ঢাকা ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪

ক্ষমতাবানদের অসহিষ্ণুতা, ক্ষমতাহীনদের অসহায়ত্ব সমাজজুড়ে

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ১১:০৯ এএম
ক্ষমতাবানদের অসহিষ্ণুতা, ক্ষমতাহীনদের অসহায়ত্ব সমাজজুড়ে
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

পাকিস্তানি হানাদাররা যেসব জঘন্য অপরাধ করে গেছে, সেগুলোর অনেক সাক্ষীর একটি হচ্ছে যুদ্ধশিশুরা। এদের অনেকেরই স্থান হয়েছে এতিমখানায়, কেউ প্রাণ হারিয়েছে পথেঘাটে পরিত্যক্ত অবস্থায়; যাদের কপাল ভালো তারা আশ্রয় পেয়েছে বিদেশে, পালক পিতামাতার গৃহে। ১৫ জন এতিম গিয়েছিল কানাডায়, তাদের নিয়ে একটি বই লিখেছেন কানাডা অভিবাসী বাঙালি গবেষক ও সমাজকর্মী মোস্তাফা চৌধুরী। বইটির নাম দিয়েছেন ‘আনকনডিশনাল লাভ, এ স্টোরি অব এডপশন অব নাইনটিন সেভেনটিওয়ান ওয়ার বেবিজ’। বইতে ওই ১৫ জনের সবার কথাই আছে। এদের ভেতর পাঁচজন একবার বাংলাদেশে এসেছিল, নিজেদের মাতৃভূমির সন্ধানে।

পাঁচজন এতিম শিশুর একজন ছিল বিশেষভাবে স্পর্শকাতর। হারিয়ে যাওয়া মায়ের কথা ভেবে সে সর্বদাই দুঃখভারাক্রান্ত থাকত। গোপনে কাঁদত। মেয়েটি আবার কবিতাও লিখত। বাংলাদেশে এসে বিশেষভাবে সে নদী দেখেছে, বুড়িগঙ্গায় নৌকায় বসে সে ভেবেছে এই দেশের কোথাও না কোথাও তার দুঃখিনী মা লুকিয়ে আছেন, যে নাকি তাকে তার জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই পরিত্যাগ করেছিলেন। অর্থাৎ পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কানাডায় ফিরে গিয়ে মেয়েটি ছোট্ট একটি কবিতা লিখেছিল। নাম দিয়েছিল ‘চাইল্ড অব দ্য রিভার্স’। বাংলাদেশকে সে নদীমাতৃক বলে জানে। সে কথাটি আছে তার কবিতায়। আছে তার নিজের মায়ের কথাও। বলেছে সে, ‘মা তুমি আমাকে তোমার বুকে রাখতে পারোনি, ছেড়ে দিয়েছিলে, যখন আমি ছোট্টটি ছিলাম। তোমার কথা ভেবে আমি খুব কেঁদেছি এবং আমার সে বেদনা শেষ হবে না যতক্ষণ না আমি তোমাকে খুঁজে পাই, তোমাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরি নিজের বুকের ভেতরে।’

মেয়েটির বাংলা নাম রানি; পারিবারিক পদবি মোরাল। রানি মোরালের বিদেশি বাবা-মা অত্যন্ত সংবেদনশীল মানুষ। মোরালদের নিজেদের একটি সন্তান আছে, তবু তারা আগ্রহের সঙ্গে পালক নিয়েছেন বাংলাদেশের এতিম একটি শিশুকে এবং তাকে আপন সন্তানের মতোই মমতা ও যত্নে লালন-পালন করেছেন। কিন্তু প্রাণপণ চেষ্টা করেও রানিকে তারা বাঁচিয়ে রাখতে পারলেন না, শেষ পর্যন্ত। সঙ্গ দেওয়ার জন্য রানির সঙ্গে তারাও বাংলাদেশে এসেছিলেন। আশা করেছিলেন জন্মভূমি খুঁজে পেয়ে রানি তার বিষণ্নতা কাটিয়ে উঠতে পারবে। কিন্তু যা ঘটেছে তা ঠিক তার উল্টো। বাংলাদেশ দেখার পর ২৬ বছর বয়সী রানির যন্ত্রণা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সহ্য করতে পারেনি। অল্পদিন পরে সে নিজের হাতে নিজের জীবনের অবসান ঘটিয়েছে। অনুমান করি, বাংলাদেশের অবস্থা দেখে তার শেষ ভরসাটুকু তার জন্য নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। আঁকড়ে ধরার মতো আর কোনো অবলম্বনই তার জন্য অবশিষ্ট ছিল না।

মাতৃহারা যে পাঁচজন মাতৃভূমির খোঁজে বাংলাদেশে এসেছিল তাদের ভেতর রায়ান নামের ছেলেটি ছিল ভিন্ন ধরনের। টগবগ করত সে আশায়। এসেছিল সম্ভব হলে মায়ের দেশে থেকেই যাবে, এই রকমের একটা গোপন ইচ্ছা নিয়ে। এখানে ছিলও সে বছরখানেক। তার আসার খবরটা জানাজানি হয়ে যায়। মিডিয়া তাকে নিয়ে বেশ খানিকটা হইচই করে। যুদ্ধশিশুর প্রথম বাংলাদেশে আগমন! ব্যাপার সামান্য নয়। রায়ান দেখেছে, শুনেছে, ঘুরে বেড়িয়েছে। লোকের সঙ্গে মিশেছে। কিন্তু অচিরেই তার ভেতর একটা হতাশা দানা বেঁধে ওঠে। হতাশা নিয়েই ফিরেছে সে কানাডায়। তবে আত্মহত্যা করেনি।

বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় কানাডার আপনজনদের সঙ্গে রায়ান নিয়মিত পত্র যোগাযোগ করত, ই-মেইলে। নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানাত। ঢাকার রাস্তায় একদিন শোনে বোমার আওয়াজ, দেখতে পায় আতঙ্কগ্রস্ত একটি মেয়ে প্রাণভয়ে দৌড়াচ্ছে। পরে শুনেছে সে যে, নারী হয়রানি ও ধর্ষণ বাংলাদেশে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। খবরের কাগজে প্রতিনিয়ত আসে সেসব খবর।

কানাডার বাবা-মাকে সে একবার যা লিখেছিল বাংলায় অনুবাদ করলে সেটা এ রকম দাঁড়ায়- ‘বাংলাদেশ মনে হয় একটা সুড়ঙ্গের ভেতর ঢুকে পড়েছে। সুড়ঙ্গটা অন্ধকার। এর শেষ মাথা দেখা যায় না। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ধরনটা পিরামিডের মতো। এর নিচের দিকে রয়েছে তরুণরা। এই তরুণরা অচিরেই বড় হবে; বড় হয়ে দেখবে যে তাদের স্থান সংকুলানের জন্য কোনো সামাজিক উদ্যোগ নেই। কাজ নেই, সুযোগ নেই, বাস্তবিক অর্থে কোনো অবকাশও নেই। বিশ্বায়িত এমন একটি বাংলাদেশে তারা বেড়ে উঠবে, যেখানে কেবল টিভি ও আমদানি করা অন্যান্য সামগ্রী খুবই ব্যস্ত থাকবে; শুধু ব্যস্ত নয়, থাকবে অত্যধিক পরিমাণে ব্যস্ত।’

রায়ান এটা লিখেছিল ১৯৯৮ সালে। আমরা ধারণা করি, বাংলাদেশে সে আর ফিরে আসেনি। একদিন তার মা তাকে পরিত্যাগ করেছিলেন, অনতিক্রম্য এক বিপদে পড়ে। তা নিয়ে রায়ানের মনে দুঃখ ও গ্লানি থাকার কথা। কিন্তু এটা খুবই সম্ভব যে, বাংলাদেশে আসার পর সে নিজেই তার মাতৃভূমি থেকে পলায়ন করেছে, প্রাণভয়ে। নইলে হয়তো তার অবস্থাও তার সমবয়স্ক ও ভগ্নিসম রানির মতোই হতো। রায়ানের জন্য সুযোগ আছে। কানাডা আছে। সে পালাতে পারে। যাদের জন্য কোনো সুযোগ নেই, তাদের অনেকেই চেষ্টায় থাকে পালানোর সুযোগ তৈরি করার। সুযোগ তৈরি না করতে পারলে ভীষণ হতাশ হয়। বিত্তবান পিতা-মাতা বৈদেশিক আশ্রয়ের এক রকমের ব্যবস্থা করেই রাখেন। সন্তানদের জন্য, নিজেদের জন্যও।

হতাশ যুবক রায়ানের ১৯৯৮ সালের অভিজ্ঞতার পর একে একে ২৫ বছর কেটে গেছে। না, অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বরঞ্চ অবনতিই ঘটেছে। আমাদের জন্য সমষ্টিগত সুড়ঙ্গবাসের অবসান ঘটেনি। অন্ধকার এখন আরও গাঢ়, ভবিষ্যৎ এখন অধিকতর অনিশ্চিত। ইতোমধ্যে যা বৃদ্ধি পেয়েছে তা হলো সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা।

