ঢাকা ১১ বৈশাখ ১৪৩১, বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪
Khaborer Kagoj

ডায়াবেটিসের ওপর নজর দিন

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:৫০ এএম
ডায়াবেটিসের ওপর নজর দিন
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

বেশি দিন হয়নি বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে কোভিড-১৯ তথা করোনা স্বাস্থ্য ও আর্থসামাজিক নানাবিধ সর্বনাশ সাধনের কারণ ছিল, এমনকি ডেঙ্গু এখনো আতঙ্কের পর্যায়ে রয়েছে। করোনা সংক্রামক রোগ। একে জয় করার প্রয়াস জোরেশোরে চলার পরও এখনো নানান পদ-পদবি নিয়ে বিশ্বের কোথাও না কোথাও আছে। ডেঙ্গু গিয়েও যাচ্ছে না। ধীরে ধীরে করোনা, ডেঙ্গু হয়তো চলে যাবে, কিন্তু ডায়াবেটিস নামের অসংক্রামক ব্যাধিটি হাজার হাজার বছর ধরে অনিরাময়যোগ্য থেকেই গেল। গত শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ডায়াবেটিস মহামারি হিসেবে গজেন্দ্রগামী। বাংলাদেশে নীরব ঘাতক ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ-প্রয়াসে জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম (১৯১১-৮৯) এবং তার হাতে গড়া বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি এখনো প্রবাদতুল্য এবং মহীরুহ প্রতিষ্ঠান। ২৮ ফেব্রুয়ারি ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৫৬ সাল অর্থাৎ ৬৮ বছর আগে জাতীয় অধ্যাপক ইব্রাহিমের স্বপ্ন-পরিকল্পনায় এর যাত্রা শুরু। প্রতিষ্ঠা দিবসকে ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। 

গ্রিক ক্রিয়াপদ ডায়াবাইনেইন থেকে ডায়াবেটিক শব্দের উৎপত্তি। মধ্য যুগের মুসলিম দার্শনিক চিকিৎসাবিদ ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭) ১০২৫ সালে সমাপ্ত তার ১৭ খণ্ডের চিকিৎসা বিশ্বকোষ ‘ক্যানন অব মেডিসিন’-এ সর্বপ্রথম ‘বহুমূত্র, অধিক ক্ষুধা এবং যৌনশক্তির ক্রমনাশক’ ডায়াবেটিক রোগের স্বভাব চরিত্র বর্ণনা করেন। ডায়াবেটিক গ্যাংগ্রিনের কথাও লিখেছেন তিনি। ইবনে সিনা লিউপিন বা নয়নতারা ফুল, ট্রিগোনেলা আর জেডোয়ারির বিজ সমন্বয়ে তৈরি ভেষজ ওষুধ দ্বারা রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের উপায়ও নির্দেশ করেছিলেন, যা আধুনিক চিকিৎসা গবেষণায়ও কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।   

রক্তে শর্করার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে গিয়ে বেশি দিন ধরে থাকলে ডায়াবেটিস রোগ দেখা দেয়। সাধারণত ডায়াবেটিস বংশগত কারণে ও পরিবেশের প্রভাবে হয়। কখনো কখনো অন্যান্য রোগের ফলেও হয়ে থাকে। এ রোগ সব লোকেরই হতে পারে। ডায়াবেটিস একবার হলে আর সারে না। এটা সব সময়ের এবং আজীবনের রোগ। তবে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা গ্রহণ করে এ রোগকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব হয়। অতিরিক্ত প্রস্রাব, অত্যধিক পিপাসা, বেশি ক্ষুধা, দুর্বল বোধ করা এবং কেটে-ছিঁড়ে গেলে ক্ষত তাড়াতাড়ি না শুকানো হচ্ছে এ রোগের সাধারণ লক্ষণ।

যাদের বংশে রক্ত-সম্পর্কযুক্ত আত্মীয়স্বজনের ডায়াবেটিস আছে, যাদের ওজন খুব বেশি, যাদের বয়স ৪০-এর ওপর এবং যারা শরীর চর্চা করেন না, গাড়িতে চড়েন এবং বসে থেকে অফিসের কাজকর্মে ব্যস্ত থাকেন, তাদের ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অত্যধিক চিন্তাভাবনা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, আঘাত, সংক্রামক রোগ, অস্ত্রোপচার, অসম খাবার, গর্ভাবস্থা এবং ওজন বেশি বেড়ে গেলে এ রোগ বাড়াতে সাহায্য করে। এগুলোর প্রতি দৃষ্টি রেখে প্রথম থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করা যায়। ডায়াবেটিস প্রধানত দুই প্রকারের- (ক) ইনসুলিন নির্ভরশীল এবং (খ) ইনসুলিন নিরপেক্ষ। ইনসুলিন নির্ভরশীল রোগীদের ইনসুলিনের অভাবের জন্য ইনসুলিন ইনজেকশন নিতে হয়। ইনসুলিন নিরপেক্ষ রোগীদের দেহে কিছু পরিমাণ ইনসুলিন থাকে। তবে চাহিদার প্রয়োজনে তা যথেষ্ট নয় বা শরীর ইনসুলিন ব্যবহার করতে পারে না। এসব রোগীর খাদ্য নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনে শর্করা কমানোর বড়ি সেবন করতে হয়। 

