বাংলাদেশে বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ এখনো স্থায়ীভাবে গৃহহীন। কেউ বাস করছে অস্থায়ী ঘরে, কেউ রাস্তাঘাটে, কেউবা নদীতীরে ভাসমান জীবনযাপন করছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, ভূমিসংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের বসতিসংকট দিন দিন আরও প্রকট আকার ধারণ করছে।
এমন বাস্তবতার মধ্যেই আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব বসতি দিবস-২০২৫। অক্টোবরের প্রথম সোমবার দিবসটি উদযাপন করা হয়। এবার দিবসটির জাতিসংঘ ঘোষিত প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘নগর সংকট মোকাবিলায় সাড়া: সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর গঠন’। এই দিবস উদযাপনের গুরুদায়িত্ব পালন করছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
জাতিসংঘ ১৯৮৫ সালে বিশ্ব বসতি দিবস ঘোষণা করে এবং ১৯৮৬ সাল থেকে এটি পালিত হয়ে আসছে। দিবসটির উদ্দেশ্য হলো মানুষের বসবাসের মৌলিক অধিকার ও নগরজীবনের মান উন্নয়নের বিষয়ে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টি করা। এদিন বিশ্বের দেশগুলোকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, একটি বাসযোগ্য শহর মানেই সবার জন্য মর্যাদাপূর্ণ আবাসন।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে ১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি মানুষ বাস করে। রাজধানী ঢাকায় এ সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশের শহুরে জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বাস করছে। ঢাকার করাইল, যাত্রাবাড়ী, রায়েরবাজার, মিরপুর ও গাবতলীর মতো এলাকাগুলোতে অগণিত পরিবার বসবাস করছে অস্বাস্থ্যকর, অপর্যাপ্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে।
অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকায় নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার কারণে প্রতিবছর গড়ে ১৫ হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। তারা জীবিকার সন্ধানে শহরে চলে আসে, ফলে শহরের ওপর বাড়ছে বসতি ও অবকাঠামোগত চাপ।
সরকার ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’, ‘ভূমিহীনদের জন্য ঘর’ এবং ‘স্বপ্ননীড়’ নামে কিছু প্রকল্প চালু করলেও তা সর্বজনীন সমস্যা মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়। নগর পরিকল্পনা, জমি ব্যবস্থাপনা ও সাশ্রয়ী আবাসন নীতিতে ঘাটতির কারণে শহরে গৃহহীনদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, ঢাকা শহরে মধ্যবিত্তের জন্যও এখন নিজস্ব ফ্ল্যাট বা আবাসনের স্বপ্ন অনেকটাই অধরা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে- ক্রমবর্ধমান নগর সমস্যাগুলোর প্রতি আমাদের ‘সাড়া’ কতটা কার্যকর ও সময়োপযোগী? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য, কারণ দেশটি বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বদ্বীপ এবং এর দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে। এখানে নগর-সংকট কেবল অপরিকল্পিত বৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত দুর্বলতার বিষয় নয়: এটি জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম অভিঘাতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ তাদের গ্রামীণ ভিটেমাটি ছেড়ে শহরের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা নগরগুলোর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশ্বজুড়ে শহরগুলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দু হলেও একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, সংঘাত এবং ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের মতো নানাবিধ চ্যালেঞ্জের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব বসতি দিবস আমাদের শহর ও নগরের অবস্থা এবং সবার জন্য পর্যাপ্ত আলয়ের মৌলিক অধিকার নিয়ে ভাবনার এক অনন্য সুযোগ করে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের নগর-সংকটকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা দরকার। পাশাপাশি সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসন নিশ্চিত করার পথে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনাগুলো তুলে ধরতে হবে। এই দ্বৈত সংকট মোকাবিলায় প্রচলিত নগর পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে উদ্ভাবনী স্থাপত্য, জন-অংশগ্রহণমূলক মডেল এবং সমন্বিত নীতি কাঠামোর প্রণয়ন জরুরি। এ বিষয়ে আরও আলোচনা দরকার। এসব আলোচনা কেবল সমস্যার চিত্র তুলে ধরবে না, বরং সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করার চেষ্টা করবে; যা ‘পরিকল্পিত উন্নয়নের ধারা’ বজায় রেখে নগর সমস্যায় কার্যকরভাবে ‘সাড়া’ দেওয়ার পথ দেখাবে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশের নগর ও আবাসন-সংকট সূচকের তথ্য অনুযায়ী নগর জনসংখ্যা (শতাংশ) ৪০.