দেশের অর্থনীতিকে চাঙা রেখেছেন কৃষিজীবীরা। সেই কৃষক ভূমি থেকে উৎখাত হচ্ছে এবং বিকল্প কাজ পাচ্ছে না। রামপালে, বাঁশখালীতে তাদের ভূমি চলে গেছে। প্রতিরোধ সম্ভব হয়নি। প্রকৃতি ভয়ংকরভাবে বিপন্ন। সুন্দরবনকে তো মনে হয় শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হবে না। কারণ তার ওপর মুনাফালোভীদের চোখ পড়েছে। প্রাকৃতিক ওই বনটি আত্মহত্যা করবে না, সে শক্তি তার নেই; কিন্তু রানির হারানো মায়ের মতোই দুঃখ নিয়ে সে একদিন হারিয়ে যাবে। বুড়িগঙ্গা নদীকে দেখে রানি তার নিজের মায়ের কথা ভেবেছে, ভেবে কাতর হয়েছে। কেঁদেছে। রানি আজ বেঁচে নেই, যদি বেঁচে থাকত এবং বুড়িগঙ্গার খোঁজ করত, তবে দেখতে পেত নদীটি আর নেই, মরে গেছে। একটা নয়, অনেক নদীই এখন মরা। বড় বড় নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, উজানের ভারত পানি ছাড়ছে না বলে। মৃত্যুর আগে রানি দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করেছে, নদীর মরণদৃশ্য তার যন্ত্রণা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিত। সাভারে রানা প্লাজা ধ্বংস হওয়ায় একসঙ্গে ১ হাজার ১৩৫ জন শ্রমিক মারা গিয়েছিল এবং তাতে তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কারখানার মালিকের কোনো দোষ দেখতে পাননি, ভবনটির পিলার ধরে অলৌকিক হস্তে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ঝাঁকুনি দেওয়াকে শনাক্ত করেছেন। বিশ্ব কাঁপানো ওই মাপের মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনার সংবাদ পেলে রানির যন্ত্রণা কতটা বাড়ত তা আমরা অনুমান করতে পারব না। রানি যদি ভাবত যে, নিহত শ্রমিকদের মধ্যে তার দুঃখিনী মা-ও আছেন, তাহলে তাকে সান্ত্বনা দিত কে? রানি সংবেদনশীল মানুষ, অন্যদের কষ্ট না দিয়ে নিজেই চলে গেছে, বক্ষভেদী দুঃখ বহন করে।

যুদ্ধশিশুরা বাংলাদেশের মানুষের জন্য অনোপচনীয় গ্লানির ও দুঃসহ দুঃখের কারণ। বাংলাদেশ যে তার মেয়েদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি, সে ব্যর্থতার ক্ষতিপূরণ কোথায়? আর অন্য সব শিশু? তাদের কী অবস্থা? কেমন আছে তারা? তাদের জন্য খেলার মাঠ কোথায়? চলাফেরার জায়গা কোনখানে? ধনী ঘরের ছেলেমেয়েরা জন্মের পরই উৎপাটিত হয় পরিবেশ, প্রকৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে। এমনকি মাতৃভাষা থেকেও। গরিব ঘরের শিশুরা শিকার হয় অপুষ্টির, পাচার হয়ে যায় বিদেশে, বাধ্য হয় অমানবিক শ্রমে। শিশু হত্যা বাড়ছে। শিশুর ওপর যৌন হয়রানি ঘটছে। ভাড়াটের শিশুটি কাঁদছে দেখে বিরক্ত হয়ে বাড়িওয়ালার গিন্নি তাকে আছাড় দিয়ে মেরে ফেলছে; এমন ঘটনাকে একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ বলে ধরে নিলে ভুল হবে। এটি হলো ক্ষমতাবানদের অসহিষ্ণুতা, ক্ষমতাহীনদের অসহায়ত্ব এবং সমাজজুড়ে প্রবহমান হিংস্রতারই উন্মোচন।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জয়ী হব যদি যুদ্ধে থাকি

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৪, ১১:০৬ এএম
জয়ী হব যদি যুদ্ধে থাকি
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যত্র যেমন, তেমনি বাংলাদেশেও আমরা দেখছি যে পুঁজিবাদীরা নিজেদের ‘আলোকিত স্বার্থ’ যে রক্ষা করবে তার ব্যবস্থাটাও অক্ষুণ্ন রাখতে পারছে না। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় যে সংসদীয় নির্বাচনব্যবস্থা, সেটাও ভেঙে পড়েছে। অর্থাৎ ভেঙে ফেলা হয়েছে। এক পায়ের ওপর ভরসা করে দাঁড়ানোর জন্য সে ব্যর্থ কসরত করছে। তা নির্বাচনব্যবস্থা না থাকলে কী ঘটতে পারে? হয়তো নৈরাজ্য আসবে। হয়তো অভ্যুত্থান ঘটবে। বামপন্থিরা এমন শক্তিশালী অবস্থানে নেই যে, তারা অভ্যুত্থান করবে, অভ্যুত্থান করলে করবে রক্ষণশীলরা। তেমন ঘটনা নিশ্চয়ই মঙ্গলজনক হবে না। 

পুঁজিবাদ ব্যক্তিস্বার্থকে প্রধান করে তোলে, স্বার্থবোধের গোপন জায়গাটাতে নীরবে ঘা দিয়ে ব্যক্তির ভেতরের মুনাফালিপ্সাটাকে জাগিয়ে তোলে। সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী ‘সাহিত্যে চাবুক’ নামের একটি প্রবন্ধে বলেছেন, বাংলা ভাষায় ‘মি’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দগুলো খুবই নোংরা; ভণ্ডামি, ইতরামি, বাঁদরামি, গুন্ডামি, নোংরামি, ভাঁড়ামি সবকিছুতেই ওই ‘মি’ হাজির; তবে মানুষের জন্য সবচেয়ে সর্বনেশে হচ্ছে ‘আমি’; কারণ ওই পদার্থটির আধিক্য ঘটলে বিদ্যাবুদ্ধি কাণ্ডজ্ঞান সবকিছু লোপ পায়। এখন সর্বত্রই কিন্তু ওই ‘আমি’র তাণ্ডব। 

মধ্যযুগের কবি যে গেয়েছেন গান, ‘আপন আপন করে তুই হারালি তোর যা ছিল আপন’, সেটা এখন অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় জাজ্বল্যমান রূপে সত্য। আমার ‘আমি’ এখন আমরা হতে চায় না; আর হয় যদি তবে ‘তোমাদের’ সঙ্গে যুদ্ধ বাধায়। বোধ ও বিবেকসম্পন্ন মানুষ বলবেন আজ প্রয়োজন সর্বজনীন ‘আমরা’ হওয়া। বলবেন, তার জন্য সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি আবশ্যক। আসলে সাংস্কৃতিক প্রস্তুতিও যথেষ্ট নয়, দরকার হবে রাজনৈতিক কাজ, সে কাজের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের পুঁজিপন্থি ভূমিকার অবসান ঘটল। সমাজ পরিবর্তন ছাড়া সেটা কিছুতেই সম্ভব নয়। 

পরিবর্তনের জন্য অত্যাবশ্যক সাংস্কৃতিক কাজটি বাংলাদেশে আমরা করছি কি? না, করছি না। ধরা যাক, পাঠাগার। পাঠাগারে গিয়ে তো মানুষ একত্র হতে পারে। বইকে কেন্দ্র করে মেলামেশা সম্ভব। কিন্তু মানুষ তো এখন আর বই পড়ায় আগ্রহী নয়, পড়লেও পাঠাগারে যায় না; ইন্টারনেট, ওয়েবসাইটে টেপাটেপি করে ঘরে বসে যান্ত্রিক বই সংগ্রহ করে নিয়ে কোনায় বসে বসে পড়ে। পাঠাগার কেবল বই সংগ্রহের জায়গা হলে সেখানে লোক পাওয়া কঠিন হবে; হচ্ছেও। পাঠাগারকে সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা দরকার। 

পাঠাগার হবে সামাজিকভাবে মিলবার একটি জায়গা, যেখানে মানুষ কেবল বই পড়ার জন্য যাবে না, নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আকর্ষণেও যাবে। পাঠাগার হওয়া চাই একটি আশ্রয়কেন্দ্র, যেখানে বই নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি নাটক, গান, আবৃত্তি, বিভিন্ন দিবস উদযাপন, আলোচনা, বক্তৃতা, খেলাধুলা, শরীরচর্চা প্রতিযোগিতা, অনেক কিছুর আয়োজন করা সম্ভব। সেটা করা গেলে বিকেল হলেই মানুষ ওই আশ্রয়ের দিকে রওনা হবে। ছাত্র, কর্মচারী, শিক্ষক, অবসরভোগী, শ্রমিক, কৃষক, রাজনৈতিক কর্মী সবাই আসবে। মিলবে মিশবে; সামাজিক হবে। আলোচনা করবে ব্যবস্থা পরিবর্তনের মতাদর্শ নিয়ে। সবকিছুর ভেতরই মতাদর্শিক বিবেচনাটা থাকবে, মিছরির ভেতর যেমন সুতো থাকত, যে সুতো ছাড়া মিছরি তৈরি করার কথা ভাবা যেত না। 

দৃষ্টি দিতে হবে শিশু-কিশোরদের ওপর। খুবই জরুরি হচ্ছে একটি কিশোর আন্দোলন গড়ে তোলা। একসময়ে কিশোর আন্দোলন ছিল; এখন নেই, পুঁজির শাসক সবগুলোকেই গ্রাস করে ফেলেছে। মুকুল ফৌজ গড়ে উঠেছিল পাকিস্তান আন্দোলনের অনুপ্রেরণায়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সেই সংগঠন তার প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলতে থাকে, একসময়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। খেলাঘর যুক্ত ছিল কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে; কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিখণ্ডিত হওয়া এবং বিভিন্ন স্রোতে বিভক্ত হয়ে পড়াতে খেলাঘর এখন আর নেই বললেই চলে। 

