ঢাকা ৫ আষাঢ় ১৪৩১, বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪

পৃথিবীর ইতিহাসে ফিলিস্তিনিদের মতো কেউ ত্যাগ স্বীকার করেনি: ইউসুফ রামাদান

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৪, ১১:১৫ এএম
আপডেট: ১৫ মে ২০২৪, ১১:১৫ এএম
পৃথিবীর ইতিহাসে ফিলিস্তিনিদের মতো কেউ ত্যাগ স্বীকার করেনি: ইউসুফ রামাদান
বাংলাদেশে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস ওয়াই রামাদান

বাংলাদেশে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস ওয়াই রামাদান। ৯ বছর ধরে এ দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে তার অবদান অতুলনীয়। হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধ, ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতি, বিশ্বব্যাপী চলমান আন্দোলনসহ তার ব্যক্তিজীবন ও ফিলিস্তিনসংক্রান্ত নানা প্রসঙ্গ নিয়ে খবরের কাগজের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিরাজ রহমানরিয়াজ উদ্দীন। সঙ্গে ছিলেন রায়হান রাশেদ

খবরের কাগজ: প্রথমেই জানতে চাই, ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতি কী? 

ইউসুফ রামাদান: ফিলিস্তিনের সর্বশেষ পরিস্থিতি হলো, কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রথমে ইসরায়েলের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হলে তারা কিছু সংশোধনী দেয় এবং হামাস এ প্রস্তাবে সম্মতি জানায়। হামাসের সম্মতির বিষয়টি নেতানিয়াহুকে খুবই অবাক করেছে। কারণ, তিনি এমনটা শুনতে চাচ্ছিলেন না। নেতিবাচক কিছু শুনতে চেয়েছিলেন তিনি। তারা ভেবেছে, এ সংশোধনী হামাস প্রত্যাখ্যান করবে। 

নেতানিয়াহুর হয়ে যারা কাজ করে, তারা তাকে বলেছে- এ প্রস্তাব হামাস মেনে নেবে না। কিন্তু হামাস শেষ মুহূর্তে চমক দেখিয়েছে, মেনে নিয়েছে। নেতানিয়াহু এবং তার সরকারের জন্য এটি অবাক করা খবর। কারণ তিনি যেকোনো উপায়ে, যেকোনো মূল্যে এ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান। এ যুদ্ধের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা তার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর সঙ্গে তার ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ জড়িত। যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেলে নেতানিয়াহুর ক্যারিয়ারও থমকে যাবে। 

বিশ্বের প্রায় সব সচেতন মানুষ বিশ্বাস করে, এ যুদ্ধটা ইসরায়েলের নয়; নেতানিয়াহুর এবং তার সরকারের যুদ্ধ। যদিও বর্তমান সময়ের সবকিছু নেতানিয়াহুর স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। 

মিসর, কাতার, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বহু প্রভাবশালী দেশসহ ফিলিস্তিনিরা চাচ্ছেন, এবার অন্তত এ যুদ্ধটি বন্ধ হোক। কিন্তু নেতানিয়াহুর একগুঁয়েমির কারণে বিষয়টি থমকে আছে। নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ইসরায়েল একা লড়তে পারে। সুতরাং আমরা অপেক্ষা করছি সামনে কী ঘটে। 

খবরের কাগজ: ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের বর্তমান অবস্থা কেমন?

ইউসুফ রামাদান: ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করার মতো নেই। এ পরিস্থিতির সঠিক ব্যাখ্যা করা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। গাজার মানুষ পুরোপুরি দুর্দশাগ্রস্ত, এমনকি পশ্চিম তীরের মানুষও মারা হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যার মধ্যে বহু নারী ও শিশু রয়েছে। গাজার বর্তমান পরিস্থিতিটা আসলে অনুমান করা সম্ভব নয়, লাখ লাখ মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছে এবং আহত অবস্থায় কাতরাচ্ছে। গাজা ভূখণ্ডের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। অসংখ্য মানুষ গৃহহীন হয়ে এখন নিজ দেশেই শরণার্থী। এর ওপর খাবারের চরম সংকট বিরাজ করছে। গাজায় যে পরিমাণ খাবার প্রবেশ করছে, তাতে ২০ শতাংশ মানুষের চাহিদাও মিটছে না। ২০ শতাংশ মানুষের অপ্রতুল খাবার বণ্টিত হচ্ছে পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্যে। ফলে তৈরি হচ্ছে তীব্র খাদ্যসংকট। 

এর মানে এই নয় যে, বহির্বিশ্ব আমাদের সহযোগিতা করছে না। বাংলাদেশসহ অনেক দেশ খাবার ও ওষুধসহ বিভিন্ন জিনিস দিয়ে সহযোগিতা করছে। কিন্তু ইসরায়েল সেসব সামগ্রী ফিলিস্তিনে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না। ইন্টারনেট নেই, যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই, খাদ্য ও পানি নেই, ওষুধ নেই। সব বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। মসজিদ, চার্চ ধ্বংস করা হয়েছে। হামলার কারণে অকার্যকর হয়ে গেছে সব হাসপাতাল ও ক্লিনিক। কারও কাছে প্রয়োজনীয় ওষুধও নেই। ছোট একটি উদাহরণ দিই, কোথাও কোনো অ্যানেস্থেসিয়ার ব্যবস্থা নেই। অ্যানেস্থেসিয়া ছাড়া সব ধরনের অপারেশন করা হচ্ছে। ১০ বছরের একটি বালকের পা কেটে ফেলা হয়েছে অ্যানেস্থেসিয়া ছাড়াই। এবার আপনি চিন্তা করে দেখুন, সেখানকার মানুষ কেমন জীবন যাপন করছে!