ডায়াবেটিস ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগ নয়। বেশি মিষ্টি খেলে ডায়াবেটিস হয়, এ ধারণা ঠিক নয়। খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা এবং ওষুধ এ রোগ নিয়ন্ত্রণের উপায়। খাদ্যের গুণগত মানের দিকে নজর রেখে পরিমাণমতো খাদ্য নিয়মিতভাবে গ্রহণ, জীবনের সব ক্ষেত্রে নিয়মকানুন বা শৃঙ্খলা মেনে অর্থাৎ কাজে-কর্মে, আহারে-বিহারে, চলাফেরায়, এমনকি বিশ্রামে ও নিদ্রায়, শৃঙ্খলা মেনে চলা দরকার। নিয়ম-শৃঙ্খলাই ডায়াবেটিস রোগীর জীবনকাঠি। ডায়াবেটিস রোগীকে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে রোগ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শমতো খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয়। রোগ সম্বন্ধে ব্যাপক শিক্ষা ছাড়া ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসায় আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না। তবে ডায়াবেটিস বিষয়ে শিক্ষা কেবল রোগীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। একই সঙ্গে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধব এবং ডাক্তার ও নার্সদের শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। রোগী যদি চিকিৎসকের সঙ্গে সহযোগিতা করে তার উপদেশ ও নির্দেশ ভালোভাবে মেনে চলেন এবং রোগ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা যথাযথভাবে গ্রহণ করেন, তবে সুখী, কর্মঠ ও দীর্ঘজীবন লাভ করতে পারেন। 

বাংলাদেশে ডায়াবেটিস চিকিৎসা আন্দোলনের পথিকৃৎ প্রাণপুরুষ জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম ১৯৫৬ সালে সেগুনবাগিচায় নিজের বাসভবনের আঙিনায় ছোট টিনের ঘরে দেশের ডায়াবেটিক চিকিৎসার যে উদ্বোধন ঘটিয়েছিলেন, আজ তার সেই প্রতিষ্ঠান, জাতির গর্বের প্রতীক ‘বারডেম’। বারডেম এশীয় প্রশান্ত অঞ্চলে ডায়াবেটিস চিকিৎসার মডেল বা সেরা কেন্দ্র এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৮২ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানটিকে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ এবং গবেষণার ক্ষেত্রে তাদের একান্ত সেরা সহযোগী সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি, সম্মান ও সমীহ করে আসছে। অনেক মেজর রোগ থাকতে এ রকম একটা মাইনর রোগ নিয়ে তিনি আলাদা চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করতে চান কেন- সে সময় প্রায়শ এ ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হলে ডা. ইব্রাহিম বলতেন, ‘রোগটা মোটেই মাইনর নয়। কারও যেদিন ডায়াবেটিস হবে সেদিনই বুঝতে হবে যে, ওই লোকটা অন্ধ হয়ে যাবে, কিংবা প্যারালাইসিস হয়ে যেতে পারে বা তার হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। 

যদি যথারীতি চিকিৎসা ও পরিচর্যার ভেতর একে রাখা যায়, তাহলে আজীবন সে সুস্থ থাকবে। রোগীর হয়তো ৩০-৪০ বছর বয়স- ১০ বছরের মধ্যেই তার সবকিছু অকেজো হয়ে যাবে, যথারীতি চিকিৎসা ও পরিচর্যা করলে এবং নিয়ম মেনে চললে সে ৬০ বছর পর্যন্ত সুস্থ থাকবে এবং প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে।’ এ প্রসঙ্গে উপমা দিয়ে তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘আমরা গাড়ি বিকল হলে তবে গ্যারেজে সারাতে আনি, এটা বোকামি, সময় থাকতে যদি নিয়মিত মেইনটেন বা চেকআপ করানো হতো তাহলে হয়তো গাড়ি গ্যারেজে আনার প্রয়োজনই পড়ত না।’ তিনি ব্রত গ্রহণ করেন ‘দেশের কোনো ডায়াবেটিস রোগীকে বিনা চিকিৎসায় কর্মহীন হয়ে অসহায়ভাবে করুণ পরিণতির দিকে যেতে দেওয়া যাবে না। চিকিৎসা ব্যয়বহনের ভার নিয়ে হলেও সবাইকে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকবে।’ তার এ মিশন ও ভিশন-এর পতাকা তারই গড়া বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস) দৃঢ় প্রত্যয়ে অত্যন্ত সযত্নে বহন করে চলছে। 

