দেশে জ্বালানি তেলের আমদানি ও সরবরাহ বাড়লেও চট্টগ্রামসহ সারা দেশে কমেনি সংকট, বরং পেট্রলপাম্পে দীর্ঘ লাইন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের নিত্যভোগান্তিতে বিপর্যস্ত জনজীবন। আতঙ্কিত হয়ে তেল কেনা, মজুত করা এবং বিপণনে অনিয়মের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত দামে জ্বালানি তেল বিক্রির অভিযোগও উঠছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) দেশে ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টন জ্বালানি আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছরে একই সময়ে আমদানি হয় ৫০ লাখ ৫০ হাজার টন জ্বালানি। সে হিসাবে বছরের ব্যবধানে ৬ লাখ ৯০ হাজার টন বেশি জ্বালানি আমদানি হয়েছে। তা ছাড়া চলতি মাসেও বেশ কিছু জ্বালানিবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে। এসব জাহাজে থাকা জ্বালানি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খালাসের ব্যবস্থা করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
কাটছে না সংকট
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নগরীর হালিশহর ঈদগাঁ, টাইগারপাস ও ওয়াসা এলাকার পেট্রলপাম্পগুলোতে মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহনের লম্বা লাইন দেখা গেছে। গাড়িতে জ্বালানি সংগ্রহে সময় লেগেছে ২ ঘণ্টা বা তারও বেশি। জ্বালানি পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার সঙ্গে যোগ হয়েছে তীব্র গরমের ভোগান্তি।
চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর ঈদগাঁ এলাকায় মেসার্স ইয়াকুব আলী পেট্রলপাম্পে কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী মো. ইরফানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বেলা ৩টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। বিশাল লম্বা লাইন। এক ঘণ্টা হয়ে গেছে। এখনো তেল নিতে পারিনি। সরকার বলছে জ্বালানিসংকট নেই। অথচ তেল পেতে এত কষ্ট! জানি না এই ভোগান্তির শেষ কোথায়?’
নগরীর আগ্রাবাদ এলাকায় বসবাসরত মিরসরাই উপজেলার বাসিন্দা মো. আবদুল গণি খবরের কাগজকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার (গতকাল) সকালে চট্টগ্রাম শহরে ফেরার জন্য মিরসরাই থেকে চয়েস বাসে উঠি। বাসটি সীতাকুণ্ড পেরোলে জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। তখন অন্য একটি বাসে করে শহরে যেতে হয়েছে।’
এদিকে বাড়তি দরে জ্বালানি বিক্রির বিষয়ে অভিযোগ করেছেন অনেকে। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার বাসিন্দা মো. শাহ আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘ফিলিং স্টেশনগুলোতে নির্ধারিত দরে জ্বালানি বিক্রি হয়। বাইকের জন্য অকটেন প্রয়োজন। ফিলিং স্টেশনে অকটেন না পেয়ে বাধ্য হয়ে দোকান থেকে প্রতি লিটার ২০০ টাকা করে বোতলে ভরা খোলা জ্বালানি কিনেছি। উপায় নেই, তাই বাড়তি দরে অকটেন কিনেছি।’ সাইফুদ্দিন নামে এক কৃষক জানান, তিনি তার পাম্প চালানোর জন্য দোকান থেকে ডিজেল কিনেছেন লিটার ১৩০ টাকা করে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির চট্টগ্রাম উত্তর জেলা প্রতিনিধি মেসার্স বেগম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মামুন অর রশিদ চৌধুরী পলাশ খবরের কাগজকে বলেন, ফিলিং স্টেশনের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নেওয়া সবাই ক্রেতা নয়। কেউ কেউ পাম্প থেকে তেল সংগ্রহকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। সংগৃহীত তেল হয় তারা বেশি দামে বিক্রি করছেন নতুবা মজুত করছেন। তিনি বলেন, মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ফিলিং স্টেশনে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। তখন থেকে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অন্তত তিন গুণ চাহিদা বেড়েছে। তিনি তার নিজের ফিলিং স্টেশনের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সপ্তাহে ৩০ থেকে ৩২ হাজার লিটার ডিজেল এবং প্রায় ১৫ হাজার লিটার অকটেন তারা বিক্রি করতেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে তার চেয়ে অনেক বেশি বিক্রি করছেন। তবু লাইন কমছে না। অথচ বিপিসির নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল গত বছরের মার্চ মাসে যে পরিমাণ তেল ফিলিং স্টেশনে বিক্রি করত। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তার থেকে ২৫ শতাংশ কম দেবে। বাস্তবে তারা বেশি দিয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে যে পরিমাণ তেল সরকারি তেল কোম্পানিগুলো বিক্রি করেছিল, ২০২৬ সালের এপ্রিলেও তা দিচ্ছে। কিন্তু তাতেও ভোক্তার চাহিদা মিটছে না।
সংকটের আরেকটি কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতীতে যারা বিভিন্ন দোকানে ড্রামে করে তেল বিক্রি করত। এখন রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা এবং যমুনা হয়তো তাদের তেল কম দিচ্ছে। যে কারণে তাদের ক্রেতারাও ফিলিং স্টেশনে ভিড় করছেন।
পেট্রলপাম্পে তেল বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা যারা পেট্রলপাম্পে তেল বিক্রি করি তাদের অনিয়ম করার সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রশাসনের লোকজন আমাদের ২৪ ঘণ্টা নজরদারিতে রেখেছে। তা ছাড়া কোন পাম্প কী পরিমাণ তেল এনেছে এবং তার কতটুকু বিক্রি হয়েছে তা যাচাই করা একদম সহজ। মিটার চেক করলেই সব পরিষ্কার হয়ে যায়। সংকট নিরসনে উচিত মজুতদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো।’