কচি-কাঁচার মেলা বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী ধারাতে গড়ে উঠেছিল। ওই ধারাও তার ভেতরকার উৎসাহ-উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলেছে। কিশোরদের এখন কোনো সংগঠন নেই। তারা স্কুল ও কোচিং সেন্টারে  ছোটাছুটি করে, ঘরে ফিরে ইন্টারনেট ও ফেসবুকের ওপর নুইয়ে থাকে, বিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধি পায়; অনেকে মাদকাসক্ত হয়, জড়িয়ে পড়ে অপরাধে। কিশোরকে নিয়ে আসা চাই বড় অঙ্গনে। তার সৃষ্টিশীলতা ও দুঃসাহসকে উৎসাহিত করা অত্যাবশ্যক। সৃষ্টিশীলতা বাড়ে সামাজিকতায়; আর সবচেয়ে বড় দুঃসাহসিক কাজটা হলো সামাজিক পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ। দেশব্যাপী একটি কিশোর আন্দোলন গড়ে তোলা আজ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। 

যুগ এখন মিডিয়ার। মিডিয়ার এত ক্ষমতা আগে কেউ কখনো দেখেনি। মিডিয়া পুরোপুরি পুঁজিবাদীদের দখলে। পুঁজিবাদের বড় একটা ভরসাও ওই মিডিয়ার ওপরই। বাংলাদেশে সমাজ পরিবর্তনকামীদের হাতে মিডিয়া নেই। দৈনিক দূরের কথা, একটি সাপ্তাহিকও নেই। খুব দরকার অন্তত একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা চালু করার। 

সেই পত্রিকা দেশ-বিদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে যা ঘটছে সেগুলো কেন ঘটছে, যা দৃশ্যমান তার পেছনে কোনো স্বার্থের কারসাজি কাজ করছে, ঘটনাবলির তাৎপর্য কী, বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে আপাত-বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর যোগ কোথায় এবং উত্তরণ কোন পথে সম্ভব, এসব বিষয়ে সপ্তাহে সপ্তাহে আলোচনা করবে। তাতে পাঠকের জ্ঞান যেমন বাড়বে, তেমনি সৃষ্টি হবে অন্যায়ের প্রতি ঘৃণা এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে ভেঙে নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্দীপনা। সমাজকে যারা বদলাতে চান তাদের পক্ষে সবাই মিলে অন্তত একটি সাপ্তাহিক প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া অত্যাবশ্যক। এটি হবে বড় একটি সাংস্কৃতিক পদক্ষেপ। 

স্বাধীনতার পর মনে হয়েছিল দেশে একটি নাট্যান্দোলন শুরু হবে। শুরু হয়েছিল, কিন্তু এগোয়নি। শিল্পীরা চলে গেছেন টেলিভিশনে ও সিনেমায়। তেমন গান গাওয়া যায়নি, যা মানুষকে একই সঙ্গে আনন্দ দেবে এবং উদ্দীপ্ত করবে। কবিতা লেখা হচ্ছে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা নিয়ে, তাতে দুঃখের দুর্বিষহতা যত পাওয়া যাচ্ছে, গভীর কোনো দার্শনিকতা তত পাওয়া যাচ্ছে না। 

মোট কথা, বিদ্যমান অন্ধকারে মননশীলতা ও সৃজনশীলতার আলো জ্বালা চাই, যে আলো সম্ভব করবে সাংস্কৃতিক জাগরণের এবং পথ দেখাবে সামাজিক বিপ্লবের, যার মধ্য দিয়ে উৎপাদনব্যবস্থা বর্তমান পুঁজিবাদী স্তরে আর আটক থাকবে না, বন্ধন ভেঙে সমাজতান্ত্রিক স্তরে উন্নীত হবে। জীবনে আসবে প্রাচুর্য, জীবনযাপন হবে আনন্দময়। সে কাজ একা কেউ করতে পারবে না, অল্প কজনে কুলাবে না; তার জন্য পাড়ায়-মহল্লায়, যেমন শহরে তেমনি গ্রামে-গঞ্জে, সব ধরনের বসতিতে সংস্কৃতিকেন্দ্র গড়ে তোলা চাই। ওইখানে পরিবর্তনকামী মানুষের সাংস্কৃতিক লালনপালন চলবে, যে মানুষ সোৎসাহে রাজনীতিতে যোগ দেবে। রাজনীতি বুর্জোয়াদের ক্ষমতা পরিবর্তনের ক্রীড়া-কৌতুকে সীমিত থাকবে না, হয়ে দাঁড়াবে বিপ্লবীদের সমাজ পরিবর্তনের পদক্ষেপ। 

পৃথিবীব্যাপী আজ পুঁজিবাদবিরোধী চেতনা প্রখর হয়ে উঠেছে; সেই চেতনাকে সামাজিক বিপ্লবের পথে এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে অগ্রসর করার ওপরই কিন্তু নির্ভর করছে মানবজাতির ভবিষ্যৎ। 

মধ্যযুগের কবির একটা পরামর্শ ছিল: ‘এবার তোর ভরা আপন তুই বিলিয়ে দেরে যারে তারে।’ ওই পরামর্শে কিন্তু কুলাবে না। কেননা বিপদটা হবে এই যে, আমার আপন যদি আপনে ভরপুর হয়ে যায়, যদি ভারি হয়ে ওঠে স্বার্থে ও সম্পদলিপ্সায়, তবে সে ‘আপন’ নির্ঘাৎ ডুববে এবং নিজে ডোবার আগে অন্যদের ভরাডুবি ঘটাতে চাইবে এবং তাতে করে সবারই হবে ডোবার দশা। সেটাই এখন ঘটছে, বিশ্বময়। আমার ‘আপন’ ভাসবে যদি নিজে ভারি না হয়ে অপরের সঙ্গে একত্রে ভাসতে চায় তবেই। মুশকিল যা ঘটাবার ঘটাবে সম্পদের ব্যক্তিমালিকানা। ঘটাচ্ছেও। মানুষের পক্ষে তাই মানুষ থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে, সামাজিকতা হারিয়ে সে অধম হয়ে পড়ছে বন্য প্রাণীরও।

ক্ষমতাধররা ও বচনবাগীশরা যা ইচ্ছা বলুন, বলতে থাকুন, আসল কথাটা হলো সমাজ পরিবর্তন। সেটা যেন না ভুলি। এটাও যেন না ভুলি যে পালাবার কোনো উপায় নেই, পালালেও বাঁচা যাবে না এবং বাঁচা মানে কেবল টিকে থাকা নয়, মানুষের মতো বাঁচা।

কিন্তু আমরা বাঁচব, অবশ্যই জয়ী হব, যদি আমরা যুদ্ধে থাকি। ভরসা এই যে, আমরা একা নই। বিশ্বজুড়ে মানুষ এখন যুদ্ধে আছে। প্রতিটি সমাজেই ব্যক্তিমানুষ যতই সন্ত্রস্ত হোক, ভয় পাক, সমষ্টিবদ্ধ মানুষ লড়ছে এবং লড়তে গিয়েই বুঝে নিচ্ছে যে বাঁচতে হলে লড়তে হবে। বাঁচার সঙ্গে মরার যে যুদ্ধ তাতে পরাজয়ের কোনো স্থান নেই। ইতিহাস এগোচ্ছে এবং এগোবেই। 

ইতিহাসে বাঁক আছে, কিন্তু থেমে যাওয়া নেই। ইতিহাসকে এগিয়ে নেওয়ার সংগ্রামে আমরা বাংলাদেশের মানুষরাও আছি। অতীতে ছিলাম, আছি বর্তমানে এবং থাকব ভবিষ্যতেও। তবে ইতিহাস এমনি এমনি এগোয় না; তার জন্য সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি চাই, অনুশীলন চাই জ্ঞানের ও সৃজনশীলতার। সবার ওপরে চাই সংঘবদ্ধতা।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ বারবার কেন সংবাদের শিরোনাম

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৪, ১১:০১ এএম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ বারবার কেন সংবাদের শিরোনাম
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

সম্প্রতি গণমাধ্যম সূত্রে জানতে পারলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ‘অছাত্ররা’ ছাত্রলীগের নেতা হওয়ার সুবাদে আবাসিক হলের একাধিক আসন দখল করে থাকছেন। আর আসন বরাদ্দ পেয়েও অনেক সাধারণ ছাত্র হলে উঠতে পারছেন না। শুধু শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলেই ছাত্রলীগের দখলে আছে শতাধিক আসন। প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। একাডেমিক সূত্রের আলোকে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৬ হাজারের বেশি নিয়মিত শিক্ষার্থী আছেন। এর মধ্যে ছাত্র ১৬ হাজার ৯৬৯।

শিক্ষার্থীদের ১১টি আবাসিক হলে মোট আসন ৫ হাজার ৩৮৩, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। ফলে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন মেসে থাকতে হয়। অবশ্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মাণাধীন আরও কয়েকটি হলের কাজ শেষ হলে শিক্ষার্থীদের আবাসিক আসনসংকট অনেকটা কমে আসবে। যেহেতু আবাসিক হলের আসনসংখ্যা কম, সেহেতু এ বিষয়ে রাজনীতির ক্ষেত্রমাত্রা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি। আমার জানামতে, একজন হল প্রাধ্যক্ষ যথাযথ নিয়মনীতি এবং ক্যাটাগরি অনুসরণ করে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের জন্য সিট বরাদ্দের ন্যায্য কাজটি যথাযথভাবে করতে পারেন না। মূলত তারা রুটিন কাগজে স্বাক্ষর এবং ডাইনিং ক্যানটিন তদারকি ছাড়া শিক্ষার্থীদের ন্যায্য সিট বরাদ্দের কাজে অনেকটা হিমশিম খান। 