বারডেমে নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা এখন ৪ লাখের বেশি, প্রতিদিন ৩ হাজারের বেশি (এর মধ্যে ৭৫ থেকে ১০০ জন নতুন) রোগী চিকিৎসাসেবার জন্য এখানে আসে। দেশের প্রায় সব জেলায় বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অধিভুক্ত শাখা রয়েছে, যেখানে স্থানীয়ভাবে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন অগণিত ডায়াবেটিস রোগী। সরকারের জনস্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির অন্যতম সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাডাস। বাংলাদেশে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রথম, প্রধান ও অন্যতম সফল নিদর্শন হলো বাডাসের উন্নয়ন কার্যক্রম। উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সরকার সমিতির প্রধান অবকাঠামো নির্মাণে অর্থায়ন করেছে আর সমিতির নিজস্ব উদ্যোগে সেই অবকাঠামোয় তুলে ধরেছে স্বাস্থ্যসেবার ডালি। বাডাস দাতা সংস্থার  সাহায্যনির্ভর না হয়ে আয়বর্ধক নানান কর্মসূচি গ্রহণ করে ‘ক্রস ফাইন্যান্সিং’-এর মাধ্যমে স্বয়ম্ভরতা অর্জনে প্রয়াসী, প্রত্যাশী। ডায়াবেটিসের মতো মহামারি নিয়ন্ত্রণে মহতী উদ্যোগের মেলবন্ধন সুস্থ দেশ ও জাতি নির্মাণের দ্বারা জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি সুনিশ্চিত হবে, সন্দেহ নেই।   

লেখক: সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির ন্যাশনাল কাউন্সিল সদস্য

বইয়ের সংস্কৃতি থেকে দূরে এ প্রজন্ম

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:৪০ পিএম
বইয়ের সংস্কৃতি থেকে দূরে এ প্রজন্ম
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

দেশে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, বইয়ের পাঠক কমে গেছে। পাঠকের আগ্রহ নেই সৃজনশীল বইয়ের প্রতি। বইয়ের সংস্কৃতি থেকে এই প্রজন্ম দূরে সরে গেছে। তারা এখন বেশি ডিজিটাল মাধ্যমে আসক্ত হয়ে পড়েছে। এ জন্য তারা দায়ী না। দায়ী পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। 

শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় যারা আছেন, তাদেরও দায় আছে। এখন পাবলিক লাইব্রেরিগুলোতে যথেষ্ট সৃজনশীল বই কেনা হয়। কিন্তু এগুলো কেউ পড়তে আসে না। ফলে এই বইগুলো বাক্সবন্দি হয়ে থাকে। ধুলো জমে। আর যারা লাইব্রেরিতে আসে, তারা আসে বিসিএস পরীক্ষার গাইড দেখতে।

এ অবস্থা দূর করতে হলে প্রথমত পরিবারে বইয়ের সংস্কৃতি গড়তে হবে। সন্তানদের বেশি করে বই কিনে দিতে হবে। জন্মদিনে অন্য কিছু না দিয়ে বই দিলে তাদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠবে। দ্বিতীয় শিক্ষা কাঠামোতে উন্নত বিশ্বের মতো স্কুল-কলেজে বই পড়া কার্যক্রম রাখতে হবে। বই পড়ার জন্য আলাদা নম্বর ব্যবস্থা রাখতে হবে। তাহলে শিক্ষার্থী বই পড়তে উৎসাহিত হবে। তৃতীয়ত বইয়ের দাম সাধ্যের মধ্যে রাখতে হবে। এখন বইয়ের দাম অত্যধিক। অনেক মধ্যবিত্তের পক্ষেই এখন বই কেনা সহজ কথা নয়। 

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক ও কথাসাহিত্যিক 

সৌজন্যতার ‘ঈদ মোবারক’ ও ‘শুভ নববর্ষ’

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:০৩ পিএম
সৌজন্যতার ‘ঈদ মোবারক’ ও ‘শুভ নববর্ষ’
ড. তোফায়েল আহমেদ

আমাদের সামাজিকতায় ‘শুভ নববর্ষ’ কিংবা ‘ঈদ মোবারক’জাতীয় অভিবাদন খুব বেশি দিনের নয়। তাই বলে নতুন বছরকে বরণ করা বা ঈদে অভিবাদনের প্রচলন কি ছিল না? অবশ্যই ছিল। উদযাপনের ধরন, মেজাজ, উপায়-উপকরণে হয়তো ভিন্নতা ছিল। কিন্তু উদযাপনে একটা স্বতঃস্ফূর্তা ছিল, ছিল প্রাণ। এখনকার সময়ে দিন দিন যান্ত্রিক সৌজন্যতার প্রাবল্যে হৃদয়ের টান ও আন্তরিকতার সম্পর্ক মার খেয়ে যাচ্ছে কি না ভেবে দেখতে অনুরোধ করি।

