মুজিবনগরে স্বাধীনতার সূর্যোদয় । খবরের কাগজ
ঢাকা ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

মুজিবনগরে স্বাধীনতার সূর্যোদয়

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ১০:২৫ এএম
মুজিবনগরে স্বাধীনতার সূর্যোদয়
তোফায়েল আহমেদ

প্রতিবছর জাতীয় জীবনে ‘মুজিবনগর দিবস’ ফিরে আসে এবং এ বছর ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবসের ৫৩তম বার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। ১৭৫৭-এর ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের মুজিবনগরের আম্রকাননে স্বাধীনতার সেই সূর্য উদিত হয়েছিল। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের স্মৃতিকথা লিখতে বসে কত কথা আমার মানসপটে ভাসছে। ২৫ মার্চ দিনটির কথা বিশেষভাবে মনে পড়ছে। এদিন মণি ভাই এবং আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে বিদায় নিই। বিদায়ের প্রাক্কালে তিনি বুকে টেনে আদর করে বলেছিলেন, ‘ভালো থেকো। আমার দেশ স্বাধীন হবেই। তোমাদের যে নির্দেশ দিয়েছি তা যথাযথভাবে পালন করো।’ 

২৫ মার্চ রাতে আমরা ছিলাম মতিঝিলের আরামবাগে মণি ভাইয়ের বাসভবনে। রাত ১২টায় অর্থাৎ জিরো আওয়ারে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্বপরিকল্পিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নীলনকশা অনুযায়ী বাঙালি নিধনে গণহত্যা শুরু করে। চারদিকে প্রচণ্ড গোলাগুলি। এক রাতেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী লক্ষাধিক লোককে হত্যা করে। যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ২৬ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ইয়াহিয়া খানের ভাষণ শুনি। ভাষণে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যায়িত করে বলেন, ‘শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের আরও আগেই গ্রেপ্তার করা উচিত ছিল, আমি ভুল করেছি।’ ‘দিস টাইম হি উইল নট গো আনপানিশড।’ 

তারপর কারফিউ জারি হয় এবং ২৬ মার্চেই চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’র কথা বারবার প্রচার করে বলছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ প্রদান করে বলেছেন, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে সেনাবাহিনীর দখলদারির মোকাবিলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সেনাকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।’ 

এরপর দুই ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল হলে আমরা কেরানীগঞ্জে আমাদের সাবেক সংসদ সদস্য বোরহানউদ্দিন গগনের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করি। জাতীয় নেতা ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান সাহেব; মণি ভাই, সিরাজ ভাই, রাজ্জাক ভাই এবং আমিসহ স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সিদ্ধান্ত হলো মণি ভাই ও আমি, মনসুর আলী সাহেব এবং কামারুজ্জামান সাহেবকে নিয়ে ভারতের দিকে যাব। আমাদের এই যাত্রাপথ আগেই ঠিক করা ছিল। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর থেকে নির্বাচিত এমসিএ (Member of Constituent Assembly) ডাক্তার আবু হেনাকে বঙ্গবন্ধু যে পথে কলকাতা পাঠিয়েছিলেন, সেই পথেই আবু হেনা আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু আমাদের জন্য আগেই বাসস্থান নির্ধারণ করে রেখেছেন। 

ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে ভুট্টো যখন টালবাহানা শুরু করে, তখন ’৭১-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে জাতির পিতা জাতীয় চার নেতার সামনে আমাদের এই ঠিকানা মুখস্থ করিয়েছিলেন, ‘সানি ভিলা, ২১ নম্বর রাজেন্দ্র রোড, নর্দার্ন পার্ক, ভবানীপুর, কলকাতা।’ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এখানে  তোমরা থাকবে। তোমাদের জন্য সব ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি।’ ২৯ মার্চ কেরানীগঞ্জ থেকে দোহার-নবাবগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া হয়ে এপ্রিলের ৪ এপ্রিল আমরা ভারতের মাটি স্পর্শ করি এবং সানি ভিলায় আশ্রয় নিই। এখানে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন পরে বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদ এবং ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম।

