দিগন্ত বিস্তৃত অরণ্য, সবুজ পাহাড়, ঝরনা আর নীল জলরাশির হ্রদের শহর রাঙামাটি। একঘেয়ে জীবনের ক্লান্তি দূর করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার ভ্রমণপিপাসু মানুষ ছুটে আসেন পাহাড়ে। সেখানের বর্ণিল সৌন্দর্য অবগাহন করে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও ভুলে থাকতে চান জীবনের নানা জটিলতা। পর্যটকদের আনন্দ আর উচ্ছলতার সারথি হতে কর্মচাঞ্চল্যে মেতে ওঠেন পাহাড়ের মানুষও। কিন্তু নিত্যদিনকার সেই কোলাহল ও কর্মচাঞ্চল্যে এখন কেবলই হতাশা আর শূন্যতায় পূর্ণ হয়ে আছে। হরতাল, অবরোধের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এখন রঙহীন রাঙামাটির পর্যটনশিল্প। অথচ মৌসুমের শুরুতে রাঙামাটি পুরোদমে প্রস্তুত পর্যটকদের বরণ করে নিতে। তাদের আগমন ঘিরে নিরাপদ ভ্রমণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ প্রয়োজনীয় সব আয়োজন নিয়ে রেখেছেন পর্যটন ব্যবসাসংশ্লিষ্টরাও।
গত ২৮ অক্টোবর থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর ডাকা অবরোধ-হরতাল কর্মসূচি জেলার সব পর্যটন স্পট ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো কার্যত অচল হয়ে আছে। এতে গত প্রায় এক মাস ধরে পর্যটন ব্যবসায় মারাত্মক মন্দা দেখা দিয়েছে। পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রায় দুই হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর খরচ মেটাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ভাঙতে হচ্ছে পুঁজি।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট (খাবারের দোকান), টেক্সটাইল (পাহাড়িদের তৈরি কাপড়), সড়ক ও নৌযান এবং বিনোদন কেন্দ্রকে (বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান) ঘিরেই মূলত পাহাড়ের পাঁচ পর্যটন খাত। রাঙামাটি চেম্বারের হিসাবে, সব মিলিয়ে জেলা শহরে পর্যটনের পাঁচটি খাতে এখন দৈনিক লোকসানের পরিমাণ টাকার অঙ্কে অন্তত এক কোটি টাকা।
জেলায় পর্যটকদের মূল আকর্ষণ ৩৩৫ ফুট দৈর্ঘের ঝুলন্ত সেতুকে ঘিরেই। বছরে প্রায় ৫ লাখ দেশি ও বিদেশি পর্যটক সেতুটি দেখতে আসেন। ঝুলন্ত সেতু ছাড়াও পর্যটন কমপ্লেক্সের অধীন দুটি হোটেল-মোটেল ও ছয়টি কটেজ রয়েছে। এ ছাড়া শহরে বেসরকারি ৫০টি হোটেল-মোটেল রয়েছে। পর্যটক না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত পাঁচ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এখন বেকার। এ ছাড়া রাঙামাটির সাজেকে ১১২টি কটেজ-রিসোর্টে ১২ শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারীও কর্মহীন হয়ে আছে। সেখানে রেস্তোরাঁ, যানবাহন, কটেজ-রিসোর্টসহ সব মিলিয়ে প্রতিদিন ৮০ লাখ টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন।
চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পর্যটকদের আগমন না থাকায় তাঁত ও হস্তশিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েক হাজার মানুষও আর্থিক সংকটে পড়েছেন। বিশেষ করে স্থানীয় পাহাড়িদের কোমর তাঁতে তৈরি কাপড়, পোশাক, বাঁশ ও বেতের তৈরি হস্তশিল্পে উৎপাদিত জিনিসপত্র বিক্রি বন্ধ হয়ে পড়ায় উৎপাদনও হ্রাস পাচ্ছে। ফলে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতেও।
গতকাল বুধবার বিকেলে রাঙামাটি পর্যটন ঝুলন্ত সেতু এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কয়েকজন তরুণ পর্যটক সেতুতে ছবি তোলায় ব্যস্ত। তাদের একজন রাজধানীর ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নায়েবে জাহান মনি। বললেন, ‘রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই সাহস করে চলে এসেছি রাঙামাটি। এরপর পরিস্থিতি কী হবে তা তো জানি না। ভাবলাম এখনই সুযোগ, ঘুরতে আসলাম বন্ধুদের নিয়ে।’
কাউন্টারের টিকিট বিক্রেতা মো. সোহেল জানান, দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা আসছেন না। স্থানীয়রাই মাঝেমধ্যে সেতু দেখতে আসছেন। টিকিট বিক্রিও খুবই কমে গেছে।
শহরের দোয়েল চত্বরের আবাসিক হোটেল ইফশার ব্যবস্থাপক রবিউল হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে রাজনৈতিক কারণে আমাদের খুবই ক্ষতি হচ্ছে। হোটেল শূন্য। পর্যটন নেই বললেই চলে। গত এক মাসে আমাদের আড়াই থেকে তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।’
সাজেক হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জেরী লুসাই জানান, গত ২৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পর্যটকরা ফোন করে আগাম বুকিং বাতিল করে দিচ্ছেন। নতুন বুকিংও বন্ধ। অথচ অন্য বছরগুলোতে পর্যটন মৌসুমের শুরুতে এই সময়ে সাজেকে ১১২টি রিসোর্ট শতভাগ আগাম বুকিং হয়ে থাকে।
রাঙামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, ‘পর্যটক নাই বললেই চলে। রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে পর্যটক একেবারেই কমে গেছে। এখন চার থেকে পাঁচ শতাংশ বুকিং আছে।’
রাঙামাটি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুল ওয়াদুদ বলেন, ‘রাঙামাটির অর্থনীতি পর্যটক নির্ভর। হরতাল-অবরোধের কারণে পর্যটক শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে রাঙামাটি বিপর্যস্ত। ধস নামা এই পর্যটন খাতে দৈনিক এক কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।’