নববর্ষ উদযাপন

জমিদার বাড়িতে প্রজাদের আগমন ঘটত নানা উপহার-উপঢৌকন নিয়ে। গোমস্তা খাজনায় কিছু  ছাড় দিলেও দিত। কোথাও কোথাও আবার খাজনা দিতে না পারলে অমানবিক শাস্তির কথাও শোনা যায়। কোথাও কোথাও জমিদাররা কাচারিতে দই, খই, মুড়ি-মুড়কি, মোয়া, মিষ্টি ইত্যাদি দিয়ে আপ্যায়নও করাতেন। গ্রামে গ্রামে বসত চৈত্র-সংক্রান্তি ও বৈশাখের মেলা। বছরের অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মাটির হাঁড়ি, ডালা, কুলা, রঙিন ফিতা-চুড়ি, আলতা প্রভৃতি গ্রামের মানুষ মেলা থেকে সংগ্রহ করত। সম্প্রদায়ভিত্তিক, পেশাভিত্তিক, সর্বজনীন নানান রকমফের নিয়ে নানাভাবে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হতো। সনাতনী ধর্মীয় সম্প্রদায় চৈত্র-সংক্রান্তির অনেক আনুষ্ঠানিকতা পালন করত, অনুষ্ঠিত হতো চরকপূজা। তাছাড়া নববর্ষ ব্যবসার একটি মাইলস্টোন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। 

পাইকারি ব্যবসায়ীর গদিতে হালখাতা উৎসব রীতিমতো নতুন বছরের নতুন হিসাব-নিকাশের দিন। সব খুচরা ব্যবসায়ীর বকেয়া পরিশোধ করে নতুন হিসাব খোলার শুভক্ষণ হিসেবে ধরা হতো। শিশু-কিশোররা নতুন খেলনা- কাঠের পুতুল, মাটির ঘোড়া, বাঁশের বাঁশি, শোলার পুতুল অনেক কিছুর জন্য সারা বছর অপেক্ষা করত। চট্টগ্রাম অঞ্চলে বলি খেলা, ষাঁড়ের লড়াই হতো। সঙ্গে কয়েক দিনের মেলা ছিল বোশেখের প্রধান আকর্ষণ। এখন গৃহস্থ নেই, নেই গৃহস্থের ষাঁড়, নেই খালি মাঠ। ষাড়ের লড়াই বিলুপ্ত। এখন শিশু-কিশোররা শুধু ভালো ফলাফলের নেশায় পড়ায় বুঁদ হয়ে থাকে, খেলে সময় নষ্ট করে না। তাই কুস্তি খেলা, বলি খেলার অবকাশ কোথায়? টিভিতে খেলা দেখে এবং রাত জেগে ভিডিও গেম খেলে, ইউটিউব দেখে তারা আর অন্য কিছু করার সময় পায় কোথায়। তাই নববর্ষ এলে ‘শুভ নববর্ষ’ এসএমএস লিখে দায় সারে মোটামুটি ছোট-বড় সবাই।

তবে ঢাকাসহ নানা শহরে কিছু তরুণ মঙ্গল শোভাযাত্রা, নানান মুখোশ পরে ঢোল-করতাল বাজিয়ে আনন্দ করা নববর্ষ অনুষ্ঠানে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। রমনায় সকালের জমায়েত ঢাকার অনেক পুরনো একটি  জনপ্রিয় অনুষঙ্গ। এখন শুধু রমনা নয়, অনেক পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানে সকালে জমায়েত হয়। নতুন পাঞ্জাবি ও নতুন শাড়ি পরার একটি জনপ্রিয় রীতি চালু আছে। এক সময় পান্তা-ইলিশের খুব ধুম চলছিল। ইদানীং এটির গুরুত্ব কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। 

আজকাল ‘নববর্ষ’ করপোরেটাইজ হয়ে যাচ্ছে। অনেক ব্যবসা হাউস এদিন অনেক খরচপাতি করে।
ইংরেজি নববর্ষ এবং বাংলা নববর্ষ দুটি আবার শ্রেণিভেদে ভিন্ন মেজাজে উদযাপিত হয়। ঢাকার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত রমনা বটমূলে, অন্যান্য শহরেও একই শ্রেণি নানা তরুতলে ‘এসো হে বৈশাখ’ গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। তারকাচিহ্নিত হোটেলগুলোয় ‘দই-চিড়া’ ব্রেকফাস্ট হয়। রাতে জমজমাট ‘পান’ উৎসব হয়। গরিব আদিবাসীরা তাড়ি উৎসব করে। সাধারণ সনাতন পরিবারে নিরামিশ পঞ্চব্যঞ্জন রান্না হয়। মিষ্টি সবার সাধারণ আপ্যায়ন।