খবরের কাগজ: যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী?

ইউসুফ রামাদান: দেখুন, রাজনীতিতে সবাই নিজ নিজ স্বার্থের কথা চিন্তা করে কাজ করে। যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ ছিল যেকোনো উপায়ে, যেকোনো মূল্যে ইসরায়েলকে সমর্থন করা। ‘ইসরায়েলেরও তাকে রক্ষা করার অধিকার রয়েছে’- এমন নীতির পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। আমরা অনেকেই জানি, আমেরিকায় জায়োনিস্ট লবি (কট্টরপন্থি ইহুদিদের প্রভাব ও গ্রুপিং) খুবই শক্তিশালী এবং কার্যকর। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো অন্য কোনো লবি আমেরিকায় নেই। এটা যেমন বর্তমানে আছে, তেমন অতীতেও ছিল। ফিলিস্তিন-ইসরায়েল যুদ্ধের শুরু (১৯৪৮ সাল) থেকে, আমেরিকার জায়োনিস্ট লবি ইসরায়েলের পক্ষে কাজ করছে। দেখুন, আমেরিকায় ৬০-৬৫টি দেশের ৩০-৪০ লাখ মুসলমান রয়েছে। তারা সবাই আলাদা দলে, কমিউনিটিতে বিভক্ত। আলাদা স্থান ও সমাজে বসবাস করে। তাদের মধ্যে শক্তিশালী ঐক্য নেই। আর এই অনৈক্য ভিন্ন লবিকে আমেরিকায় যেভাবে খুশি সেভাবে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ করে দিচ্ছে। 

এ ছাড়া জায়োনিস্ট লবির আর্থিক সামর্থ্য অনেক বেশি এবং গণমাধ্যমেও তারা খুবই সক্রিয়। ফলে জায়োনিস্ট লবি আমেরিকায় খুবই শক্তিশালী। হোয়াইট হাউস, সিনেট, কংগ্রেসসহ আমেরিকার সর্বত্র এদের বিচরণ। আমি এটাকে ‘আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়া ক্যানসার’ বলে থাকি। এ লবি আমেরিকার সরকারের মাধ্যমে মানুষের স্বাধীনতাকে বাজেয়াপ্ত করার মতো প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা রাখে। পরিস্থিতি এখন এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আপনি আমেরিকান হলে আমেরিকার সবকিছু নিয়ে সমালোচনা করতে পারবেন, দেশটির প্রেসিডেন্ট এবং কংগ্রেস সদস্যদের নিয়েও কথা বলতে পারবেন, কিন্তু কোনোভাবেই ইসরায়েলের সমালোচনা করতে পারবেন না। এভাবে আপনার কাছ থেকে স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। যেটা নিয়ে আমেরিকারও কিছু করার নেই। ইসরায়েলের সমালোচনা করলে তারা আপনাকে অ্যান্টিসিমেটিকের তকমা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করলে কিছুই হবে না।

বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফিলিস্তিনের চৌকস কিছু সাংবাদিক সবকিছু রেকর্ড করছেন এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এ কাজ করতে গিয়ে তাদের অনেকেই জীবন হারিয়েছেন, অনেকে পরিবার হারিয়েছেন। তবু তারা কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে আমেরিকায় ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছে।

খবরের কাগজ: আপনার কথার সূত্র ধরে জানতে চাই, আমেরিকার ছাত্র আন্দোলনকে ফিলিস্তিন কীভাবে দেখে?  

ইউসুফ রামাদান: এই বিপ্লব, ছাত্রদের এই আন্দোলন আমেরিকার প্রশাসনকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে, কার পক্ষে অবস্থান নেবে তারা। আমেরিকার জনসাধারণের স্বার্থ দেখবে নাকি ইসরায়েলের স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নেবে। আর এ কারণে আমেরিকা এখন জোরালোভাবে যুদ্ধবিরতি চাচ্ছে। অথচ তারা ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্যপদের দাবিতে আলজেরিয়ার প্রস্তাবে ভেটো দেওয়াসহ তিনবার যুদ্ধবিরতিতে ভেটো দিয়েছে। ছয় মাসে তারা চারবার ভেটো দিয়েছিল। আর এটাই জায়োনিস্ট লবিস্টদের অভূতপূর্ব ক্ষমতা। এভাবেই নেতানিয়াহু সমর্থকরা জো বাইডেনকে প্রতিবন্ধকতায় ফেলে। 