গণমাধ্যম সূত্রে প্রায়ই জানতে পারি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ রয়েছে আবাসিক হলগুলোতে আসন পেতে হল প্রশাসনের অনুমতির পাশাপাশি ইদানীং ছাত্রলীগের সম্মতিও লাগে। ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের সম্মতি ছাড়া শিক্ষার্থীরা হলের আসন পান না। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ গণমাধ্যমের কাছে প্রায়ই অভিযোগ দেন যে, আবাসিক হলে আসন বরাদ্দ পেয়ে প্রতি মাসে ভাড়ার টাকা ঠিকই দেন কিন্তু আসন দখল পান না। উল্টো তাদের মেস ভাড়া দিতে হয়। হল প্রাধ্যক্ষকে বললে তারা ‘বড় ভাইদের’ (ছাত্রলীগ নেতা) ধরে হলে ওঠার পরামর্শ দেন। এসব পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আমার মনে যথেষ্ট শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ এ বিষয়টির দ্রুততম সময়ে সুন্দর সমাধান না হলে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সাধারণ শিক্ষার্থীদের তথা সাধারণ মানুষকে চরমভাবে ব্যথিত করে তুলবে।

অবশ্য কোনো অছাত্র হলের রুম বা সিট দখল করে আছেন, এমন তথ্য ছাত্রলীগের দায়িত্বশীল নেতারা স্বীকার করেন না। গণমাধ্যমে যেসব অভিযোগ আসে এর বাইরেও অসংখ্য অভিযোগ শিক্ষার্থীরা প্রকাশ করে না বা করতে পারছে না। অথচ সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হলের সিটসংক্রান্ত আধিপত্য এবং সংকট বিদ্যমান রয়েছে।

একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ঐতিহাসিকভাবে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চর্চারও জায়গা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি তাই খুব স্বাভাবিক বা পরিচিত বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয় যেহেতু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তাই সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চর্চাগুলো হওয়ার কথা অনেক বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক। সারা দুনিয়ার বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে তেমনটাই হচ্ছে।

আরও অনেক বিষয়ের মতো এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এক ‘ব্যতিক্রম’। বহু বছর ধরে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ক্ষমতাসীন সরকারের ছাত্রসংগঠনগুলো যে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, সেটাকে ছাত্ররাজনীতি বলা যায় কি না, তা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতি সৃষ্টি ও তা বজায় রাখার জন্য শুধু কি ছাত্রসংগঠনগুলো বা ছাত্ররাজনীতিই দায়ী, নাকি এর জন্য অন্যদেরও দায় আছে? সম্প্রতি রাবিতে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেই প্রশ্নগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনা করতে হচ্ছে।

কিছুদিন আগে রাবির প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলো প্রশাসনের কাছে চার দফা দাবি জানিয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে ছিল আবাসিক হলে আসন-বাণিজ্য বন্ধ করা, আসন-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা, অনলাইনে প্রতিটি হলের আসন তালিকা প্রকাশ করা, হলের ডাইনিংয়ে খাবারের দাম কমিয়ে ভর্তুকি দিয়ে খাবারের মান বাড়ানোর পাশাপাশি ক্যাম্পাসে খাবারের দাম ও মান মনিটরিং করা এবং গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস নিশ্চিত করে অবিলম্বে রাকসু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। 

দীর্ঘদিন থেকে আসন-বাণিজ্য, কক্ষ দখলদারিত্বসহ ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে একধরনের ক্ষোভ এবং মেধার ভিত্তিতে আবাসিক হলে আসন বরাদ্দ নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন কারণে এখন আর এসব খবর পড়তে ইচ্ছা করে না। এ জন্য পড়িও না। কারণ এসব খবরকে স্বাভাবিক মনে হয়। বিষয়গুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিভিন্নভাবে সমাধান করলেও আরও কিছু ঘটনা রয়েছে, যেগুলোর জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে যথেষ্ট ক্ষোভ ও শঙ্কা বিরাজ করে। 

ছাত্ররাজনীতি ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে। এর অন্যতম কারণ ছাত্র সংসদ না থাকা, নির্বাচন না হওয়া। এমনকি যথাযথ প্রতিনিধিত্ব গড়ে না ওঠা। বিশেষ করে ক্ষমতার আধিপত্য, বড়াই-লড়াই, হল দখল, আসন-বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, চাটুকারিতা, পকেট নেতা তৈরি, প্রশাসনের অন্যায্য সমর্থন প্রভৃতি কারণে ছাত্ররাজনীতির যথাযথ বিকাশ হচ্ছে না। ছাত্রসংগঠনগুলোর কমিটি গঠনের জন্য এখন যোগ্যতার পাশাপশি চলে লাখ লাখ টাকার রাজনৈতিক বাণিজ্য। এই অপরাজনীতির দাপটে ক্রমেই ছাত্ররাজনীতি হয়ে উঠছে অসৎ ও অশুভ। আর এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর। 

এখন অনেক তুচ্ছ বিষয়ে ছাত্রলীগ সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। ছাত্রলীগ অনেক ভালো কাজ করছে কিন্তু দু-একটি মন্দ কাজ তাদের বিতর্কিত করে তুলেছে। সম্প্রতি গাঁজা সেবনে নিষেধ করায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে আহত করেছে শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এসব এখন নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

সাধারণত পিতৃ সংগঠন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকলে ছাত্রসংগঠনগুলো আধিপত্য বিস্তারের নামে নিজেদের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ইদানীং যেহেতু ছাত্রসংগঠনগুলো নির্বাচনের ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্ধারিত হয় না, সেহেতু সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভালো-মন্দ বিচার কিংবা ছাত্রনেতাদের উত্তম চরিত্র প্রকাশের প্রয়োজন পড়ে না। এমনকি তারা এটাও চিন্তা করে না যে, তাদের পিতৃ সংগঠনগুলোর ক্ষমতায় আসতে সাধারণ জনগণের ভোটের মুখোমুখি হতে হয়। 

এ কারণে অনবরত সাধারণ শিক্ষার্থীরা হয়রানির শিকার হয় ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন কর্তৃক। তারা কখনোই আমলে নেয় না যে, একজন সাধারণ শিক্ষার্থীকে হয়রানি করার অর্থ হচ্ছে তার পরিবার তথা পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনকে হয়রানি করা। স্বাভাবিকভাবেই এসব ক্ষেত্রে পরিবারের দুঃখ কষ্টের প্রভাব পড়ে জাতীয় নির্বাচনের ওপর। একটি সাধারণ পরিবারের সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে লাঞ্ছিত কিংবা হয়রানির শিকার হলে ওই পরিবারের সদস্যদের ভোট প্রদানের মাপকাঠি ভিন্নভাবে প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected] 

এমপি আনারের হত্যাকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন

প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৪, ১০:৫১ এএম
এমপি আনারের হত্যাকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের ঝিনাইদহের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীমকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা ইতিহাসে বিরল। তার মতো একজন জনপ্রতিনিধিকে হত্যা করে, দেহ টুকরো টুকরো করে কোথায় ফেলে দেওয়া হয়েছে, তা বাংলাদেশ বা ভারতের গোয়েন্দাদের কাছে অজানা। তারা খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে কারা, তা খুঁজে বের করার জন্য দুই দেশের গোয়েন্দা দল আদা-জল খেয়ে নেমে পড়লেও, এই লেখা শেষ হওয়া পর্যন্ত সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। ভারতের দক্ষ প্রবীণ অবসরপ্রাপ্ত গোয়েন্দারা মনে করছেন এই জঘন্যতম ঘটনা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি বা তৃণমূল টুঁ শব্দটি করছে না। এই প্রসঙ্গ তুলে সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম এবং রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীও অভিযোগ তুলেছেন। 

বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ শুধু ঝিনাইদহ নয়, ওই এলাকার মতুয়াদের মধ্যে অনেক সভা করেছেন কয়েক বছর আগে। সেটা বাংলাদেশ সরকারের অজানা নয়। দিলীপ ঘোষের সঙ্গে ওপারের মতুয়াদের সুসম্পর্ক ছিল। বাংলাদেশের সংসদ সদস্য তার ছেলেবেলার বন্ধু একজন মতুয়া। তিনবারের এই সংসদ সদস্য সোনা পাচার থেকে শুরু করে হুন্ডির ব্যবসা সবই নাকি করতেন। তিনি কলকাতায় এলে বরাহনগরে তার বন্ধু গোপাল বিশ্বাসের বাড়িতে অত্যন্ত সাধারণভাবে জীবন যাপন করতেন। অবসরপ্রাপ্ত গোয়েন্দারা প্রশ্ন তুলেছেন, ঝিনাইদহের ওই সংসদ সদস্য কেন বরাহনগরে তার বন্ধুর বাড়িতে উঠতেন?

