জাপানকে আমরা ‘সূর্যোদয়ের দেশ’ কিংবা ‘উদীয়মান সূর্যের দেশ’ বলি, তবে সেটি সাংস্কৃতিক পরিচয়; ভৌগোলিক সত্য নয়। জাপানের আগেই মহাবিশ্বের অন্য এক স্থানে সূর্যোদয় হয়। পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে, প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত দ্বীপগুলো আসলে প্রথম সূর্যোদয় দেখে। পৃথিবীর প্রথম সূর্যোদয় হয় কিরিবাতিতে।
বিশ্বের মানচিত্রে কিরিবাতি একটি ছোট কিন্তু অনন্য নাম। প্রশান্ত মহাসাগরের নীল গভীরে ছড়িয়ে থাকা ৩৩টি প্রবালদ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দেশকে অনেকেই চেনেন না, কিন্তু প্রতিদিন পৃথিবীতে প্রথম সূর্যোদয় দেখার সৌভাগ্য এই দেশেরই।
কিরিবাতির সৌন্দর্য যেমন অনন্য, তেমনি এর অবস্থানও আশ্চর্যজনক। এই দেশটি প্রায় ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত বিশাল সামুদ্রিক অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে। দেশটির পূর্বতম অংশ মিলেনিয়াম আইল্যান্ড প্রতিদিন পৃথিবীর প্রথম সূর্যোদয় দেখার স্থান হিসেবে পরিচিত।
তবে এটি সব সময় এমন ছিল না। ১৯৯৫ সালের আগে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা কিরিবাতির মাঝ দিয়ে চলে যেত, ফলে একই দেশের কিছু দ্বীপ একদিন এগিয়ে আরেক দল পিছিয়ে থাকত। প্রশাসনিক বিভ্রান্তি দূর করতে সরকার তারিখ রেখাকে পূর্ব দিকে সরিয়ে নেয়, তখন থেকেই পুরো দেশ একই দিন অনুসরণ করে এবং সূর্যোদয়ের প্রথম আলো তাদের হিসেবেই গণ্য হয়।
তবে প্রকৃতির এই সৌন্দর্য ও পরিচয়ের পাশাপাশি কিরিবাতি বহন করছে চরম দুর্বলতাও। এটি বিশ্বের সবচেয়ে কম উচ্চতার দেশগুলোর একটি, যার অনেক দ্বীপই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র দুই মিটার উঁচু। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে এবং গবেষকদের মতে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই কিরিবাতির একাধিক দ্বীপ পানির নিচে মিলিয়ে যেতে পারে। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোট টোং একবার বলেছিলেন- ‘কিরিবাতি প্রথম দেশ যে সূর্যের আলো দেখে, আর সম্ভবত প্রথম দেশ হবে, যা সমুদ্রের নিচে হারিয়ে যাবে।’ এই উক্তি জলবায়ু সংকটের ভয়াবহ বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে।
প্রবালদ্বীপে ঘেরা কিরিবাতির মানুষের জীবন সমুদ্রকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। ঐতিহ্যবাহী নৌকা তৈরি, নারকেল নির্ভর খাবার, সহজ-সরল জীবনযাপন এবং তাদের নিজস্ব নাচ ও সংগীত পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে ভিন্ন। পর্যটকরা এখানে গিয়ে পান নীল সমুদ্রের অদ্ভুত শান্তি, নির্জন দ্বীপের সৌন্দর্য এবং বিশ্বের প্রথম সকাল দেখার এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
অন্যদিকে জাপান কেন ‘উদীয়মান সূর্যের দেশ’? এর উত্তর ভূগোলে নয়, ইতিহাসে। যেহেতু জাপান চীনের পূর্বদিকে অবস্থিত, চীনারা বহু আগেই এটিকে ‘নিপ্পন’ বা ‘সূর্যের উৎসভূমি’ বলে ডাকত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি জাপানের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
কিরিবাতি বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের মুখোমুখি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে দেশটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। কিছু কিছু দ্বীপ ইতোমধ্যেই নিমজ্জিত হতে শুরু করেছে। এই কারণে কিরিবাতি জলবায়ু সচেতনতায় বিশ্বমঞ্চে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর কিরিবাতি শুধু একটি দ্বীপরাষ্ট্র নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে মানবজাতির টিকে থাকার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তারেক/
.jpg)
.jpg)
.jpg)