ঢাকা ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০, বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
Khaborer Kagoj

ভারতের লোকসভা নির্বাচন: নানা হিসাব-নিকাশ

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:৪৮ এএম
ভারতের লোকসভা নির্বাচন: নানা হিসাব-নিকাশ
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

গত বছর বিজেপির সঙ্গে নির্বাচনে লড়াই করার জন্য ২৬টি আঞ্চলিক দলের সঙ্গে কংগ্রেস ইন্ডিয়া জোট গঠন করেছিল। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা তখনই কংগ্রেসকে সতর্ক করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, জন্তু-জানোয়ারের সঙ্গেও সমঝোতা করা যায়। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিশ্বাস করা যায় না। মমতা নিজেই ঘোষণা করেছেন, তিনি জোটে আর থাকছেন না। তিনি একাই লড়বেন। তার এই সিদ্ধান্তে পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম-এর সাধারণ সম্পাদক মহ. সেলিম এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মমতা তো বিজেপি-আরএসএস থেকে কোনো দিন বের হতে পারবেন না। তাদের কাছে তার দায়বদ্ধতা বেশি। মমতার গোঁমা হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী বলেছেন, ভারতের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় কোথাও রাহুল গান্ধীর যাত্রাকে বাধা দেওয়া হয়নি। একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই তাকে বাধা দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল নেত্রী পাল্টা আক্রমণ করে বলেছেন, রাহুল হলো বসন্তের কোকিল। এই বিতর্কের মধ্যে রাহুল পশ্চিমবঙ্গ ছাড়ার আগে মন্তব্য করেছেন, বাংলার মানুষের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি, তাতে আমি আপ্লুত। নির্বাচন এলে বিভিন্ন দল বদল হয়। এবারও তা থেকে পিছিয়ে থাকছে না গোটা দেশ।

গত শুক্রবার একটি ইংরেজি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিয়ে ভারতের নির্বাচন বিশেষজ্ঞ প্রশান্ত কিশোর মন্তব্য করেছেন, রামমন্দিরে বিজেপি আরএসএস-এর খুব একটা লাভ হবে না। এবার দেখা যাক পরিস্থিতি কোন দিকে যায়। ২০২৪ সালের ভারতের লোকসভা নির্বাচন যেকোনো সময় ঘোষণা হতে পারে। কারণ নিয়ম অনুযায়ী সংসদের শেষ অধিবেশন হয়ে গেছে। সম্ভবত এ মাসের মধ্যেই লোকসভা ভোটে নির্ঘণ্ট ঘোষিত হয়ে যাবে। তাই রাজনৈতিক দলগুলো পুরোদমে একে অন্যের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু করে দিয়েছে। তারা যে ভাষা একে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে আরম্ভ করেছে তা সংবাদপত্রে লেখা যায় না, টেলিভিশনে দেখানো যায় না। যত দিন যাচ্ছে তাদের এই প্রবণতা বাড়তে দেখা যাচ্ছে যথাসম্ভব বেশি বেশি করে। আশা ছিল এবারে হয়তো কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি দলকে বিরোধীরা একটা উচিতশিক্ষা দিলেও দিতে পারবে। গত বছরের আগস্টে ২৬টি অবিজেপি দলকে নিয়ে ইন্ডিয়া জোট নামে একটি জোট গঠিত হয়েছে এবং সেই জোটে যোগ দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তখনই দেশের রাজনীতি-সচেতন মানুষ, যারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অতীত জানেন, তারা এই জোটের বিষয়ে কিছুটা হলেও সন্দিহান হয়ে পড়েন। কারণ তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না।

১৯৯৭ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপির সহযোগী হয়ে পড়েন। তিনি অটল বিহারি বাজপেয়ির নেতৃত্বে বিজেপি সরকারে যোগ দেন। তারপর থেকেই তার সঙ্গে বিজেপির সখ্য। তিনি মুখে গণতন্ত্রের কথা বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেন, অথচ একই সঙ্গে তাকে বিজেপির বন্ধু হিসেবেও দেখা যায়, যারা ধর্মনিপেক্ষতায় বিশ্বাস করে না, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে আস্থা রাখে না, গণতন্ত্রে যাদের বিন্দুমাত্র আস্থা নেই।