৪৭% (২০২৩)। প্রাক্কলিত নগর জনসংখ্যা (২০৫০) ৫৬%। বর্তমান আবাসন ঘাটতি প্রায় ৬০ লাখ ইউনিট। প্রাক্কলিত আবাসন ঘাটতি (২০৩০) ১ কোটি ৫ লাখ ইউনিট। বস্তিতে বসবাসকারী জনসংখ্যা (আদমশুমারি-২০২২) ১৮ লাখ (দেশব্যাপী)। প্রাক্কলিত জলবায়ু উদ্বাস্তু (২০৫০) ১ কোটি ৩৩ লাখ।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। যার পেছনে নগর এলাকার অবদান অনস্বীকার্য। দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৬৫ শতাংশই আসে নগর থেকে। এই অর্থনৈতিক আকর্ষণের ফলে নগরায়ণের হারও বেড়েছে দ্রুতগতিতে। ১৯৬০ সালে যেখানে দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ শহরে বাস করত, ২০২৩ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ দশমিক ৪৭ শতাংশ বা প্রায় সাত কোটি। ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ শহরে বাস করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কিন্তু এই নগরায়ণ মূলত অপরিকল্পিত এবং ঢাকাকেন্দ্রিক। দেশের মোট নগর জনসংখ্যার প্রায় ৪৪ শতাংশ এক ঢাকাতেই বাস করে। সরকারি হিসেবে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার মানুষ নতুন করে ঢাকায় আসছে। যদিও বেসরকারি হিসাবে এর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গৃহহীনতার প্রভাব দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিরাজমান। গৃহহীনতা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে এবং মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে। গৃহহীন মানুষেরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকে, যা তাদের নানা রোগের কারণ হয়। গৃহহীন মানুষেরা সমাজের ওপর একটি অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, কারণ তাদের পুনর্বাসন ও সহায়তা দেওয়ার জন্য সরকারের ওপর আরও বড় দায়িত্ব আসে।
সমাধানের উপায় হিসেবে তারা বলেন, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগে সাশ্রয়ী মূল্যে পর্যাপ্ত বাসস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। দুর্যোগ মোকাবিলায় উন্নত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা দরকার। দারিদ্র্য দূরীকরণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা নিজেদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। গৃহহীনদের সংখ্যা কমাতে এবং এদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া খবরের কাগজকে বলেন, ঢাকা থেকে গৃহহীনদের চাপ কমাতে হলে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে পরিকল্পনা করে নগরায়ণ গড়তে হবে। সেখানে নাগরিক সব সুবিধা দিতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে গৃহ নিশ্চিত করতে হলে সেখানকার মানুষের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এর জন্য পর্যটনশিল্পের প্রসার, স্থানীয় ছোট ও মাঝারি শিল্প (ক্ষুদ্রশিল্প) গড়ে তোলা, কৃষিভিত্তিক শিল্পের উন্নয়ন করা যেতে পারে। পাশাপাশি মানুষের জন্য লোনের সুবিধা দিতে হবে এবং সেটা যেন দীর্ঘমেয়াদি হয়। উন্নত দেশের মতো করে অবকাঠামো তৈরি করতে হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ড. আদিল মোহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, ঢাকায় বসতি বাড়ার কারণে সৃষ্ট অপরিকল্পিত নগরায়ণ শুধু রাজধানীই নয়, পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে, যা প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এর মোকাবিলায় প্রয়োজন অপরিকল্পিত নগর উন্নয়নে নিয়ন্ত্রণ, অন্য জেলা শহরগুলোতে নাগরিক সুবিধা ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করে জনস্রোত বিকেন্দ্রীকরণ। গৃহহীনদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে কাঠামো গড়তে হবে।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে আজ সকাল সাড়ে ৮টায় একটি র্যালি জিয়া উদ্যান থেকে শুরু হয়ে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শেষ হবে। র্যালিতে মন্ত্রণালয় এবং এর আওতাধীন দপ্তর সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা থাকবেন।
দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সেমিনারের আয়োজন করেছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং ইউএন রেসিডেন্ট কো-অর্ডিনেটর ইন বাংলাদেশ, গোয়েন লুইস। এ ছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও বিশ্ব বসতি দিবস উদযাপন করা হবে।
দিবসটি উপলক্ষে আজ এবং আগামীকাল (৭ অক্টোবর) চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। প্রদর্শনীতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দপ্তর-সংস্থা এবং বেসরকারি সংস্থার স্টল থাকবে বলে জানা গেছে।