পরিস্থিতি এখন কিছুটা পাল্টেছে। বাইডেন বুঝতে পারছেন, বারবার একই পথে যাওয়াটা তার দেশ, জনগণ ও প্রশাসনের স্বার্থের বিপক্ষে যাচ্ছে। তিনি বিকল্প ভাবতে শুরু করেছেন। তিনি ইসরায়েলকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ না দেওয়ার কথাও বলছেন। এর মানে এই নয় যে, তিনি গাজার মানুষকে ভালোবাসেন কিংবা তাদের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন; আসলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসরায়েলবিরোধী আন্দোলনের কারণে তিনি এমনটা করতে বাধ্য হচ্ছেন। আমরা আশাবাদী। কারণ ইসরায়েল বর্তমানে সারা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। হামাসের প্রস্তুাব মেনে নেওয়াটা ইসরায়েলকে আরও কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। এখন হয়তো তারা চরমভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, নয়তো ভিন্ন কিছু চিন্তা করবে।   

খবরের কাগজ: বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশ, বিশেষত আরব বিশ্বের ভূমিকায় কি আপনারা সন্তুষ্ট?

ইউসুফ রামাদান: আরব বিশ্বের ভূমিকা কিংবা সাধারণ মুসলিম দেশের ভূমিকা নিয়ে কিছুটা সমস্যা আছে এবং সেটা যে কেবল ফিলিস্তিন ইস্যুতে সীমাবদ্ধ, বিষয়টা কিন্তু এমন নয়। বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের ভূমিকা নিয়ে সমস্যা আছে। অনেক ইস্যুতেই যথার্থভাবে তারা পাশে দাঁড়াচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কথা বলা যায়। ফিলিস্তিন ইস্যুর তুলনায় এটা অনেক অনেক সহজ ইস্যু। এখানে কি মুসলিম বিশ্ব কিংবা আরব বিশ্ব কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছে? তারা এখনো উদ্বাস্তু এবং বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যারা এটি বহন করছে এবং দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। ফিলিস্তিন ইস্যুতে তারা (আরব বিশ্ব) অবশ্যই তাদের মতো করে ভূমিকা পালন করছে। তারা কি পর্যাপ্ত ভূমিকা পালন করছে? না, সেটা তারা করছে না। তারা কাজ করছে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।

খবরের কাগজ: বাংলাদেশ-আমেরিকাসহ বিভন্ন দেশে আন্দোলন হচ্ছে, একে আপনি কীভাবে দেখছেন?

ইউসুফ রামাদান: এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। ফিলিস্তিনি মানুষের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সাপোর্ট। এমনটা এর আগে ঘটেনি। একেবারেই নতুন কিছু হচ্ছে। এটা ফিলিস্তিনি জনগণের প্রাপ্য। কারণ তারা যে ত্যাগ স্বীকার করেছে, তার মূল্যটা বেশ ভারি। যে পরিমাণ ধ্বংসযজ্ঞ, দুর্দশা ও নির্যাতন ফিলিস্তিনের মানুষ সহ্য করছে, তারা এমন একটি সংহতি পাওয়ার প্রকৃত হকদার। 

গোটা বিশ্বের মানুষ এখন ফিলিস্তিনের পক্ষে একাত্মতা ঘোষণা করছে। তারা বুঝতে পেরেছে, ইসরায়েলের এ হামলা শুধু ফিলিস্তিনের বিপক্ষে নয়, এটা মানবতা ও ন্যায়ের বিপক্ষে এবং এ কারণে মানবতা কলঙ্কিত হচ্ছে। 

আমেরিকার মানুষ তাদের সরকারকে প্রশ্ন করছে, ‘কোথায় তোমার মানবতা, কোথায় তোমার নীতি-আদর্শ, কোথায় তোমার নৈতিকতা ও মোরালিটি? তোমরা আমাদের যেসব নীতি ও মানবতার কথা বলেছ, তা কি শুধু নির্দিষ্ট কিছু মানুষের জন্য? আমরা কি সেসব নীতির পক্ষে অবস্থান নেব?’ সুতরাং এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্দোলন এবং এমন কাজ চালু রাখতে আমরা তাদের আরও উৎসাহিত করি। 

বাংলাদেশের জনসাধারণকেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসহ বাংলাদেশের জনগণ যে আন্দোলন-সংহতি বাস্তবায়ন করছে, তা খুব দারুণ। আশা করি, বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও একই কাজ করবে। ফিলিস্তিনি মানুষের সমর্থনে এগিয়ে আসবে এবং আশা করি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এ সংহতি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়বে। 
 
খবরের কাগজ: বাংলাদেশের সঙ্গে ফিলিস্তিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক কেমন?