আসলে তিনি কী- এ নিয়ে রাজনীতি-সচেতন মানুষের মধ্যে একটা প্রশ্ন তখন থেকেই  উঠেছে, যখন তিনি বিজেপির পরিচালনায় সরকারে অবধি গিয়েছিলেন। অনেকেই অবশ্য তারপরও আশা করেছিলেন যে দিনে দিনে হয়তো মমতার শিক্ষা হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় তা হয়নি। ১৯৯৯ সালে তিনি দিল্লিতে আরএসএসের অফিস উদ্বোধন করতে গিয়ে বলেন যে, আরএসএস একটি দক্ষ নীতি ও নিয়মনিষ্ঠ দল। তারা নিয়ম মেনে চলে। সেই থেকেই তার সঙ্গে বিজেপি ও আরএসএসের ঘনিষ্ঠতা। তিনি কীভাবে বিজেপি তথা আরএসএসের কাছাকাছি মানুষ হলেন, আসুন সেই ইতিহাস একটু দেখা যাক। ১৯৯৭ সালে বিজেপির কাছাকাছি আসার একদম গোড়ার পর্বে তার সঙ্গে একটি দীর্ঘ বৈঠক হয় বিজেপির তৎকালীন বলিষ্ঠ নেতা, পরবর্তীকালে ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার স্বয়ং লালকৃষ্ণ আদভানির। আদভানির সঙ্গে তার যোগাযোগ করিয়ে দেন দিল্লির একজন বাঙালি সাংবাদিক। স্বভাবতই এই পর্বের পরে তার সঙ্গে বিজেপির ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ৯৭, ৯৮ ও ৯৯ সালের তিনটি নির্বাচনে বিজেপির তিনি সহযোগী ছিলেন এবং পুরস্কারস্বরূপ তিনি এনডিএর মন্ত্রী পদে আসীন হন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে আসলে কী চান, তা সম্ভবত তিনি নিজেও জানেন না। যেমন জানেন না ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মোদি নিজেও গত ১০ বছরে যখন যেভাবে পেরেছেন ভারতের মানুষকে কেবল চমকে দিতেই চেয়েছেন। প্রতিটি পদক্ষেপেই তিনি যা যা বলে প্রধানমন্ত্রিত্বের জায়গায় পৌঁছেছিলেন তাকে এড়িয়ে গেছেন। মানুষের রুটি-রুজি নিয়ে তার বা তার দলের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। তার সরকারের গত দুটি পর্বেই  তিনি ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে এসে সব কথা বলেছেন, কেবল নিজের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির কথা ভুলেও বলেননি। সেসব কথা সম্ভবত তার মনেও পড়েনি। না পড়াই স্বাভাবিক, কারণ সেসব যে স্রেফ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি মাত্র, যা রক্ষা করা, না করায় কিছু যায় আসে না।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় এসেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ভয় দেখিয়ে বিশ্বাস করাতে চাইছেন যে, তাদের একমাত্র রক্ষা করতে, নিরাপত্তা দিতে পারেন কেবল তিনিই, সিপিআইএম বা কংগ্রেস পারে না। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি সংখ্যালঘুদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার কাজটাই কেবল করে চলেছেন। সম্প্রতিকালে দেখা যাচ্ছে, মমতা এবং তার দল প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে সংখ্যালঘুদের মধ্যে ব্যাপকভাবে অর্থ বিলি করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। কেন এই অর্থ বিলি করা হচ্ছে, এ নিয়ে সিপিআইএম নেতা মহম্মদ সেলিম একটি স্পষ্ট অভিযোগ তুলেছেন। তার বক্তব্য, মমতা এই টাকা বিলি করছেন ভোট কেনার জন্য। তিনি নিজের উদ্দেশ্য সিদ্ধির পথে গত এক বছরে অনেক দূর এগিয়েও গেছেন। বাংলাদেশের সরকারের তার ঘনিষ্ঠতা নেই বটে, তবে জামায়াতের সঙ্গে তার দলের আছে। জামায়াতের সঙ্গে তার দলের এই যোগাযোগের পেছনে আছেন সেই সব ব্যক্তি, যারা একদা তসলিমা নাসরিনকে দেশছাড়া করতে এবং তাকে হত্যা করতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। তখন পশ্চিমবঙ্গের সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও তার দল। বুদ্ধবাবু তখন রাজ্যকে সেই আশু বিপদ ও সেই সঙ্গে দাঙ্গার হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন সামরিক বাহিনী নামিয়ে।

তিনটি কর্মসূচি নিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল। বিজেপির সর্বভারতীয় নেতৃত্বে যিনি মাথায় ছিলেন, যিনি দল ও সরকার পরিচালনার নেপথ্যে ছিলেন, সেই লালকৃষ্ণ আদভানি, তার বয়স এখন ৯১ বছর। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, বিজেপির মূলনীতি হবে তিনটি: অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি এবং ভারতের সংবিধান থেকে ৩৭০ ধারা বিলোপ। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি মানে সারা দেশে সব সম্প্রদায়ের জন্য একই আইন প্রযোজ্য হওয়া এবং সংসদের বর্তমান অধিবেশনে না হলেও কেন্দ্ৰীয় সরকার সম্ভবত আগামী অধিবেশনে এই আইন বিল করে পাস করিয়ে নেবে। এটা তাদের দায়। এ কাজ তারা করবেই। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রামমূর্তি উদ্বোধনের পর সংসদে দেশের সংবিধানের রক্ষক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংসদের দরজায় দাঁড়িয়ে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি তুলেছেন এবং বাকি বিজেপি সদস্যরাও তাকে অনুসরণ করে ওই ধ্বনি তুলেছেন। এটা কখনো ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ কল্পনা করতে পারেন না। বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য গত বছর আগস্টে ভারতের ২৬টি অবিজেপি রাজনৈতিক দল ইন্ডিয়া জোট গঠন করেছিল। 

