর যে ভ্যাট, সেটা ধনীও বহন করে, গরিবও। অতএব, পরোক্ষ করের ওপর যে আমাদের এত নির্ভরতা, এটা মোটেও ঠিক হচ্ছে না। অনেক সময় হয় কী, সরকার একটা সহজ উপায়ে আদায় করতে পারে।

প্রত্যক্ষ কর আরোপ করতে অনেক অ্যাসেস করতে হয়। যারা ধনী, তাদের বেশি হারে, মানে ক্রমবর্ধমান হারে কর দিতে হয়। সেটা বাংলাদেশে এখন নেই। এটা বিশেষ করে নর্থ ইউরোপে- নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক- সেখানে করের হার অত্যন্ত বেশি, সেটা প্রত্যক্ষ করের হার। তাদেরটা কল্যাণমুখী একটা রাষ্ট্র। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ট্রান্সপোর্টে ধনী-দরিদ্র সবাই সুবিধা পায়। সেখানে বেকার, চাকরি গেলে খাবার খেতে পারবে না, বাসস্থানের অভাব হবে- এত চিন্তা করতে হয় না। কারণ সরকার এগুলোর দায়িত্ব নেয়। সরকার জনগণের টাকায় এগুলো করে। আমাদের এখানে জনগণ টাকা দেয় না, ট্যাক্স দেয় না, সরকারের কাছে যথেষ্ট অর্থ থাকে না। তখন সরকারের সীমিত আকারে দরিদ্র ব্যক্তিদের সেবা দিতে হয়।

সামনে নতুন বছরের বাজেট ২০২৪-২৫ আসছে। সেই সঙ্গে জুলাই মাস থেকে ৬ মাস মেয়াদি নতুন মুদ্রানীতির আসবে। এখন থেকেই আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সমস্যাগুলো মোকাবিলা করার জন্য সমন্বিত নীতি ও কৌশল বাস্তবায়ন করার চিন্তা করতে হবে।

লেখক: সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়  

দ্রব্যমূল্য ও দীর্ঘশ্বাস

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৪, ১০:৪৮ এএম
দ্রব্যমূল্য ও দীর্ঘশ্বাস
রাজেকুজ্জামান রতন

বাজারে গেলে মাথাটা খারাপ হয়ে যায়, এ কথা বলেন না এমন মানুষ পাওয়া কঠিন। প্রতি সপ্তাহে নয়, প্রতিদিনই দামের ওঠানামা দেখে দিশেহারা মানুষ। সাধারণ মানুষ যা খান এবং ব্যবহার করেন তার কোনটার দাম বাড়ছে না? এই প্রশ্নে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ, অর্থনীতিবিদরা চিন্তিত আর সরকারি মহল গলার জোরে বলেন, কোন দেশে দাম বাড়েনি? আমরা না থাকলে যে কী হতো, এখন তো বাজারে জিনিস পাচ্ছেন, সেটাও পেতেন না। এ কথায় সাধারণ মানুষ আরও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন আর খরচ কমানোর পথ খুঁজতে থাকেন। মানুষের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর সাময়িক প্রভাব যতটা দীর্ঘ, মেয়াদি প্রভাব তার চেয়ে বেশি এবং ভয়াবহ। 

কষ্টের মধ্যে মনে পড়ে মুজতবা আলীর সেই সরস চুটকি। পুরান ঢাকায় লিচু কিনতে গিয়েছে ক্রেতা। লিচু দেখে, দাম করে কিন্তু কিনতে পারে না। বিক্রেতা ব্যঙ্গ করে বলেন, কী, শুধু দেখবেন, লইবেন না? ক্রেতা বললেন, লিচু তো ছোট। বিক্রেতা একগাল হেসে বললেন, শুধু বাইরে থেকে দেখলেন লিচু ছোট, বিচিটা যে বড় তা দেখলেন না? সাধারণ মানুষেরও এখন তেমনি দশা। শুধু জিনিসের দাম বেড়েছে সেটাই দেখছেন, আয় যে কমে যাচ্ছে সেটা দেখছেন না। 