১৯৭১-এর ১০ এপ্রিল জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নবনির্বাচিত সদস্যদের সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ’ গঠন করে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলাকে ‘মুজিবনগর’ নামকরণ করে রাজধানী ঘোষণা করা হয় এবং জারি করা হয় ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ তথা ‘Proclamation of Independence’। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণাকে অনুমোদন করা হয়। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে আরও যা ঘোষিত হয় তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকিবেন এবং রাষ্ট্রপ্রধান প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক পদে অধিষ্ঠিত থাকিবেন।’ 

রাষ্ট্রপতি শাসিত এই ব্যবস্থায় ‘ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতাসহ সর্বপ্রকার প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা’, ‘একজন প্রধানমন্ত্রী এবং প্রয়োজন মনে করিলে মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়োগের’ ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হস্তে ন্যস্ত করার বিধান রাখা হয়। এ ছাড়া যেহেতু বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি, সেহেতু স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে এই মর্মে বিধান রাখা হয় যে, ‘কোনো কারণে যদি রাষ্ট্রপ্রধান না থাকেন অথবা যদি রাষ্ট্রপ্রধান কাজে যোগদান করিতে না পারেন অথবা তাহার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অক্ষম হন, তবে রাষ্ট্রপ্রধান প্রদত্ত সব ক্ষমতা ও দায়িত্ব উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পালন করিবেন।’ ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ মোতাবেক জাতীয় নেতা উপ-রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন এবং জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় নেতা ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী, জাতীয় নেতা এ এইচ এম কামারুজ্জামান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দান করেন।

পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদের সভায় কর্নেল ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করা হয়। ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’- এই সাংবিধানিক দলিলটির মহত্তর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমরা ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ’ সদস্যরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলাম, ‘আমাদের এই স্বাধীনতার ঘোষণা ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মার্চ হইতে কার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে।’ অর্থাৎ যেদিন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেছিলেন সেই দিন থেকে কার্যকর হবে। জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা অনুসারে প্রণীত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ মোতাবেক স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ১০ এপ্রিল ও সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগরে।

সে সময় তাজউদ্দীন ভাইয়ের সঙ্গে সীমান্ত অঞ্চল পরিদর্শন করেছি। একটি বিশেষ প্লেনে তাজউদ্দীন ভাই, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, মণি ভাই এবং আমি যখন শিলিগুড়ি পৌঁছাই, তখন সেখানে পূর্বাহ্ণে ধারণ করা তাজউদ্দীন ভাইয়ের বেতার ভাষণ শুনলাম। বাংলার মানুষ তখন মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে আপসহীন, এককাতারে দণ্ডায়মান। পরবর্তী সময়ে ১৭ এপ্রিল যেদিন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণের তারিখ নির্ধারিত হয়, তার আগে ১৬ এপ্রিল গভীর রাতে মণি ভাই, সিরাজ ভাই, রাজ্জাক ভাই এবং আমি-আমরা মুজিব বাহিনীর চার প্রধান একটা গাড়িতে করে রাত ৩টায় নবগঠিত সরকারের সফরসঙ্গী হিসেবে কলকাতা থেকে রওনা করি সীমান্ত সন্নিহিত মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা তথা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী মুজিবনগরের উদ্দেশে। 

সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রবেশ করি প্রিয় মাতৃভূমির মুক্তাঞ্চল মেহেরপুরের আম্রকাননে। আমাদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি অনেক সাংবাদিক ছিলেন। কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছিল। আশঙ্কা ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেখানে বোমা হামলা চালাতে পারে। মেহেরপুরসহ আশপাশের এলাকা থেকে প্রচুর লোকসমাগম হয়েছিল। মুহুর্মুহু ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনিতে আকাশ-বাতাস তখন মুখরিত। আন্তর্জাতিক বিশ্ব বিস্ময়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করছিল নবীন এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদ্ভব। দিনটি ছিল শনিবার। বেলা ১১টা ১০ মিনিটে পশ্চিম দিক থেকে শীর্ষ নেতারা দৃপ্ত পদক্ষেপে মঞ্চের দিকে এলেন। দেশ স্বাধীন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সমবেত সংগ্রামী জনতা আমাদের সঙ্গে সমস্বরে গগনবিদারী কণ্ঠে মুহুর্মুহু ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলল। 

মুজিবনগরে শপথ অনুষ্ঠানস্থলে একটি ছোট্ট মঞ্চ স্থাপন করা হয়েছিল। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রথমে মঞ্চে আরোহণ করেন। ঝিনাইদহের এসডিপিও মাহবুবউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সশস্ত্র দল রাষ্ট্রপ্রধানকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়। এরপর মঞ্চে আসেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা এবং প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানী। উপস্থিত স্বেচ্ছাসেবকরা পুষ্পবৃষ্টি নিক্ষেপ করে নেতাদের প্রাণঢালা অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। সরকারের মুখপত্র ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি আবদুল মান্নান, এমসিএর উপস্থাপনায় শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রথমেই নতুন রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দলিল ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ পাঠ করেন চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে মুক্তির বাণীগুলো পাঠ করা হয়। 

আকাশে তখন থোকা থোকা মেঘ। স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা মায়ের চারজন বীর সন্তান প্রাণ ঢেলে গাইলেন জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। উপস্থিত সবার সঙ্গে কণ্ঠ মেলালাম। অপূর্ব এক ভাবগম্ভীর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল তখন। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম ইংরেজিতে প্রদত্ত ভাষণের শুরুতে বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমি তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ করেছি এবং তার পরামর্শক্রমে আরও তিনজনকে মন্ত্রীরূপে নিয়োগ করেছি।’ 

এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেন। তারপর ঘোষণা করেন প্রধান সেনাপতি পদে কর্নেল ওসমানী এবং সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ পদে কর্নেল আবদুর রবের নাম। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম তার আবেগময় ভাষণের শেষে দৃপ্তকণ্ঠে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রপতি জনগণনন্দিত ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ নির্যাতিত মানুষের মূর্ত প্রতীক শেখ মুজিব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম করে আজ বন্দি। তার নেতৃত্বে আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম জয়ী হবেই।’ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর তাজউদ্দীন আহমদ অভূতপূর্ব ও অবিস্মরণীয় বক্তৃতায় বলেন, ‘পাকিস্তান আজ মৃত এবং অসংখ্য আদম সন্তানের লাশের তলায় তার কবর রচিত হয়েছে। 

পূর্বপরিকল্পিত গণহত্যায় মত্ত হয়ে ওঠার আগে ইয়াহিয়ার ভাবা উচিত ছিল তিনি নিজেই পাকিস্তানের কবর রচনা করছেন।’ মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বক্তৃতার শেষে তিনি বলেন, ‘আমাদের এই অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে আমরা কামনা করি বিশ্বের প্রতিটি ছোট-বড় জাতির বন্ধুত্ব।’ ‘বিশ্ববাসীর কাছে আমরা আমাদের বক্তব্য পেশ করলাম। বিশ্বের আর কোনো জাতি আমাদের চেয়ে স্বীকৃতির বেশি দাবিদার হতে পারে না। কেননা, আর কোনো জাতি আমাদের চেয়ে কঠোরতর সংগ্রাম করেনি, অধিকতর সংগ্রাম করেনি। জয় বাংলা।’ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী উভয়েই তৎকালীন বাস্তবতায় যা বলার প্রয়োজন ছিল তা-ই তারা বলেছেন। আমাদের শীর্ষ দুই নেতার এই দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ ছিল ঐতিহাসিক এবং অনন্য। জাতীয় নেতারা, নির্বাচিত এমসিএ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক, পাবনার জেলা প্রশাসক নুরুল কাদের খান, মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীসহ আরও অনেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