ইউসুফ রামাদান: বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক অসাধারণ। এ সম্পর্ক খুবই গভীর ও আন্তরিক। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ, যাদের সরকার ও জনগণ যেকোনো ইস্যুতে ব্যাপকভাবে ফিলিস্তিনকে সমর্থন করে থাকে। গত ৯ বছর ধরে আমি বাংলাদেশে বসবাস করছি, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে পরিমাণ এবং যে মানের সাহায্য-সহযোগিতা ফিলিস্তিন গ্রহণ করেছে, আমি তা স্বচক্ষে দেখেছি এবং আমি এর প্রধান সাক্ষী। 

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশকে একটি স্বীকৃতি পত্র পাঠিয়েছিল। যদিও সে সময়ে বাংলাদেশের জন্য এ স্বীকৃতির প্রয়োজন ছিল, কিন্তু বাংলাদেশ তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। অথচ বাংলাদেশের সঙ্গে তখন ফিলিস্তিনের সম্পর্ক তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ ফিলিস্তিনের অকৃত্রিম বন্ধু।

বর্তমানে সবাই পরিষ্কারভাবে বুঝতে সক্ষম হয়েছেন, ফিলিস্তিনের যুদ্ধের বিষয়টি কেবল ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সীমাবন্ধ নেই; বরং এটা ভালো ও মন্দের মধ্যকার যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ তাদের স্বাধীনতার প্রথম দিন থেকেই ভালোর পক্ষে থাকার সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফিলিস্তিনের পাশে ছিল, আছে এবং আশা করি থাকবে। 

খবরের কাগজ: বাংলাদেশ থেকে সরকারি ও বেসরকারিভাবে ফিলিস্তিনে যেসব সহযোগিতা পাঠানো হচ্ছে, আদৌ কি তা সেখানে পৌঁছে?

ইউসুফ রামাদান: বাংলাদেশর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় আমরা প্রথমবার বিপুল পরিমাণ ওষুধ এবং পরবর্তী সময়ে শুকনো খাবার সাহায্য হিসেবে গ্রহণ করেছি এবং কায়রোয় থাকা বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তা গ্রহণ করে রেড ক্রিসেন্টের মাধ্যমে ফিলিস্তিনে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছেন। বাংলাদেশের এ সাহায্য ফিলিস্তিনের মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। সবাই বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন। এগুলো হস্তান্তর করা, পৌঁছানো, বিতরণ, রান্না করা এবং খাওয়ার অনেক ভিডিও রয়েছে। বাংলাদেশের পতাকা পেছনে রেখে সাহায্য গ্রহণ করার সময় শিশুরা বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে- এমন ভিডিও রয়েছে। 

এ ছাড়া বেসরকারিভাবেও বহু মানুষ এবং অনেক সংগঠনের কাছ থেকে আমরা বিপুল সাহায্য-সহযোগিতা পাচ্ছি। গত রমজানেও আমরা সরকারি ও বেসরকারিভাবে ইফতারের সহযোগিতা গ্রহণ করেছি এবং যথাযথভাবে তা ফিলিস্তিনে পৌঁছিয়েছি। তবে সমস্যা হচ্ছে, যে পরিমাণ সাহায্য পাচ্ছি, সব পৌঁছাতে কষ্ট হচ্ছে। কারণ ইসরায়েল ফিলিস্তিনে কোনো কিছু প্রবেশ করাতে প্রচণ্ড বাধার সৃষ্টি করছে। 

গাজায় ‘বাংলাদেশ অনাথ আশ্রম’ নামে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ ফিলিস্তিনের পাশে ছিল, আছে এবং থাকবে বলে আশা করি। আরও একটি খুশির সংবাদ হলো, বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ফিলিস্তিনিদের ফুল ফ্রি শিক্ষাবৃত্তি প্রদানে সম্মত হয়েছে, যেটা ফিলিস্তিনের জন্য অনেক বড় সুসংবাদ। অনেক বড় সহযোগিতা। প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সাড়া পেয়েছি আমরা। এ জন্য আমি বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। 

খবরের কাগজ: বাংলাদেশের জনসাধারণের কাছে ফিলিস্তিনের প্রত্যাশা কী? 

ইউসুফ রামাদান: এটা খুবই পরিষ্কার। তারা অতীতে যা করেছেন, বর্তমানে যা করছেন- এটাকে অব্যাহত রাখুন। হাল ছেড়ে দেবেন না। এ দেশের জনগণ যা করছে, তা অভূতপূর্ব। ফিলিস্তিন একে মূল্যায়ন করে। ফিলিস্তিনের ইতিহাসের পাতায় এসব সাহায্য-সহযোগিতার কথা খচিত থাকবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তা পড়বে এবং জানবে। ফিলিস্তিন মুক্ত হওয়ার পর, আশা করছি আমরা একদিন বাংলাদেশের এ ভালোবাসার মর্যাদাপূর্ণ প্রতিদান দেব।  

খবরের কাগজ: গাজায় ইসরায়েলের হামলার ক্ষতির প্রভাব কী?

ইউসুফ রামাদান: এ হামলার ক্ষতির প্রভাব অবর্ণনীয়। আমি আগেই বলেছি, গাজার প্রায় ৭৫ শতাংশ এলাকা একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে। কীভাবে আমরা এগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করব? এগুলো পুনর্নির্মাণ করতে বহু অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু ফিলিস্তিনের সে সামর্থ্য নেই। ফিলিস্তিনের আর্থিক সক্ষমতা এমনিতেই কম। এ হামলা ও যুদ্ধের ফলে তারা আরও পঙ্গু হয়ে গেছে। 

ফিলিস্তিনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ধ্বংস হওয়া জনপদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ফিলিস্তিনের যেহেতু এ সামর্থ্য নেই, সুতরাং সারা বিশ্বের সহযোগিতা প্রয়োজন। 

এ যুদ্ধ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এ জনপদ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কেউ সহযোগিতাও করবে না। কারণ আজকে নির্মাণ করলে কালকে যে আবার ইসরায়েল তা ধ্বংস করে দেবে না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই।    

খবরের কাগজ: গাজায় আপনার কি কোনো আত্মীয় রয়েছে? 