এই জোটে এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও আছেন। স্বভাবতই এটা তার কাছে বিব্রতকর অবস্থা। এই জোট যদি কার্যকর হয় তাহলেই সেটা বিজেপির পক্ষে ভালো হবে না। একই সঙ্গে সেটা মমতার পক্ষেও মন্দই হবে। অন্তত রাজ্যে এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যা অবস্থা। তখনই আন্দাজ করেছিলাম মমতার পক্ষে বিজেপি-বিরোধিতা খুব একটা সম্ভব নয়। কারণ, তার এ ক্ষেত্রে অনেক পিছুটান আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। যেদিন রামমন্দির উদ্বোধন হলো, তারপরের দিন সকালেই কলকাতায় আরএসএসের কেশব ভবনে গিয়ে বৈঠক করে এসেছেন মমতা। পশ্চিমবঙ্গ বরাবরই ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শে বিশ্বাসী। কীভাবে সে আদর্শ রক্ষা করা যায় তা নিয়ে কর্মসূচি না নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যতম প্রধান জোট-শরিক কংগ্রেসকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিতে শুরু করেছেন। এই লেখা যখন লিখছি তখনো এই গালাগাল পর্ব চলছে। গত শুক্রবার যখন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী তার ন্যায়যাত্রা নিয়ে রাজ্যে প্রবেশ করেন, তখন শুধু গালাগাল নয়, মমতার মুক্ত দল তার গাড়ির কাচও ভেঙে দিয়েছে। কেন এই আক্রমণ? না রাহুলের কংগ্রেস সিপিআইএমের সঙ্গে জোটে আছে এবং থাকবে। আসলে বিজেপি যেমন কংগ্রেসমুক্ত দেশ গড়তে চায়, মমতাও চান কংগ্রেস ও সিপিআইএমমুক্ত রাজ্য। এটাই মরিয়া হয়ে ওঠা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একমাত্র এজেন্ডা। 

জানি না এ ব্যাপারে তিনি কতটা সফল হতে পারবেন। এর উত্তর ভবিষ্যৎই দিতে পারবে।

নির্বাচনের আগে আরএসএস এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে কায়দায় কাজ করছেন, আমরা জানি না তার পরিণাম কী হতে চলেছে। আরএসএস যে কায়দায় কংগ্রেসমুক্ত ভারত চায়, মমতাও তাই চাইছেন। অথচ তিনি ভুলে যাচ্ছেন রাজ্যে তিনি যে ক্ষমতায় এসেছেন সেটাও তার দলের একার ক্ষমতায় নয়। সেখানেও তাকে কংগ্রেসের হাতই ধরতে হয়েছিল। এই অকৃতজ্ঞতাই মমতা এবং তার দলের অবলম্বন।

আসলে মমতার উত্থানের পেছনে হাত ছিল প্রধানত বিজেপি তথা আরএসএসের এবং আমেরিকার তরফে সিআইএর। সিআইএর সাউথ এশিয়ার এই অঞ্চলে যিনি দায়িত্বে ছিলেন, তিনি হলেন ন্যান্সি পাওয়েল। তিনি এ ব্যাপারে ব্যাপক সাহায্য করেন। মমতার আসল দায়বদ্ধতা তাই আরএসএস তথা বিজেপির কাছে। তিনি চান দিল্লিতে বিজেপি থাকুক আর রাজ্যে তিনি এবং তার দলবল। এ জন্য কংগ্রেসের সব রকম বিরোধিতা তাকে করতেই হবে। অনেক প্রশ্ন এ ক্ষেত্রে জড়িয়ে আছে। এসব প্রশ্নের উত্তর দেবেন ভোটাররা। কীভাবে দেবেন, কোন চেহারায় দেবেন, সেটা অদূর ভবিষ্যৎই বলে দেবে।

লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক

ডায়াবেটিসের ওপর নজর দিন

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:৫০ এএম
ডায়াবেটিসের ওপর নজর দিন
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

বেশি দিন হয়নি বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে কোভিড-১৯ তথা করোনা স্বাস্থ্য ও আর্থসামাজিক নানাবিধ সর্বনাশ সাধনের কারণ ছিল, এমনকি ডেঙ্গু এখনো আতঙ্কের পর্যায়ে রয়েছে। করোনা সংক্রামক রোগ। একে জয় করার প্রয়াস জোরেশোরে চলার পরও এখনো নানান পদ-পদবি নিয়ে বিশ্বের কোথাও না কোথাও আছে। ডেঙ্গু গিয়েও যাচ্ছে না। ধীরে ধীরে করোনা, ডেঙ্গু হয়তো চলে যাবে, কিন্তু ডায়াবেটিস নামের অসংক্রামক ব্যাধিটি হাজার হাজার বছর ধরে অনিরাময়যোগ্য থেকেই গেল। গত শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ডায়াবেটিস মহামারি হিসেবে গজেন্দ্রগামী। বাংলাদেশে নীরব ঘাতক ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ-প্রয়াসে জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম (১৯১১-৮৯) এবং তার হাতে গড়া বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি এখনো প্রবাদতুল্য এবং মহীরুহ প্রতিষ্ঠান। ২৮ ফেব্রুয়ারি ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৫৬ সাল অর্থাৎ ৬৮ বছর আগে জাতীয় অধ্যাপক ইব্রাহিমের স্বপ্ন-পরিকল্পনায় এর যাত্রা শুরু। প্রতিষ্ঠা দিবসকে ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। 

