প্রতিদিনের মতোই অফিস শেষে বাসায় ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে বিছানায় শুতে যাব ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল ছোট বোনের নাম, তাসফিয়া।
কল ধরেই বুঝলাম, কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে। ভয়ার্ত কণ্ঠে সে হড়বড় করে কথা বলতে শুরু করল। শব্দগুলো এলোমেলো, নিশ্বাস অস্থির। মাঝে মধ্যেই কথা থেমে যাচ্ছিল। আমি তাকে শান্ত হতে বললাম। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে সে গভীর শ্বাস নিল। তারপর সে বলা শুরু করল।
ঘটনাটি শুরু হয়েছিল একেবারেই সাধারণভাবে। সন্ধ্যা নামছিল। আকাশে তখনো হালকা আলো রয়ে গেছে। কয়েক দিনের শীতের প্রকোপ শেষে বাতাস আজ তুলনামূলক গরম। তাসফিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে মায়ের সঙ্গে কথা বলছিল। ঘরের ভেতরে হালকা আলো জ্বলছে। বারান্দার রেলিংয়ে ভর দিয়ে সে নিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
মাগরিবের নামাজ শেষ করে মুসল্লিরা মসজিদ থেকে বেরিয়েছে রাস্তায়। চারপাশে পরিচিত শব্দ—গাড়ির হর্ন, মানুষের কথা, শহরের চেনা কোলাহল। সবই স্বাভাবিক।
ঠিক তখনই অস্বাভাবিক ঘটনাটি ঘটে।
মুসল্লিদের মধ্যে কেউ একজন তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। হঠাৎ তার মনে হলো, কেউ একজন একদম পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, নিশ্বাসের দূরত্বে। সে শুনতে পেল কোরআন তিলাওয়াত। পরিষ্কার, ধীর, শিশুকণ্ঠ। কোনো রেকর্ডিং নয়। যেন কোনো শিশু তার পাশেই দাঁড়িয়ে তিলাওয়াত করছে।
তাসফিয়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল। এক ধরনের শীতলতা বয়ে গেল শরীরজুড়ে। সে মায়ের কথা শোনা বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল-
-কে? কে এখানে?
কোনো উত্তর এল না। শুধু তিলাওয়াত চলতে থাকল। সময় যেন থমকে গেল। পাঁচ সেকেন্ড কিন্তু তার কাছে মনে হলো কয়েক মিনিট, জীবনের দীর্ঘ পাঁচ সেকেন্ড। তারপর হঠাৎ করেই শব্দ থেমে গেল। যেন কেউ সুইচ বন্ধ করে দিয়েছে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতিটাও মিলিয়ে গেল।
ভয় সামলাতে চেষ্টা করল তাসফিয়া। ভাবল, হয়তো কেউ রুমে ঢুকে মজা করছে। এই যুক্তিতে সে দ্রুত বারান্দা ছেড়ে ঘরে ঢুকল।
ঘর পুরো ফাঁকা। জানালাগুলো বন্ধ। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় দরজাটি ভেতর থেকে বন্ধ।
তার মাথার ভেতর কেমন একটা ঝাঁকুনি লাগল। দরজা বন্ধ থাকলে কেউ ঢুকবে কীভাবে?
মনের ভুল ভেবে আবার বারান্দায় ফিরে গেল সে। নিচে তাকিয়ে দেখল রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই মুসল্লিও আর সেখানে নেই। মা তখনো ফোনে, সে মাকে জিজ্ঞেস করল কেউ কী তোমার পাশে কোরআন তিলাওয়াত করছে?
-মা উত্তর দিলেন, না।
তাসফিয়া স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল। পরিচিত কণ্ঠে নিজেকে শক্ত রাখার জন্য কথা চালিয়ে যেতে থাকল মায়ের সঙ্গে। কিন্তু ঠিক তখনই ঘটনাটি আবার ঘটল।
একই কণ্ঠ। একই তিলাওয়াত। এবার সময় কম তিন সেকেন্ডের মতো। কিন্তু ভয় দ্বিগুণ। কারণ এবার সে জানত, এটি ভুল শোনা নয়।
সে ভয়ে বারান্দা ছেড়ে রুমে, অতঃপর রুম থেকে দৌড়ে মাঝের রুমে চলে এল।
সব শুনে আমার শরীরের ভেতর অজান্তেই এক ধরনের শীতলতা বয়ে গেল।
তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনা স্বাভাবিক করতে আমি তাকে অভয় দিলাম। বললাম, হয়তো শোনার বিভ্রম। সে আমার কথায় ভরসা খুঁজে পেলেও শান্ত হলো না।
বয়স কম হলেও তাসফিয়ার কল্পনা ও অনুভবের ক্ষমতা প্রবল। ভয় পেলে সে যেমন ভেঙে পড়ে, তেমনি অজানার প্রতি এক ধরনের কৌতূহলও কাজ করে তার ভেতরে।
ওর মতো আমিও শান্ত হতে পারলাম না। ঘটনাটি নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম।
এটা কি প্যারানরমাল অ্যাক্টিভিটি? নাকি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোনো ব্যাখ্যা?