নির্বাচনের আগে গোপাল বিশ্বাস কোনো বিশেষ দলের হয়ে কোটি কোটি টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশের সংসদ সদস্য কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক বলে গোয়েন্দাদের ধারণা। তাহলে তিনি হোটেলে না উঠে, বন্ধুর বাড়িতে উঠেছিলেন কেন? পেশাগত কারণে ১৯৭১-এ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় দিনাজপুর, খুলনা, যশোর, বগুড়া, সাতক্ষীরা প্রভৃতি এলাকায় যখন ঘুরতাম, তখন দেখেছি খান সেনারা শত শত মানুষকে হত্যা করে রাস্তায় ফেলে রেখেছে। সেসব দৃশ্য দেখে তখন আমার মনে হতো এরা কি সত্যি মানুষ, নাকি ধর্মের নামে পিশাচ? মুক্তিবাহিনীর জওয়ানরা আমাকে বোঝাতেন, এসব হত্যার নেপথ্যে ছিল রাজাকার, আলবদর, আলসামস ও খান সেনারা। 

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্যকে কলকাতায় ডেকে এনে নিউটাউনের একটি বাড়িতে প্রচণ্ড মধ্যপান করিয়ে হত্যা করে, তার দেহ টুকরো করে ট্রলিব্যাগে ভরে বিভিন্ন ঝিলে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে তদন্তকারী সংস্থা থেকে বলা হয়। তবে প্রকৃত ঘটনার পেছনে কি টাকা বা মহিলা সংক্রান্ত কোনো বিষয় ছিল? প্রশ্ন থেকে যায়। যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সেটা যে খতিয়ে দেখা দরকার, সে ব্যাপারে অনেকেই একমত। 

কিন্তু বর্তমানে কলকাতা ও ঢাকার তদন্তকারী যেসব সংস্থা তদন্ত করছে, তারা কি আসল সত্য উদ্ঘাটন করতে পারবে? নাকি কিছুদিন পর তারা ফাইল বন্ধ করে বলবেন, আমরা দেখছি। কিন্তু তারা কী দেখছেন, সেটা আমরা কোনোদিনই দেখতে পাব না। এই ধরনের মারাত্মক ঘটনার পেছনে আসল সত্য জনগণের সামনে আনা উচিত, এ কথা স্মরণে রাখা দরকার। যাকে দিয়ে করা হয়েছে, সেই কসাইকেও মুম্বাই থেকে ভাড়া করে আনা হয়েছিল। 

ঢাকা থেকে দুই দিন আগে কলকাতায় এসে পৌঁছেছেন ঢাকার গোয়েন্দাপ্রধান হারুন-অর-রশিদ। তার দুই সহকর্মী আব্দুল আহাদ এবং সায়েদুর রহমান কলকাতার সিআইডির সঙ্গে ঘন ঘন বৈঠক করছেন এবং ঘটনাস্থল ঘুরে দেখছেন। যদিও গোয়েন্দারা মনে করছেন যে, হত্যাকারীদের মোটিভ তারা খুঁজে বের করবেন, প্রশ্ন উঠেছে, তারা কি আদৌ সেটা পারবেন? সংসদ সদস্যের বন্ধু গোপাল বিশ্বাস হত্যার দিন থেকেই হৃদযন্ত্রের সমস্যাজনিত অসুখে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। ভারতের গোয়েন্দারা তার ওপর কড়া নজর রাখছেন। কিন্তু তিনি হাসপাতাল থেকে না বেরোনো পর্যন্ত তার মুখ থেকে কিছুই বের করা যাবে না। এই হত্যাকাণ্ডের ছক ঢাকা এবং আমেরিকায় করা হয়েছে বলে তদন্তকারী অফিসাররা মনে করছেন।

বাংলাদেশের শাসক দল আওয়ামী লীগের ঝিনাইদহের নির্বাচিত সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম যেভাবে, যে কায়দায় খুন হলেন, তাতে শুধু ভারত-বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্ব স্তম্ভিত। হত্যার পর তার দেহ যেভাবে টুকরো টুকরো করা হলো, সেটা শুধু উপমহাদেশে চর্চার ব্যাপার নয়। এই ঘটনাকে অনেকে তুলনা করছেন উগান্ডার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইদি আমিনের সঙ্গে। ইদি আমিন মানুষ কেটে মাংস খেতেন। তিনি একটা দেশের রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। তার এই ঘটনার কথা গোটা বিশ্ব জানে। তাই তারা ইদি আমিনের সঙ্গে ঢাকার কসাই জিহাদ হাওলাদারের তুলনা করছেন। জিহাদ জন্মসূত্রে বাঙালি হলেও মুম্বাইয়ে থাকত। 

এই ঘটনা নিয়ে দুই বাংলা উত্তাল। তবে সেই সঙ্গে কিছু প্রশ্নও উঠেছে। এই সংসদ সদস্য কোনো দিন ছাত্রলীগ বা যুবলীগের সদস্য ছিলেন না। তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি এরশাদকে ধরে। নানা সূত্রে বলা হয়, এরশাদ জমানায় তিনি নানা ধরনের ব্যবসায় নামেন। সেই ব্যবসার সূত্র ধরে তিনি এরশাদকে ছেড়ে যোগ দেন বিএনপিতে। বিএনপির আমলে একাধিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ঝিনাইদহসহ সংলগ্ন এলাকার মতুয়ারা দলে দলে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষে চলে আসেন। সংসদ সদস্য কলকাতা এলে যে বাড়িতে উঠতেন, সেই গোপাল বিশ্বাসও তার ঝিনাইদহের বন্ধু। খবরে প্রকাশ, মতুয়ারা এ দেশে চলে আসায় বহু গরিব মতুয়ার জমিবাড়ি সস্তায় কিনে নেন আনোয়ারুল আজীম আনার। 

এ ব্যাপারে তাকে সাহায্য করেছিলেন এই গোপাল বিশ্বাস। কলকাতায় আনারের ব্যবসায় টাকা-পয়সা লেনদেন করতেন এই গোপাল, এমনটাই ধারণা এখানকার গোয়েন্দা সংস্থার। কোনো কোনো মহল থেকে বলা হয়, বর্তমানে ভারতে যে নির্বাচন চলছে সেখানে কিছু টাকা-পয়সার লেনদেনও হতে পারে। এই লেখা পর্যন্ত গোপালকে পুলিশ গ্রেফতার করেনি। কারণ তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। সাংবাদিক হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে অনেক মধুচক্রের ঘটনা দেখেছি এবং রিপোর্টও করেছি। কিন্তু এই ধরনের পাশবিক হত্যাকাণ্ড কোনো মধুফাঁদের সূত্র ধরে ঘটে যেতে পারে, তা ছিল কল্পনারও অতীত। 

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে যেসব ব্যবস্থা নিয়েছে তা নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়। আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ অনেকেই এখানে প্রশ্ন তুলেছেন, কেন আনোয়ারুলের মতো বিতর্কিত একজনকে টিকিট দেওয়া হয়েছে? এনিয়ে তিনবার তিনি সংসদ সদস্য হয়েছেন। ঝিনাইদহ এলাকার বাসিন্দারা এবং সেখানকার রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিরা প্রশ্ন তুলেছেন, নির্বাচনের আগে তাকে দু-চার দিন দেখা যেত। তারপর আর দেখা যেত না। নিজের বন্ধুমহলেও তার গতিবিধি নিয়ে চর্চা ছিল। এই চর্চা সীমাবদ্ধ নেই ঢাকা বা কলকাতায়। এই চর্চা পৌঁছেছে আমেরিকায়ও।

গত ১৫-২০ বছর ধরে আনোয়ারুল মূলত দুটি ব্যবসা করতেন বলে খবর বেরিয়েছে। একটি হলো সোনার কারবার। আমেরিকা-দুবাই থেকে সোনা এনে ভারতে চোরাকারবার করা। আর দ্বিতীয় হলো হুন্ডির ব্যবসা। তার এই হুন্ডির ব্যবসায় কারা কারা জড়িত তাও খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। এই নৃশংস ঘটনায় শিলাস্তি নামে এক নারীর নাম উঠে এসেছে। পেশায় মডেল এই নারীকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে আনোয়ারুলকে প্রলুব্ধ করে অকুস্থলে নিয়ে গিয়েছিল খুনিরা। সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এমপি হওয়া সত্ত্বেও আনোয়ারুল একাই বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় সফর করছিলেন।

এই নারী আক্তারুজ্জামান শাহিনের সঙ্গে কলকাতা এসেছিলেন। আমেরিকাপ্রবাসী শাহিন খুনের পরিকল্পনা করে ঢাকা হয়ে আমেরিকা চলে যাওয়ার পরও কলকাতায় ছিলেন এই নারী।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, ইদি আমিনের শিষ্যরা এই ধরনের সন্ত্রাস-কর্ম কতদিন চালিয়ে যাবে? একজন সংসদ সদস্যের দেহ খণ্ড খণ্ড করে খালে, জলাজমিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ফলে আদৌ ওই দেহের অংশ খুঁজে পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক 

বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে: সতর্কতা জরুরি

প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৪, ১০:৪৮ এএম
বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে: সতর্কতা জরুরি
সৈয়দ ফারুক হোসেন

সম্প্রতি দেশের চার জেলায় বজ্রপাতে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবছর উদ্বেগজনকহারে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। বজ্রপাতে মৃত্যু থেকে রক্ষা পেতে সতর্কতার বিকল্প নেই। বাংলাদেশে বছরে দুটি মৌসুমে বজ্রপাত বেশি হয়। ২০২১ সালে বজ্রপাতে অন্তত ৩৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবছর মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সরকার ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে। দেশে বজ্রপাতের শিকার মানুষের বড় অংশ কৃষক, যারা সবার মুখে অন্ন তুলে দিতে মাঠে যান। আর সেখানেই মরে পড়ে থাকেন। পৃথিবীর বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলের একটি বাংলাদেশ। 