বাংলা নববর্ষ সকালে শুরু হলেও ইংরেজি নববর্ষ শুরু হয় মাঝরাতে। আদর-আপ্যায়ন, হইচই, মাতামাতি সবই রাতে। খ্রিষ্টীয় জগৎ ২৫ ডিসেম্বরে যিশুখ্রিষ্টের জন্মদিন পালনের পর পর একই আমেজে নববর্ষ পালন করে। আলোকসজ্জা-আতশবাজি, পারিবারিক মিলন, পানোৎসব, বছরের সেরা আকর্ষণ। সেটির এক ধরনের সংক্রমণ খ্রিষ্টীয় জগতের বাইরেও ব্যাপকভাবে হয়েছে। চীনসহ ওই সন্নিহিত অঞ্চল ভিন্নভাবে তাদের নববর্ষ উদযাপন করলেও ১ জানুয়ারিও তারা উৎসবে মাতে।

এখন আমাদের দেশের সরকারি চাকরিজীবীরা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের জন্য উৎসব-ভাতা পান। আগে তা ছিল না। ভবিষ্যতে ইংরেজি নববর্ষ-ভাতাও যুক্ত হয় কি না জানি না। কারণ বাস্তবিক দিক থেকে বাংলা থেকে ইংরেজি সন-তারিখ আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে। ইংরেজি মাসের শেষ দিন চাকরিজীবীর বেতন হয়। শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়। জন্ম-মৃত্যু ও বিবাহদিবস পালিত হয়। ইংরেজি বর্ষপঞ্জিই আমাদের সত্যিকারের বর্ষপঞ্জি। শুধু পয়লা বৈশাখের একটি দিন বাংলার।

ঈদ প্রসঙ্গ

ঈদ উৎসব বটে, তবে তা প্রথমত ও প্রধানত ধর্মীয় উৎসব। আরবি শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখ ঈদ পালিত হয়। দ্রুপদী ধর্মীয় ধারায় ঈদ তাদেরই উৎসব যারা শাওয়ালের আগের এক মাস উপবাস ও নানা আনুষঙ্গিক কঠোর সংযম পালন করেছে। এর সঙ্গে নিবিষ্ট উপাসনা, দান-খয়রাত ও নতুন জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হওয়ার ঐকান্তিকতা যুক্ত। দিনের শুরু হয় রোজার ফিতরা আদায় ও সমবেত উপাসনার মাধ্যমে, ঈদের জামাত ও খুতবা এ দিবসের প্রাণ। এটি দেশ-কাল-পাত্র নয়, সারা পৃথিবীর মুসলমানের সর্বজনীন রীতি। বাকি  জাতি, দেশ ও সমাজভেদে  নানা সামাজিক রীতিনীতির মিশ্রণ স্বাভাবিকভাবে হবে, তা দোষণীয় নয়। নতুন পোশাক পরা, নিজে ভালো খাওয়া ও অন্যকে খাওয়ানো অবশ্যই ঈদের অঙ্গীভূত আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু ওই অংশটিই ঈদের প্রধান আবশ্যকীয় ধর্মীয় বিধান নয়। তবে পালনীয়।

এখন আসি দায়সারা ‘ঈদ মোবারক’ প্রসঙ্গে। ঈদের ঈদগাহের জামাতে সরাসরি সাক্ষাৎ, কোলাকুলি, শুভেচ্ছাবিনিময় একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় রীতি। এ উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর নেওয়া আবহমান মুসলিম সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজকাল নৈর্ব্যক্তিক এসএমএস, মেসেঞ্জার, টুইটার, নানা ইলেকট্রনিক ডিভাইসে ‘ঈদ মোবারক’ পাঠানোর মধ্যে হৃদয়ের সংযোগ খুব একটা থাকছে তা হলপ করে বলা যায় না। একটি সাধারণ সৌজন্যতা দেখানো হয় মাত্র। এক দশক আগে পর্যন্ত নানা সুন্দর বাণী লেখা ঈদ কার্ড বিনিময় ছিল। এখন সে ঝামেলায় কে যায়? তা ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। এভাবে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির আন্তরিক যোগাযোগ কমছে। যন্ত্রের কাজ যন্ত্র করছে। সব সময় যন্ত্র ও যান্ত্রিকতা মানবিক সম্পর্ক রক্ষা ও বিকাশের বিকল্প মাধ্যম নয়। এ ক্ষেত্রে সৌজন্যতার ‘ঈদ মোবারক’ কোনোভাবেই যায় না। এটি ঘোলে দধির স্বাদ মেটানোর মতও হয় না। তাই আমাদের সনাতনী অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানগুলোর অবক্ষয় ও বিকৃতি যদি কিছু শুরু হয় সে বিষয়ে একটু মনোযোগী বা সতর্ক হওয়া  ভালো।

লেখক: শিক্ষক, গবেষক ও শাসন বিশেষজ্ঞ
Webpage:tofailahmed.info

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন জরুরি

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:০০ পিএম
পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন জরুরি
আইজাজ আহমেদ চৌধুরী

