আমাদের নিত্যদিনের কথাবার্তায়, আলাপে কাউকে প্রতারক, অসৎ বা নেতিবাচক চিন্তার বোঝাতে অথবা ব্যঙ্গ করে প্রায়ই বলি ‘ও তো একটা ৪২০।’ এই সংখ্যাটি কীভাবে একজন মানুষের চরিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে গেল, তা আসলে বেশ আগ্রহ জাগানিয়া।
মূলত এর পেছনে রয়েছে উপমহাদেশের আইন, ইতিহাস এবং ভাষার সামাজিক ব্যবহার। ‘৪২০’ সংখ্যাটির উৎস ব্রিটিশ শাসনামলের ইন্ডিয়ান পেনাল কোড (Indian Penal Code বা IPC)। ১৮৬০ সালে প্রণীত এই দণ্ডবিধিতে বিভিন্ন অপরাধের জন্য আলাদা আলাদা ধারা বা সেকশন নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ধারা ৪২০ (Section 420) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ধারার শিরোনাম হলো- ‘Cheating and dishonestly inducing delivery of property’, অর্থাৎ প্রতারণার মাধ্যমে অসৎ উদ্দেশ্যে অন্যের সম্পত্তি বা অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।
আইনগতভাবে IPC-এর ৪২০ ধারা অনুযায়ী, কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে প্রতারণা করে, মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকে টাকা, সম্পত্তি বা মূল্যবান কিছু আদায় করে নেয়, তবে সে অপরাধী হিসেবে গণ্য হয়। এ অপরাধের শাস্তি হিসেবে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। ফলে আইন ও প্রশাসনের চোখে ৪২০ মানেই প্রতারণা এবং প্রতারক ব্যক্তি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি আইনি ধারার নম্বর কীভাবে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে চরিত্রগত অপবাদে পরিণত হলো? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সমাজে আইনের প্রভাব ও লোকজ ভাষার বিবর্তনের মধ্যে। ব্রিটিশ আমল থেকেই আদালত, পুলিশ এবং মামলা-মোকদ্দমা সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। সংবাদপত্রে, আদালতের রায় নিয়ে আলোচনায় কিংবা থানার ভাষায় ‘চার শ কুড়ি মামলা’ বা ‘৪২০ ধারায় গ্রেপ্তার’- এ শব্দগুলো নিয়মিত শোনা যেত। ধীরে ধীরে মানুষ বুঝে নেয়, ৪২০ মানে এমন একজন ব্যক্তি যে ঠকায়, ধোঁকা দেয় এবং বিশ্বাসভঙ্গ করে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ‘৪২০’ শব্দটি আইনি পরিভাষা ছাড়িয়ে কথ্য ভাষায় ঢুকে পড়ে। তখন আর কাউকে সত্যিই আইনের ৪২০ ধারায় অভিযুক্ত হতে হয় না; বরং কেউ যদি বন্ধুকে ঠকায়, ব্যবসায় অসততা করে বা চালাকি করে লাভবান হতে চায়, তাহলেই তাকে মজা করে কিংবা ব্যঙ্গ করে ‘৪২০’ বলা হয়। এভাবে সংখ্যাটি একটি প্রতীকে রূপ নেয়- প্রতারণা ও অসততার প্রতীক।
ভারত ও বাংলাদেশে চলচ্চিত্র, নাটক এবং সাহিত্যেরও এখানে বড় ভূমিকা রয়েছে। বহু হিন্দি ও বাংলা সিনেমা, নাটকে ‘৪২০’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে প্রতারক চরিত্র বোঝাতে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংখ্যার ব্যবহার মানুষের কাছে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও রসিকতাপূর্ণ। কাউকে সরাসরি ‘তুমি অসৎ’ বা ‘তুমি প্রতারক’ বললে তা আঘাতমূলক হতে পারে। কিন্তু ‘তুমি তো একটা ৪২০’ বললে কথাটা একই অর্থ বহন করলেও তা তুলনামূলকভাবে হালকা, ব্যঙ্গাত্মক এবং অনেক সময় হাস্যরসের মোড়কে বলা যায়। এ কারণেও সংখ্যাটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘৪২০’ কোনো রহস্যময় বা কুসংস্কারজাত সংখ্যা নয়। এর পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট একটি আইনি ধারা, ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং সমাজের ভাষাগত রূপান্তর। আইন থেকে লোকজ ভাষা, আর লোকজ ভাষা থেকে সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে এই সংখ্যা।
তারেক/
.jpg)
.jpg)
.jpg)