গ্রিক ক্রিয়াপদ ডায়াবাইনেইন থেকে ডায়াবেটিক শব্দের উৎপত্তি। মধ্য যুগের মুসলিম দার্শনিক চিকিৎসাবিদ ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭) ১০২৫ সালে সমাপ্ত তার ১৭ খণ্ডের চিকিৎসা বিশ্বকোষ ‘ক্যানন অব মেডিসিন’-এ সর্বপ্রথম ‘বহুমূত্র, অধিক ক্ষুধা এবং যৌনশক্তির ক্রমনাশক’ ডায়াবেটিক রোগের স্বভাব চরিত্র বর্ণনা করেন। ডায়াবেটিক গ্যাংগ্রিনের কথাও লিখেছেন তিনি। ইবনে সিনা লিউপিন বা নয়নতারা ফুল, ট্রিগোনেলা আর জেডোয়ারির বিজ সমন্বয়ে তৈরি ভেষজ ওষুধ দ্বারা রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের উপায়ও নির্দেশ করেছিলেন, যা আধুনিক চিকিৎসা গবেষণায়ও কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।   

রক্তে শর্করার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে গিয়ে বেশি দিন ধরে থাকলে ডায়াবেটিস রোগ দেখা দেয়। সাধারণত ডায়াবেটিস বংশগত কারণে ও পরিবেশের প্রভাবে হয়। কখনো কখনো অন্যান্য রোগের ফলেও হয়ে থাকে। এ রোগ সব লোকেরই হতে পারে। ডায়াবেটিস একবার হলে আর সারে না। এটা সব সময়ের এবং আজীবনের রোগ। তবে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা গ্রহণ করে এ রোগকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব হয়। অতিরিক্ত প্রস্রাব, অত্যধিক পিপাসা, বেশি ক্ষুধা, দুর্বল বোধ করা এবং কেটে-ছিঁড়ে গেলে ক্ষত তাড়াতাড়ি না শুকানো হচ্ছে এ রোগের সাধারণ লক্ষণ।

যাদের বংশে রক্ত-সম্পর্কযুক্ত আত্মীয়স্বজনের ডায়াবেটিস আছে, যাদের ওজন খুব বেশি, যাদের বয়স ৪০-এর ওপর এবং যারা শরীর চর্চা করেন না, গাড়িতে চড়েন এবং বসে থেকে অফিসের কাজকর্মে ব্যস্ত থাকেন, তাদের ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অত্যধিক চিন্তাভাবনা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, আঘাত, সংক্রামক রোগ, অস্ত্রোপচার, অসম খাবার, গর্ভাবস্থা এবং ওজন বেশি বেড়ে গেলে এ রোগ বাড়াতে সাহায্য করে। এগুলোর প্রতি দৃষ্টি রেখে প্রথম থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করা যায়। ডায়াবেটিস প্রধানত দুই প্রকারের- (ক) ইনসুলিন নির্ভরশীল এবং (খ) ইনসুলিন নিরপেক্ষ। ইনসুলিন নির্ভরশীল রোগীদের ইনসুলিনের অভাবের জন্য ইনসুলিন ইনজেকশন নিতে হয়। ইনসুলিন নিরপেক্ষ রোগীদের দেহে কিছু পরিমাণ ইনসুলিন থাকে। তবে চাহিদার প্রয়োজনে তা যথেষ্ট নয় বা শরীর ইনসুলিন ব্যবহার করতে পারে না। এসব রোগীর খাদ্য নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনে শর্করা কমানোর বড়ি সেবন করতে হয়। 

ডায়াবেটিস ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগ নয়। বেশি মিষ্টি খেলে ডায়াবেটিস হয়, এ ধারণা ঠিক নয়। খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা এবং ওষুধ এ রোগ নিয়ন্ত্রণের উপায়। খাদ্যের গুণগত মানের দিকে নজর রেখে পরিমাণমতো খাদ্য নিয়মিতভাবে গ্রহণ, জীবনের সব ক্ষেত্রে নিয়মকানুন বা শৃঙ্খলা মেনে অর্থাৎ কাজে-কর্মে, আহারে-বিহারে, চলাফেরায়, এমনকি বিশ্রামে ও নিদ্রায়, শৃঙ্খলা মেনে চলা দরকার। নিয়ম-শৃঙ্খলাই ডায়াবেটিস রোগীর জীবনকাঠি। ডায়াবেটিস রোগীকে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে রোগ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শমতো খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয়। রোগ সম্বন্ধে ব্যাপক শিক্ষা ছাড়া ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসায় আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না। তবে ডায়াবেটিস বিষয়ে শিক্ষা কেবল রোগীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। একই সঙ্গে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধব এবং ডাক্তার ও নার্সদের শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। রোগী যদি চিকিৎসকের সঙ্গে সহযোগিতা করে তার উপদেশ ও নির্দেশ ভালোভাবে মেনে চলেন এবং রোগ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা যথাযথভাবে গ্রহণ করেন, তবে সুখী, কর্মঠ ও দীর্ঘজীবন লাভ করতে পারেন। 

