আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সব সময়ই দেখি নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে। হাসিখুশি মানুষ। আড্ডাবাজ। কিন্তু হঠাৎ করেই দেখি নীরব হয়ে গেছে। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। দেখতে মুলার ধবধবে মতো সুন্দর। মাথার চুল আস্তে আস্তে কমতে শুরু করেছে। বিয়ে করার কথা বললেই বলে, আগে বোনদের বিয়ে দেবে, তারপর নিজের বিয়ের চিন্তাভাবনা। এবার বুঝতে পারলাম ঘটনার শানে নজুল কী।
তাহলে বোনদের বিয়ে হচ্ছে না কেন? বোনদের কোনো ছেলেই নাকি পছন্দ হয় না। কেন হয় না? এমন প্রশ্ন করলে বলে তারা শাহরুখ খানের মতো ছেলে খোঁজে। তারও আবার কারণ আছে। বন্ধুর বোনগুলো দেখতে পরীর মতো সুন্দর। দুধের আলতা বলতে যা বোঝায় সেরকম। পরপর তিনটি বোন বিবাহ উপযুক্ত। বন্ধু একটা প্রকাশনীর মালিক। অফিস পল্টনে। আমরা সেখানেই সব সময় আড্ডা দিই। বন্ধুর বোনদের জন্য ঘটক আসে ঘটক যায়। কিন্তু ছেলে পছন্দ হয়, তো পরিবার পছন্দ হয় না। আবার ছেলের বাড়ি পছন্দ হয় তো ছেলে পছন্দ হয় না। এমন জটিলতার মধ্য দিয়েই তার পথচলা। পুরো সংসারটি তিনিই দেখাশোনা করেন। দুই ভাই জাপান থাকেন। বন্ধুর অর্থনৈতিকভাবে কোনো সমস্যা নেই। বলা চলে বিলাসী জীবনযাপন করছেন তারা। তখন পরামর্শ দিলাম বাড়ির ডিশ লাইন কর্তন করতে। তখনকার সময়ে ইউটিউব আসেনি। মোবাইল প্রযুক্তি ততটা ছিল না। ডিশ লাইনেই ছবি দেখে দেখে বোনদের জন্য পাত্র পাওয়া নিদারুণ কঠিন থেকে কঠিন হচ্ছিল। তাই বাড়ির ডিশ লাইন কাটা হলো। বোনদের বিয়ে দেওয়ার জন্য চারদিকে ঘটক ধরা আরও জোরদার শুরু করলাম। কিন্তু না। কিছুতেই বিবাহ দেওয়া যাচ্ছে না। তার কারণে বন্ধুকেও বিয়ে দিতে পারলাম না। তবে প্রকাশনীতে আসা একজন লেখিকা সুরাইয়া আপা; লালমাটিয়ায় বাসা তার। তিনি বললেন, আমার আত্মীয়ের একটা মেয়ে আছে, উত্তরাতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জব করেন।
লেখিকা আপার কথা মতো বন্ধুকে শার্টের বদলে লাইট গেঞ্জি পরিয়ে দিলাম। পোশাক-পরিচ্ছদে একটু ভিন্নতা আনলাম। কিন্তু মাথার চুল যে নেই। তা এখন কি দিয়ে ঢাকি। তারপরও যতটুকু সম্ভব সাজিয়ে লালমাটিয়া লেখিকার সুরাইয়া আপার বাড়িতে হাজির হলাম। সেখানে গিয়ে খাওয়া হলো। তারপর মেয়ে দেখার পালা। কিছুক্ষণ পর মেয়েও এল। আমরা দেখলাম। মেয়েটি বয়স একটু ভাটির দিকে। দেখতে উঁচা-লম্বা, নাকটা খাড়া, শ্যাম বর্ণের। তবে মোটামুটি পছন্দ হলো। কিন্তু আমাদের পছন্দে তো আর কিছু যায় আসে না। মেয়েরও তো একটা পছন্দ রয়েছে। মেয়ে জানিয়ে দিল তারা সামনে এগোনোর বিষয়টি পরে জানাবেন। আমাদের আর বুঝতে বাকি রইল না। ছেলে পছন্দ হয়নি। অথচ ছেলে দেখতে অসাধারণ সুন্দর। লাখে একটা। লাল মিষ্টি বর্ণের। কিন্তু মাথায় চুল নেই। এটাই হলো বড় ধরনের সমস্যা। কাজেই বিরস বদনেই আমাদের ফিরে আসতে হলো।