এ অস্বাভাবিকতার কারণ হচ্ছে বায়ুমণ্ডলে কালো মেঘ বেড়ে যাওয়া। কালো মেঘ সৃষ্টির পেছনে বাতাসে নাইট্রোজেন ও সালফারের পরিমাণ বাড়াকেই দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামান্য বৃষ্টিপাত বা ঝোড়ো বাতাসেও ঘটছে বজ্রপাত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৃতের সংখ্যা বেড়েছে, যার পেছনে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। বনের পরিমাণ এবং উঁচু গাছের সংখ্যা কমে যাওয়াও বজ্রপাতের অন্যতম কারণ। জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। আর প্রযুক্তি না থাকায় আগে থেকে পূর্বাভাস দিতে পারে না আবহাওয়া অধিদফতর। এ ক্ষেত্রে কালো মেঘ দেখলেই নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

প্রকৃতির এ ভয়াবহ খেয়ালে দিনকে দিন বেড়েই চলেছে মৃত্যুর সংখ্যা। বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেওয়ার মতো প্রযুক্তি এখনো অপ্রতুল হওয়ায় মানুষকে জানানো সম্ভব হয় না। সাধারণত এপ্রিল মাসে যে মেঘের সৃষ্টি হয় সেখানে সব মেঘেই বজ্রপাত থাকে। বর্ষা মৌসুমে মেঘের গর্জন হিসেবে পরিচিত ‘বজ্রপাত’ আমরা দেখতে পাই। বজ্রের গর্জন আর আকাশে চোখ ধাঁধানো স্ফূলিঙ্গ জানান দেয় বৃষ্টির বার্তা।  ইদানীং এই বজ্রপাত আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বজ্রপাতের স্থায়িত্বকাল এক সেকেন্ডের দশ ভাগের এক ভাগ। ঠিক এই সময়েই বজ্রপাতের প্রভাবে বাতাস সূর্যপৃষ্ঠের পাঁচ গুণ বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। শব্দের গতি আলোর গতির থেকে কম হওয়ায় বজ্রপাতের পরই শব্দ শোনা যায়। 

বজ্রপাত ভূমিকম্পের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। একটি বজ্রপাতে প্রায় ৫০ হাজার অ্যাম্পিয়ার বিদ্যুৎশক্তি থাকে। অথচ বাসাবাড়ির বিদ্যুৎ চলে গড়ে ১৫ অ্যাম্পিয়ারে। একটি বজ্র কখনো কখনো ৩০ মিলিয়ন ভোল্ট বিদ্যুৎ নিয়েও আকাশে জ্বলে ওঠে। যেটি আমরা সবচেয়ে বড় ভুল করে থাকি, সেটি হচ্ছে বড় গাছের নিচে আশ্রয় নিয়ে থাকি। এটি  আসলে ঠিক নয়। নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই কৃষক ও জেলে। এ ছাড়া বাসার ছাদে ও মাঠে খেলার সময় বজ্রপাতে প্রাণ হারায় শিশুরাও। আকাশে কালো মেঘের ইঙ্গিত দেখলেই নিরাপদ ছাউনির নিচে আশ্রয় নেওয়া উত্তম। বজ্রপাতের কারণে মূলত দুটি উপায়ে মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকে। একটি প্রত্যক্ষ বা সরাসরি আঘাত, যা মানুষের শরীরের ওপর সরাসরি পড়ে। দ্বিতীয়টি পরোক্ষ আঘাত। সরাসরি আঘাতে মানুষের মৃত্যুর হার অনেক কম। 

এ ধরনের ঘটনা খুব কমই ঘটে থাকে। বিশ্বব্যাপী যত মানুষের মৃত্যু হয় তার মধ্যে সবচেয়ে কম মৃত্যু হয় প্রত্যক্ষ আঘাতের কারণে। এটি দুর্লভ ঘটনা। বেশির ভাগ মৃত্যুই হয় পরোক্ষ আঘাতের কারণে। পরোক্ষ আঘাতও কয়েক ধরনের হয়ে থাকে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে- যেখানে বজ্রপাত আঘাত হানছে সেখানকার পুরো জায়গাটি বিদ্যুতায়িত হয়ে যাওয়া। একে বলা হয় ভূমির বিদ্যুতায়ন। এভাবেই সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকে। 

২০১৩ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বজ্রপাতে মারা গেছে ১ হাজার ৮৭৮ এবং তাদের ৭২ শতাংশই কৃষক। বড় গাছগুলো আগে বিজলীর বিরুদ্ধে কাজ করত, ফলে প্রাণহানি কম হতো। বজ্রপাত থেকে বাঁচতে সচেতনতার বিকল্প নেই। সতর্ক হলে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো যেতে পারে। দুঃখজনক সত্যটি হলো, বাংলাদেশে বজ্রপাতের ওপর তেমন কোনো গবেষণা নেই। বজ্রপাত একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও বর্তমানে মৃত্যুর সংখ্যা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, বিষয়টি সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। বজ্রপাত থেকে বাঁচতে জরুরি নির্দেশনা মেনে চলা উচিত। এর ফলে রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি  থাকবে। 

কিছু কিছু নিয়ম মেনে নিজেকে এবং পরিবারের সদস্যদের বজ্রপাতের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। বজ্রপাতের সময় এসব সচেতনতামূলক বিষয় খেয়াল করে  চললে প্রাণহানিসহ নিজেকে এবং পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করা সম্ভব। যেমন- বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির ধাতব রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ না করা। প্রতিটি বিল্ডিংয়ে বজ্রনিরোধক স্থাপন নিশ্চিত করা। কোনোমতে একাজে অবহেলা করা যাবে না। খোলা স্থানে অনেকে একত্রে থাকাকালীন বজ্রপাত শুরু হলে প্রত্যেকে ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরে দূরে সরে যাওয়া। কোনো বাড়িতে যদি পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকে তাহলে সবাই এক কক্ষে না থেকে আলাদা আলাদা কক্ষে অবস্থান করা। খোলা জায়গায় কোনো বড় গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া যাবে না। গাছ থেকে চার মিটার দূরে থাকতে হবে। কারণ বড় গাছের মধ্যে বজ্রপাত হলে সেই গাছের ডালপালা ভেঙে মাথায় পড়তে পারে। বৈদ্যুতিক তারের নিচ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হবে। ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্লাগগুলো লাইন থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। 

যদি কেউ বজ্রপাতে আহত হয় তাহলে বজ্রপাতে আহতদের বৈদ্যুতিক শকের মতো করেই চিকিৎসা দিতে হবে। বজ্রপাতে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে অকারণে ঘোরাফেরা করা থেকে বিরত থাকাই উত্তম। বজ্রপাতের সময় যত দ্রুত সম্ভব দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেওয়া। বজ্রপাতের সময় বাড়িতে থাকলে জানালার কাছাকাছি বা বারান্দায়  না থাকা এবং ঘরের ভেতরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকা উচিত। ঘন-কালো মেঘ দেখা গেলে অতি জরুরি প্রয়োজনে রাবারের জুতা পরে বাইরে বের হলে উত্তম। বজ্রপাত শুরু হলে উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি, তার, ধাতব খুঁটি ও মোবাইল টাওয়ার ইত্যাদি থেকে দূরে থাকা। বজ্রপাতের সময় জরুরি প্রয়োজনে প্লাস্টিক বা কাঠের হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করা। বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গা, মাঠ বা উঁচু স্থানে না থাকা। 

বাংলাদেশে বজ্রপাত নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তাদের মতে, বাংলাদেশে বজ্রপাতের মূল কারণ দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান। বাংলাদেশের একদিকে বঙ্গোপসাগর, এরপরই ভারত মহাসাগর। সেখান থেকে গরম আর আর্দ্র বাতাস আসছে। আবার উত্তরে রয়েছে পাহাড়ি এলাকা, কিছু দূরেই হিমালয় রয়েছে, যেখান থেকে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। এই দুই বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। 

দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ উদাসীনতা, অবহেলা, উপেক্ষা। বজ্রপাত নিয়ে এই উপেক্ষার কারণে মারা যায় সাধারণ মানুষ। ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির দিক থেকে বিবেচনা করে বজ্রপাতকে নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করছেন গবেষকরা। বজ্রপাতে মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় ২০১৬ সালের ১৭ মে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বজ্রপাতে আহতরা স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে যায়। হাওড়, বাঁওর ও বিল এলাকার জেলাগুলোয় বজ্রপাতে মৃত্যু বেশি। ঝড়বৃষ্টির সময় খোলা মাঠ, নৌকা ও পথঘাটে যারা চলাচল করে তারাই এর শিকার। 

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে বজ্রপাতের ঘটনা ১৫-২০  শতাংশ বেড়েছে।  বজ্রপাতে একটি মৃত্যু হলে আরও অনেকেই আহত হন। অন্য দুর্ঘটনায় আহত আর বজ্রাঘাতে আহতের মধ্যে পার্থক্য আছে। এই দুর্ঘটনায় আহতরা স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে যান। সাধারণত এই দুর্যোগের শিকাররা সংশ্লিষ্ট পরিবারের সবচেয়ে কর্মক্ষম ব্যক্তি। বজ্রঝড় সাধারণত ৩০-৩৫ মিনিট স্থায়ী হয়। এ সময়টুকু ঘরে অবস্থান করতে হবে। অতি জরুরি প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যেতে হলে রাবারের জুতা পরে বাইরে যেতে হবে। বজ্রপাতের সময় ধান খেত বা খোলা মাঠে যদি থাকেন তাহলে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এবং কানে আঙুল দিয়ে নিচু হয়ে বসে পড়তে হবে। বজ্রপাতের আশঙ্কা দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব ভবন বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে। ভবনের ছাদে বা উঁচু ভূমিতে যাওয়া উচিত হবে না। 

