দখল-দূষণে নাব্য হারিয়ে শেরপুরের বেশির ভাগ খাল-বিল ও নদ-নদী এখন অস্তিত্বসংকটে পড়েছে। এরই মধ্যে অনেকগুলো বিলীন হয়ে গেছে। আবার কিছু নদীর বুকে চলছে চাষাবাদ, নির্মাণ করা হয়েছে ঘর-বাড়িসহ নানা স্থাপনা। অথচ একসময় শেরপুর ছিল কৃষি ও বাণিজ্যসমৃদ্ধ জেলা। নান্দনিক নামের নদ-নদীর স্রোতের সঙ্গে বয়ে চলত মানুষের জীবন, চলমান থাকত ব্যবসা-বাণিজ্য। ব্রহ্মপুত্র, মৃগী, সোমেশ্বরী, মালিঝি, ভোগবতী, নেত্রবতী, মহারশি- এই নদীগুলো শেরপুরকে দিয়েছিল আলাদা গৌরব। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নদীগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। অনেক নদী মরে গেছে, বাকিগুলো আজ সংকুচিত, দূষিত অথবা নাব্যসংকটে ভুগছে।
ইতিহাস থেকে জানা গেছে, শত বছর আগে শেরপুরে ছিল ১৬টি প্রধান ও ৯টি ক্ষুদ্র নদী। এগুলোর মধ্যে ছিল ব্রহ্মপুত্র, মৃগী, সোমেশ্বরী, মালিঝি, নেত্রবতী, মহারশি, থলঙ্গ, ভোগবতী, খারুয়া, দর্শা, ভুরাঘাট, বলেশ্বরী, সুতী, মরাখড়িয়া, বৃদ্ধ ভোগবতী ও খড়িয়া। আজ এগুলোর অর্ধেকই বিলীন হয়ে গেছে। বাকি নদীগুলোও নানা সমস্যায় জর্জরিত। নদীর নামেও এসেছে পরিবর্তন। ভোগবতী হয়েছে ভোগাই, মহাঋষি হয়েছে মহারশি, থলঙ্গ হয়েছে চেল্লাখালি এবং নেত্রবতী নদী এখন নেতাই নামে পরিচিত। ৪৩ মাইল (পুরোনো হিসাব) দীর্ঘ এই নদীটি আজ একেবারেই হারিয়ে গেছে।
ব্রিটিশ আমলে সুতী নদীর ওপর নির্ভর করত চন্দ্রকোনা বন্দর। আজ সেই নদী প্রভাবশালীদের মৎস্য খামারে পরিণত হয়েছে। দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি নদী; অথচ একসময় এই নদীতে ছিল অথৈ জল। অনেকে এখান থেকে মাছ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু সেই নদী এখন প্রভাবশালীদের দখলে। কয়েক বছর আগে স্থানীয় প্রশাসন নদী রক্ষার উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু তা কার্যকর হয়নি।
ব্রহ্মপুত্র নদ প্রবাহিত হয় শেরপুর-জামালপুর সীমান্তে। এই নদী ছিল চরাঞ্চলের আশীর্বাদ। কিন্তু এখন বর্ষাকালে এটি অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। নদীর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতা কমে গেছে। দখল চলছে নিয়মিত। বর্ষায় সংকুচিত নদী চরাঞ্চলকে বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছে।
মেঘালয়ের কর্ণঝোড়া নদী থেকে উৎপন্ন মৃগী নদী ছিল শেরপুর শহরের প্রাণ। শহরের মানুষ এখানে গোসল করত। আজ সেই নদী এখন শহরের বর্জ্যের ভাগাড়। নদীতে নামলেই চর্মরোগ হয়। মৃগী নদীর প্রাচীন দৈর্ঘ্য ছিল ২৯ মাইল, প্রস্থ ৫০ মিটার, গভীরতা ৪০ হাত। এখন হাঁটলেও হাঁটু পর্যন্ত পানি থাকে না। শহরের ড্রেনগুলো সরাসরি মৃগীতে মিশেছে। নদীর বুকে বাড়িঘর গড়ে উঠেছে, চাষাবাদ চলছে।
ভারতের মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা কংস নদী শেরপুরে প্রবেশ করে হয়েছে ভোগাই নদী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মহারশি, মালিঝি, চেল্লাখালি, সোমেশ্বরী। বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসা বালি-পলিতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়েছে। খননের অভাবে নদী সংকুচিত হচ্ছে। এতে বর্ষাকালে দেখা দেয় বন্যা, শুষ্ক মৌসুমে থাকে পানিশূন্য।
জানা গেছে, ১৮৮৫, ১৮৯৭ ও ১৯১৮ সালের ভূমিকম্পে শেরপুরের অনেক নদীর খাত পরিবর্তন হয়। পরে বনভূমি ধ্বংস ও পাথর উত্তোলনের কারণে উজানের মাটি নদীতে এসে ভরাট করছে। শহরের বর্জ্য ও পলিথিন যোগ হয়ে সংকট আরও বেড়েছে। অপরিকল্পিত বাঁধ ও স্লুইসগেট নির্মাণে পানি প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সদস্য মো. কালাম বলেন, ‘উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও বালি-পলি নদীর প্রবাহ বন্ধ করে দিচ্ছে। নদী বাঁচানোর জন্য আমরা স্থানীয়দের সচেতন করে যাচ্ছি।’
সচেতন মহলের অভিযোগ, আইনকে উপেক্ষা করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা নদ-নদী ও জলাশয় ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করছে। শুধু তাই নয়, নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে মৎস্য চাষ করা হচ্ছে। অন্যদিকে খনিজসম্পদ আহরণের নামে শ্যালোচালিত ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বিভিন্ন নদ-নদী থেকে অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। এতে অনেক নদ-নদী গতিহীন হয়ে পড়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন শাইন-এর নির্বাহী পরিচালক মুগনিউর রহমান মনি বলেন, ‘বিষয়টি দুঃখজনক হলেও সত্য- আমরা অনেক নিচে নেমে গেছি।
আমাদের আশপাশের নদ-নদী, খাল-বিলগুলোর গতিপথ আমরাই বন্ধ করছি। সেখানে আবার মাছের চাষ করছি। অথচ একটু সচেতন হলেই নদীগুলো রক্ষা পায়। মানুষের অসচেতনতার কারণে নদী ও খালগুলোর অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। নদ-নদী ও খাল দখলের প্রতিযোগিতা চলছে। প্রশাসনের উচিত নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি দখল হওয়া খাল-বিল উদ্ধারে অভিযান চালানো।’
তবে আশার বাণী শুনিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) শেরপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখিনুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘মৃগী ও মালিঝি নদীর পুনঃখনন কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে গঠিত নদী-খাল দখলমুক্ত কমিটি দখলদারদের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। নির্দেশনা পেলেই উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে।’
জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান বলেছেন, ‘নদী থেকে অবৈধ উপায়ে বালু উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। এর আগে, নকলা ও ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসন প্রায় ২০০ একর বিলের জায়গা উদ্ধার করছে। জনস্বার্থে এ ধরনের উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকবে।’