দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদুল ফিতর। শপিংমলে কেনাকাটার ভিড়সহ চারদিকে সাজ সাজ রব দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এই আনন্দের ভাগিদার হতে পারছেন না একীভূত পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা। তারা নিজেদের আমানত ব্যাংকে গচ্ছিত রেখে এখন প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা তুলতে পারছেন না। এমনকি চিকিৎসাও করাতে পারছেন না। সব মিলিয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
একীভূত করা ব্যাংক পাঁচটি হলো ইউনিয়ন, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল, সোশ্যাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক। পাঁচ ব্যাংকের সমন্বয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই এই ব্যাংকগুলোকে দুর্বল ব্যাংক হিসেবে চিহ্নিত করেন সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। এর পর থেকেই এই ব্যাংকগুলো থেকে আমানতকারীদের আমানত উত্তোলনের হিড়িক লেগে যায়। ফলে ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের টাকা দিতে ব্যর্থ হয়। এরপর এই পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। যার পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার জোগান দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন হলেও আমানতকারীরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা তুলতে পারছেন না। মেয়াদ শেষ হলেও স্থায়ী আমানতের টাকা তুলতে পারছেন না। উপরন্তু সাবেক গভর্নর ‘হেয়ার কাট’ নামক পদ্ধতি চালু করে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের কোনো মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে ৪ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু আমানতকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্ত মানতে রাজি নয়। তারা নির্বাচিত সরকারের নতুন গভর্নরের কাছে বিষয়টি প্রত্যাহারের দাবি জানান।
আমানতকারীরা পুরো মুনাফাসহ আমানত ফেরত পাওয়ার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছেন। কিন্তু নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান এ বিষয়ে কোনো আশা দেননি আমানতকারীদের। উল্টো আগের গভর্নরের সব ধরনের সংস্কারকাজ অব্যাহত রাখার কথা জানান তিনি। গভর্নরের কাছে আশ্বাস না পেয়ে আমানতকারীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেন। তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় মানববন্ধন করেন তারা।
এ সময় ‘হেয়ার কাট’ পদ্ধতি বাতিল করে পুরো মুনাফাসহ আমানত ফেরতের দাবি জানিয়েছেন পাঁচ ব্যাংকের ভুক্তভোগী আমানতকারীরা। এ সময় তারা এই হেয়ার কাট পদ্ধতি সাধারণ আমানতকারীদের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে শর্তমুক্ত স্বাভাবিক লেনদেনের দাবি জানান। দাবি মানা না হলে লাগাতার কর্মসূচি এবং আগামীতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাওয়ের মতো কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেন তারা।
পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, রবিবার (১৫ মার্চ) সকালে তারা সংসদ ভবনের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেন। একপর্যায়ে পুলিশ এসে তাদের সরিয়ে দেয়। এ সময় তাদের বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। তারা একপর্যায়ে শাপলা চত্বরের প্রধান সড়ক অবরোধ করলে জলকামান ব্যবহার করে সরিয়ে দেয় পুলিশ।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, সাবেক গভর্নরের সিদ্ধান্তে আমানতের ওপর গত দুই বছরের ৪ শতাংশ করে মুনাফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা অমানবিক ও অন্যায্য। অনেক আমানতকারী এসব ব্যাংক থেকে মূলধন ও মুনাফা তুলতে পারছেন না। এতে অনেকেই কষ্টে জীবনযাপন করছেন।
তারা ‘হেয়ার কাট’ সিদ্ধান্ত বাতিল করে মুনাফাসহ পুরো আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়ার দাবি জানান। পাশাপাশি স্বাভাবিক লেনদেন শুরুর দাবি জানান। বক্তারা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নরের সিদ্ধান্তে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংকের আমানতের ওপর গত দুই বছরের মুনাফা কেটে মাত্র ৪ শতাংশ সরকারি অনুকম্পা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা আমানতকারীদের জন্য অমানবিক ও অন্যায্য। দাবি মানা না হলে আগামী ১২ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে জানান আন্দোলনকারীরা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ভুক্তভোগী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব আলিফ রেজা খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা সংসদ ভবনের সামনে শান্তিপূর্ণভাবে মানববন্ধন করেছি। তার পরও পুলিশ এসে আমাদের ওপর চড়াও হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এই পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা নানা ধরনের সমস্যার মধ্যে রয়েছেন। কেউ চিকিৎসা করাতে পারছেন না, কেউ ঠিকমতো খেতে পারছেন না। ঈদের আনন্দ তো আমাদের মধ্যে নেই বললেই চলে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন হেয়ার কাট করে ৪ শতাংশ মুনাফা দিচ্ছে। আমরা পুরো মুনাফা চাই, সব টাকা দ্রুত দিতে হবে। আমাদের ন্যায্য দাবি মানা না হলে ঈদের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাওসহ কঠোর কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘তাদের আন্দোলন যৌক্তিক। কিন্তু বাস্তবতা হলো সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের তো তারল্য সংকট রয়েছে। সব টাকা দিয়ে দিলে তো ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। তাদের অনুরোধ করব, সরকার তো ব্যাংকের দায়িত্ব নিয়েছে, আরও একটু ধৈর্য ধরতে হবে সব টাকা ফেরত পেতে।’ আমানতকারীদের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে মুখপাত্র বলেন, বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ যাচাই-বাছাই করছে, দেখা যাক কী সুপারিশ আসে। শিগগিরই এই ব্যাংকে এমডি নিয়োগ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।