বজ্রপাতের সময় যেকোনো ধরনের খেলাধুলা থেকে শিশুকে বিরত রাখতে হবে, ঘরের ভেতরে অবস্থান করতে হবে। খালি জায়গায় যদি উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি, ধাতব পদার্থ বা মোবাইল টাওয়ার থাকে, তার কাছাকাছি থাকবেন না। বজ্রপাতের সময় ছাউনিবিহীন নৌকায় মাছ ধরতে না যাওয়া উচিত। সমুদ্র বা নদীতে থাকলে মাছ ধরা বন্ধ রেখে নৌকার ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে। যদি কেউ গাড়ির ভেতর অবস্থান করেন, তাহলে গাড়ির ধাতব অংশের সঙ্গে শরীরের সংযোগ রাখা যাবে না। ঝড়/জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের মৃত্যুর হার যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি মৃত্যুর হার বজ্রপাতে। 

বজ্রপাতের ধর্ম হচ্ছে তা মাটিতে আঘাত হানার আগে সবচেয়ে উঁচু যে জায়গাটি পায় সেখানে গিয়ে পড়ে। বৃক্ষহীন হাওড় এলাকায় কৃষকের শরীরই মাটির চেয়ে উঁচু থাকে। হাওড় এলাকায় বজ্রপাত প্রতিরোধক দণ্ড স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আশা করা যায়, এতে মৃত্যু কমবে। প্রযুক্তির ব্যবহার করে বজ্রপাতে মৃত্যু কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে, তবে সচেতনতা এবং সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। ওদিকে আমাদের দেশে বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির লাশ চুরিরও হিড়িক পড়ে যায়। এখনই এই দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে করোনার মতো এটি স্থায়ী রূপ ধারণ করতে পারে।

লেখক: রেজিস্ট্রার, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর
[email protected]

গ্রাম ও শহরে শক্তিশালী সালিশি ব্যবস্থা এবং উপজেলায় পূর্ণাঙ্গ আদালত স্থাপন করুন

প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৪, ১১:৫৪ এএম
গ্রাম ও শহরে শক্তিশালী সালিশি ব্যবস্থা এবং উপজেলায় পূর্ণাঙ্গ আদালত স্থাপন করুন
ড. তোফায়েল আহমেদ

সাধারণভাবে সারা ভারতবর্ষ বিশেষভাবে বৃহত্তর বাংলা বা বর্তমান বাংলাদেশের বিচার ও সালিশি ব্যবস্থার ইতিহাস একটি বৈচিত্র্যময় অধ্যায়। এ ইতিহাসের ধারাবাহিক কোনো নির্ভরযোগ্য লিখিত দলিল নেই। খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ অব্দ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন রাষ্ট্র ও শাসকের শাসন ও বিচারব্যবস্থা এবং যুগে যুগে শাসকদের হস্তক্ষেপের বাইরে স্বতঃপ্রণোদিত স্বাধীন সমাজ ও সে সমাজের বিরোধ নিষ্পত্তির সনাতনী সালিশি প্রথা ও পদ্ধতির (পঞ্চায়েত/গ্রাম সমিতি) অস্তিত্ব নানাভাবে নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ খুঁজলে পাওয়া যায়। এখানে প্রাগৈতিহাসিক হিন্দু (আর্য-অনার্য) বৌদ্ধ, জৈন সমাজ ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ‘গণরাজ্য’ এবং বিদগ্ধ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত কৌটিল্য উদ্ভাবিত মৌর্য শাসন এবং যা সে শাসনামলের বিচার ও দণ্ডবিধি তথা প্রাচীন ভারতের শাসন ও বিচারব্যবস্থার ভিত রচনার প্রামাণ্য দলিল হিসেবে সবিস্তারে বিধৃত। তবে গ্রাম্য সমাজের শাসন ও বিচারে বোধগম্য কারণে রাজন্যবর্গ হস্তক্ষেপ করতেন না। গ্রাম্য সমাজ তাদের নিজস্ব প্রথা-পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করেই চলত। এ কারণে সমাজ স্থিতিশীল ছিল এবং এই স্থিতিশীলতাই রাজন্যবর্গের কাম্য ছিল।

রাজতন্ত্র উদ্ভবের পর থেকে গুপ্ত যুগ পর্যন্ত বিচারব্যবস্থার বিস্তৃত বা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। মৌর্য যুগে কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ শাসনের সঙ্গে বিচার, দণ্ড, নৈতিকতা প্রভৃতির ওপর বিশদ কাঠামো সৃষ্টি করে। প্রাচীন হিন্দু যুগের বিচার সংস্কৃতি মোগলপূর্ব মুসলিম শাসন ও মোগলদের সময়ের বিচারব্যবস্থার পরম্পরা অব্যাহত রেখেছে। ওপরে রাজা, রাজবংশ, বাদশাহর পর হাজার বছরব্যাপী পরিবর্তন হলেও তলের সমাজকে তা খুব অল্পই স্পর্শ করেছে। মুসলিম শাসকদের কাজির বিচারব্যবস্থার আওতায় গ্রাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না। বড়জোর পরগনায় এসে তা আর নিচে যাওয়ার বা নেওয়ার অবকাশ ছিল না। ব্রিটিশদের আগমন এবং কোম্পানি আমলে দ্বৈতশাসন অবসানের পর থেকে ঔপনিবেশিক স্বার্থকে সামনে রেখে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতব্যবস্থার সূচনা হয়। এ আদালত মূলত ছিল প্রশাসনেরই একটি প্রলম্বিত দক্ষিণহস্ত। যেখানে শেষ পর্যন্ত রাজদণ্ডই প্রাধান্য পেত। জনহিতের চেয়ে রাজস্ব আহরণ, শাসন ও জনশৃঙ্খলা রক্ষাই ছিল বিচারের মূল লক্ষ্য। লর্ড হেস্টিংসের আমলের নন্দকুমারের ফাঁসিকে আধুনিক আইনের পরিভাষায় ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’ বলা হয়। ১০০ বছরের কোম্পানি শাসনের পর ১৮৫৭ সালের ‘প্রথম স্বাধীনতা’ সমরের পর যখন ভারতবর্ষকে কোম্পানি শাসন থেকে সরাসরি ব্রিটিশ রানির শাসনের অধীন করা হয়, তারপর থেকে ফৌজদারি দণ্ডবিধি ও দেওয়ানি আইনসমূহ প্রণীত হয় এবং ব্রিটিশ আদলের আদালতব্যবস্থা কার্যকর হতে থাকে। তবে গ্রামীণ সালিশি-সংস্কৃতির ধারা পূর্ববৎ অক্ষুণ্ন ও অব্যাহত থাকে।

ভারতবর্ষের গ্রামগুলো কোনো আইনি সহায়তা এবং আইনি বাধাবিঘ্ন ছাড়া অত্যন্ত স্বাধীনভাবে সালিশি প্রথাকে বিরোধ মীমাংসার সর্বজনীন প্রথা ও পদ্ধতি হিসেবে চালিয়ে যেতে থাকে। ব্রিটিশ এবং ভারতীয় ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা ভারতীয় ‘সালিশি’ ব্যবস্থার ন্যায্যতা ও সুবিচারের মোটামুটি প্রশংসা করেছেন। তবে প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু ও তর্জনী কোথাও কোথাও যে দুর্বলের ওপর প্রয়োগ হয়নি, সেটি বলা যাবে না। দুর্বল ও দরিদ্রদের ইংরেজের ব্যয়বহুল ও দূরবর্তী আদালত থেকে সুবিচারের লেশমাত্র আশাও ছিল না। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলেও ব্রিটিশসৃষ্ট আদালত এবং আইনকানুনের ধারাবাহিকতা বর্তমান ও বিদ্যমান। এখানে এখনো কীভাবে ‘বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে’ তা সম্প্রতি প্রকাশিত সায়েদুর রহমান তালুকদারের ‘সালিশ বিচারের ইতিবৃত্ত’ নামক বইটিতে অত্যন্ত সার্থক ও সফলভাবে ঐতিহাসিক নানা উপাদান, তথ্য-উপাত্ত এবং বাস্তব ঘটনা সমীক্ষা দ্বারা প্রদর্শন করেছেন। সায়েদুর রহমান বনাম জিতু মিয়া গং শীর্ষক একটি মামলা ১৯৯৫ সাল থেকে নিম্ন আদালত, হাইকোর্ট, আপিলেট ডিভিশনের রায় পাওয়ার পরও বাদী ২০২৪ সাল পর্যন্ত একটি জমির দখল বুঝে নিতে পারেননি (পৃষ্ঠা-৩০২-৩০৬)। কারণ এ দেশে আদালতের রায়ই শেষ কথা নয়। এ রায় বের করতে যে কাঠখড় পোড়াতে হয় তাতে বাদী-বিবাদীর বাড়িঘর ছাই হয়ে যায়। কৌঁসুলিদের কূটকৌশল, আদালতের কর্মচারীদের ছলনা, প্রশাসন ও পুলিশের রায় বাস্তবায়নে ইচ্ছা ও অনিচ্ছাকৃত অবহেলা নিরীহ বিচারপ্রার্থীর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে। এ বইয়ে মামলার দীর্ঘসূত্রতার ঘটনা সমীক্ষা এবং দ্রুত, ব্যয়সাশ্রয়ী ও সফল গ্রামীণ সালিশের সাতটি কেস স্টাডি আছে। প্রতিটি কেস স্টাডিতে সফলতা-বিফলতার কাহিনিগুলো পাওয়া যায়।