বন্ধু অত্যন্ত পরোপকারী। কেউ তার সহযোগিতা চেয়েছে আর পায়নি এমনটা কখনো দেখা যায়নি। তার প্রকাশনা অফিসে নানা জন আসেন বই প্রকাশ করতে। তাদের মধ্যে কবির চৌধুরী স্যারের বইও প্রকাশ করা হয়েছে। নির্মলেন্দু গুণের বাসায় পাণ্ডুলিপি আনতে গেলে ফল নিয়ে যেত। যুগান্তরের রফিকুল হক দাদু ভাই তার অফ ডেতে দীর্ঘ সময় আড্ডা দিত। আমি রেডিওতে কবিতা পাঠের আসরে অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখে আগারগাঁওয়ের রেডিও স্টেশনের হেলাল ভাইকে ডেকে আনলেন। আমাকে হেলাল ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তিনটি কবিতা একসঙ্গে রেকর্ড করালেন। পরপর প্রচার হলো আমার কবিতা। তখনকার সময়ে রেডিওতে কবিতা পাঠ করলে ৪৪১ টাকার বাংলাদেশ ব্যাংকের চেক দেওয়া হতো। আহ! কী সোনালি দিন গেছে তখন।
তিনটি কবিতা পাঠের সম্মানীর চেক ভাঙিয়ে আমার প্রকাশনী বন্ধু, হেলাল ভাইসহ চাইনিজ খেলাম। এমনই আনন্দ উৎসবের মধ্যে দিয়ে তখনকার সময়ের দিনলিপি পার করেছি। সময়ের ব্যবধানে অনেক বছর চলে গেছে। কিন্তু আজও বোনগুলোকে বিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। আর বন্ধুটিও তার চুল পড়ার কারণে বিয়ে করতে পারেনি। সময়ের অসংগতি এভাবেই মানুষকে নিচের দিকে ধাবিত করে থাকে। তারপরই আবার নতুন উদ্যমে এবার শুরু করলাম বন্ধুর বোনগুলো বিয়ে দিতে। না। এবার চিত্রনাট্যের দৃশ্যপট উল্টো। আগে ছেলে পছন্দ হতো না। এখন ছেলেরা মেয়ে পছন্দ করে না। ভাটির টানে গাল-চেহারার লাবণ্য বসে গেছে। উঠতি বয়সের একটি ছেলেকে আকর্ষণ করার মতো গ্লামারস ধূলিধূসরিত হয়ে পড়েছে। তাদের বিয়ে দিতে আমরা এখন মরিয়া কিন্তু কোনো ছেলে পাওয়া যাচ্ছে না। আর বন্ধুকেও বিয়ে করাতে পারছি না। অসম্ভব রূপবতী বোনগুলো এখন গলার কাঁটায় যেন পরিণত হয়েছে। ঘটকরাও অনেক বিরক্ত বোধ করছে। এখন আর ডাকলে তারাও আসে না। এবার বিয়ের কৌশল একটু পরিবর্তন করলাম। শহরের কোনো ছেলে এবার দেখাব না। গ্রামে বিয়ে দেব। সেখানেও চলল ছেলে দেখা। না। সেখানে কোনো ছেলে পাওয়া গেল না।
ধীরে ধীরে সুন্দর, লাবণ্যময় চেহারার বন্ধুটি তার জৌলুস হারিয়ে এখন ফিনকে হয়ে গেছে। সময়ের কাজ সময়ে না করে জীবন-যৌবন হারিয়ে এখন সে মধ্যবয়সে পা রেখেছে। বোনগুলোও নিয়তির অমোঘ বিধানের জন্য রেখে দেওয়া ছাড়া বিকল্প আর কোনো পথ নেই। হঠাৎ করেই শুনতে পেলাম বন্ধুটি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছে। চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসছে। নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। ভারতে নিয়ে গেল চিকিৎসার জন্য। না। কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থায় বন্ধুটিকে আর ফিরিয়ে আনা গেল না। জোছনার আলো দপ করে নিভে আঁধারে তলিয়ে গেল।
মিরাপাড়া, রিকাবী বাজার, মুন্সীগঞ্জ
তারেক/
.jpg)
.jpg)
.jpg)