নিয়মতান্ত্রিকতার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিনিধিদের ইচ্ছার শতভাগ প্রতিফলন ঘটিয়ে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রেখে, সাংবিধানিক বৈধতা অর্জন করে সেদিন রাষ্ট্র ও সরকার গঠিত হয়েছিল। আর এসব কিছুর বৈধ ভিত্তি ছিল বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে তথা ’৭১-এর এপ্রিলের ১০ ও ১৭ তারিখে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ও সরকারের শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রধানতম লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় সাংবিধানিক বৈধতা নিশ্চিত করে সমগ্র বিশ্বের সমর্থন নিয়ে জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করে সুমহান বিজয় ছিনিয়ে আনা। 

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেরাদুনে মুজিব বাহিনীর ট্রেনিং ক্যাম্পে শপথের সময় আমরা সমস্বরে বলতাম, ‘বঙ্গবন্ধু মুজিব, তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ আমরা জানি না। কিন্তু যতদিন আমরা প্রিয় মাতৃভূমি এবং তোমাকে মুক্ত করতে না পারব, ততদিন আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাব না।’ মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোয় বাঙালির চেতনায় বন্দি মুজিব মুক্ত মুজিবের চেয়ে বেশি শক্তিশালী ছিলেন। যারা ষড়যন্ত্রকারী তাদের হোতা খুনি মুশতাক তখনই আমাদের কাছে প্রশ্ন তুলেছিল, ‘জীবিত মুজিবকে চাও, না স্বাধীনতা চাও।’ আমরা বলতাম, ‘আমরা দুটোই চাই। স্বাধীনতাও চাই, বঙ্গবন্ধুকেও চাই।’ ৩০ লাখ প্রাণ আর ২ লাখ মা-বোনের সুমহান আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং বঙ্গবন্ধু মুজিবকে মুক্ত করতে পেরেছিলাম।

প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের এই মহান দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানের অমর স্মৃতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। জাতীয় চার নেতা জীবনে-মরণে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকেছেন। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে থেকেছেন, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, কিন্তু বেইমানি করেননি। ইতিহাসের পাতায় তাদের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য তারা যে আত্মদান করেছেন সেই আত্মদানের ফসল আজকের এই স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে জাতীয় নেতাদের বীরত্বপূর্ণ অবদানের কথা সর্বত্র স্মরণ করা উচিত। জাতীয় ইতিহাসের গৌরবময় দিনগুলো যথাযথ মর্যাদায় স্মরণ করে জাতীয় মর্যাদা ও গৌরব বৃদ্ধিই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক: উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য 
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ; সদস্য, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ। [email protected]

উত্তেজনা-অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হবে

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৪, ১১:৩১ এএম
উত্তেজনা-অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হবে
মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার

দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা, সেটি এখনো পরিষ্কার না। এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বর্তমানে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যে রকম সম্পর্ক, তাতে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা- মোসাদের প্রতি অনেকের সন্দেহ হতে পারে। কারণ মোসাদ বিভিন্ন সময়ে ইরানের রাজনীতিক, বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যা করেছে। এর আগে সিরিয়ায় ইরানি কনস্যুলেটে হামলা চালিয়ে ইরানের ছয়-সাতজন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে। তাই মোসাদ জড়িত থাকতে পারে, এমন সন্দেহ করা অমূলক নয়। 

যদি ইরানের গোয়েন্দারা বুঝতে পারেন যে এটি নাশকতা, তাহলে তারা স্বাভাবিকভাবেই প্রতিশোধ নিতে চাইবে। সেটি হলে এই অঞ্চলে নিশ্চিতভাবে উত্তেজনা বাড়বে। সে ক্ষেত্রে ইরান পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নেবে। সেটি তারা কীভাবে নেবে, তা দেখার বিষয়। এমনকি সেটি সরাসরি যুদ্ধের পর্যায়েও চলে যেতে পারে। 

