ময়মনসিংহের পর্যটন স্থানগুলোর মধ্যে একটি আকর্ষণীয় স্পট হচ্ছে নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জমিদার শশীকান্ত আচার্য্য চৌধুরীর বাড়ি ‘শশী লজ’। ৯ একর জায়গাজুড়ে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে লাল ইটের রাজবাড়িটি। দ্বারপ্রান্তে সাদা মার্বেল পাথরের দৃষ্টিনন্দন গ্রিক দেবী ভেনাসের মর্মর প্রতিমূর্তি। যেখানে আজ রাজা-রানি কেউ নেই। বেঁচে আছে সুবিশাল রাজপ্রাসাদ, তার পরতে পরতে জড়ানো ইতিহাসের লাবণ্য ও স্মৃতিচিহ্ন। অপরূপ, অনিন্দ্যসুন্দর প্রাসাদটি দেখতে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী এখানে ভিড় করেন।
শশী লজের মূল ফটকে রয়েছে ১৬টি গম্বুজ। মূল ভবনের সামনে রয়েছে একটি বাগান। এর মাঝখানে শ্বেতপাথরের ফোয়ারা। সেখানেই রয়েছে গ্রিক দেবী ভেনাসের স্নানরত মর্মর মূর্তি। বাগানের ঠিক পেছনেই শশী লজ। এর পাশেই বিস্ময়কর পদ্মবাগান। শশী লজের ভেতর মহলের বারান্দা অতিক্রম করে কয়েক ধাপ সিঁড়ি পেরোলেই রঙ্গালয়।
একসময় বাইজির রিনিঝিনি নূপুরের শব্দে মুখরিত থাকত সেই রঙ্গালয়। আজ সেখানে কেবলই ইট-পাথরের দেয়াল। রাজবাড়ির প্রায় প্রতিটি ঘরেই রয়েছে একই রকমের ঝাড়বাতি। আরও রয়েছে জলসাঘর ও বড় স্নানঘর। সাদা মার্বেল পাথরে নির্মিত স্নানঘরটি দর্শনার্থীর চোখ জুড়িয়ে দেয়। স্নানঘরের ভেতরে রয়েছে একটি সুড়ঙ্গ। ধারণা করা হয়, এই সুড়ঙ্গপথে নাকি মুক্তাগাছা পর্যন্ত যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। মূল ভবনের পেছনে আরও একটি স্নানঘর রয়েছে।
রাজবাড়ির পেছনে রয়েছে একচিলতে উঠান। সেটি পার হলেই দেখা মিলবে জলাশয়ের। এর পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে দুটি ঘাট রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, আশপাশের এলাকাসহ দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি দেখতে এসেছেন। অনেকে অনেকভাবে সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। কেউ ফুলের বাগান দেখছেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে বড় বড় গাছগাছালি দেখছেন। অনেকে প্রাসাদের পটভূমিতে সেলফি তুলছেন। আবার অনেকে প্রাসাদের ভেতরে থাকা নানা ঐতিহাসিক জিনিস দেখছেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। একে অপরের সঙ্গে ইতিহাস সম্পর্কে গল্প করছেন।
বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফুল ইসলাম গৌরীপুর থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে এসেছেন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘পরিবারের সবাইকে নিয়ে তেমন একটা ঘোরার সুযোগ হয় না। দুই দিনের ছুটিতে ছিলাম। একসঙ্গে আনন্দ উপভোগ করতে ইচ্ছা হলো। তাই ময়মনসিংহের রাজবাড়ি বলে খ্যাত শশী লজে সবাইকে নিয়ে এলাম। ভেতরে ঢুকে সবাই ইতিহাস সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পেরেছে। নিজ চোখে ইতিহাসের সাক্ষী অনেক কিছু দেখতে পেয়ে তারা দারুণ খুশি।’
ময়মনসিংহ নগরীর একটি মেসে ভাড়া থাকেন আনন্দমোহন কলেজে অনার্সের ছাত্র আরাফাত ও শাহীন নামের দুই বন্ধু। তারা জানান, দুজনই বেশ কয়েকবার শশী লজ দেখেছেন। এখানকার চোখজুড়ানো সৌন্দর্যসহ ইতিহাসের স্মারকচিহ্ন দেখলে মনে প্রশান্তি আসে। তাই কখনো সময় পেলেই দুই বন্ধু মিলে এখানে বেড়াতে চলে আসেন।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, বাংলার বিখ্যাত মহারাজা শশীকান্ত আচার্য্যের পরিবার বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে প্রথম জমিদারি লাভ করেছিলেন। ময়মনসিংহ শহর থেকে কিছু দূরে অবস্থিত মুক্তাগাছাকে কেন্দ্র করে সেই কালে তাদের জমিদারি পরিচালিত হতো।