ইউসুফ রামাদান: সরাসরি রক্তের সম্পর্কের কোনো আত্মীয় নেই। তবে আমার একজন জামাতা রয়েছে সেখানে। যুদ্ধের প্রথম তিন সপ্তাহে সে তার পরিবারের ৫৯ সদস্যকে হারিয়েছে। আর আমি গাজার অধিবাসীও নই। আমি ফিলিস্তিনের অন্য অংশের অধিবাসী। ফলে গাজায় আমার সরাসরি কোনো আত্মীয় নেই। তবে আমি বিশ্বাস করি, গাজায় যত ফিলিস্তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন এবং বর্তমানে যত মানুষ জীবিত রয়েছেন, সবাই আমার আত্মীয়। তাদের কেউ আমার মা, কেউ বাবা, কেউ আমার বোন, কেউ ভাই, কেউবা ছেলে কিংবা মেয়ে। তারা সবাই আমার পরিবারের সদস্য।

খবরের কাগজ: ইসরায়েল কেন ফিলিস্তিনে হামলা চালাচ্ছে? এখানে কি কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কারণ জড়িত? মূলত কি কারণে তারা হামলা চালাচ্ছে বা যুদ্ধ করছে? 

ইউসুফ রামাদান: তাদের যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য পরিষ্কার। লুকানোর কিছু নেই। ৭৬ বছর ধরে যার জন্য তারা যুদ্ধ চালাচ্ছে, সেটা হলো- ফিলিস্তিনের পুরো ভূখণ্ড তারা দখলে নিতে চায়। পুরো ভূমি দখল করার পর তারা ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গঠন করতে চায়। অন্য সব কারণ গৌণ। এটাই মূল বা প্রধান কারণ। নেতানিয়াহুর মতো কিছু কট্টরপন্থি ইহুদি এ মিশন বাস্তবায়নে জড়িত। এই মিশনের অংশ হিসেবে এখন তারা যেকোনো মূল্যে গাজার জনসাধরণকে ভূমিছাড়া করতে চাচ্ছে। গাজাকে খালি করে এটা দখল করবে এবং তাদের ‘বৃহত্তম ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার একটি ধাপ সম্পন্ন করবে, এটাই তাদের উদ্দেশ্য। ফিলিস্তিনি জনগণ তাদের এ মিশন কোনোভাবেই বাস্তবায়ন করতে দেবে না। তারা তাদের জন্মভূমি রক্ষায় আমরণ লড়াই করে যাবে। ফিলিস্তিনি মানুষের দেশপ্রেম ও সাহসিকতা বিশ্বের মানুষকে বিস্মিত করেছে। 

পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো জাতি ফিলিস্তিনিদের মতো ত্যাগ স্বীকার করেনি। ফিলিস্তিনিরা বিশ্বাস করে, তারা স্বাধীনভাবে এখানে জন্মেছে এবং স্বাধীনভাবে বসবাস করার অধিকার তাদের আছে। কেউ তাদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার রাখে না। তারা সৃষ্টিকর্তার দাস। নেতানিয়াহু, বাইডেন কিংবা অন্য কারও দাসত্ব করার জন্য তাদের জন্ম হয়নি। 

খবরের কাগজ: অনেকে বলেন, ‘হামাস ও ফাতাহ গ্রুপে বিভক্ত থাকা এবং শক্তিশালী বিশ্বস্ত নেতা না থাকার কারণে ফিলিস্তিনের এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে না’- এ মন্তব্যকে আপনি কীভাবে দেখেন? 

ইউসুফ রামাদান: ইয়াসির আরাফাত কি শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত নেতা ছিলেন না? অবশ্যই ছিলেন। তো তখন এ সমস্যার সমাধান হলো না কেন? ১৯৯০ সালে মাদ্রিদ থেকে তিনি এ সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা শুরু করেন এবং ২০০৪-এ এসে মারা যান। ১৪ বছর চেষ্টা করে তিনি কী পেয়েছেন? তখন তো হামাস ছিল না, ফাতাহও ছিল না। আমরা তখন একসঙ্গে ছিলাম। দেখুন, এটা ইসরায়েলের ছড়ানো একটি অজুহাত মাত্র। প্রোপাগান্ডা। তারা বলে বেড়ায়, ফিলিস্তিনিরা দেশ গড়তে পারবে না, কারণ তারা বিভক্ত। আমার দৃষ্টিতে, তারা (হামাস ও ফাতাহ) উভয়ই একই ভিশনে কাজ করছে। তারা উভয়ই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা চায়। তবে দুই পক্ষের পন্থা ও চিন্তা আলাদা। কিন্তু ভিশন এক। স্বাধীন রাষ্ট্র চায় তারা। 

ইসরায়েল ফিলিস্তিনকে বিভক্ত রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং আমেরিকা তাকে এ কাজে মদদ দিচ্ছে। আশার কথা হলো, বর্তমান পৃথিবী বাস্তবতা বুঝতে সক্ষম হয়েছে এবং পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করেছে।

খবরের কাগজ: ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ কী? আপনি কি কোনো আশার আলো দেখছেন?

