বাবাকে দেখতাম হঠাৎ করে বাইরে থেকে অচেনা লোক ধরে এনেছেন এক বেলা আহার করাবেন বলে। যাকে ধরে এনেছেন সে হয়তো অস্বস্তি বোধ করছেন। কিন্তু বাবা তো নাছোড়বান্দা। যাকে ধরে এনেছেন তাকে আহার করিয়েই ছাড়বেন তিনি। আমাদের এলাকায় বিশেষ করে শীত মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্ষেতের আলু তোলা ও অন্যান্য কাজের জন্য লোক আসেন। তাদের অনেকেরই থাকার জায়গা নেই। প্রচণ্ড শীতে তারা সড়কের পাশে বা বাজারের কোনো দোকানের বারান্দায় রাতটুকু পার করে থাকেন। খুব ভোরে হাটের নির্দিষ্ট একটা জায়গায় সব শ্রমিক একত্রিত হন। সেখান থেকেই মূলত শ্রমিকদের জমির মালিকরা তাদের জমিতে কাজ করার জন্য নিয়ে যান।
সে সময় আবার কিছু বাড়তি মানুষ রয়ে যান। তারা কাজ পান না। তাদেরই মূলত থাকার জায়গা থাকে না। তো আমার বাবা তাদেরই দুয়েকজনকে ধরে নিয়ে এসে বাড়িতে খাওয়াতেন। বাবা বলতেন, মানুষকে খাওয়ানোর মতো পূর্ণতা আর কিছুতেই নেই। তবে খাওয়াতে বসে তার একটা বিশেষত্ব থাকত। যাকে খাওয়াতেন তাকে পরিপূর্ণ তৃপ্তি সহকারে খাওয়াতেন। নিজের ভাগের অংশটুকু পর্যন্ত খাওয়াতে কার্পণ্য করতেন না। এভাবে চোখের সামনে মানুষ খাওয়ানোর দৃশ্যটা আমার মনে গেঁথে রয়েছে।
একদিন আমিও উৎসাহ বোধ করলাম বাড়িতে মানুষ ডেকে খাওয়াব। তখন ঢাকায় থাকি। বাসা দক্ষিণ বনশ্রী। প্রতি শুক্রবার দুপুরে খাওয়ানোর জন্য কিছু গরিব-দুঃখী মানুষকে দাওয়াত করি। গরুর মাংস আর ভাত রান্না করে তাদের জন্য অপেক্ষায় থাকি। জুমার নামাজ পড়েই আমার অপেক্ষার প্রহর শুরু হয়। প্রথম প্রথম দেখি দুপুরে মানুষজন আসছে না। এদিকে নিজেও দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষুধার্ত থাকতে থাকতে ধৈর্যহারা হয়ে গেলাম। না, কেউ আসে না। গরিব মানুষের না আসার সূত্রটি আমার বুঝতে অনেক সময়ের প্রয়োজন পড়ল। তবে তারা আসে শেষ বিকেলে। তাও আবার অল্পসংখ্যক। দেরিতে আসার কৈফিয়ত গরিব মানুষের কাছে জানতে চাইলাম। কেন তারা দুপুরের খাবার সময় আসতে পারেননি। অনেকে লজ্জায় এড়িয়ে যায় বিষয়টি। কেউ কেউ মুখ ফুটে বলতে থাকেন।
শুক্রবার তারা হাঁটলে মানুষের বাড়ি থেকে কিছু টাকা-পয়সা পান। তা দিয়ে তাদের বাড়িভাড়া আর খাবারের টাকা জোগাড় হয়। তাই এক বেলা খাওয়ার জন্য সময়টুকু অপচয় করলে তাদের চলে না। বাড়ি বাড়ি থেকে টাকা-পয়সা উঠিয়ে আসতে আসতেই তাদের বেলা শেষ হয়ে যায়। তাদের কথা শুনে আমি মনে বড় একটি ধাক্কা খেলাম। তারপর থেকে শুক্রবারের মানুষ খাওয়ানোর আয়োজনটা শনিবার করতে শুরু করলাম। তাতে কিছু মানুষ দেখতে পেলাম। তবে খাওয়াতে গিয়ে তাদের করুণ মুখ আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিতে লাগল। তারা যখন গরুর মাংস দিয়ে ভাত খায় তখন বাড়িতে থাকা অসুস্থ স্বামী বা ছেলেটির কথা মনে করে তাদের মুখটি করুণদশায় উপনীত হতো। কতদিন হলো তাদের মুখে হয়তো এক টুকরো গরুর মাংস তুলে দিতে পারেনি হতভাগ্য মা। তাদের সে ভারাক্রান্ত মুখের করুণ দৃশ্য দেখে টিফিন বাটি ভরে তাদের বাড়ির জন্যও খাবার দিয়ে দিতাম।