বাংলাদেশে ডায়াবেটিস চিকিৎসা আন্দোলনের পথিকৃৎ প্রাণপুরুষ জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম ১৯৫৬ সালে সেগুনবাগিচায় নিজের বাসভবনের আঙিনায় ছোট টিনের ঘরে দেশের ডায়াবেটিক চিকিৎসার যে উদ্বোধন ঘটিয়েছিলেন, আজ তার সেই প্রতিষ্ঠান, জাতির গর্বের প্রতীক ‘বারডেম’। বারডেম এশীয় প্রশান্ত অঞ্চলে ডায়াবেটিস চিকিৎসার মডেল বা সেরা কেন্দ্র এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৮২ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানটিকে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ এবং গবেষণার ক্ষেত্রে তাদের একান্ত সেরা সহযোগী সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি, সম্মান ও সমীহ করে আসছে। অনেক মেজর রোগ থাকতে এ রকম একটা মাইনর রোগ নিয়ে তিনি আলাদা চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করতে চান কেন- সে সময় প্রায়শ এ ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হলে ডা. ইব্রাহিম বলতেন, ‘রোগটা মোটেই মাইনর নয়। কারও যেদিন ডায়াবেটিস হবে সেদিনই বুঝতে হবে যে, ওই লোকটা অন্ধ হয়ে যাবে, কিংবা প্যারালাইসিস হয়ে যেতে পারে বা তার হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। 

যদি যথারীতি চিকিৎসা ও পরিচর্যার ভেতর একে রাখা যায়, তাহলে আজীবন সে সুস্থ থাকবে। রোগীর হয়তো ৩০-৪০ বছর বয়স- ১০ বছরের মধ্যেই তার সবকিছু অকেজো হয়ে যাবে, যথারীতি চিকিৎসা ও পরিচর্যা করলে এবং নিয়ম মেনে চললে সে ৬০ বছর পর্যন্ত সুস্থ থাকবে এবং প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে।’ এ প্রসঙ্গে উপমা দিয়ে তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘আমরা গাড়ি বিকল হলে তবে গ্যারেজে সারাতে আনি, এটা বোকামি, সময় থাকতে যদি নিয়মিত মেইনটেন বা চেকআপ করানো হতো তাহলে হয়তো গাড়ি গ্যারেজে আনার প্রয়োজনই পড়ত না।’ তিনি ব্রত গ্রহণ করেন ‘দেশের কোনো ডায়াবেটিস রোগীকে বিনা চিকিৎসায় কর্মহীন হয়ে অসহায়ভাবে করুণ পরিণতির দিকে যেতে দেওয়া যাবে না। চিকিৎসা ব্যয়বহনের ভার নিয়ে হলেও সবাইকে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকবে।’ তার এ মিশন ও ভিশন-এর পতাকা তারই গড়া বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস) দৃঢ় প্রত্যয়ে অত্যন্ত সযত্নে বহন করে চলছে। 

বারডেমে নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা এখন ৪ লাখের বেশি, প্রতিদিন ৩ হাজারের বেশি (এর মধ্যে ৭৫ থেকে ১০০ জন নতুন) রোগী চিকিৎসাসেবার জন্য এখানে আসে। দেশের প্রায় সব জেলায় বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অধিভুক্ত শাখা রয়েছে, যেখানে স্থানীয়ভাবে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন অগণিত ডায়াবেটিস রোগী। সরকারের জনস্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির অন্যতম সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাডাস। বাংলাদেশে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রথম, প্রধান ও অন্যতম সফল নিদর্শন হলো বাডাসের উন্নয়ন কার্যক্রম। উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সরকার সমিতির প্রধান অবকাঠামো নির্মাণে অর্থায়ন করেছে আর সমিতির নিজস্ব উদ্যোগে সেই অবকাঠামোয় তুলে ধরেছে স্বাস্থ্যসেবার ডালি। বাডাস দাতা সংস্থার  সাহায্যনির্ভর না হয়ে আয়বর্ধক নানান কর্মসূচি গ্রহণ করে ‘ক্রস ফাইন্যান্সিং’-এর মাধ্যমে স্বয়ম্ভরতা অর্জনে প্রয়াসী, প্রত্যাশী। ডায়াবেটিসের মতো মহামারি নিয়ন্ত্রণে মহতী উদ্যোগের মেলবন্ধন সুস্থ দেশ ও জাতি নির্মাণের দ্বারা জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি সুনিশ্চিত হবে, সন্দেহ নেই।   

লেখক: সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির ন্যাশনাল কাউন্সিল সদস্য

সুদানের জনগণের দুর্দশা উপেক্ষা করা উচিত নয়

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:৪৬ এএম
সুদানের জনগণের দুর্দশা উপেক্ষা করা উচিত নয়
ড. মজিদ রাফিজাদেহ

সুদানের সংঘাত প্রায় ১০ মাস হতে চলল, যা ভয়ানক মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। দেশের অভ্যন্তরে এবং প্রতিবেশী দেশের লাখ লাখ মানুষের ওপর গভীর দুর্ভোগ বয়ে নিয়ে এসেছে। এই যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া বিশেষ করে নারী ও শিশুদের সংকটাপন্ন করে তুলেছে। সুদানের দুর্দশা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের দুর্দশা দূর করার জন্য সমন্বিত আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার দাবি রাখে। 

