বিশ্বের সবচেয়ে বড় অজগর প্রজাতি ‘রেটিকুলেটেড পাইথন’ আমাদের দেশে যার স্থানীয় নাম গোলবাহার। যার দেখা মিলে চট্টগ্রামের কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান ও এর পাশের সীতাপাহাড় এলাকায় এবং সিলেট অঞ্চলে। এই সাপকে স্থানীয়ভাবে ‘গোলবাহার’ বলা হয় এর গায়ের চমৎকার সোনালি ও জ্যামিতিক নকশার জন্য। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের চিরহরিৎ বনাঞ্চলের আদি বাসিন্দা এই গোলবাহার। একটি প্রাপ্তবয়স্ক রেটিকুলেটেড পাইথন সাধারণত ৬ দশমিক ২৫ মিটারের (প্রায় ২০ ফিট) বেশি লম্বা হতে পারে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী, ১৯১২ সালে ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপে প্রায় ১০ মিটার (৩২ ফিট ৯.৫ ইঞ্চি) লম্বা একটি অজগর পাওয়া গিয়েছিল, যা এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে দীর্ঘতম অজগর। দৈর্ঘ্যের দিক থেকে ‘রেটিকুলেটেড পাইথন’ই হলো পৃথিবীর দীর্ঘতম সাপ। বাংলাদেশে কেবল সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু দুর্গম বনাঞ্চলেই এই সাপের প্রজননক্ষম ছোট একটি দল এখনো টিকে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে রেটিকুলেটেড পাইথন দেখা যাওয়ার উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো উল্লেখ করা হলো-
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি: বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির গহীন বনে বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ও গবেষক আদনান আজাদ আসিফ একটি বিশাল গোলবাহার অজগরের ছবি তোলেন, যা বাংলাদেশে এই প্রজাতির উপস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ছিল।
২০২৫ সালের আগস্ট: কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানসংলগ্ন চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে একটি বড় গোলবাহার সাপ রাস্তা পার হওয়ার সময় পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরে আসে। সে সময় গাড়ি থামিয়ে সাপটিকে নিরাপদে বনে ফিরে যেতে সাহায্য করা হয়।
বারবার এদের দেখা পাওয়া খুবই মুশকিল। কারণ, এরা সাধারণত মানুষের থেকে দূরে গহীন জঙ্গলে বা জলাধারের পাশে থাকতে পছন্দ করে। এরা সংখ্যায়ও বিরল। আবাসস্থল ধ্বংস ও শিকারের কারণে এদের সংখ্যা এখন খুবই কম, যার ফলে সহজে এদের দেখা মেলে না। রেটিকুলেটেড পাইথন মূলত রাতে সক্রিয় থাকে এবং দিনের বেলা ঘন ঝোপঝাড়ে নিজের বড় দেহ লুকিয়ে রাখে। পুরো বিশ্বে রেটিকুলেটেড পাইথনের প্রধান আবাসস্থল হলো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। আমাদের দেশের অত্যন্ত বিরল এবং বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী এটি। শুধু সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের গহীন চিরহরিৎ বনাঞ্চলে এদের বসবাস রয়েছে। আগে জঙ্গল ঘন ছিল, তাই অজগর মানুষের এলাকায় আসত না। কিন্তু বন উজাড় ও পাহাড় কাটা বেড়ে যাওয়ায় তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। ফলে মাঝে মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এই সাপ ভুল পথে চলে আসে লোকালয়ের খুব কাছে। এভাবেই আমরা জানতে পারি এই সাপটির অস্তিত্ব সম্পর্কে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রেটিকুলেটেড পাইথন মূলত নদী, খাল, জলাভূমি ও পাহাড়ি জঙ্গল এলাকায় বসবাস করতে পছন্দ করে। খাদ্য হিসেবে এরা হরিণ, বানর, বন্য শূকর, পাখি এমনকি গৃহপালিত পশুও শিকার করতে পারে। তবে মানুষের ওপর আক্রমণ তাদের স্বাভাবিক আচরণ নয়।
বাংলাদেশে এই সাপের মাধ্যমে মানুষের প্রাণহানির ঘটনা খুবই বিরল, তবে ২০০৩ সালে রাঙামাটির সাজেক ইউনিয়নে একটি ঘটনা ঘটে। বাসন্তী ত্রিপুরা নামের এক নারী স্বামীর সঙ্গে জুমে কাজ করছিলেন। এ সময় একটি অজগর তাকে গিলে ফেলে। পরে স্বামী পাড়ার মানুষদের ডেকে সবাই মিলে সাপটিকে মেরে মৃত অবস্থায় ওই নারীকে বের করে আনেন। তবে এটি ব্যতিক্রম। এমন আর কোনো নজির দেশের বনাঞ্চলে নেই। বরং মানুষের কারণে এই সাপের অস্তিত্ব হারিয়ে যাওয়ার পথে।
আইন অনুযায়ী অজগর একটি সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী। এটিকে হত্যা বা পাচার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে এই অজগরের উপস্থিতি প্রমাণ করে, এখানকার বন এখনো পুরোপুরি প্রাণহীন হয়নি। তবে ক্রমাগত বন ধ্বংস, অবৈধ শিকার এবং মানুষের বসতি সম্প্রসারণের কারণে এদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। আজ যে গোলবাহারকে ভয়ংকর গল্প বলে ভাবা যাচ্ছে, সঠিক সংরক্ষণ না হলে আগামী প্রজন্ম হয়তো তাকে শুধু বইয়ের পাতায় হারিয়ে যাওয়া এক মহাবিপন্ন প্রাণী হিসেবেই খুঁজে পাবে, যা মোটের কাম্য নয়। গোলবাহার দেশের এক জীবন্ত সম্পদ, যা রক্ষা করা আমাদেরই দায়িত্ব।
তারেক/
.jpg)
.jpg)
.jpg)