এমনিতেই ওই অঞ্চলে নানা সংঘাতপূর্ণ ইস্যু রয়েছে। গাজা হত্যাকাণ্ড, হুথি বিদ্রোহীদের হামলা, হিজবুল্লাহ, হামাসের গেরিলা যুদ্ধ; তার ওপর এমন ঘটনা নিঃসন্দেহ অঞ্চলটিতে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করল।

লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক

ক্ষমতা কাঠামোতে পরিবর্তন হয়নি

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৪, ১১:২৯ এএম
ক্ষমতা কাঠামোতে পরিবর্তন হয়নি
এম হুমায়ুন কবির

দুর্ঘটনার কারণে ইরানের ক্ষমতাকাঠামোতে পরিবর্তন ঘটেনি। খামেনি সাহেব সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যমণি। কাজেই নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত তেমন নেই। 

দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট রাইসি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মৃত্যুতে প্রতিবেশীরাও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কোনো কোনো প্রতিবেশী তো সহযোগিতাও করছে, যেমন তুরস্ক। ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রও নেতিবাচক কিছু বলেনি বা করেনি। তাই আমার মনে হয় না, এই অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা বাড়বে। 

দুর্ঘটনার পর অনেক ধরনের স্পেকুলেশন দেখছি। অনেকে বলছেন, নাশকতাও হতে পারে। তবে বিষয়টি এখনো পরিষ্কার না। নাশকতার বিষয়টি উড়িয়েও দেওয়া যায় না, আবার ঘটনা না জানা পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তেও আসা যাবে না। শেষ পর্যন্ত যদি নাশকতা বা অন্য কোনো দেশের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তাহলে পরিস্থিতি অবশ্যই অন্য রকম হবে। তবে এখন পর্যন্ত তেমন লক্ষণ নেই।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত

পরিস্থিতি ভিন্ন হবে, নাশকতা হলে

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৪, ১১:২৬ এএম
পরিস্থিতি ভিন্ন হবে, নাশকতা হলে
মুন্সি ফয়েজ আহমেদ

এটি এখন পর্যন্ত একটি নিছক দুর্ঘটনা। ফলে এ নিয়ে তেমন প্রতিক্রিয়া হবে না। পরবর্তী সময়ে যদি কোনোভাবে প্রমাণিত হয় যে বিদেশি সম্পৃক্ততায় এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে; সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অন্য রকম হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। 

তবে এখন পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকেও সন্দেহ করার মতো এমন কিছু বলা হয়নি। ইসরায়েলের পক্ষ থেকেও কিছু বলা হয়নি। এই অবস্থায় উত্তেজনাকর কিছু হবে বলে মনে হয় না। 

ইরান খুব সুশৃঙ্খল একটি দেশ। দুর্ঘটনার পর পরই ভাইস প্রেসিডেন্টকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে মুরুব্বিরা সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। তাই ইরানের অভ্যন্তরেও উত্তেজনাকর কিছু হবে না। তবে ইব্রাহিম রাইসির অনুপস্থিতি ন্যূনতম হলেও ইরানের এগিয়ে যাওয়ার পথকে বাধাগ্রস্ত করবে। এর বেশি কিছু আপাতত মনে হচ্ছে না।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত

পুরো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়াবে

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৪, ১১:২০ এএম
পুরো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়াবে
অধ্যাপক এম শহীদুজ্জামান

অবশ্যই পুরো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়াবে এই দুর্ঘটনা। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন। দুজনই অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। এটা নাশকতা কি না, যদিও সেটা এখনো প্রমাণিত নয়।

নিহত পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনেক নতুন নতুন পরিবর্তন এনেছেন ওই অঞ্চলে। যেমন, ইরান-সৌদি আরব সম্পর্ক স্থাপন বা ইরান-তুরস্ক সম্পর্কের কথাও বলা যায়। এগুলো ইসরায়েলকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। 