এদিকে জ্বালানিসংকটের কারণে বেড়েছে লোডশেডিং। চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ এলাকার বাসিন্দা মো. আকবর হোসেন বলেন, আগে এত লোডশেডিং ছিল না। বিদ্যুৎ গেলেও ১০ মিনিট বা আধা ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ চলে আসত। কিন্তু বর্তমানে লোডশেডিংয়ের সময় বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে মধ্যরাতে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. আবির বলেন, যুদ্ধের আগে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি একেবারে স্বাভাবিক ছিল। বর্তমানে লোডশেডিং ব্যাপক হারে বেড়েছে। দিনে ৬ ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ থাকে। সেই সঙ্গে গরমের মাত্রাও বেড়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করতে হলে সরকারকে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, কাঁচামালের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হলেও পরিশোধিত জ্বালানির আমদানি অব্যাহত রয়েছে। সরকার বলছে জ্বালানিসংকট নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। আতঙ্কিত হয়ে তেল কেনার চর্চা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জ্বালানিসংকট, বিদ্যুৎ বিভ্রাটসহ যাবতীয় ভোগান্তি মোকাবিলায় সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা জ্বালানির দাম ও সরবরাহকে অস্থির করে তুলেছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান ও ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের সাবেক মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মানজারে খোরশেদ আলম খবরের কাগজকে বলেন, আতঙ্কিত হয়ে কেনা হলো জ্বালানিসংকটের অন্যতম একটি কারণ। বিশ্বে সংকট তৈরি হলেও সরকার দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি। তবু একশ্রেণির ব্যবসায়ী এই সংকটকে পুঁজি করে তেল মজুত করছেন এবং বাড়তি দামে বিক্রি করছেন। সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া। এতে মজুতের প্রবণতা কমবে।
ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি বলেন, ‘দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রের মজুত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এই কাজ করার জন্য বিদেশি বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন নেই। দেশীয় প্রযুক্তি এবং বিশেষজ্ঞ দ্বারা কাজটি করা যায়। আরেকটি বিষয় হলো–দেশের জ্বালানি চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন হওয়া সত্ত্বেও আমরা শুধু ১৫ লাখ টন পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন ইস্টার্ন রিফাইনারির ওপর নির্ভরশীল। এই রিফাইনারিতে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা যায়। নতুন একটি রিফাইনারি অনতিবিলম্বে স্থাপন করতে হবে, যেখানে অন্যান্য দেশের ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা যাবে।’
প্রকৌশলী খোরশেদ বলেন, দেশে তেল বিতরণ, বিপণনে শৃঙ্খলা আনতে হবে, কালোবাজারি ও মজুতদারি বন্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে। বিশাল সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির (ইডকল) সাবেক ডেপুটি সিইও এস এম ফরমানুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, “প্রশাসনিকভাবে জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা বলা হলেও বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি (সৌর, জৈব বা বায়ুশক্তি) উৎপাদন ও ব্যবহারে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। ফলে যখনই তেল বা গ্যাসের সরবরাহ কমে, তখন পুরো অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ে। বিকল্প জ্বালানির প্রসার না বাড়িয়ে কেবল ‘ব্যবহার কমানোর’ নির্দেশনায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল মেলা কঠিন। তা ছাড়া আমাদের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা প্রয়োজন ছিল, তা হয়নি। বরং ব্যয়বহুল আমদানির দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়েছে। এখন যখন বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে, তখন দ্রুত কোনো দেশীয় বিকল্প তৈরি করা প্রযুক্তিগত, অর্থায়ন ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সম্ভব নয়।”
জানতে চাইলে সনাক-টিআইবি চট্টগ্রামের সভাপতি ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশে প্রতিটি সংকটের সময় বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত সুনিপুণ ও বিজ্ঞানসম্মত সমাধান তুলে ধরছেন। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে যারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, সেই আমলা বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাছে এসব পরামর্শ খুব বেশি গুরুত্ব পায় না। বিশেষজ্ঞ মতামত উপেক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে সাময়িক সমাধান খোঁজার প্রবণতা বেশি তাদের। অতীতের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আজ যে জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে, তার জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে না। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি নীতিনির্ধারকদের আরও বেপরোয়া করে তোলে। জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অবহেলার ফল, যা কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর বাস্তবায়নের দাবি রাখে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম বলেন, ‘সংকটের মূল কারণ হিসেবে একক কোনো উপাদানকে চিহ্নিত করা দুষ্কর। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা, অবৈধ মজুত এবং প্যানিক বাই থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সমাধান হিসেবে হাইব্রিড মডেল অবলম্বন করতে হবে। সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তি করতে হবে এবং একই সঙ্গে আমদানির ওপর যেন পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে পড়ি সেই চিন্তাও পরিকল্পনার মধ্যে থাকতে হবে। অন্যদিকে, ফরেন রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে দ্রুত নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান করতে হবে এবং উৎপাদন কমে যাওয়া কূপগুলো থেকে উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’