প্রকৃতি সব সময় তার রহস্যময়তার মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করে। প্রকৃতির গর্ভে অসংখ্য রহস্য লুকিয়ে আছে যেগুলো মানুষের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়। আমরা সবাই জানি মাছ মানেই পানিতে বেঁচে থাকা প্রাণী। অথচ দক্ষিণ ও পশ্চিম আফ্রিকার নদী-নালা ও হ্রদে পাওয়া যায় এমন এক মাছ, যা আমাদের ধারণা পাল্টে দেয়। প্রাণীটির নাম আফ্রিকান লাংফিশ। এটি এক ব্যতিক্রমধর্মী মাছ, যা পানি ছাড়াই প্রায় তিন বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
কি আশ্চর্য হচ্ছেন, প্রশ্ন জাগছে এ আবার কীভাবে সম্ভব? হ্যাঁ নদী শুকিয়ে গেলে যখন চারপাশ প্রাণহীন পরিবেশে পরিণত হয় তখনো এই মাছ নিজেকে কাদার মধ্যে লুকিয়ে ফেলে এবং বৃষ্টির অপেক্ষায় ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে।
আফ্রিকান লাংফিশের বৈজ্ঞানিক নাম Protopterus যা ‘Dipnoi’ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। জানা যায় পৃথিবীতে বর্তমানে মাত্র ছয় প্রজাতির লাংফিশ বেঁচে আছে। অদ্ভুতভাবে এর মধ্যে চারটিই হলো আফ্রিকায়, একটি দক্ষিণ আমেরিকায় এবং অন্যটির দেখা মেলে অস্ট্রেলিয়ায়। লাংফিশের বিশেষত্ব হলো এদের একই সঙ্গে ফুসফুস ও ফুলকা দুই-ই রয়েছে। সাধারণ মাছের মতোই পানি থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে, আবার প্রয়োজনীয় মুহূর্তে সরাসরি বাতাস থেকেও অক্সিজেন নিতে পারে। এর শরীর লম্বাটে ও আঁশে ঢাকা থাকে। দৈর্ঘ্যে প্রায় ১ মিটার পর্যন্ত হতে পারে।

পানিশূন্য পরিবেশে বেঁচে থাকার রহস্য
মাছটির সবচেয়ে বড় রহস্য এটি পানি ছাড়া দীর্ঘ সময় বাঁচতে পারে কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? সেটিই আজ আমরা জানব। লাংফিশ এই জটিল প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন করে।
প্রথম যে কাজটা করে তা হলো কাদার গর্ত খুঁজে বের করা। নদী শুকিয়ে গেলে লাংফিশ কাদায় গর্ত খুঁজে অথবা নিজেই কাদা খুঁড়ে ঢুকে যায়। ধীরে ধীরে পুরো শরীর কাদার ভেতরে লুকিয়ে ফেলে। পরবর্তী ধাপে শরীর থেকে নিঃসৃত শ্লেষ্মা (mucus) দিয়ে তৈরি করে এক ধরনের বিশেষ কোকুন। এটা শুকিয়ে বেশ শক্ত হয়ে যায় এবং লাংফিশ বাইরের তাপমাত্রা ও শুষ্কতা থেকে নিজেকে অনেকটা রক্ষা করে। তারপর বেচে থাকতে চাই অক্সিজেন। লাংফিশ এই অবস্থায় ফুসফুস ব্যবহার করে সরাসরি বাতাস থেকে শ্বাস নেয়। এতে পানির প্রয়োজন পড়ে না।
এমতাবস্থায় লাংফিশ নিজের শক্তি বাঁচাতে নিদ্রা যায়, এই অবস্থাকে বলা হয় এস্টিভেশন। এটি অনেকটা হাইবারনেশনের মতো, তবে পার্থক্য শীতকালে নয়, খরা ও গরমকালে এটি ঘটে। এই সময় মাছের শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া অনেক বেশি ধীর হয়ে যায় ফলে খাবারের প্রয়োজন হয় না। বাকি থাকে শেষ চূড়ান্ত ধাপ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পালা। আফ্রিকান লাংফিশ প্রায় তিন বছর পর্যন্ত এভাবে না খেয়ে, না পান করেই বেঁচে থাকতে পারে এবং বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করে দিন শুনতে থাকে। এই মাছ আমাদের শেখায় কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে টিকে থাকতে হয় বছরের পর বছর।
লাংফিশের জীবনচক্র ও অভ্যাস
এদের প্রজনন মৌসুম সাধারণত বর্ষার সময়, যখন পানির প্রাচুর্য থাকে। এরা কাদার মধ্যে গর্ত করে ডিম দেয়। শিশু লাংফিশ প্রথম অবস্থায় ফুলকা দিয়ে শ্বাস নেয় কিন্তু ধীরে ধীরে এদের শরীরে ফুসফুস তৈরি হয়। আর খাদ্যাভ্যাস বলতে এরা প্রধানত কীটপতঙ্গ, শামুক, ছোট মাছ এবং জলজ প্রাণী খায়।
তারেক/
.jpg)
.jpg)