সুদানে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শিশু স্থানচ্যুতি সংকটের কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সুদানে নিয়োজিত কেয়ারের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর মেরি ডেভিড বলেছেন, ‘জীবনহানি, ব্যাপক স্থানচ্যুতি, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, ক্ষুধা, কলেরা সবই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।’ সংঘাত আক্রান্ত এলাকায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ হাসপাতাল অকেজো হয়ে পড়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় আরও মনোযোগ এবং তহবিল দরকার।  

ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের তথ্যমতে, সুদানে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১০.৭ মিলিয়ন মানুষ, যার মধ্যে ৯ মিলিয়ন দেশের মধ্যেই রয়েছেন। এই সংস্থাটি অবিলম্বে মানবিক সাহায্য বাড়াতে এবং বাস্তুচ্যুতি সংকট মোকাবিলায় সমন্বিতভাবে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার অনুরোধ করেছে। বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে ১.৭ মিলিয়ন প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় চেয়েছে, যাদের অধিকাংশই (৬২ শতাংশ) সুদানি।

বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে চাদ ৩৭ শতাংশ, দক্ষিণ সুদান ৩০ শতাংশ এবং মিসরে ২৪ শতাংশ রয়েছে। এ ছাড়া ইথিওপিয়া, লিবিয়া এবং মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র অবশিষ্ট শরণার্থীদের বহন করছে। এই ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি গভীর সমস্যায় জর্জরিত অঞ্চলে মানবিক চাহিদার বিশেষ প্রয়োজন। 

ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের মহাপরিচালক অ্যামি পোপ বলেছেন, ‘বিশ্বে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত প্রতি আটজনের মধ্যে একজন সুদানে রয়েছে।’ তিনি খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্যানিটেশন ঘাটতিসহ বাস্তুচ্যুত মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদাগুলো তুলে ধরেন। এর কারণে তাদের রোগ, অপুষ্টি এবং সহিংসতার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। চরম মানবিক পরিস্থিতিতেও তাদের চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারে না। লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত লোকের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া উচিত না।  

সুদানে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সাধারণ নাগরিকদের মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং বিদ্যুৎ ও পানির মতো প্রয়োজনীয় উপযোগী ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে সৃষ্ট ঘাটতি শুধু রোগের প্রাদুর্ভাব, ক্ষুধা এবং অপুষ্টিই বৃদ্ধি করেনি; বরং যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা আরও বেড়ে গেছে। নারী ও মেয়েরা চলমান বিশৃঙ্খলায় ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে। এর জন্য মানবিক হস্তক্ষেপের জরুরি প্রয়োজন। 

দক্ষিণ দারফুর রাজ্যের নিয়ালা শহরের ২০ বছর বয়সী এক নারী মানাল অ্যাডাম ইউসিফ জাতিসংঘকে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত আমাদের বাড়ি এবং আশপাশের অন্য সব বাড়িতে ডাকাতি হয়। আমার পরিবারের অন্যদের জন্য খুব ভয় হচ্ছে। আমরা যে জামাকাপড় পরা অবস্থায় ছিলাম, তা নিয়েই পালিয়ে এসেছি।’ শীতকালের কারণে অনেক রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, তার ছেলে এবং অন্য অনেক শিশু অসুস্থ। ইউসিফ তার আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি আরও বলেন, ‌‘আমার কাছে (আমার ছেলেকে) হাসপাতালে নেওয়ার মতো টাকা নেই। আমি আশা করি যুদ্ধ অচিরেই বন্ধ হবে। দেশে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা থাকবে, যাতে আমরা আমাদের বাড়ি ও পরিবারের কেছে ফিরে যেতে পারি।’

আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে অবিলম্বে টেকসই সহায়তা প্রদান করা দরকার। বাস্তুচ্যুতদের চাহিদা মেটাতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা সরবরাহ এবং আশ্রয়সহ জরুরি ত্রাণ সরবরাহ করতে হবে। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলোয় জনগণের প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে।  

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নারী ও মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বাস্তুচ্যুত শিশুরা যাতে শিক্ষার সুযোগ পায় তা নিশ্চিত করার জন্য অস্থায়ী শিক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত।  

সংঘাতের অবসান ঘটাতে জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং আলোচনা দরকার। সুদানের ভয়াবহ সংঘাতের সুদূরপ্রসারী প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে ব্যাপকভাবে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ব্যাপকভাবে সমন্বিত সহযোগিতা জরুরি প্রয়োজন।

লেখক: আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী
আরব নিউজ থেকে সংক্ষেপিত: সানজিদ সকাল

সামান্য কারণেই হত্যার মতো অপরাধ কেন?