ফলে ব্যয় বৃদ্ধি ও আয় কমে যাওয়ার দ্বিমুখী আক্রমণে মানুষ নাজেহাল। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস বা বিবিএস-এর হিসাব অনুযায়ী এ বছরের এপ্রিলে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এর আগে মার্চে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ। গত মাসে দেশে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও আবারও ১০ শতাংশের ওপরে উঠেছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ২২ শতাংশে, যা আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। আর গত বছরের এপ্রিলে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ। 

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বা দ্রব্যমূল্য নাকি সরকারের ১ নম্বর এজেন্ডা। এ বিষয়ে সরকারপ্রধান নানা নির্দেশনা দিচ্ছেন। কিন্তু বাজারে তার প্রভাব বিপরীতমুখী। চলতি অর্থবছরের শুরুতে মূল্যস্ফীতিকে ৬ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল সরকার। কিন্তু নানা পদক্ষেপ নিয়েও তা কোনোভাবেই ৯ শতাংশের নিচে নামাতে পারেনি। বরং টানা ২৩ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। 

বিবিএস যেসব পণ্যমূল্য নিয়ে জরিপ করে, সে তালিকায় খাদ্যপণ্যের মধ্যে রয়েছে- চাল, ডাল, মাছ, মাংস, তেল, চিনিসহ ১২৭টি পণ্য। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত খাতের মধ্যে রয়েছে কেরোসিনসহ সব ধরনের জ্বালানি তেল, স্বর্ণ, পরিবহন, যোগাযোগসহ ২৫৬টি পণ্য। জ্বালানি তেল, পরিবহন ভাড়া প্রতি মাসে বাড়ে না আর সোনার দাম সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে না। তাদের জীবনে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো খাদ্যপণ্য, ওষুধ আর চিকিৎসার ব্যয় বৃদ্ধি। ফলে মূল্যবৃদ্ধির জরিপে প্রকাশিত তথ্যের চেয়ে তাদের জীবনে দুর্দশা অনেক বেশি।

আবার মূল্যস্ফীতির হিসাব দেখে সামগ্রিক পরিস্থিতি অনুমান করা যায় না, কারণ কোনো বছরকে ভিত্তি ধরে মূল্যস্ফীতি হিসাব করা হয় তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে গত বছরের এপ্রিলে মূল্যস্ফীতির হিসাব পদ্বতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরকে ভিত্তি বছর ধরে মূল্যস্ফীতির হিসাব করা হচ্ছে। এর আগে ২০০৫-০৬ অর্থবছরকে ভিত্তি বছর ধরে এই হিসাব করা হতো। মূল্যস্ফীতির হিসাব করতে তালিকায় পণ্য ও সেবার সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। 

ভোক্তা মূল্যসূচকে ৭৪৯ ধরনের ৩৮৩টি আইটেমের পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নতুন হিসাবের আওতায় এসেছে মদ, সিগারেট, বেভারেজ ও মাদকদ্রব্য, সন্তানের শিক্ষার খরচ, পরিবারের ইন্টারনেটের খরচ, রেস্টুরেন্ট ও হোটেলে খাবারের খরচসহ আরও কয়েকটি খাত। নতুন পণ্য ও সেবার সঙ্গে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা ই-মেইলের ব্যবহারে ইন্টারনেটের খরচও যুক্ত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় নিম্নবিত্ত ও গরিব মানুষ এত পণ্য ব্যবহার করে না। গড়ে প্রায় ৩৭ থেকে ৫০ পণ্যের দামের ওপর নির্ভর করে তাদের জীবনযাপন ব্যয়।

বিবিএস তাদের জরিপকাজে দেশের সব সিটি করপোরেশন ও ৫৬টি জেলা শহরের বাজার থেকে শহরের দর এবং ৬৪ জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ বাজার থেকে পণ্য ও সেবার দর সংগ্রহ করে থাকে। নির্দিষ্ট বাজারের নির্দিষ্ট দোকান থেকে সংগ্রহ করে মাসের প্রতি সপ্তাহের তথ্য। আর সেবার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান থেকে মাসে একবার তথ্য সংগ্রহ করে তারা। ফলে এই জরিপকে মানদণ্ড ধরে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন ব্যয় পুরোপুরি বোঝা যায় না।