১৯৯২ সালে বিল ক্লিনটন তিনটি স্লোগান নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য তার প্রচার চালিয়েছিলেন। তার মধ্যে একটি ছিল অর্থনীতি। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে আমেরিকা ভেঙে পড়েছিল। অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের চেষ্টার জন্য ক্লিনটনের যে প্রচার তা ভোটারদের কাছে সুন্দরভাবে অনুরণিত হয়েছিল। তিন বছরের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চরম আকারে বেড়েছিল। তাই একটি জাতির সমৃদ্ধির জন্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মুখ্য ভূমিকার ওপর জোর দেওয়া উচিত। 

আজ পাকিস্তানে অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তার ওপর খুব বেশি জোর দেওয়া যায় না। যুগ যুগ ধরে আমরা আমাদের সাধ্যের বাইরে জীবন যাপন করছি, দেশ ঋণের বড় বোঝা বহন করছে। সুদ প্রদানেই আমাদের রাজস্বের সিংহভাগ ব্যয় হয়ে যায়। সরকার পরিচালনার জন্য ধারাবাহিকভাবে ঋণ চাওয়া হয়। এর অর্থ হলো সরকার যা করে তার বেশির ভাগই ধার করা টাকা দিয়ে করে থাকে। এটি দেশের জন্য খুবই অস্থিতিশীল অবস্থা। আমরা আমাদের রাজস্ব বাড়াব, নাকি আমাদের খরচ কমিয়ে ফেলব, এমন উভয় সংকটে পড়েছে দেশ। 

আইএমএফ চুক্তি অনুসারে, সরকার দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিভিন্ন ক্ষুদ্র খাতে কর আরোপের পরিকল্পনা করেছে। এটি অবশ্যই করের ভিত্তি প্রসারিত করতে সহায়তা করবে। আমার বাড়ির বিপরীত মুখে একটি সুপার মার্কেটে এত বেশি গ্রাহক হয় যে, আমি খুব কমই ক্যাশিয়ার ডেস্কে সারিবদ্ধ মানুষ ছাড়া দেখেছি। তবুও, যখন কর দেওয়ার কথা আসে, তখন অনেক খুচরা বিক্রেতারাও কর দিতে নারাজ থাকে। জনগণকে উপলব্ধি করতে হবে যে, আমরা যে রাস্তায় যাতায়াত করি, যে জনসেবা গ্রহণ করি এবং যে উচ্চমানের জীবনযাপন করতে চাই তা কেবলমাত্র আমরা কর প্রদান করলেই অর্জন করা সম্ভব। ট্যাক্স বাড়ানোর প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রায়শই যুক্তি তৈরি করে যে, সাধারণ মানুষের করের সংগৃহীত রাজস্ব থেকে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তাদের জীবনযাত্রার অর্থায়নের জন্য ব্যয় করে। কর প্রসারিত করার সময় সরকার জনগণের অপচয়মূলক ব্যয় কমানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে।

সরকারকে খরচ কমানোর জন্য এখনো কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখিনি। যখন সরকার আন্তর্জাতিক ভ্রমণে খরচ কমানোর ঘোষণা করেছিল, তখন মানুষ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দীর্ঘ তালিকা দেখেছিল, যারা বিজনেস ক্লাস ভ্রমণের অধিকারী। আমরা দিন দিন ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছি। এগুলো কি কম করা উচিত নয়? অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা চলাফেরা করতে অনেক ব্যয় করে থাকেন, যা মোটেই কাম্য নয়। 

ইতোমধ্যে ১৮তম সংশোধনী যা বিভিন্ন বিষয় প্রদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল, যা সঠিক পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু এটি বাস্তবায়নের ফলে সম্ভাবনাময় অনেক কিছু রেখে গেছে। প্রথমত, ফেডারেল মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই প্রদেশগুলোতে অর্পিত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করেছে, তা বিলুপ্ত করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, প্রদেশগুলো স্থানীয় সরকারের কাছে সম্পদ হস্তান্তর করেনি। যেহেতু গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান এখনো উন্নত হয়নি, তাই আমাদের দেশের অর্থনীতি যেভাবে কাজ করছে তাতে সাধারণ মানুষ অসন্তুষ্ট।

এই সম্পর্কিত ইস্যুতে, ২০১০ সালে গৃহীত এনএফসি পুরস্কার বিভাজ্য পুল করের নিট আয় থেকে প্রদেশের অংশকে ৪৫ শতাংশ (২০০৯-১০) থেকে ৫৭ শতাংশে (২০১১-১২) বাড়িয়েছে। যেহেতু ঋণের বাধ্যবাধকতা ক্রমাগত বাড়ছেই, কেন্দ্রীয় সরকার এখন নিজেকে সীমাবদ্ধ বলে মনে করছে। আরও টাকা ধার করা বা মুদ্রণ করা ছাড়া তার আর কোনো বিকল্প নেই। এনএফসি অ্যাওয়ার্ড পর্যালোচনা করা দরকার। এর জন্য প্রদেশগুলোকে অবশ্যই সহযোগিতা করতে হবে। কারণ দেশের ঋণ পরিশোধের তাদের সমান দায়িত্ব রয়েছে।