ইউসুফ রামাদান: অবশ্যই, সব সময় আশা ছিল, আছে এবং থাকবে। আশা ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। আশাবাদী না হলে আমরা বাঁচতে পারব না। আমরা মুসলিম। আপনি জানেন, মুসলিম মানে কী? ‘আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হইও না।’ হতাশ হওয়া যাবে না। সব সময় আল্লাহর ওপর আশা-ভরসা রাখতে হবে। আপনি যদি এই আশা হারিয়ে ফেলেন, তাহলে আপনি মানবতাকে হারিয়ে ফেলবেন। 

আমরা আশার ওপর বেঁচে থাকি, আশা নিয়েই অগ্রসর হই। আর এ কারণেই ৭৬ বছর ধরে ফিলিস্তিনিরা বেঁচে আছে। নইলে আমরা অনেক আগেই অনেকের মতো হারিয়ে যেতাম। ফিলিস্তিনিরা ব্যতিক্রম। আল্লাহর ওপর আমাদের শক্ত বিশ্বাস আছে। আমাদের যা করার আছে, আমরা তা করছি- মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য স্বাভাবিক সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। বাকিটা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি। তিনি যা ভালো মনে করেন, তার ফয়সালা করবেন। প্রত্যেক ফিলিস্তিনি দৃঢ়ভাবে এমনটা বিশ্বাস করে।

খবরের কাগজ: আপনাকে ধন্যবাদ। 

ইউসুফ রামাদান: আপনাদেরও ধন্যবাদ।  

কোরবানি: বাজারের পশু ও মনের পশু

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৪, ০২:২৫ পিএম
আপডেট: ১৬ জুন ২০২৪, ০২:২৫ পিএম
কোরবানি: বাজারের পশু ও মনের পশু
ড. তোফায়েল আহমেদ

হে নবী! ওদের বলুন, আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ- আমার সবকিছুই বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্যে। তিনি একক ও অদ্বিতীয়। এ আদেশই আমি পেয়েছি। আমি সমর্পিতদের মধ্যে প্রথম।-সুরা আনআম, আয়াত ১৬২-১৬৩

কোরবানি ও ঈদুল আজহার আনন্দ এক যুগলবন্দি ইবাদত। তার মাঝখানে থাকে মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.)-এর পুণ্য স্মৃতির স্মরণ। যার প্রধান মর্মবাণী- সর্বোচ্চ ত্যাগ ও আত্মসমর্পণ। সব কিছুর ওপরে আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্দেশের প্রাধান্য প্রদান। মহান আল্লার ইচ্ছায় যে পরম ও চরম ত্যাগের পরাকাষ্ঠা দুই মহান নবী- হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.) প্রদর্শন করেন এবং তাকে রোজ কেয়ামত পর্যন্ত স্মরণীয় করে রাখা  কোরবানি ও হজের নানা নিয়মকানুনের মধ্য দিয়ে অনুশীলন করা হয়। পিতা সন্তানকে কোরবান করছেন এবং সন্তান স্বেচ্ছায় আল্লাহর ইচ্ছায় পিতার হাতে কোরবান হয়ে যাচ্ছেন। মাঝখানে মহান স্রষ্টার কেরামতে পশু কোরবানি হয়ে গেল। শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (স.)-এর উম্মতদের ওপর পশু কোরবানির আদেশ হয়। পূর্বের আরও নবী- রসুলের উম্মতের ওপরও কোরবানির বিধান ছিল।

প্রতিটি ধর্মীয় বিধিবিধান কালক্রমে নানা জাতি তার সামাজিক রীতিনীতি, সংস্কৃতি ও সভ্যতার অংশ করে নিয়ে থাকে। উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশেও নানা ইসলামি বিধি-বিধান ও আচার-অনুষ্ঠানের দেশীয়করণ বা সামাজিক আত্তীকরণ হয়েছে। আমাদের দেশে কোরবানির ঈদ ও গরু বেচাকেনা একটি মহা বড় অনুষঙ্গ। পৃথিবীর কোনো মুসলিম দেশে কোরবানির পশু জবাইতে গরুকে এত বড় ভূমিকায় দেখা যায় না। অনুমান করা হচ্ছে, কম-বেশি এক কোটি সাত লাখ গরু বাংলাদেশে ঈদুল আজহা উপলক্ষে জবাই হবে। বিশ্বব্যাপী ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, উট, মহিষ কোরবানি হয়। কিন্তু সংখ্যায় গরু এবং বড় পশু কোরবানিতে সম্ভবত বাংলাদেশই প্রথম।