তদানীন্তন পাকিস্তানে এবং তার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে সালিশি ব্যবস্থার আইনিকরণ করতে গিয়ে আনুষ্ঠানিক আদালত ও প্রথানির্ভর সালিশি ব্যবস্থার মাঝামাঝি নিম্ন স্তরের স্থানীয় সরকার তথা ইউনিয়ন পরিষদকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে একধরনের আদালতবহির্ভূত আদালত সৃষ্টি করা হয়েছে। ধারণা ছিল, এর মাধ্যমে আইনি কাঠামোর অধীনে গ্রামীণ সালিশি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। কিন্তু এ আইনি বিধান ও সহায়তা সঠিকভাবে কাজ করছিল না। তাই বারবার সংশোধন করে এখতিয়ার বৃদ্ধি করা হয়। অর্থ দণ্ডদান ক্ষমতা বাড়ানো হয়। কিন্তু পাঁচ সদস্যের গ্রামীণ আদালতের পঙ্গুত্ব কাটে না। ‘গ্রাম আদালত’ প্রথাগত গ্রামীণ সালিশ বা আনুষ্ঠানিক আদালত কোনোটারই বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। এখন দেখাদেখি আবার পৌরসভাগুলোও বিচারিক ক্ষমতার দাবি করছে এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণের অংশ হিসেবে পৌরসভাকেও সীমিত বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে আইন প্রণীত হয়েছে। কিন্তু এত সব সত্ত্বেও মানুষ বেশি সংখ্যায় প্রথাগত সালিশের ওপর নির্ভরশীল। এর বহুবিদ কারণ রয়েছে। ২০১৫ সালের ২৯ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকের এক রিপোর্টের ভাষ্য অনুযায়ী, সালিশের মাধমে বছরে দেড় কোটি বিরোধ নিষ্পত্তি হয়। পরবর্তী সময়ে নানা সূত্র সে তথ্য অস্বীকার করে এবং নানা বিচারে তা ৭৩ লাখ বলে স্বীকৃত হয়। দেশের আদালতগুলোয় ২০২২-এ ৪৩+ নতুন ৬ লাখ মামলা বিচারাধীন। প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ নতুন মামলা হয়। দেশের নিম্ন আদালতের বিচারক সংখ্যা কমবেশি ২০০০ (শাহদীন মালিক, ২২-০৫-২০২৪) এবং উচ্চ আদালতে দেড় থেকে ২০০ জন। এমতাবস্থায় দেশের বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কী? মামলাজট কি আমাদের চিরস্থায়ী নিয়তি?

স্থানীয় সরকার রাজনৈতিক দলনির্ভর জনপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান। এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে মানুষ বিচারিক নিরপেক্ষতা আশা করে না। তাই গ্রাম আদালত বা পৌর আদালত এ রকম একটি অবস্থায় কোনো সঠিক বিকল্প বা রক্ষকবচ নয়। এ জাতীয় জনতুষ্টিমূলক আদালতের চেয়ে সনাতনী সালিশি ব্যবস্থা অনেকটা কার্যকর। নিম্নে এ বিষয়ে পাঁচটি কারণ উল্লেখ করা হলো।

এক. ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা চেয়ারম্যান, মেয়র, সদস্য ও কাউন্সিলররা মূলত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তারা নিজস্ব সমর্থক গোষ্ঠীকে সংগঠিত করে নির্বাচনে লড়ে জয়লাভ করেন। দাঙ্গা-হাঙ্গামা, সন্ত্রাস, খুন-জখম নির্বাচন ও রাজনীতির পরিচিত অনুষঙ্গ। একটি নির্বাচিত পক্ষের এক বা একাধিক বিরোধী পক্ষ থাকে। তাই নির্বাচিত রাজনৈতিক ব্যক্তির নিরপেক্ষ বিচারক হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অসম্ভব।

দুই. স্থানীয় সরকারের নেতারা বিচারক হওয়ার জন্য নির্বাচন করেন না। তারা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ও জনসেবা করার জন্য নির্বাচন করেন। দেশের দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনে তাদের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকে না। তা ছাড়া ভারতসহ পৃথিবীর কোথাও স্থানীয় সরকারের ওপর বিচারের ভার নেই। এতে বাংলাদেশেও স্থানীয় সরকারের সাধারণ কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিন. বাংলাদেশে অবশেষে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার সংবিধানে নির্বাহী অংশের অন্তর্ভুক্ত সংস্থা। এখানে বিচারকাজ অর্পণ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। 

চার. গ্রাম আদালতের বা পৌর আদালতের দণ্ডদান ক্ষমতা যতই বাড়ানো হোক তা কখনো নিম্ন আদালতের বিচারকের ক্ষমতাকে অতিক্রম করতে পারবে না। তাই বিরোধের গুরুত্ব অনুসারে সব বিরোধের অভিযোগ গ্রাম আদালত বা পৌর আদালতে বিচার করা যায় না। কিন্তু সালিশের সে সীমাবদ্ধতা নেই। সালিশি আপস-মীমাংসার মাধ্যমে যেকোনো বিষয়ে মীমাংসার উদ্যোগ নিতে পারবে এবং নিচ্ছে।

পাঁচ. গ্রাম আদালতের একজন প্রধানসহ বিচারক মোট পাঁচজন। সালিশে সালিশকারীর সংখ্যার সীমাবদ্ধতা নেই। সময়ের সীমাবদ্ধতা নেই। সালিশকারীরা মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত উঠে যান না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন এবং শেষ পর্যন্ত একটি আপস-মীমাংসায় উপনীত হন।

ছয়. সালিশকারীরা ছাড়াও সালিশিস্থলে বহু মানুষ দর্শক হিসেবে উপস্থিত থাকে, তাতে সালিশের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির একটি পরিবেশ তৈরি হয়। যা গ্রাম আদালতের পাঁচজনের ছোট্ট প্রকোষ্ঠে সম্ভবপর নয়।

সাত. গ্রাম আদালত বা পৌর আদালতের ওপর কোনো বিচার বিভাগীয় নজরদারি নেই। উপরন্তু কোনো আদালতের তত্ত্বাবধান ছাড়া কোনো আদালত কাজ করতে পারে না। এসব বিচার কার্যক্রমের ওপর কারও কোনো তত্ত্বাবধান বা নিয়ন্ত্রণ নেই।

গ্রাম আদালত আইনি সত্তা হওয়া সত্ত্বেও চেয়ারম্যান-মেম্বাররা নিজেরাও প্রতিদিন অন্যান্য সালিশকারীকে নিয়ে গ্রাম আদালতের বাইরে অসংখ্য সালিশ-মীমাংসায় সময় দেন। কারণ বিরোধের ধরন ও প্রকৃতি তথাকথিত আদালতের এখতিয়ারবহির্ভূত এবং সাধারণ মানুষ ও বিচারপ্রার্থীরা গ্রাম আদালতের ওই পাঁচজনের বিচারের ওপর আস্থাশীল নন। তাই সায়েদুর ররহমান তালুকদারের সঙ্গে আমিও একমত। সালিশি ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে আইনি স্বীকৃতি দিন। সালিশকে ইউনিয়ন ও পৌরসভার সহায়তায় যথাযথভাবে রেকর্ড করুন। কেউ বিচার মেনে বা না মেনে আনুষ্ঠানিক আদালতে গেলে সে আদালত যাতে সালিশের রায়কে রেফারেন্স হিসেবে বিবেচনা করে সে ব্যবস্থাটি নিশ্চিত করলে সালিশি ব্যবস্থা একটি নতুন প্রাণ পাবে। গ্রাম আদালত, পৌর আদালত ও প্রথাগত সালিশ এসবের জটিলতার অবসান হবে। গ্রাম-শহর সর্বত্র একই সালিশি ব্যবস্থা একটি আইনি ভিত্তি পাবে।

সালিশ কখনো আনুষ্ঠানিক আদালতব্যবস্থার বিকল্প নয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সবার আদালতে প্রবেশাধিকার অপরিহার্য। আর আনুষ্ঠানিক আদালতে সাধারণ মানুষের অভিগম্যতা (Access to Justice) বৃদ্ধি এবং আদালত থেকে মামলার বোঝা কমাতে চাইলে উপজেলা পর্যায়ে নিম্ন আদালত সম্প্রসারণই সবচেয়ে উত্তম সমাধান। জেলা আদালতের অংশ হিসেবে যেসব উপজেলা (দেওয়ানি ও ফৌজদারি) আদালত জেলা সদরে রয়েছে সেগুলোকে উপজেলায় পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হোক। নতুন করে উপজেলায় পূর্ণাঙ্গ ‘উপজেলা আদালত’ গঠন করা হোক এবং উপজেলা আদালতই হোক দেশের নিম্নতম আদালত। এখানে সাধারণ মানুষের হাজিরা, সাক্ষী নিয়ে আসা, বাদী-বিবাদীর আসা-যাওয়া সহজ ও ব্যয়সাশ্রয়ী। অন্তত ১৯৮১ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত উপজেলা আদালত তার সফলতার সাক্ষ্য বহন করে।

লেখক: স্থানীয় শাসন বিশেষজ্ঞ, লেখক ও গবেষক
[email protected]