বেসরকারিকরণের জন্য লোকসানকারী প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর একটি তালিকা করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সেদিকে গতি এসেছে। যাই হোক, এটা পরিষ্কার নয় যে, নতুন সরকার এই ভারী আর্থিক বোঝা বছরের পর বছর বহন করে কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। 

সরকারকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে দ্রুতগতির মূল্যস্ফীতি। আমাদের তরুণ দেশ, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাকে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। সে লক্ষ্যে সরকারগুলোকে তথ্যপ্রযুক্তি ও ক্ষুদ্রঋণ সুবিধার দিকে নজর দিতে হবে। শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। এর জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা উচিত। এসআইএফসি বেসরকারি-খাতের বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করা উচিত।

সরকারের বড় লক্ষ্য থাকা উচিত। তবে যতই ছোট হোক না কেন, প্রতিটি পদক্ষেপই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ঘোষণাগুলো অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনকে অগ্রাধিকার বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে। জনগণের আস্থা কখনোই ছিন্নভিন্ন হওয়া উচিত নয়। কারণ স্বাভাবিকভাবে ব্যবসার জন্য কোনো অবশিষ্ট সময় নেই। পাকিস্তানের জন্য এটা সত্যিই নির্বুদ্ধিতার অর্থনীতি যুগ চলছে।

লেখক: পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও সানোবার ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান
ডন থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: সানজিদ সকাল

বন্ধুতা চাই বিশ্বজুড়ে

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৫৮ পিএম
বন্ধুতা চাই বিশ্বজুড়ে
ওয়াহিদ মুরাদ

বন্ধু!  বন্ধুত্ব! বন্ধুতা! মনুষ্য জীবনের এক চিরকল্যাণকর সম্পর্কের নাম। এই বন্ধুতা কি শুধু মানুষের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়? নাকি 
গাছপালা, পশুপাখি, মাছ, কীটপতঙ্গ এদের মধ্যেও দেখা যায়? 

হ্যাঁ! বন্ধুতা বা বন্ধুত্ব সব প্রাণীর মধ্যে বিদ্যমান। এমনকি সৃষ্টি জগতের মহান স্রষ্টার সঙ্গে এবং তার সৃষ্টিকুলের সঙ্গেও চমৎকার একটা বন্ধুত্ব বিদ্যমান। ফলে এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড টিকে আছে বহাল তবিয়তে। 

মানুষের মধ্যে বন্ধুতা এক অভিনব বন্ধন। হতে পারে সে বন্ধুতা মা ও মেয়ের, হতে পারে ছেলে ও বাবার, হতে পারে ভাই ও বোনের, হতে পারে স্বামী-স্ত্রীর, হতে পারে যুবক-যুবতীর। আসলে বন্ধুত্ব হচ্ছে হৃদয়ে হৃদয়ে এক মায়াময় আকর্ষণ। সেটা না কাউকে দেখানো যায় না অথবা সত্যিকারভাবে কাউকে বোঝানও না যায়!

যেমন ধরুন, ১৯৭১ সালে মানুষ নিজের জীবন বিপন্ন জেনেও হিন্দু মেয়েদের সতীত্ব রক্ষা করেছে, হিন্দুদের মুসলিমদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত হিন্দু পরিবারকে পাকসেনা ও রাজাকারদের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে! সেখানে শুধু কি মানবতা কাজ করেছে নাকি বন্ধুতাও কাজ করেছে? আমার শতভাগ বিশ্বাস বন্ধুতা ও মানবিকতা পাশাপাশি ছিল এবং থেকেছে।

আমাদের ছোট দেশ। আক্রান্ত ছিলাম পাকিস্তানি সৈন্য দ্বারা। বড় দেশ ভারতে ১৯৭১ সালে প্রায় ১ কোটি মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলাম, সেটা কি শুধু মানবিকতা নাকি বন্ধুত্বও ছিল? বন্ধুর বন্ধুত্ব ছিল সেখানেও বিদ্যমান। বিশাল মানবপ্রেমও বলা যায় একে।