মুক্তাগাছার জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা শ্রীকৃষ্ণ আচার্য্যের প্রস্থানের পর কেটে গেছে অনেক দিন। তিন পুরুষ ধরে চলমান জমিদারির সিলসিলা বহাল রাখতে গৌরীকান্ত আচার্য্য চৌধুরীকে দত্তক নেন জমিদার রঘুনন্দন আচার্য্য। জমিদার গৌরীকান্ত আচার্য্য চৌধুরীরও কোনো সন্তান ছিল না। জমিদার গৌরীকান্ত আচার্য্য চৌধুরী মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী লক্ষ্মী দেবী আচার্য্য চৌধুরানী পূর্বসূরিদের পথ অনুসরণ করে দত্তক নেন চন্দ্রকান্তকে। অল্প বয়সে চন্দ্রকান্তের মৃত্যু হলে লক্ষ্মী দেবী সূর্যকান্ত আচার্য্য চৌধুরীকে দত্তক নেন। ব্রহ্মপুত্র নদ তীরবর্তী জনপদে সূর্যকান্ত আচার্য্য চৌধুরীর শাসনামলে যুক্ত হলো সোনালি মাত্রা।
প্রায় ৪১ বছর জমিদারি পরিচালনাকালে বহু জনহিতকর কাজের পাশাপাশি তিনি গড়ে তোলেন একাধিক নান্দনিক স্থাপনা। ১৯০৫ সালে জমিদার সূর্যকান্ত আচার্য্য চৌধুরী শহরের প্রাণকেন্দ্রে ৯ একর ভূমির ওপর নির্মাণ করেন দৃষ্টিনন্দন এই দ্বিতল ভবনটি। কিন্তু সূর্যকান্তও ছিলেন নিঃসন্তান। দত্তক পুত্র শশীকান্ত আচার্য্য চৌধুরীর নামে বাড়ির নাম দেন ‘শশী লজ’।
রাজপ্রাসাদটি ১৮৯৭ সালের ১২ জুন ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হলে অত্যন্ত ব্যথিত হন সূর্যকান্ত আচার্য্য চৌধুরী। ১৯০৫ সালে ঠিক একই স্থানে নতুনভাবে শশী লজ নির্মাণ করেন শশীকান্ত আচার্য্য চৌধুরী। ১৯১১ সালে শশী লজের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য আরও কিছু সংস্কারকাজ করা হয়। নবীন জমিদারের প্রচেষ্টায় শশী লজ হয়ে ওঠে আভিজাত্যপূর্ণ, দৃষ্টিনন্দন রাজমহল। শশীকান্ত আচার্য্য ছিলেন এই জমিদার পরিবারের শেষ উত্তরাধিকার।
জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর তৎকালীন সরকার জমিদারদের সব ভবন ও সম্পত্তিকে সরকারের খাসজমি ও ভবন হিসেবে ঘোষণা দেয়। ১৯৫২ সালে সরকার এই ভবনটিকে নারী শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ করে। ২০১৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সেখানে জাদুঘর স্থাপনের জন্য বাড়িটি অধিগ্রহণ করে। ২০১৯ সালে রাজবাড়ির অন্দরমহল জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। রাজমহলের মোট ১৮টি কক্ষের মধ্যে ৩টি কক্ষে রাজবাড়ির পুরাকীর্তি, রাজার ব্যবহৃত জিনিস, আসবাবপত্র সংরক্ষণ করে রাখা আছে। সেখানে আছে হাতির দাঁতের তৈরি সোফা, মাঝখানে রাখা একটি মার্বেল পাথরের টেবিল। চেয়ারের সর্বাঙ্গে ময়ূর, লতাপাতা আর ফুলের কারুকাজ। এই কাজগুলো করা হয়েছে হাতির দাঁত দিয়ে।
গন্ডারের চামড়া থেকে শুরু করে বুনো মোষের শিং, হরিণের শিং, জমিদারদের ব্যবহৃত পালঙ্ক, মহিষের শিং দিয়ে তৈরি পানপাত্র, শ্বেতপাথরের মূর্তি, হাতির মাথার কঙ্কাল, হাতির চোয়ালের কঙ্কাল, মাটির নলসহ হুঁকা এবং আরও বেশ কিছু ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি দর্শনার্থীদের দেখার জন্য রাখা হয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ময়মনসিংহের কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াসমিন খবরের কাগজকে বলেন, এই শশী লজ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রত্ন নিদর্শন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা ঐতিহাসিক এই স্থাপনা দেখতে আসেন। এখানে এসে ইতিহাসের নিদর্শন নিজ চোখে দেখে ঋদ্ধ ইতিহাসের ঐতিহ্য তারা গভীরভাবে উপলব্ধি করে থাকেন।
সোমবার বেলা ২টার পর থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এ ছাড়া অন্যান্য দিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা রাখা হয়। রবিবার বন্ধ। প্রাপ্তবয়স্ক সাধারণ দর্শনার্থীরা ৩০ টাকার টিকিট কিনে প্রবেশ করতে পারেন। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে এবং এইচএসসি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ১০ টাকা, সার্কভুক্ত দেশগুলোর দর্শনার্থীরা ২০০ টাকা এবং অন্যান্য বিদেশি নাগরিক ৪০০ টাকার টিকিটে ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন।