পৃথিবীতে এমন কিছু প্রাণী রয়েছে, যাদের দেখে প্রথমে মনে হয় তারা হয়তো অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছে। তেমনই এক বিস্ময়কর সামুদ্রিক প্রাণী হলো অক্টোপাস। রহস্যে ঘেরা প্রাণীটি শুধু তার অদ্ভুত শারীরিক গঠন দিয়ে নয়, অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও প্রতিরক্ষা কৌশল দিয়েও বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে চলেছে।
আকৃতি ও গঠন: অক্টোপাস এক ধরনের সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণী, যা মূলত গভীর সমুদ্রে বসবাস করে। এরা মোলাস্ক (Mollusk) শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত এবং শরীরে কোনো হাড় থাকে না। নমনীয় দেহের কারণে এরা খুব সহজেই সংকীর্ণ ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। সাধারণত এর দৈর্ঘ্য ১২ ইঞ্চি থেকে শুরু করে ১৬ ফুট পর্যন্ত হতে পারে, যদিও কিছু গভীর সমুদ্রের প্রজাতি আরও বড় হয়। এদের দেহে আটটি বাহু থাকে এবং প্রতিটি বাহুতে শত শত সাকশন কাপ রয়েছে, যা দিয়ে তারা শিকার ধরে, চলাচল করে এবং পরিবেশ স্পর্শ করে অনুভব করতে পারে।
অক্টোপাসের রয়েছে তিনটি হৃৎপিণ্ড। এর মধ্যে দুটি ফুসফুসের মতো কাজ করে, শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সরবরাহ করে, আর একটি পাম্প করে সাধারণ রক্তপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। আশ্চর্যজনকভাবে এদের রক্তের রং নীল। কারণ এদের রক্তে মানুষের মতো লৌহ নয়, বরং তামা (Copper) ভিত্তিক হিমোসায়ানিন নামের একটি যৌগ থাকে।
খাদ্যাভ্যাস ও আবাস: অক্টোপাস সাধারণত কাঁকড়া, চিংড়ি, ঝিনুক ও ছোট মাছ খায়। তারা শিকারকে ধীরে ধীরে অনুসরণ করে এবং সুযোগ বুঝে হঠাৎ আক্রমণ করে ধরে ফেলে। কখনো কখনো তারা শিকারকে অচল করে দেওয়ার জন্য বিষাক্ত লালা ব্যবহার করে।
বাসস্থানের ক্ষেত্রে, অক্টোপাস গভীর সমুদ্রের পাথরের ফাঁক, প্রবাল বা গুহা বেছে নেয়। কেউ কেউ নিজেদের জন্য গর্ত তৈরি করে এবং আশপাশের শামুকের খোলস বা পাথর দিয়ে ‘দরজা’ বানিয়ে নিরাপদে অবস্থান করে।
বিস্ময়কর বুদ্ধিমত্তা: অক্টোপাস পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান অমেরুদণ্ডী প্রাণী হিসেবে বিবেচিত। গবেষণায় দেখা গেছে, তারা ধাঁধা সমাধান, পাত্রের ঢাকনা খোলা, লুকানো বস্তু খুঁজে বের করা কিংবা মানুষকে চিনে রাখা এসব কাজ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করতে পারে। প্রতিটি বাহুতে নিজস্ব স্নায়ুতন্ত্র থাকে, যা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। এটি তাদের আচরণে জটিলতা ও বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ ঘটায়।
আত্মরক্ষার কৌশল: অক্টোপাসের আত্মরক্ষার অন্যতম কৌশল হলো কালি ছিটানো। শত্রুর আক্রমণের মুখে পড়লে অক্টোপাস হঠাৎ গাঢ় কালো কালি ছেড়ে দেয়, যা শত্রুর দৃষ্টি ও ঘ্রাণশক্তিকে বিভ্রান্ত করে। এই সুযোগে অক্টোপাস দ্রুত পালিয়ে যায়।
এ ছাড়া, তারা আশপাশের পরিবেশ অনুযায়ী দেহের রং ও আকৃতি পরিবর্তন করতে পারে। এটি এক ধরনের ক্যামোফ্লাজ, যা শিকারি প্রাণী থেকে আত্মগোপন করতে সাহায্য করে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, অক্টোপাস যদি কোনো বাহু হারিয়ে ফেলে, সেটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবার নতুনভাবে জন্ম নিতে পারে, যাকে বলে পুনরুৎপাদন (Regeneration)।
বিলুপ্তির আশঙ্কা: এই আশ্চর্য ও দুর্লভ প্রাণী বর্তমানে বিপদের মুখে। সমুদ্রদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত শিকার এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রকোপে অক্টোপাসসহ অনেক সামুদ্রিক প্রাণী হুমকির মুখে পড়েছে। অক্টোপাসের অনেক প্রজাতি ইতোমধ্যেই বিলুপ্তির পথে।
তারেক
.jpg)
.jpg)