ভয় কল্পনার বিষয় নয়। ভয় শরীরকে প্রভাবিত করে হৃৎস্পন্দন বাড়ায়, শ্বাস ভারী করে, সময়ের ধারণা বদলে দেয়। পাঁচ সেকেন্ডের একটি শব্দ যদি কারও ভেতরের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়, তবে সেই পাঁচ সেকেন্ডকে অস্বীকার করার কোনো মানে হয় না।
ভাবতে থাকলাম ঘটনাটি আদৌ কি অস্বীকার করার মতো? না। একবার মনে হলো, এটি অলৌকিক। ইসলামে জিনের অস্তিত্ব স্বীকৃত। তাদের মানুষের চোখে দেখা যায় না, কিন্তু শব্দ ও অনুভূতির মাধ্যমে নিজেদের জানান দিতে পারে। তাছাড়া কোরআনের তিলাওয়াত—এটি কোনো অশুভ লক্ষণ নয়। বরং ভিন্ন জগতের কোনো উপস্থিতিও হতে পারে।
কিন্তু ঠিক এখানেই নিজেকে থামালাম। কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা খোঁজার সময় অতিপ্রাকৃতকে প্রথম সারিতে বসালে অনুসন্ধান আর এগোতে চায় না। সব প্রশ্নের উত্তর একটাই হয়ে দাঁড়ায়, ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।
তাই একটা হাইপোথিসিস দাঁড় করানোর চেষ্টা করলাম।
তাসফিয়া তখন ফোন কলে ছিল। মোবাইল নেটওয়ার্কে ভয়েস ট্রান্সমিশন হয় বিভিন্ন সুইচিং সিস্টেম ও রুটের মাধ্যমে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘ক্রস কানেকশন’ ঘটতে পারে যেখানে অন্য কোনো কলের অডিও অনিচ্ছাকৃতভাবে ঢুকে পড়ে। সম্ভবত অন্য প্রান্তে কেউ কোরআন তিলাওয়াত করছিল। সেই শব্দ তাসফিয়ার কলে মিশে গেছে, যা তাসফিয়াকে অপ্রস্তুত করে দিয়েছে এবং ভয় জাগিয়ে দিয়েছে তার মনে।
আর মানুষের মস্তিষ্ক? ভয় পেলে তা শব্দের উৎস নির্ণয়ে ভুল করে। ফোনের স্পিকারের শব্দ তখন তার কাছে পাশের কারও কণ্ঠ বলে মনে হয়েছে। দ্বিতীয়বার একই ঘটনা ঘটার কারণ, কল তখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি নেটওয়ার্ক রুটও একই ছিল।
মানুষ নিজেই এক অদ্ভুত যন্ত্র। ভয় পেলে তার ইন্দ্রিয়গুলো নিরপেক্ষ থাকে না। শব্দ তখন আর কেবল শব্দ থাকে না, তা হয়ে ওঠে উপস্থিতি। আর প্রযুক্তি? সেটাও মানুষের মতোই, ত্রুটিমুক্ত নয়। সামান্য নেটওয়ার্ক বিভ্রান্তি, সামান্য অডিও লিক, তার ওপর মানসিক উত্তেজনা এই তিনটি একসঙ্গে মিললে এমন ঘটনা ঘটা অসম্ভব কিছু নয়।
তবে সবকিছুর ব্যাখ্যা আমরা জানি না এটা স্বীকার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু না জানার জায়গাটাকে ভয় দিয়ে ভরিয়ে ফেলাটাও ঠিক নয়। ভয় মানুষকে সত্যের কাছাকাছি নেয় না, বরং তাকে নিজের মনের অন্ধকারে ঢুকিয়ে দেয়।
আমি আজও জানি না কোন ব্যাখ্যাটি সত্য। হয়তো তার মনেও একই দ্বন্দ্ব কাজ করছে। হয়তো দুটোই আংশিক সত্য।
২৯৫/১, কাঁঠালবাগান
ঢাকা
তারেক/
.jpg)
.jpg)