অন্যদিকে আর এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখন ১৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে মাছের দাম। গত এক বছরে মাছের দাম ২০ শতাংশের ওপর বেড়েছে। এরপর বেড়েছে মুরগিসহ পোলট্রি পণ্যের দাম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসের তথ্য পর্যালোচনা ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে করা সাম্প্রতিক এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে বলে তারা জানিয়েছে। তারা বলেছে, গত ডিসেম্বরে দেশের সব জেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তারা দেখেছেন যে, গরিব মানুষের ক্ষেত্রে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১৫ শতাংশ। 

বাড়তি এ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ অসুবিধায় রয়েছেন। ডিসেম্বরে বিবিএস মূল্যস্ফীতির যে তথ্য প্রকাশ করেছিল, তাতে সামগ্রিক খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু তারা জরিপের তথ্যে পেয়েছেন, গরিব মানুষের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ১৫ শতাংশ। এ ছাড়া বিবিএসের তথ্য পর্যালোচনা করে তারা দেখেছেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা মাছ ও পোলট্রি পণ্যের দামের। এর বাইরে তেল, চিনি, চাল, ডাল, ওষুধের দাম বৃদ্ধির পেছনে সিন্ডিকেটের প্রভাব কেউ অস্বীকার করতে পারেন না।

খাদ্যপণ্যের বাইরে যেসব পণ্যের দাম মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে তোলে তা হলো গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম। গড়ে ২৫ হাজার টাকা আয় করে এমন একটি নিম্নবিত্ত পরিবারে রান্নার সিলিন্ডার গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল মিলে জ্বালানির পেছনে মাসিক ব্যয় হয় ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা। মানে তার মোট আয়ের ১০ ভাগের এক ভাগ ব্যয় হচ্ছে জ্বালানির পেছনে। এ বছরে বিদ্যুতের দাম চারবার বাড়ানো হবে। তাহলে তিন বছরে বাড়বে ১২ বার। গত দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার আর খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। গত বছরের প্রথম তিন মাসে তিন দফা বেড়েছিল। 

বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি গড়ে বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ৪ পয়সা। ভোক্তা পর্যায়ে ৮ টাকা ৯৫ পয়সা। এই হারে বিদ্যুতের দাম বাড়লে তিন বছর পর তা বেড়ে হবে দ্বিগুণ। এখনই যখন স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির পেছনে তাদের আয়ের ১০ ভাগের এক ভাগ ব্যয় করতে হচ্ছে; তাহলে তিন বছর পরে তাদের এই ব্যয় কত দাঁড়াবে? বাসা ভাড়া, জ্বালানি, পরিবহন, ওষুধের পেছনে যে খরচ হয় তা তো কমানো সম্ভব নয়, কমাতে হয় তার খাওয়ার খরচ। এতে পুষ্টির যে ঘাটতি হবে তার প্রভাব পড়বে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। 

ফলে একদিকে দ্রব্যমূল্য, অন্যদিকে সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের দাম বাড়ানো, দুর্নীতির লাগামহীন বিস্তার, দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ শোধ দেওয়া সবকিছুর বোঝাই চাপবে শেষ পর্যন্ত জনগণের কাঁধে। সরকারের দেখার কথা জনগণের স্বার্থ, দূর করার কথা জনদুর্ভোগ কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্তই যদি দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয় আর সরকার দেখে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ, তাহলে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ করা জরুরি। আর এই জরুরি কাজ না করতে পারলে দীর্ঘশ্বাসই সম্বল। কিন্তু দীর্ঘশ্বাস ফেলে তো দাম কমানো যাবে না, দুর্ভোগও কমবে না। 

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
[email protected]