এবারের বইমেলা নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। এখন মানুষ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পেয়েছে। জুলাইয়ে যে অভ্যুত্থান হয়েছে, সেটাকে কেউ বলে স্বাধীনতা, কেউ বলে বিপ্লব। এই স্বাধীনতাকে আরও বলিষ্ঠ করতে হলে দরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। সবার অভিমত ব্যক্ত করার অধিকার থাকতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বইমেলায়ও প্রকাশ হতে হবে। বইমেলা নিয়েও কিছু বিতর্কের চেষ্টা করা হয়েছে। মেলায় কিছু দুর্ঘটনা ঘটানোর চেষ্টাও করা হয়েছে। সেই ঘটনাগুলো হলো নোংরামি ও স্বাধীনতার অপব্যবহার।
আমাদের বয়সের প্রজন্মের লেখকদের চাইতে বর্তমান সময়ের লেখকরা অনেক মেধাবী। আগের প্রজন্মের লেখকদের লেখা মূল্যায়নের একটা বড় সুযোগ ছিল। তাদের লেখা মূল্যায়নের জন্য যথাযথ সমালোচক ছিলেন। এখন যে সাহিত্য রচিত হচ্ছে তা মূল্যায়নের জন্য তেমন সমালোচক নেই। সমালোচনার দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার। আরও বেশি সমালোচনামূলক সাহিত্য হওয়া দরকার। তাহলে আমাদের সাহিত্য অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারবে। আমাদের লেখকরা সময়কে ধারণ করছে। লেখকরা আধুনিকতাকে ধারণ করছে। আমাদের আধুনিক সমাজ ও যুগের মননকে ধারণ করেই সাহিত্য এগিয়ে যাচ্ছে।
একজন লেখক যখন লেখেন, তখন তিনি অন্ধের মতো লিখেই যান। সেই লেখায় হয়তো কিছু অসঙ্গতি থাকতে পারে। সে কারণে বইয়ের সম্পাদনা খুবই প্রয়োজন। বইকে ভালো মানে নিতে হলে অবশ্যই সম্পাদনা প্রয়োজন। বই প্রকাশের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্পাদনা। সেই জায়গায় প্রকাশক কি অর্থ খরচ করতে পারেন না? ভালো সম্পাদনা না হলে ভালো বই হবে কীভাবে।
বাংলাভাষায় লেখকরা যে সাহিত্য রচনা করছেন সেটাই বিশ্বমানের সাহিত্য। আমার দেশে যে সমাজ ও নেতৃত্ব বিদ্যমান রয়েছে তার চেয়ে উন্নততর সমাজ তৈরি হবে, সে স্বপ্ন দেখতে পারি। কিন্তু এই সমাজ ও যুগ থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হতে পারি না। আমাদের যে সাহিত্য রচিত হয় তা সমাজ ও সময়কে কেন্দ্র করেই হয় এবং তা বিশ্বমানের সাহিত্য। ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্য তাদের দরিদ্র দেশের চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের সেই সাহিত্য বিশ্বমানের সাহিত্য হিসেবে ফুটে উঠেছে। আমরা যে সমাজে বসবাস করি, সেখানে বসে ইউরোপের সমাজের চিত্র আঁকতে পারি না। আমার মননকে যদি সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারি, তাই বিশ্বমানের সাহিত্য।
একজন লেখক কখনো পুরস্কারের আশায় লেখেন না। একজন লেখক তার চিন্তাচেতনা ও বোধকে প্রকাশ করার জন্য লেখেন। লেখককে যে প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি সম্মানিত করে, তারাই বেশি সম্মানিত হয়। বর্তমানে পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অনেক লেখক কোনো পুরস্কার না পেয়েও কীর্তিমান লেখক হয়ে আছেন। সুতরাং পুরস্কার কোনো লেখকের মানদণ্ড হতে পারে না।
লেখক: কথাসাহিত্যিক
অনুলিখন: সানজিদ সকাল