ঘটনা দেখে মনে হচ্ছে নাশকতা হতেও পারে। সঙ্গে আরও দুটো হেলিকপ্টার ছিল প্রোটেকশনের জন্য। তারা অ্যাটেম্পট নিলে বাঁচাতেও পারত হয়তো, কিন্তু তারা সেটা করেনি। তা ছাড়া আমেরিকা-ইসরায়েল বিশেষ ধরনের ডিভাইস তারা ব্যবহার করে এমন ঘটনা আগেও ঘটিয়েছে।

লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

বাংলাদেশের স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রয়োজন

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৪, ১১:০৪ এএম
বাংলাদেশের স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রয়োজন
মো. তৌহিদ হোসেন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু দুই দিনের বাংলাদেশ সফরে আসেন গত ১৪-১৫ মে। সফরকালে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন এবং পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় মিলিত হন। এ ছাড়া  তিনি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের দেওয়া নৈশভোজে অংশ নেন। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন ডোনাল্ড লু। 

বাংলাদেশে গত ৭ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে মানবাধিকার ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারের গভীর মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল। অবাধ, নিরপেক্ষ ও নির্বিঘ্ন নির্বাচনের স্বার্থে ভিসানীতিতে কড়াকড়ি আরোপের ঘোষণা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। নির্বাচনের পরও নির্বাচন সুষ্ঠু ও মানসম্পন্ন হয়নি বলে যুক্তরাষ্ট্র বিবৃতি দিয়েছিল। এমতাবস্থায়, নির্বাচনের পাঁচ মাসের মাথায় ডোলান্ড লুর এবারের সফর দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে এক ধরনের উত্তরণের প্রয়াস বলেই সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হচ্ছে।

লুর বক্তব্যেও সেটির আভাস পাওয়া যায়। অস্বস্তি কাটিয়ে দুই দেশের মধ্যে পুনরায় আস্থা স্থাপনের চেষ্টা করছেন বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন ডোনাল্ড লু। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অনেক বিষয়ে মতভেদ ছিল। আমরা অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন (বাংলাদেশে) অনুষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলাম। এতে কিছু টেনশন তৈরি হয়েছিল। তবে আমরা সামনে তাকাতে চাই, পেছনে নয়। কাজেই সম্পর্ক উন্নয়নের উপায় খুঁজে বের করতে হবে বলেও মনে করেছেন লু। বিষয়গুলো দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

লু বলেন, এই সম্পর্কের পথে অনেকগুলো কঠিন বিষয় রয়েছে, যথা র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার। এসবকে পাশে রেখে ব্যবসার পরিবেশের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরও বেশকিছু বিষয়কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে সাংবাদিকদের বলেন মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। 

ডোনাল্ড লুর সফরে সার্বিক সুর অনেকটাই ইতিবাচক ছিল। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছিল যে, এবারের সফরের মাধ্যমে র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসতে পারে। কিন্তু ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্টতই বলা হয়েছে যে, তা হচ্ছে না। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেশটার নৈশভোজের সময় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের অব্যাহত পতনের বিষয়টি লু উল্লেখ করেছেন, এবং মার্কিন বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলো যে তাদের লভ্যাংশ ফেরত নিতে পারছে না এনিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পক্ষান্তরে নাগরিক সমাজের সঙ্গে মতবিনিময়ে লু বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জনগণ এবং তাদের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি তাদের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করে।

