কমলাঘাট বন্দর। মুন্সীগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক এ বন্দরটিতে সব সময়ই হইচই লেগেই থাকে। সকাল থেকে শুরু হয়ে মধ্যরাত অবধি মানুষের হাঁকডাকই বলে দেয় কতটা জৌলুসময় এ নদী বন্দর। পাইকারদের মালামাল ওঠানামা দিনরাত চলতেই থাকে। কুলিদের মাথায় মাথায় বস্তা। নদীঘাটে নৌকার সিরিয়াল একটার পর একটা। একেকজন পাইকারের একেক রকম মালের বস্তা। বন্দরের গুড়ের গলি একদিকে। সেখানে শুধু গুড়ের পাইকারি বেচাকেনা চলে। অপর পাশেই গুড়ের বাতাসার গলিতে গুড় জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু বাতাসা।
গলির একটু ভেতরে ঢুকলেই ডালের মিলের ডাল ভাঙানোর শব্দে কান ভোঁ ভোঁ করতে থাকে। রাতভর চলে ডাল ভাঙানোর কাজ। সেখানে ডাল ভাঙানোর পর চলে নারী শ্রমিকদের কুলায় করে ডাল ঝেড়ে পরিষ্কার করার পালা। তবে রাতভর কাজ করতে করতে মিলের নারী শ্রমিকরা পুরুষ শ্রমিকদের চোখের ইশারায়-ইঙ্গিত দিয়ে কিছু ডাল বাগিয়ে নিয়ে থাকে। তারা ডাল চুরি করতে গিয়ে ব্লাউজের ভেতরে যতটুকু পারে চুরি করে নেয়। রাতে বন্দরের মধুমক্ষীদের একটু অন্যরকম আনাগোনা থাকে চোখে পড়ার মতো।
ব্রিটিশ আমলে এ বন্দরের সঙ্গে কলকাতার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। স্টিমারে এ বন্দর থেকে যেত মুন্সীগঞ্জের কলাসহ অনেক খাদ্যদ্রব্য আর কলকাতা থেকে আসত কমলা। তাতেই এ বন্দরের নামকরণ করা হয়েছে কমলাঘাট বন্দর। এ বন্দর ছিল সে সময়ে অনেক আধুনিক। তখনকার সময়ে ছিল দুটি সিনেমা হল, ফায়ার সার্ভিস, সুপেয় পানির জন্য পানির পাম্প। বন্দরটি একটি আধুনিক নদীবন্দর হওয়ায় হাঁকডাকের চিত্র ছিল সর্বদা।
হঠাৎ করেই বন্দরের মিল-কারখানাগুলোয় অনৈতিকতার চিত্র ভারী হতে লাগল। অল্প বয়সের মেয়ে শ্রমিকরা অনৈতিকতায় জড়িয়ে পড়তে লাগল। এ চিত্রের কারণে বন্দরের দুর্নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। অনৈতিকতা বেশি মাত্রায় ছড়িয়ে পড়লেই টনক নড়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের। তারা বন্দরের সব নারী শ্রমিক দেখে দেখে কার্ড দিতে থাকেন। শরীর স্বাস্থ্য যাদের ভালো সেসব নারী শ্রমিকদের বের করে দেওয়া হলো। তাতেই মধুমক্ষী গঙ্গীরানীকে সমস্যার মধ্যে পড়তে হলো।
যে গঙ্গী একটু গভীর রাত হলেই শীতের রাতে একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে পড়েন মিল-কারখানার অলিগলিতে। চারদিক ঘুরে বেড়ান রাতভর। মিলের শ্রমিকদের সঙ্গে ফিসফাস তার লেগেই থাকে। এক গলিতে কাজ শেষ করে অপর গলিতে সে হানা দেয়। এভাবেই একটি জৌলুসময় বন্দরের গঙ্গীরানী হয়ে উঠে গঙ্গী। গায়ে গতরে একটু গোশত বেশি গঙ্গীর। তাই একটু বয়স হলেও সব সময় পরিপাটি থাকায় তাকে একটু নজরকাড়া লাগে। তার চুলে থাকে মিষ্টি তেলের একটা সুবাস। কারখানার গলির ভেতর যেতেই শ্রমিকরা বুঝে যায় গঙ্গীরানী আসার খবর। তার মাথা থেকে বাসনাই তেলের ঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বন্দরে থাকতে হলে তাকে কার্ড করতে হবে। আর কার্ড করার জন্য সমিতিতে হাজির হলে যে তাকে বের করে দেওয়া হবে এটা গঙ্গীরানী ভালো করেই জানতে পেরেছেন। অগত্যা বন্দর ছাড়তে হলো গঙ্গীকে। সে কমলাঘাট বন্দর ছেড়ে কলকাতায় চলে যায়। সেখানে যেয়ে একটা হোটেলে কাজ নেয় গঙ্গীরানী।
