বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল দুটি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়; এটি ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মানুষের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক অনন্য সম্পর্ক। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিভিন্ন সময়ে এই সম্পর্কের উত্থান-পতন ঘটিয়েছে, কিন্তু সংস্কৃতির প্রবাহ কখনো পুরোপুরি থেমে থাকেনি। বরং বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক যখন সংকটের মুখে পড়ে, তখন সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতিই দুই দেশের মানুষের মধ্যে সংযোগের সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা ছিল সেই সেতুবন্ধনের সবচেয়ে প্রাণবন্ত প্রতীক। প্রতি বছর বাংলাদেশের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল উৎসাহে এই মেলায় অংশগ্রহণ করত। বাংলাদেশের নতুন বই, লেখক, প্রকাশক এবং পাঠকদের মধ্যে এক অনন্য মিলনমেলার পরিবেশ সৃষ্টি হতো। শুধু তাই নয়, কলকাতায় পৃথকভাবে "বাংলাদেশ বইমেলা" আয়োজনও ছিল দুই বাংলার প্রকাশনা জগতের এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক আয়োজন। সেখানে বাংলাদেশের প্রকাশকরা সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পেতেন এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রকাশকরাও বাংলাদেশের প্রকাশনা জগত সম্পর্কে নতুন ধারণা লাভ করতেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রভাব সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পড়ে। তারই ধারাবাহিকতায় কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বন্ধ হয়ে যায় এবং টানা দুই বছর ধরে বাংলাদেশ বইমেলাও অনুষ্ঠিত হয়নি। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন শুধু প্রকাশকরা নন; ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন লেখক, গবেষক, পাঠক, অনুবাদক, পরিবেশক এবং সর্বোপরি দুই বাংলার সাহিত্যপ্রেমী মানুষ।
বইমেলা কেবল বই বিক্রির স্থান নয়। এটি চিন্তার আদান-প্রদান, নতুন লেখক আবিষ্কার, গবেষণার উৎস, কপিরাইট বিনিময়, অনুবাদ চুক্তি এবং প্রকাশনা শিল্পের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম। বাংলাদেশের প্রকাশকরা কলকাতায় গিয়ে যেমন নতুন বাজার খুঁজে পেয়েছেন, তেমনি পশ্চিমবঙ্গের বহু প্রকাশক ঢাকার অমর একুশে বইমেলার মাধ্যমে বাংলাদেশের বিশাল পাঠকসমাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এই স্বাভাবিক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুই দেশের প্রকাশনা শিল্পে এক ধরনের অদৃশ্য মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
এই দূরত্ব অর্থনৈতিক দিক থেকেও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাংলাদেশের বহু বই পশ্চিমবঙ্গে জনপ্রিয় হয়েছে, আবার পশ্চিমবঙ্গের অসংখ্য লেখকের বই বাংলাদেশের পাঠকের কাছে সমানভাবে সমাদৃত। যৌথ প্রকাশনা, পুনর্মুদ্রণ, অনুবাদ এবং কপিরাইট সহযোগিতার যে পরিবেশ গড়ে উঠেছিল, তা অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। নতুন লেখকদের জন্য সম্ভাবনার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে এবং প্রকাশকদের পারস্পরিক আস্থা আগের মতো সক্রিয় নেই।
তবে আশার কথা হলো, বর্তমান আঞ্চলিক বাস্তবতায় আবারও সম্পর্ক উন্নয়নের একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক পরিবেশ যখন সংলাপ ও সহযোগিতার দিকে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে, তখন সেই সুযোগকে কাজে লাগানোর সবচেয়ে নিরাপদ এবং কার্যকর মাধ্যম হতে পারে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ। কারণ সংস্কৃতি কখনো সীমান্ত মানে না; বই, সাহিত্য, কবিতা, সংগীত কিংবা নাটক মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করে রাষ্ট্রীয় সীমারেখা অতিক্রম করেই।
আগামী ২০২৭ সালের কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলাকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ও ভারতের উভয় সরকারের উচিত ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করা। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দুই দেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রকাশনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে আনুষ্ঠানিক সংলাপ শুরু করা যেতে পারে। সেই আলোচনায় বইমেলায় অংশগ্রহণের প্রশাসনিক জটিলতা, বই পরিবহনের শুল্ক ও কাস্টমস প্রক্রিয়া, ভিসা সহজীকরণ এবং প্রকাশকদের যাতায়াতের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কলকাতা বইমেলার আয়োজক সংস্থা এবং বাংলাদেশের প্রকাশক ও বই বিক্রেতাদের সংগঠনগুলোর মধ্যেও নিয়মিত যোগাযোগ পুনরায় শুরু হওয়া জরুরি। উভয় পক্ষ যদি আগেভাগেই পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তাহলে বাংলাদেশের জন্য আবার একটি সম্মানজনক জাতীয় প্যাভিলিয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সেখানে শুধু বই বিক্রিই নয়, লেখক-পাঠক সংলাপ, নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, সাহিত্য আলোচনা, কবিতা পাঠ, অনুবাদ কর্মশালা এবং প্রকাশনা শিল্পবিষয়ক সেমিনারের আয়োজন করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ বইমেলার পুনরায় আয়োজনও সময়ের দাবি। এই মেলা শুধু একটি বাণিজ্যিক আয়োজন নয়; এটি দুই বাংলার সাংস্কৃতিক আত্মীয়তার প্রতীক। পশ্চিমবঙ্গের পাঠক বাংলাদেশের নতুন সাহিত্য সম্পর্কে জানবেন, আবার বাংলাদেশের লেখকরাও পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যধারার সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে পারবেন। একইভাবে ঢাকার অমর একুশে বইমেলায় পশ্চিমবঙ্গের প্রকাশকদের অংশগ্রহণও উৎসাহিত করা উচিত।
দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি, সাহিত্য একাডেমি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড এবং প্রকাশনা সংগঠনগুলোর মধ্যে যৌথ কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। যৌথ অনুবাদ প্রকল্প, তরুণ লেখক বিনিময়, গবেষণা সহযোগিতা, ডিজিটাল প্রকাশনা এবং কপিরাইট সংলাপের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের জন্য আরও বিস্তৃত সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হবে।
এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং অনলাইন গণমাধ্যম যদি ইতিবাচক সাংস্কৃতিক উদ্যোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে, তাহলে পারস্পরিক আস্থা আরও দৃঢ় হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিভ্রান্তিকর প্রচারণার পরিবর্তে সাহিত্য ও সংস্কৃতিভিত্তিক ইতিবাচক যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভিত্তি কেবল রাষ্ট্রীয় চুক্তি নয়; এর ভিত্তি গড়ে উঠেছে হাজার বছরের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের ওপর। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কূটনৈতিক জটিলতাও সৃষ্টি হতে পারে, কিন্তু সাহিত্য ও সংস্কৃতির দরজা কখনো সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়া উচিত নয়। ২০২৭ সালের কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় বাংলাদেশের সম্মানজনক প্রত্যাবর্তন যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে সেটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা হবে না; এটি হবে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে নতুন আস্থার সূচনা, দুই বাংলার সাহিত্যজগতের পুনর্মিলন এবং উপমহাদেশে সাংস্কৃতিক কূটনীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইতিহাস সাক্ষী, রাজনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলাতে অনেক সময় কূটনীতিকদের আগে এগিয়ে আসেন কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও প্রকাশক। সেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায় শুরু হোক বইকে সঙ্গে নিয়েই।
হাবিব বাবুল: জার্মান প্রবাসী সাংবাদিক এবং শুদ্ধস্বর ডটকমের প্রধান সম্পাদক