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:৪৪ এএম
সামান্য কারণেই হত্যার মতো অপরাধ কেন?
ফারিশতা সিদ্দিকী

‘সিগারেট কেনার ৫০ টাকা না দেওয়ায় বন্ধুকে হত্যা’, ‘নোয়াখালীতে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে যুবক খুন’- এগুলো দেশে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক সময়ের দুটি খবর। কাউকে হত্যা করার পেছনে মোটামুটি শক্ত কোনো কারণ থাকতে হয় বলেই আমরা দেখে এসেছি। কিন্তু এই খবরগুলো দেখে মনে হচ্ছে, বর্তমান সময়ে কাউকে মেরে ফেলার জন্য সাহস আর ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট। আমরা যত বেশি সভ্যতার দিকে যাচ্ছি আমাদের মানবিক গুণাবলি ততই লোপ পাচ্ছে। হত্যা, ধর্ষণ, গুম, চুরি, ছিনতাই- এসব আমাদের দৈনন্দিন জীবনের দেখা ও শোনা ঘটনা। আমাদের সমাজব্যবস্থা যত এগোচ্ছে, আমাদের মানসিক অস্থিরতা ততই বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর অপরাধমূলক কিছু ঘটনা যেন আমাদের তারই ইঙ্গিত দেয়।  

গত বছর রাজধানীর কদমতলীর মুরাদপুর এলাকায় এক নারী খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে নিজের মা, বাবা ও ছোট বোনকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছে। আর সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই ঘটনার পর হত্যাকারী নিজেই ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা বোধহীন বা অসুস্থ মানসিকতা লক্ষ করি। 

আরেকটি ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গেছে গত বছরের সেপ্টেম্বরে। মোহাম্মদপুরে যখন আমরা দেখেছি কীভাবে হাত-পা বেঁধে ঝুলিয়ে নির্যাতন করে, হাত পায়ের গোড়ালি কেটে তার ভিডিও ধারণ করে সেটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের বর্বরতার প্রমাণ দিয়েছে একদল সন্ত্রাসী। 

প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে, এই ঘটনাগুলো বারবার কেন ঘটছে? এটার পেছনে বেশ কিছু কারণ আছে যা দৃশ্যমান আবার একই সঙ্গে অদৃশ্যমান। দৃশ্যমান একটি বড় সমস্যা হলো, আমরা এখন অতিমাত্রায় আধুনিক এবং শিল্পায়নের শিকার। অবশ্য এখানে শিকার না বললেও চলবে, কারণ এমন সমাজ সৃষ্টির পেছনে আমরাই আছি। আমরা বর্তমানে সনাতন সমাজব্যবস্থা থেকে নগরায়ণ, শিল্পায়ন, আধুনিক সমাজব্যবস্থার এমন স্তরে আছি যেখানে লোভ-লালসা, হিংসা, ঘৃণা ও বিদ্বেষকে কেন্দ্র করে সব সংঘাত তৈরি হচ্ছে। ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি আমাদের সমাজে অনেকাংশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নেতিবাচক প্রভাবের ফলে মানুষ নানান রকম অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। 

অতিরিক্ত আধুনিকতার কারণে জাতি হিসেবে আমরা সংস্কৃতিবিমুখ হয়ে যাচ্ছি। ফলে আমরা আমাদের নৈতিকতা এবং সামাজিক মূল্যবোধ থেকে আজ এত দূরে সরে এসেছি যে, মানুষ হত্যা করে সেই ভিডিও আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের বীরত্ব জাহির করছি। মাদক সেবনের আরেকটি ফল হলো কিশোর গ্যাং কালচার তৈরি হওয়া। সব সমাজেই এই গ্যাং কালচারের প্রবণতা আছে। যুবসমাজ অতিরিক্ত মাত্রায় এই নেশায় আসক্ত। শুধু ঢাকা নয়, অন্যান্য শহরেও এই কিশোর গ্যাং কালচার গড়ে উঠেছে। এই গ্রুপগুলো বিভিন্ন সময়ে কারণে-অকারণে ধর্ষণ, মাদক সেবন, হত্যাকাণ্ডের মতো অপকর্মে লিপ্ত হয়। এক গ্রুপের সঙ্গে অন্য গ্রুপের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতার চরম মূল্য অনেক সময় দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। গ্যাং কালচার মূলত আধুনিকায়নেরই একটি প্রোডাক্ট। সামান্য কারণে কাউকে মেরে ফেলার মানসিকতা এসব কালচারেরই ফল। যত বেশি আধুনিক সমাজব্যবস্থার দিকে আমরা ধাবিত হব, আমাদের মধ্যে তত বেশি মানসিক অস্থিরতা বাড়বে।

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষকে যে বোধশক্তি দেওয়া হয়েছে তা আর কাউকে দেওয়া হয়নি। যেখানে সামাজিক স্থিতিশীলতার অভাব থাকে, সেখানে মূল্যবোধের একটি বড় ফাঁক রয়ে যায়। মানুষ হতাশায় ভোগে। হতাশা মনের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করে, যা সমাজে নৃশংসতা বৃদ্ধি করে। এই স্থিতিশীলতা হ্রাস পেতে থাকলে ব্যক্তি নিরাপত্তা ক্ষয় হবে আর মানুষ সভ্য সমাজ থেকে দূরে সরে যাবে। আমাদের ওপরের কারণগুলো নিয়ে ভাবতে হবে, বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। এমন অরাজক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ বের করে সমাজের সব মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। হীনম্মন্যতা আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু সেগুলো দূর করতে কিছু প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র এবং সমাজ যদি কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়, তাহলে মানুষের মধ্যে ভয় কাজ করবে। সেই সঙ্গে আইন এবং বিচারের প্রতি মানুষের পূর্ণ আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। তাতে অন্তত নিজের পরিবার এবং রাস্তাঘাটে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে।