তারপর শহর থেকে যখন আবার গ্রামে চলে আসি। এখানে প্রচুর গরিব মানুষের দেখা পাই, যা ঢাকায় পাওয়া যেত না। কোনো ভিক্ষুক আমার বাসায় এলে না খাইয়ে যেতে দিতাম না। আমার রান্নাঘরের চৌকিতে বসিয়ে তাদের খাওয়ানো আর তাদের জীবনবৃত্তান্ত শুনতাম। অনেকেরই ছেলে আছে। অনেক কষ্ট করে তাদের বড় করেছেন। যেই না তাদের বিয়ে দিয়ে ঘরে বউ তুলে এনেছেন অমনি তাদের কপালটা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বাড়িতে বউ আসার পর তাদের কপালে আর ছেলের খাওয়া জুটত না। ছেলের বউ জ্বালাতন করতে থাকে। খেতে বসলে খোঁটা দেয়। বলে- আপনি শুধু ছেলেরটা খাবেন কেন। আপনার মেয়ে আছে, সেখানে যেতে পারেন না। ছেলের বউয়ের এ কথা বয়স্ক মা-বাবার আত্মসম্মানে লাগে। তারা না যেতে পারেন মেয়ের ঘরে আর না খেতে পারেন ছেলের ঘরে। তখন তারা সিদ্ধান্ত নেন প্রয়োজনে মানুষের দুয়ারে হাত পেতে খাবেন তারপরও ছেলে আর মেয়ের ওপর বোঝা হবেন না। এমন কথা শুনে মনটা আমার ভীষণ ভারী হয়ে যায় তখন। বলি যত দিন দরকার আমার এখানে এসে খাবেন। নাহ, তারা কেউ নিয়মিত আসেন না। এক এলাকায় সপ্তাহে একবারের বেশি তারা আসেন না। এটা কোনো ঘরের গেরস্ত পছন্দ করেন না। তাই অনেক দূর-দূরান্ত থেকেই তাদের জীবন ধারণের জন্য অন্ন জোটাতে হয়।
তারপর আসে একজন ফেরিওয়ালার কথা। একদিন আমার বাসা থেকে ১০ কিলোমিটার দূর দীঘিরপাড় থেকে একজন নারী এসেছেন কাপড় বিক্রি করতে। তার কাছ থেকে নারীদের কিছু কাপড় কিনে রাখলাম। কাপড়ের টাকা তার হাতে দিতেই দেখলাম তার মুখটা মলিন। তাকে বললাম, হাত-মুখ ধুয়ে দুপুরে আমাদের এখানে খেতে। এ কথা শুনেই সে অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। আমার কথাটি যেন তার বিশ্বাস হচ্ছে না। তাকে দ্বিতীয়বার বলাতে আমতা আমতা করে হাত ধুতে গেলেন। এ ফাঁকে তার জন্য খাবার দেওয়া হলো। খেতে খেতে তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সকাল থেকে সারা দিন তিনি না খাওয়া। যাও বেচাকেনা করেছেন তাও সামান্য। সে আয়টুকু দিয়ে তাদের বাড়িতে থাকা মা আর সন্তানদের জন্য আহার জোটাবেন। তাইতো দুপুরে ইচ্ছা থাকলেও হোটেলে খেতে পারেন না। তার স্বামী নেই। বিধবা হওয়ার পর দুটি বাচ্চা নিয়ে গরিব মায়ের কাছে গিয়ে উঠেছেন।
আরেক দিন ঠিক দুপুর বেলা। খেতে বসেছি। অমনি একজন পাটিওয়ালা এসেছেন আমার বাসায়। সে আবার হিন্দু। তার বাড়ি অন্য উপজেলায়। টঙ্গিবাড়ী উপজেলার আব্দুল্লাপুরে তার বাড়ি। তার কাছ থেকে একটা চিকন বেতের পাটি কিনে রেখেছি। এখন দুপুর বেলা। আমি খেতে বসেছি। আমি খাচ্ছি। তাকে কী খেতে দিই এ কথা মনে মনে ভাবছি। সে হিন্দু মানুষ, সে তো আর আমার বাসায় ভাত খাবে না। তাইতো হঠাৎ মনে পড়ল বাসায় পায়েস রান্না করা আছে। তাকে মুড়ি আর পায়েস খেতে দিলাম। তিনি না করলেন না। তৃপ্তি করে খেয়ে সন্তুষ্ট মনে ফিরে গেলেন।
সমাজের এসব অবহেলিত মানুষ নিয়ে আমাদের জীবন। তাদের অনাহারে রেখে আমাদের পেট পুড়ে খেলে সেটাতে তৃপ্তি আসতে পারে না। আমরা একই মা এবং বাবা থেকে এসেছি। আদম আর হাওয়ার সন্তানই জগৎজুড়ে। হিন্দু-নাপিত, মুচি, মুসলিম, জাত-অজাত সবই এক মা আর বাবার সন্তান আমরা। আমরা যদি এ কথাটি একবার ভাবতে পারি তাহলে এ জগৎ সংসারে কোনো পথশিশুর একবেলা উপোস থাকতে হবে না। কোনো ভিক্ষুক তার ঝুলিটা নিয়ে খালি হাতে যাবে না। সৃষ্টির অমোঘ এক সৃষ্টি তা হলো–মানুষ। আল্লাহপাক অতি যত্ন এবং আদর করে এ মনুষ্যজাত তৈরি করেছেন। কোনো মানুষকে আহার করালে আল্লাহপাক তাতে অনেক খুশি হন।
মিরাপাড়া রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ।
তারেক/
.jpg)
.jpg)
.jpg)