কোরবানির বহুবিধ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। তার মধ্যে একটি অত্যন্ত গঠনমূলক আলোচনা হচ্ছে, ‘‌কোরবানির অর্থনীতি’র আলোচনা। এক. পশুপালন কর্মকাণ্ড। এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বহু অর্থ লেনদেন এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবন-জীবিকা সম্পৃক্ত। অবশ্য পশু চোরাচালানও হয়। দুই. ঈদুল আজহার এই একটি সপ্তাহে পশু কেনাবেচায় হাজার কোটি টাকার নগদ লেনদেন। তিন. পশুর চামড়া, হাড় প্রভৃতি শিল্পপণ্য হিসেবে বাজারে আসা। তিন. পরোক্ষভাবে মসলা, লবণ এবং ঈদে ব্যবহার্য নানা খাদ্য ও বিলাসসামগ্রীর বাজার। সব মিলিয়ে ঈদের অর্থনীতি একটি বিশাল আলোচনার বিষয় হতে পারে। কিন্তু আমাদের ধ্রুপদী অর্থনীতিবিদরা এসব বিষয় সেভাবে আলোচনায় আনেন না। এখানে অপচয়, অনিয়ম, দুষ্কৃতি ও দুর্নীতি রোধ করা গেলে এ অর্থনীতির সুফল পুরো জাতি পেত। ঈদুল আজহার একটি বড় দুষ্কর্ম হচ্ছে নানা জাতের চাঁদাবাজি। পরিবহনে চাঁদাবাজি, গরুর হাটে চাঁদাবাজি। তেল, লবণ, মসলার বাজারে কারসাজি, চামড়াশিল্প ও চামড়ার বাজার নিয়ে নানা অনিয়ম ও ধান্দাবাজি। একটি পবিত্র সময়কে কালো ব্যবসায়ী ও চাঁদাবাজরা কলুষিত করে।

সমাজ-সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রেও আসামঞ্জস্যতার শেষ নেই। প্রথমেই চেষ্টা করা হয়েছে এ কথাটি বলার জন্য যে, ঈদুল আজহা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান নয়। এটি ধর্মীয় কোনো অনুষ্ঠান বিশেষও নয়। এটি একটি মহান ইবাদত বা উপাসনা। উপাসনা করার জন্য যে পরম পবিত্রতা, হালাল রুজি ও খাঁটি নিয়তের শর্ত- তা এক্ষেত্রেও পরিপূর্ণভাবে প্রযোজ্য। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম স্তম্ভ হজ। হজ এ সময়ের একটি মহান ইবাদত। সে হজব্রত শেষে হাজিরা কোরবানি করেন। যারা হজ করছেন না, তাদের মধ্যে সামর্থ্যবানরা পশু কোরবানি করেন। পশুর মাংস খাওয়া ও বিতরণ কোরবানির প্রধান কোনো রীতি বা অঙ্গ নয়। এটি আনুষঙ্গিক বা ঐচ্ছিক বিষয়। পশু জবাই করে রক্ত বইয়ে দেওয়াটাই কোরবানি। নিয়ত সঠিক হলে জবাই করা পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই কোরবানি কবুল হয়ে যায়। মাংস, চামড়া, হাড়গোড় দিয়ে কী করবেন, এর সঙ্গে কোরবানির সম্পর্ক খুবই গৌণ। তাই পবিত্র কোরআন শরিফে বলা হয়েছে, ‘কিন্তু মনে রেখো কোরবানির মাংস বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, আল্লাহর কাছে পৌঁছায় শুধু তোমাদের নিষ্ঠাপূর্ণ আল্লাহ-সচেতনতা। এ লক্ষ্যেই কোরবানির পশুগুলোকে তোমাদের অধীন করে দেওয়া হয়েছে। অতএব আল্লাহ তোমাদের সৎপথ প্রদর্শনের মাধ্যমে যে কল্যাণ দিয়েছেন, সে জন্যে তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করো। হে নবী! আপনি সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ দিন যে, আল্লাহ বিশ্বাসীদের রক্ষা করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না।’-সুরা হজ, আয়াত ৩৭-৩৮।

হালাল খাদ্যসামগ্রী ও অন্যান্য উপজাত, যা সমাজের উপকারে আসবে- তা ফেলে দেওয়া বা অপচয় করা নিশ্চয়ই  উচিত হবে না। তাই তা নিজে, পরিবার, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, গরিব-দুঃখী সবার মধ্যে বণ্টন-বিতরণ অবশ্যই পুণ্যের কাজ। তা কীভাবে করা ভালো, তারও বিধান রয়েছে। সমাজে তার চর্চাও হচ্ছে। কিন্তু এখানে আমার এ বিষয়ে লেখার মূল আবেদনটি হচ্ছে, গরিবের নিকট মাংস বিতরণ, একাধিক গরু-মহিষ জবাই করে সামাজিক ভোজ, জৌলুস করে গরু কেনা এবং গরুর পিছনে যেভাবে সময়, সামর্থ্য ও সামাজিক প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশি সমাজ ঈদুল আজহাকে এক ‘গরু জবাই উৎসব’ হিসেবে পালন করে, তাতে কোরবানির মূল পবিত্রতা ও একটি মহান ইবাদতের বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত।

