এক কেজি আমের দাম ৭৫০ টাকা। দাম শুনে আম না কিনে উল্টো নিজেই আমবাগান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দিনাজপুরের বিরল উপজেলার কৃষক আনছার আলী। সেই সিদ্ধান্তই যেন বদলে দিয়েছে তার জীবনের গল্প। মাত্র দুটি গাছ দিয়ে শুরু করা সেই উদ্যোগ আজ রূপ নিয়েছে বিশাল বাণিজ্যিক আমবাগানে। দেশি-বিদেশি প্রায় ৪০ জাতের আম চাষ করে ইতোমধ্যে সাড়া ফেলেছেন তিনি। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তার বাগানের আম রপ্তানি হয়েছে বিদেশেও। এখন তার লক্ষ্য—বিশ্ববাজারে দিনাজপুরের নিরাপদ ও মানসম্মত আমের পরিচিতি তৈরি করা।
বিরল উপজেলার রাজারামপুর ইউনিয়নে আনছার আলীর গড়ে তোলা আধুনিক আমবাগানটি এখন এলাকার কৃষি উন্নয়নের এক অনন্য উদাহরণ। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নিয়মিত পরিচর্যা এবং কৃষি বিভাগের কারিগরি পরামর্শে গড়ে ওঠা এ বাগান শুধু আনছার আলীর সাফল্যের গল্প নয়, বরং নতুন উদ্যোক্তা ও কৃষকদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
জানা যায়, ২০২০ সালে থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা ব্যানানা ম্যাংগো কিনতে গিয়ে প্রতি কেজি আমের দাম ৭৫০ টাকা শুনেছিলেন আনছার আলী। এত বেশি দাম দেখে আম না কিনে তিনি ভিন্নভাবে চিন্তা করেন। সিদ্ধান্ত নেন, বিদেশি জাতের এই আমের দুটি গাছ লাগিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করবেন। ফলন ও স্বাদ ভালো হলে গড়ে তুলবেন বাণিজ্যিক বাগান।
সেই চিন্তা থেকেই শুরু হয় তার পথচলা। ২০২১ সালে গাছে প্রথম আম আসে। স্বাদ ও মিষ্টতায় মুগ্ধ হয়ে বাণিজ্যিকভাবে চাষের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরপর ২০২২ সালে বাগানে রোপণ করেন ৬৫০টি গাছ। ২০২৩ সালে শুরু হয় বাণিজ্যিক উৎপাদন। আর ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো তাঁর বাগানের উৎপাদিত আম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে রপ্তানি হয়।
বর্তমানে আনছার আলীর বাগানে ব্যানানা ম্যাংগো, কাটিমন, চিয়াংমাই, কিং অব চাকাপাত, আর টু ইটু, ক্যাচু ইউ, সূর্যের ডিম, থ্রি টেস্ট, বারি-৪, বারি-৮, বারি-১৩, পালমার, উষা ও নীমসহ প্রায় ৪০ জাতের উচ্চফলনশীল ও সুস্বাদু আম রয়েছে।
বাগানের বিশেষ আকর্ষণ হলো আধুনিক ব্যাগিং পদ্ধতি। গাছ থেকে আম সংগ্রহের আগেই নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী প্রতিটি আম ব্যাগে ঢেকে দেওয়া হয়। এতে পোকামাকড়ের আক্রমণ কমার পাশাপাশি আমের গুণগত মানও ভালো থাকে। নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে এ পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাগান দেখতে আসা লিটন কুমার রায় বলেন, “এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি আমগুলো ব্যাগের মধ্যে ঝুলছে। বিষয়টি আমার কাছে বেশ ব্যতিক্রম মনে হয়। কৌতূহল থেকে বাগানে ঢুকে আমগুলো দেখে খুব ভালো লেগেছে। আমারও একটি জমি আছে, সেখানে আমবাগান করার সুযোগ রয়েছে। তাই আনছার আলীর কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে আগামী বছর আমবাগান করার পরিকল্পনা করছি।
স্থানীয় কৃষক বিমল বলেন, “এই বাগানে আম চাষের আধুনিক পদ্ধতি দেখে আমি মুগ্ধ। বিশেষ করে ব্যাগিং পদ্ধতিটি বেশ আকর্ষণীয়। এতে আমের গুণগত মান ভালো থাকে এবং পোকামাকড়ের আক্রমণও কমে। আনছার আলীর উদ্যোগ আমাদের মতো কৃষকদের নতুনভাবে ভাবতে উৎসাহিত করছে।
কৃষক আনছার আলী বলেন, “২০২০ সালে ব্যানানা ম্যাংগো আম কিনতে গিয়ে প্রতি কেজি ৭৫০ টাকা দাম শুনেছিলাম। আমগুলো থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা হয়েছিল। এত বেশি দামে আম না কিনে ভাবলাম, দুটি গাছ লাগিয়ে দেখি। আমের স্বাদ ভালো হলে ভবিষ্যতে নিজেই বাগান করব। সেখান থেকেই আমার ব্যানানা ম্যাংগো চাষের যাত্রা শুরু।
তিনি বলেন, “২০২১ সালে গাছে প্রথম আম আসে। আমগুলো অত্যন্ত সুস্বাদু ও মিষ্টি হওয়ায় আমার মনে হয়, আমাদের দেশেও যদি এই জাতের আম উৎপাদন করে বিদেশে রপ্তানি করা যায়, তাহলে দেশের জন্যও ভালো হবে। সেই চিন্তা থেকেই ২০২২ সালে ৬৫০টি গাছ রোপণ করি। ২০২৩ সালে বাণিজ্যিকভাবে আম উৎপাদন শুরু হয়। ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো আমার বাগানের আম বিদেশে রপ্তানি করা হয়।
আনছার আলী আরও বলেন, “বিদেশে রপ্তানির উপযোগী আম উৎপাদনের জন্য আমরা গ্যাপ প্রটোকল অনুসরণ করে চাষাবাদ করছি। রাসায়নিক বালাইনাশক ও ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ ও মানসম্মত আম উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ পেয়েছি। বাগানে কর্মরত শ্রমিকদেরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আশা করছি, এ বছরও আমার বাগানের আম দেশের বাইরে রপ্তানি করতে পারব।
বিরল উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আফজালুর রহমান বলেন, “আনছার আলীর বাগান থেকে প্রতিবছরই বিদেশে আম রপ্তানি করা হয়। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে এবারও শুরু থেকেই বাগানের মাটি পরীক্ষা, সারের সঠিক ব্যবহার ও পানির মান পরীক্ষা করা হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং গ্যাপ প্রটোকলের নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাগানের এমআরএল পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে। নিয়মিত আগাছা দমন ও রোগাক্রান্ত ডালপালা ছাঁটাই করা হয়েছে। ফ্রুট ফ্লাই দমনে ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আনছার আলীকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। আমরা চাই, তাঁর মতো আরও কৃষক আধুনিক পদ্ধতিতে নিরাপদ আম উৎপাদনে এগিয়ে আসুন এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হন।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (উদ্যান) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চলতি বছর দিনাজপুর জেলায় ৫ হাজার ৬৯২ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি আম উৎপাদনের আশা করছি। এখনো বিভিন্ন বাগানে আম রয়েছে। চূড়ান্ত উৎপাদনের হিসাব পরে পাওয়া যাবে।
তিনি বলেন, “আম উৎপাদনের শুরু থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে চাষিদের বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবছরই আমচাষির সংখ্যা বাড়ছে। এ বছর দিনাজপুর থেকে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে আম রপ্তানি হয়েছে। এতে আমচাষিরা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
সুলতান মাহমুদ/এসএন