২০১০ সালের কথা। ভয়াবহ এক বাইক দুর্ঘটনায় আমি তখন বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি, নিউরোলজিক্যাল ইনজুরির কারণে জীবন-মৃত্যুর সীমারেখায় দাঁড়িয়ে। মাথায় রক্তক্ষরণ, শরীরে আঘাত। শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার উত্তম কুমার বললেন, যেকোনো সময় অবস্থার অবনতি হতে পারে এবং কঠোরভাবে জানিয়ে দিলেন, কোনো খাবার না দিতে- প্রয়োজনে পানি তাও কয়েক ফোঁটা দিতে হবে। কারণ, সামান্য বমিও আমার জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে।
এভাবে কেটে গেল একদিন, দুই দিন আমি ভেতরে ভেতরে ক্ষুধায় কাতরাচ্ছি। মায়ের হাত ধরে বলেছিলাম, ‘মা, একটু ক্ষুধা লেগেছে খাবার দাও’ মা তখন ঠাণ্ডা গলায় বলেছিলেন, ‘এখানে খাবার পাওয়া যায় না, এখান থেকে ছুটি হলে খাবার কিনে দেব।’
আমি জানতাম না, মা-ও এই দুই দিন এক ফোঁটা খাওয়া ছাড়াই আমার পাশে বসে ছিলেন।
দুদিন পর, আত্মীয়দের অনেক অনুরোধে মা যখন একটুখানি খাবার মুখে তুলবেন, তখনই আমি দেখে ফেলি। কষ্ট নিয়ে বলে ফেলি, ‘এই যে তুমি খাচ্ছ, খাবার নাকি পাওয়া যায় না?’
সেই মুহূর্তে মা থেমে গেলেন। মুখের খাবারটা ফেলে দিলেন ডাস্টবিনে। অঝোরে কাঁদলেন।
সেই মুহূর্তটা আমার জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষা। মা শুধু জন্মদাত্রী নন, তিনি ত্যাগের এক জীবন্ত প্রতিমা। আমার যন্ত্রণায় মা নিজের ক্ষুধাকে শাস্তি বানিয়ে নিয়েছিলেন। তার সেই চাওয়া- আমার জন্য বেঁচে থাকা, আমার জন্য নিজের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করার শক্তি- আজও আমাকে নিঃশব্দে শক্তি জোগায়। মায়ের ভালোবাসা কখনো শব্দে মাপে যায় না। সেটি বোঝা যায় এমন ক্ষণেই।
এরপরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় রেফার করা হলে নিউরোলজিক্যাল সার্জারির মাধ্যমে কিছুটা সুস্থতা ফিরে পেলেও, সেই পীড়া আজও বয়ে বেড়াচ্ছি জীবনের সঙ্গে। কিন্তু মা এই শব্দটা যেন ভরসা, সাহসের আরেক নাম। যখনই হোঁচট খেয়েছি, মা তখনই পাশে দাঁড়িয়েছেন খুঁটি হয়ে। প্রসঙ্গত, তখন আমি ছিলাম চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। সেই সময় থেকেই মায়ের উদ্যম, সাহসিকতা আর দোয়ায় আমি আজ গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছি। মাঝে হারিয়েছি বাবা নামক বটবৃক্ষকে, কিন্তু মা এক মুহূর্তের জন্যও বাবার অভাব বুঝতে দেননি। কাঁধে তুলে নিয়েছেন বাবার সব দায়িত্ব।
আমার এই যাত্রাটা হয়তো অসম্পূর্ণ থেকে যেত, যদি মায়ের সেই ত্যাগ, ভালোবাসা আর অটুট ভরসা না পেতাম। আমার স্বপ্নগুলো আলোর মুখ দেখেছে শুধু তারই কারণে, সে স্বপ্নের সঙ্গে আজ যোগ হয়েছে নতুন এক স্বপ্নের- একদিন মাকে টোকিও শহরটা কিনে দেব। সেদিন গর্বে ভরে উঠবে তার চোখ আর শান্তিতে হাসবে তার মুখ।
২০২৩ সালের ৯৫তম একাডেমিক অস্কারে কে হুই কোয়ান যেভাবে তার অর্জন উৎসর্গ করেছিলেন মাকে, ঠিক তেমনি আমিও আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তিগুলো উৎসর্গ করতে চাই আমার মাকে।
‘মা, তোমার সেই ত্যাগের ছায়াতেই আমি দাঁড়িয়ে আছি।
আজও, সব কষ্টের মাঝেও তোমার ভালোবাসার শক্তিতে বেঁচে আছি।
আমি তোমার ছায়ায় থাকি, মা।
আমি তোমার গর্ব হবো, মা।’
দত্তপাড়া, বাইশারী, বানারীপাড়া, বরিশাল
তারেক
.jpg)
.jpg)