লেখক: প্রভাষক, জার্নালিজম, মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

দেশে দেশে নতুন বাজার বাড়াতে হবে

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:৫২ এএম
দেশে দেশে নতুন বাজার বাড়াতে হবে
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি

প্রথমত ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসির মর্যাদা ছেড়ে যেহেতু আমরা উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় যাব, তাই আগে থেকেই সে প্রস্তুতি থাকতে হবে। এ প্রস্তুতি দুই ধরনেরই হতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি-কৌশল নিরূপণ করতে এ প্রস্তুতি দরকার। এখন থেকেই তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানিতে নতুন বাজারের সন্ধান করার কাজ বাড়াতে হবে। গবেষণা করতে হবে এবং আগামী দিনের সম্ভাবনাময় বাজারে প্রবেশের লক্ষ্য নিয়ে এগোতে হবে।

দ্বিতীয়ত আমাদের তৈরি পোশাকের পণ্যগুলোর গুণগত মানে উন্নতি সাধন ও মূল্যসংযোজন করতে হবে। এতে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা বাড়বে এবং বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে কাজে লাগবে।

তৃতীয়ত আমাদের শিল্পের উদ্যোক্তা ও কর্মী এ দুই পর্যায়েই দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রযুক্তির সঙ্গে আত্মস্থতা বাড়াতে হবে এবং আগামী দিনের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রয়োজনগুলো পূরণ করতে আগে থেকেই পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের দিকে যেতে হবে।

সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ 

প্রবৃদ্ধির জন্য উচ্চ ক্ষমতার কমিটি দরকার

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:৪২ এএম
প্রবৃদ্ধির জন্য উচ্চ ক্ষমতার কমিটি দরকার
বিজিএমইএ-এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এস এম মান্নান কচি

আমাদের প্রতিশ্রুতি হলো আমরা শ্রমিকের বেতন-ভাতা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই। আর আমাদের প্রত্যাশা হলো সরকার আমাদের আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অতীতের মতো নীতি সহায়তা দিয়ে পাশে থাকবে। এ দুই মিলিয়ে আমরা ২০৩০ সালের ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার পথে এগিয়ে যেতে চাই।

২০২৬ সালের পর রপ্তানিতে আমরা ইইউ জোনে যে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাতে যাচ্ছি তৎপরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের শিল্পের উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা ধরে রাখতে সরকারের সহযোগিতা দরকার। 

আমি দাবি জানাব উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের পর রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন বাড়াতে সরকারের পক্ষ থেকে কি কি সুবিধা দেওয়া যেতে পারে, তা নির্ধারণে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে দেওয়া হোক। ওই কমিটিতে পোশাকশিল্প সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতিনিধিত্ব রেখেই একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ করা যেতে পারে। এতে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব অধিদপ্তর এবং অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিনিধির সমন্বয়ে ওই কমিটি ঝুঁকি নিরুপণ ও উত্তরণে নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারকে পরামর্শ দেবে।

অনেক দেশেই সরকার এ ক্ষেত্রে শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানিসংশ্লিষ্ট ঋণের সুদ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলে ভর্তুকি এবং শ্রমিকের জন্য রেশনিং কর্মসূচির মতো সুবিধা দিয়ে সহযোগিতা করে থাকে।

আমরাও এমন কিছু সুবিধা চাই। অতীতেও সরকার আমাদের পাশে ছিল। নীতি সুবিধা দিয়ে সহযোগিতা করেছে। সর্বশেষ রপ্তানিতে নগদ ভর্তুকি সুবিধা প্রত্যাহার করলেও আবারও তা ফিরিয়ে দিয়েছে। আমরা সরকারের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। একটা বিষয় উল্লেখ করতে হয়, সব পোশাক কারখানার মালিক রপ্তানিতে সমান প্রতিযোগী নয়। তাই তাদের শ্রমিকের সব দাবি একসঙ্গে বাস্তবায়ন করাও সম্ভব হয় না। অন্যদিকে সব ক্রেতা প্রতিষ্ঠান শ্রমিকের সম্প্রতি বর্ধিত বেতন ভাতাও রপ্তানি আদেশে পোশাকের মূল্যের সঙ্গে সঙ্গে সমন্বয় করেনি। আমরা শ্রমিকের জন্য কর্মপরিবেশের উন্নতি করেছি, তাদের সুযোগ সুবিধা বাড়িয়েছি। কিন্তু সবাই এখনো বর্ধিত বেতন দিতে পারছে না। এমতাবস্থায়, আমি বিশেষ করে বলব শ্রমিকের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা জরুরি। এটি আমাদের জোর দাবি। কিন্তু এটা আমাদের খুব স্পষ্ট অবস্থান যে, শ্রমিক ভালো থাকলে এ শিল্প ভালো থাকবে। 

ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, বিজিএমইএ