বসন্ত মানেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে শিমুল আর পলাশের আগুনরাঙা রূপ। ফাল্গুনের শুরু থেকেই প্রকৃতির ক্যানভাসে লাল রঙের একচ্ছত্র আধিপত্য দেখা যায়। কিন্তু এ গাঢ় রঙের ভিড়ে প্রকৃতিতে এমন কিছু ফুল ফোটে, যা আমাদের চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়। এমনই এক স্নিগ্ধতার নাম কাঞ্চন ফুল। লাল রঙের দাপটের মাঝে সাদা, গোলাপি বা হালকা বেগুনি রঙের কাঞ্চন চারপাশের পরিবেশে এক মায়াবী রূপ তৈরি করে।
ইদানীং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর সদরের হোতাপাড়া অংশের রোড ডিভাইডারে ফুটে থাকা অন্যান্য ফুলের মাঝে কাঞ্চন ফুল পথচারীদের মুগ্ধ করছে। যারা নিয়মিত এ পথে যাতায়াত করেন, তারা জানেন এ মহাসড়কে ধুলোবালি আর যানজটের ক্লান্তি কতটা বিরক্তিকর হতে পারে। কিন্তু রুক্ষ পিচঢালা পথের মাঝখানে ডিভাইডারের ওপর সারি সারি গাছে ফুটে থাকা কাঞ্চন ফুলগুলো যেন এক পসলা বৃষ্টির মতো কাজ করছে। বাসের জানালা দিয়ে অথবা মোটরবাইকে চলার পথে হঠাৎ এ ফুলের স্নিগ্ধতা দেখলে রাস্তার সব ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে যায়।
মহাসড়কের এ অপূর্ব দৃশ্য এখন আর শুধু পথচারীদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ফুলের ছবি এবং ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তা রীতিমতো ভাইরাল হয়েছে। অনেকেই মন্তব্য করছেন, ইটপাথরের শহরে এমন দৃশ্য চোখের জন্য পরম শান্তি। শুধু গাজীপুরের মহাসড়ক নয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনারের পাশেও এখন আপন মনে সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে এ কাঞ্চন ফুল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক আবহের সঙ্গে কাঞ্চনের এ স্নিগ্ধ রূপ এক অসাধারণ মাত্রা যোগ করেছে। স্নিগ্ধতা ছড়াচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে, পার্কে এবং রাস্তার ধারে।
কাঞ্চন বেশ কৌতূহলোদ্দীপক একটি গাছ। এর পাতাগুলো খুব অদ্ভুত আর আকর্ষণীয়। কাঞ্চনের পাতা দেখলে মনে হয় দুটি পাতা মাঝখান থেকে জোড়া লাগানো। দেখতে অনেকটা উটের পায়ের ছাপ বা প্রজাপতির ডানা মেলার মতো। এ পাতার গড়নের কারণেই গাছটি সহজে চেনা যায়। চমৎকার গড়নের কারণে এর বৈজ্ঞানিক নাম রাখা হয়েছে বাউহিনিয়া (Bauhinia)। ষোড়শ শতকের বিখ্যাত দুই যমজ ফরাসি উদ্ভিদবিজ্ঞানী জিন বাউহিন এবং গ্যাসপার্ড বাউহিনের নামানুসারে এ গাছের নামকরণ করা হয়েছে। জোড়া লাগানো পাতার মতোই এই দুই ভাইয়ের সম্পর্ক এবং বিজ্ঞানে তাদের অবদানকে সম্মান জানাতেই এ নাম দেওয়া হয়েছিল।
আমাদের দেশে মূলত কয়েক ধরনের কাঞ্চন ফুল বেশি দেখা যায়। এর মধ্যে সাদা কাঞ্চন, রক্ত কাঞ্চন এবং দেব কাঞ্চন অন্যতম। সাদা কাঞ্চনের পাপড়িগুলো ধবধবে সাদা হয়। অন্যদিকে রক্ত কাঞ্চন বা দেব কাঞ্চনের রং হালকা গোলাপি থেকে শুরু করে বেগুনি আভার হয়ে থাকে। বসন্তের শুরুতে যখন গাছের সব পাতা ঝরে যায়, তখন ন্যাড়া ডালে থোকা থোকা কাঞ্চন ফুল ফুটতে শুরু করে। নীল আকাশের পটভূমিতে এ ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয় যেন প্রকৃতির এক নিখুঁত চিত্রকর্ম। ফুলের পাপড়িগুলো বেশ নরম এবং এর মাঝখানে সুন্দর পুংকেশর থাকে, যা ভ্রমর আর মৌমাছিদের সহজেই আকর্ষণ করে।
গাজীপুর মহাসড়কের দৃশ্য আমাদের একটি বড় বিষয় মনে করিয়ে দেয়। পরিকল্পিতভাবে দেশি গাছ লাগালে আমাদের চারপাশ কতটা সুন্দর হতে পারে, এটি তারই প্রমাণ। নগর বা মহাসড়কের সৌন্দর্যবর্ধনে কাঞ্চনের মতো গাছ চমৎকার একটি বিকল্প। কাঞ্চন খুব কষ্টসহিষ্ণু একটি গাছ। মহাসড়কের ধুলোবালি, কালো ধোঁয়া এবং দূষণের মাঝেও এরা অনায়াসে টিকে থাকতে পারে। এটি খরা সহ্য করতে পারে এবং এর খুব বেশি যত্ন বা পানির প্রয়োজন হয় না। তাই রাস্তার ডিভাইডার, ফুটপাতের পাশ অথবা শহরের পার্কগুলোতে এ গাছ লাগানো খুবই পরিবেশবান্ধব একটি সিদ্ধান্ত। খুব বেশি যত্ন ছাড়াই এরা অনায়াসে বেড়ে ওঠে এবং রুক্ষ পরিবেশে প্রাণের সঞ্চার করে।
বসন্তের রাজত্ব হয়তো বরাবরের মতো শিমুল, পলাশ আর কৃষ্ণচূড়ার দখলেই থাকবে। বসন্তের গানে বা কবিতায় লাল রঙের এ ফুলগুলোই হয়তো বেশি জায়গা পাবে। কিন্তু যারা একটু নীরব, শান্ত আর স্নিগ্ধ সৌন্দর্য খোঁজেন, তাদের কাছে এ বসন্তে কাঞ্চনই হয়ে উঠেছে প্রধান আকর্ষণ। কংক্রিটের এ যান্ত্রিক শহরে রাস্তার ধারের কাঞ্চন ফুলগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সৌন্দর্য সবসময় তীব্র বা আকর্ষণীয় রঙের হতে হয় না। কখনো কখনো সাধারণ স্নিগ্ধতার মাঝেই লুকিয়ে থাকে সত্যিকারের মুগ্ধতা।
তারেক/
.jpg)
.jpg)