আনিশার মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা চলে। বাড়ি থেকে কল দিলেই আব্বু-আম্মু বারবার বলবে রমজানের আগেই বাড়িতে চলে যেতে। কিন্তু আনিশার যেতে ইচ্ছে করে না। পরীক্ষা শেষে বাড়িতে যাওয়া মানেই চাকরি নিয়ে সবার নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।
এখন পড়াশোনার চাপ নেই। তাই ও ঠিক করল কয়েকটা দিন হলে কাটিয়ে এরপর যাবে বাড়ি। কিন্তু বুধবার বিকেলেই মায়ের কল এল, ‘কবে আসবি বাড়িতে, তোর বাবার শরীরটা আজ ভালো নেই।’
যদিও কয়েকদিন পরে যাবে ভেবেছিল, বন্ধুদের সঙ্গে একটু সময় নিয়ে টিএসসিতে বের হয়েছিল। কিন্তু বাবার অসুস্থতার কথা শুনে মনটা অস্থির হয়ে গেল। তানিয়া আর রাফির থেকে বিদায় নিয়ে উঠল। এর মধ্যেই ‘মৌ পরিবহনে’ কল দিয়ে রাতের একটা ফিমেল টিকিট কনফার্ম করল। এখন যে দিনকাল পড়েছে, পাশে মেয়ে মানুষ নিশ্চিত হয়ে টিকিট কনফার্ম করল।
হলে ফিরতে ফিরতে ৭টা বেজে গেল। বাস সাড়ে ১০টায়। দ্রুত হালকা-পাতলা কাপড় নিয়ে ডাইনিংয়ে রাতের খাবার খেয়ে নিল। এর মধ্যে রাফির কল এল।
- তুই এত রাতে একা যেতে পারবি? আমি যাব তোকে দিতে?
- নারে, লাগবে না। চিন্তা করিস না। তানিয়াকেও বলে দিস আমি সিএনজি নিয়ে চলে যাব। হালকা একটা ছোট ব্যাগ নেব শুধু। বের হব সাড়ে ৯টার দিকে।
- পৌঁছে কল দিস।
- আচ্ছা।
রাফির সঙ্গে কথা শেষ করেই বাবার খোঁজ নিতে বাড়িতে কল দিল। মা জানালেন এখন একটু সুস্থ আছেন। পাশের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
একটু চিন্তামুক্ত হয়ে রেডি হওয়া শুরু করল। টিউশনির বাসায় জানিয়ে দিল। বাবার অসুস্থতার কথা বলে ছুটি নিল ঈদ পর্যন্ত।
বাস ছাড়ল রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে। ফোনে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে টেরই পায়নি। ঘুম যখন ভাঙল তখন বাস দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে বাইরে ভালো করে দেখা যায় না। সিটে বসেই ও জানালা লাগিয়ে দিয়েছিল। বাসের সামনে গুটিকয়েক অবয়ব দেখা যাচ্ছে আবছা। অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে। দরজা না খুললে সোজা গুলি চালিয়ে দেবে।
বাধ্য হয়ে বাসের কন্ডাক্টর দরজা খুলে দিল। যাত্রীদের যার কাছে যা পেল তাই কেড়ে নিল অস্ত্রের মুখে। টাকা-পয়সা, মোবাইল। নতুন বউয়ের হাতে থাকা স্বর্ণের চুড়ি, গলার চেইন। জানের ভয়ে শব্দ করা ছাড়াই সবাই বের করে দিল সবকিছু।
হঠাৎ ডাকাতদলে থাকা কনিষ্ঠ ছেলের চোখ গেল আনিশার দিকে। টিকিট দেরিতে পাওয়ায় আজ জানালার পাশে সিট পায়নি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অভুক্ত শকুনের মতো আনিশার শরীরে হাত বোলাতে লাগল বারবার। চিৎকার করতে লাগল আনিশা। নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা। কিন্তু ষাঁড়ের মতো দুটি পেশিবহুল হাত তাকে যুদ্ধ ময়দানের মতো বিধ্বস্ত করে দিয়ে গেল।
কিরামান-কাতিবিন কী ছিল সেখানে পাপ আর পুণ্য লেখার জন্য? কার বাহুতে তবে পাপ লিখলেন আর কার বাহুতে পুণ্য?
ওদিকে আনিশার সঙ্গে ধস্তাধস্তির সময় ডাকাতদলের আরেক লোক নতুন বধূর গহনা খুলে নিয়েও ক্ষান্ত হলো না। টেনেহিঁচড়ে তাকে নিয়ে গেল বাসের একদম শেষের সিটে। পাশে থাকা স্বামী বাধা দিতে গেলে তাকে রামদা উঁচিয়ে কল্লা কাটার ভয় দেখানো হলো। চারপাশে কেবলই শোনা গেল দুটি শব্দ ‘আমাকে বাঁচাও’। এরপর সবই নিস্তব্ধ।
৪৪ সিটের বাস। ৪০ জনই পুরুষ যাত্রী। বন্দুকের সামনে সবারই মাথা নিচু। তারা শুনলেন গোঙানির আওয়াজ। তারা শুনলেন ধস্তাধস্তির শব্দ। কিন্তু কারও চোখ তুলে তাকানোর অনুমতি নেই। এতগুলো পুরুষের সম্মিলিত শক্তি জ্বলে উঠতে পারল না! কয়েকটি চিৎকার পারেনি কারও অন্তরে প্রতিবাদের আগুন জ্বালাতে!
অন্ধকার কেটে গেলে সকালেই বড় করে দৈনিক পত্রিকায় ভেসে উঠল আনিশা আর গৃহবধূর ছবি। ধর্ষকদের কোনো ছবি নেই সেখানে। ধর্ষকদের কোনো ছবি থাকে না।
তারা আসে অন্ধকারের রূপ নিয়ে। যেখানে একটা নতুন ভোর আসার কথা ছিল আনিশার জীবনে, সেখানে এল আজন্ম অন্ধকার। এই অন্ধকার কি কখনো কেটে যাবে?
আফিয়া সুলতানা আশা
উলিপুর, কুড়িগ্রাম
তারেক
.jpg)
.jpg)