নির্বাচন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী পর্যায়ে বহিঃরাষ্ট্রগুলোর প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নির্বাচনের আগে চীন, রাশিয়া এবং বিশেষ করে ভারত, সরকারের পক্ষে খুব শক্ত অবস্থান নিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশগুলো একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য তাদের চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছিল। নির্বাচনের পর পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর অনেকটা স্থিমিত হয়ে আসে। অনুমান করা যায় যে, সরকারের পক্ষে ভারতের শক্ত অবস্থানের কারণে, বাংলাদেশের নির্বাচন ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে সংঘাতময় সম্পর্কে জড়ানো যুক্তরাষ্ট্র নিজ স্বার্থের অনুকূল মনে করেনি। ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য চীনের আধিপত্যরোধ, যাতে ভারত তার সহযোগী।

বাংলাদেশের নির্বাচন যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আশানুরূপ হয়নি, দেশ দুটির মধ্যে পরস্পরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তো শেষ হয়ে যায়নি। ডোনাল্ড লুর সাম্প্রতিক সফরকে এই প্রেক্ষিত থেকে দেখতে হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে যে বহুমাত্রিক সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের আছে, সে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা তারা রক্ষা করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের স্বার্থ হয়তো বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তবে বিভিন্ন ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থও বিদ্যমান। আগামী সময়গুলোতে যে বিষয়গুলো আমাদের সামনে আছে তার মধ্যে অন্যতম নিরাপত্তা ইস্যু। যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা ইস্যুতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেবে বলে মনে করা হচ্ছে । 

অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটা আশঙ্কা সবসময় ছিল যে, নির্বাচনের পর পশ্চিমা দেশগুলো থেকে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা আসে কি না! এ ক্ষেত্রে ভিসা নিষেধাজ্ঞা কিছু কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও অর্থনীতির ওপর এখন পর্যন্ত কোনো বিরূপ প্রভাব দেখা যায়নি। আগামী দিনগুলোয় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে উভয় পক্ষকেই। যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কোনো বিকল্প নেই বাংলাদেশের জন্য। একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যখন টানাপোড়েন থাকে তখন ব্যবসায়ীরাও তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে শঙ্কিত থাকেন। বাংলাদেশ আশা করবে, এই সফরের প্রেক্ষিতে সে আশঙ্কা দূরীকরণের পরিবেশ সৃষ্টি হবে। 

আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে আরও কয়েকটি দেশ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত আছে, যেমন ভারত, চীন, মায়ানমার ইত্যাদি। ভারতের সঙ্গে বর্তমান সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান থাকার পরিপ্রেক্ষিতে মনে করা যায় যে, ভারতের নিরাপত্তার প্রয়োজনগুলোকে সরকার হয়তো বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে অন্যান্য দেশের তুলনায়। তবে ভারতের স্বার্থ যে সবসময় বাংলাদেশের সঙ্গে একইরকম হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। লক্ষ্য রাখতে হবে যে, ভারতের স্বার্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বার্থ যেন বিঘ্নিত না হয়। 

নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশের অন্যতম উদ্বেগের বিষয় মায়ানমার পরিস্থিতি। ইতোমধ্যে মায়ানমারের গৃহযুদ্ধ এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। রোহিঙ্গা সমস্যায় আমাদের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে অতীতে প্রকৃত প্রস্তাবে ভারত বা চীন কোনো ধরনের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি। প্রত্যাশিতভাবে, নিজেদের স্বার্থের নিরিখেই তারা তাদের কার্যক্রমকে সীমিত রেখেছে। ভারত, চীন ছাড়াও মায়ানমারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে ভারত, চীনের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা লাভের চেষ্টা বাংলাদেশের স্বার্থে অপরিহার্য।

রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় পশ্চিমের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে  ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য জরুরি। রপ্তানি পণ্যের বাজার, বিদেশি বিনিয়োগের উৎস, রেমিট্যান্স ইত্যাদি সব বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্য অপরিসীম। এ ছাড়া আছে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। এসব কথা মাথায় রেখেই সামনের দিনগুলোতে আমাদের বৈদেশিক সম্পর্কের অগ্রাধিকারগুলোকে নির্ধারণ করতে হবে।

লেখক: সাবেক পররাষ্ট্র সচিব