বৃহত্তর পর্যায় থেকে ব্যক্তিপর্যায়ে এবার আসি। ক্লাসের এক বন্ধু যখন বাসা থেকে টিফিন এনে খায়, পাশের বন্ধু টিফিন আনেনি শুনে, নিজের টিফিন থেকে খাবার পাশের জনকে ভালোবেসে দিয়ে দেয়, সেই তো আসল সিনারিও ভালোবাসার আর বন্ধুত্বের। এ যে মহাপবিত্র বন্ধুতা। আমি তো প্রায়ই দেখি, পথের কুকুর তার বাচ্চাকে ছুড়ে দেওয়া খাবার বাচ্চাকেই খেতে দেয়, নিজে না খেয়ে। ভালোবাসা, দয়ামায়া, প্রেম তো এরই নাম! এ যে স্বর্গীয় প্রেমের বাঁধন, বন্ধুতার অমর সিলেবাস।  গাছকে লতা জড়িয়ে ধরে বাড়তে থাকে, বাড়তে বাড়তে এক সময় লতা গাছকে ছাড়িয়ে যায়, আশ্চর্য! লতা একসময় ফুল দেয়, ফল দেয়, গাছও ফুল দেয়, ফল দেয়। কী চমৎকার বোঝাপড়া! এই বোঝাপড়াই অসীম রহস্যের প্রথম ধাপ বন্ধুতার। 

ছেলেটি যখন বুঝে ফেলে তার পাশের মেয়েটিকে, মেয়েটি যখন বোঝে তার অতি কাছের মানুষটিকে, ঠিক তখনই স্বর্গ থেকে আসে প্রেম মানুষের হৃদয়ে। একজন মানুষ একজন মানুষের প্রতি টান অনুভব করে। আর সে টান কখনো বন্ধুতায় রূপ নেয়, কখনো প্রেমের মহাকাব্য রচনা করে ফেলে। এটাই সত্য, এটাই স্বাভাবিক। এটাই বন্ধুত্বের শাশ্বত রূপ। প্রেমের অমোঘ বাঁধন বলতেও দ্বিধা নেই আমার।

বন্ধুতা আর প্রেম পাশাপাশি চলে। কেউ কাউকে না দেখলে কষ্ট পায়, নিভৃতে-নীরবে একে অপরের জন্য কাঁদে। দূরত্ব প্রেম, ভালোবাসা, বন্ধুতা দারুণভাবে এড়িয়ে চলতে চায়, কেন? কেউ জানে না। শুধু বলে, ওকে না দেখলে মনটা পোড়ে...। এই মন পোড়া, হৃদয়ভাঙা, কষ্টের নীল চাদর- এর নাম ভালোবাসা। আসলে ব্যক্তিপর্যায় থেকে বৃহত্তর পর্যায়ে যখন বন্ধুত্ব বিকাশ লাভ করে, তখনই মানবসমাজে বিশ্বপ্রেমের আবির্ভাব ঘটে। আমরা মানবজাতি, বিশ্বপ্রেম নিয়ে টিকে আছি, টিকে থাকব। যুদ্ধ, হানাহানি, হিংসাবিদ্বেষ মানবজাতিকে কলুষিত করে, বর্বরতার ছোবল মারে।

ইসরায়েল প্যালেস্টাইনে নিষ্ঠুর আচরণ করছে, শিশু, নারী মারছে। আমরা যে তাতে ক্ষুব্ধ হই, সেটাই আসলে বিশ্বপ্রেম। মূলতঃ বন্ধুতার বিশাল বিকাশ বিশ্বপ্রেম। এই বিশ্বপ্রেম মানুষের মাঝে যতদিন সামান্যটুকুও থাকবে, ততদিন মানবজাতি বেঁচে থাকবে, টিকে থাকবে। আমরা মানুষ, বিশ্বপ্রেমিক হলেই মঙ্গল, তখনই স্বার্থ দূরে চলে যায়।

লেখক: কলামিস্ট

শুধু জরিমানা নয়, সাজাও দিতে হবে

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১২:২৮ পিএম
শুধু জরিমানা নয়, সাজাও দিতে হবে
মনজিল মোরসেদ

পরিবেশ রক্ষায় সরাসরি মামলা করতে আইনের পরিবর্তন করা প্রয়োজন। শুধু মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা করে কিংবা জরিমানার ভয় দেখিয়ে পরিবেশ রক্ষার মূল উদ্দেশ্য সফল হবে না। সাজা দিতেই হবে। মামলার মাধ্যমে সাজা না হলে পরিবেশ দূষণ রোধ করা অসম্ভর। যেসব পরিবেশ আদালত আছে, সেখানে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে। কাজের কাজ কিছুই হয় না। এ জন্য আইন পরিবর্তন করতে হবে। পরিবেশ আদালতগুলোকে হাইকোর্টের অধীনে আনতে হবে। যেমনটা আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে আছে। পরিবেশ রক্ষায় মাঠপর্যায়ে প্রশাসন ও দায়িত্বরতদেরও সদিচ্ছা প্রয়োজন। এ ছাড়া, যেসব ব্যবসায়ী পরিবেশ দূষণ করছেন, তাদেরও বোধোদয় হতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। আইনগতভাবে কঠোর ব্যবস্থার পাশাপাশি সচেতনতা বাড়াতে সরকারকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সিনিয়র আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট ও প্রেসিডেন্ট, এইচআরপিবি