হোটেলে কাজ করার সময় গঙ্গীরানী সে হোটেলেই কাজ করতে আসা তার বয়সের অর্ধেক বয়সের বিহারি একটা ছেলেকে তার প্রেমের জালে ফাঁসান। কয়েক বছর কলকাতার সে হোটেলে কাজ করে বিহারি ছেলেটি বিয়ে করে আবার কলকাতা থেকে বাংলাদেশের কমলাঘাট বন্দরে ফিরে আসেন গঙ্গী। উঠেন আগে যে বাড়িতে গঙ্গীরানী ভাড়া থাকতেন সে বাড়িতেই। সেখানেই তার বয়সের অর্ধেক বয়সী স্বামীকে নিয়ে চলতে থাকে তার সংসার জীবন। তার স্বামী একটা ডালের মিলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। আর গঙ্গীরানী রাত হলেই আবারও আগের মতোই বেরিয়ে পড়েন নতুন নতুন সঙ্গীর খোঁজে। স্বামীটি একটু বোকা হওয়ায় সে গঙ্গীর এমন কীর্তিকলাপ ঘুণাক্ষরেও টের পাননি। সারা দিন ডালের বোঝা মাথায় নিতে নিতে কাজ শেষে যখন বাড়িতে ফিরেন তখনই গোসল আর খাওয়া শেষে তিনি সন্ধ্যা রাতেই ঘুমিয়ে পড়েন গঙ্গীর স্বামী। কিন্তু গঙ্গী এ সুযোগটিই কাজে লাগান। স্বামীকে মশারি টাঙিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বের হন। ফেরেন শেষ রাতে। নিশুতি রাতের পেঁচা পাখি যখন কু-কু করে ডেকে চলে তখনই ফেরেন গঙ্গীরানী।
একদিন শীতের রাত। গঙ্গী স্বামীকে মশারি টাঙিয়ে তার চাদরটি গায়ে জড়িয়ে ঘর থেকে বের হন। বাইরে থেকে শিকল আটকিয়ে চলে যান। রাত শেষ হয়। কিন্তু না। গঙ্গীর আর ঘরে ফেরা হলো না। তার স্বামী জেগে উঠে দেখে গঙ্গী ঘরে নেই। সে চিন্তায় পড়ে যায়। সে খুব ভোরে ঘুম থেকে জেগে উঠে। গুম থেকে জেগে কখনো গঙ্গীকে দেখতে পায়নি এমনটা তার কখনোই হয়নি। সে গঙ্গীকে দেখতে না পেয়ে আবার ঘুমান।
সকালের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই চারদিকে কমলঘাট বন্দরের পশ্চিম পাশে নদী লাগোয়া একটা চরে গঙ্গীর লাশ পাওয়া যায়। সে লাশ গলাকাটা। সে লাশের বুকের একটা স্তন কাটা রয়েছে। মুখমণ্ডল কেটে তা গরু ছোলার মতো করে ছিলে ফেলেছে হত্যাকারীরা। লাশ দেখতে মানুষ আসে। মানুষের পায়ে চাপে পড়ে নদীপাড়ে ধানের খেত মলতে থাকে। সবুজ ধানের গাছগুলো মানুষের চাপ কুলাতে না পেরে নেতিয়ে মাটি সঙ্গে মিশে যায়। পাড়ের মানুষ ধান খেতের আইল দিয়েই গোসল আর হাঁড়িপাতিল ধুতে নদী পাড়ে যাওয়া-আসা করেন। তারাই প্রথমে গঙ্গীর এমন বীভৎস লাশ দেখে কেঁপে উঠেন। যে বাড়িতে গঙ্গী ভাড়া থাকতেন, আসেন সে বাড়ির মালিকও। তার বেঢপ শরীর দেখে খুব সহজেই গঙ্গীরানীকে শনাক্তকরণ করতে পারেন। ঘটনা শুনতে পেয়ে তার স্বামী এসেও গঙ্গীর লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাকে যখন মশারি খাটিয়ে দেয় তখন গঙ্গরানী বলেছিল, তুমি ঘুমাও আমি একটু পরই আসব। সহজ সরল স্বামী গঙ্গীরানীর রাতের জলসার খবর জানতেন না। থানা থেকে আসেন পুলিশ। সুরতহাল রিপোর্ট করা হয়। লাশের ছবি পুলিশ তুলে নেয়। পুলিশ আটক করেন গঙ্গীর সহজ-সরল স্বামীকে। কিন্তু তাকে জিঙ্গাসাবাদ করায় কিছুই পাওয়া যায়নি। অগত্যা পুলিশ গঙ্গীর নিরীহ স্বামীকে ছেড়ে দেয়।
ঘটনার ৩০ বছর অতিবাহিত হলেও এখনো এ ঘটনার কোনো সুরাহা হয়নি। গঙ্গীরানী মৃত্যুর জায়গায় এখন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট হয়েছে। সে নদীপাড় থেকে এখনো ভেসে আসে গঙ্গীর চিৎকার। আমাকে মারিস না। আমাকে মারিস না।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ।
তারেক/
.jpg)
.jpg)
.jpg)