যার ফলে পশু কোরবানি সঠিকভাবে হয় না। ভালো খাওয়া-দাওয়া, উৎসব আয়োজন হয়। সবার ঘরে ( যারা মাংস খায়) কিছু না কিছু মাংস পৌঁছায়। অনেকে বলেন, গরিবের প্রোটিন ঘাটতি পূরণ হয়। কিন্তু অন্তরের পশুটি কোরবানি হয় না। সে পশু যথাস্থানে অবস্থান করে এবং যথাসময়ে হানা দেয়। সে পশু নদীর বালু, জলাধার, পরের জমি, ঘরবাড়ি দখল করে। ছিনতাই-রাহাজানি, অবৈধ কন্ট্রাক্ট, নির্মাণে সিমেন্ট-বালু অনুপাত ঠিক রাখে না, রডের বদলে বাঁশ, ওষুধে ভেজাল, ফাইল ঠেকিয়ে অর্থ আদায়, সোনা চোরাচালান, মানিলন্ডারিং, বিনাভোটে বা ভোট চুরি করে নেতা হয়। প্রতি বছর হাতির মতো গরু, মহিষ, উট কোরবানি করে। কিন্তু তার চেয়েও বড় পশু বা পাশবশক্তিকে ভেতরে রীতিমতো লালন-পালন করা হয়। সে শক্তি সমাজকে তছনছ করে।

ধর্ম বা ধর্মের অন্তর্নিহিত গূঢ বিষয়কে বিকৃত আনুষ্ঠানিকতার মোড়কে ঢেকে ফেলায় আমাদের জুড়ি নেই। আনুষ্ঠানিকতা ও আচার সত্যিকারের ধর্ম নয়। হজ-উমরা পালন এবং ঈদুল আজহায় গরু জবাই উৎসবের ক্ষেত্রে বিষয়টি এখন প্রায় ধর্মীয় আবেদনের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা। একই বিচ্যুতি রমজানেও আমাদের হয়। রমজানের শুদ্ধতা ও সংযমের চেয়ে বাহারি ইফতারে এবং ঈদের কেনাকাটায় বাজার ও বিজ্ঞাপন আমাদের বেশি প্রভাবিত করে। আত্মশুদ্ধি ও সংযমবিযুক্ত রোজা নিছক উপবাস। তাতে হয়তো মেদ হ্রাস হতে পারে বা অন্যান্য শারীরিক উপকার হতে পারে, কিন্তু রমজানের আধ্যাত্মিকতা ও শুদ্ধাচারী হওয়ার যে সুফল, তা আসবে না। একইভাবে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক কল্যাণমুখী কাজ হিসেবে কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে সরকার ও জনগণ দেখতে পারে, কিন্তু ব্যক্তি মুসলমানের সত্যিকারের ধর্মীয় তাৎপর্য ও ইবাদতের বিষয়টি ভূলুণ্ঠিত হতে থাকবে।

লেখক: শিক্ষক ও স্থানীয় শাসন বিশেষজ্ঞ
[email protected]

বিজেপি জোট সরকার কতদিন টিকবে?

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৪, ০২:২২ পিএম
আপডেট: ১৬ জুন ২০২৪, ০২:২২ পিএম
বিজেপি জোট সরকার কতদিন টিকবে?
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

ভারতবর্ষের ১৮তম লোকসভা নির্বাচন শেষ। একদলীয় শাসনব্যবস্থার পক্ষে জনগণ রায় দেয়নি। তাই নরেন্দ্র মোদিকে জোট সরকার গঠন করতে হলো। এই জোটের যেসব শরিক তাকে ‘আপাতত’ সমর্থন করেছেন, সেই সমর্থন কতদিন বজায় থাকবে- সেই প্রশ্ন কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এতদিন ধরে ভারতবর্ষ জানত, ধর্মীয় সংগঠন আরএসএস পরোক্ষে সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে। হঠাৎ নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দেখা গেল, আরএসএস-প্রধান মোহন ভাগবত সাংবাদিক বৈঠক ডেকে নরেন্দ্র মোদির কঠোর সমালোচনা করলেন। 

অপরদিকে কংগ্রেসের মুখপাত্র জয়রাম রমেশ মোদিকে কটাক্ষ করে বলেছেন, মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসে বলেছিলেন, আমি ৫৬ ইঞ্চি ছাতি নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব। কিন্তু ভোটের পর ওনার ছাতির মাপ অর্ধেক হয়ে গেছে। আমরা আরও লক্ষ্য রাখছি ওনার বুকের ছাতির ‘মাপের ওপর’।

মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী, অথবা ভারতের প্রধানমন্ত্রী- তিনি বরাবরই দলকে পেছনে ঠেলে নিজেকেই জাহির করে গেছেন। ইন্ডিয়া জোটের যেসব শরিক তাকে সমর্থন করেছে, তারা এবার প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেছেন, এই সরকার ইন্ডিয়া সরকার। মোদি সরকার নয়। তিনি ক্ষমতার দম্ভে নির্বাচনি প্রচারে কার্যত নিজের বাবা-মাকে অস্বীকার করে বলেছিলেন, ভগবান স্বয়ং তাকে ধরাধামে পাঠিয়েছিলেন। তাই তিনি ২০৪৭-এর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত নাকি দেশ শাসন করবেন।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, মোদি ভোটপর্বে ‘পরিবারতন্ত্র’ নিয়ে গলা ফাটিয়েছেন। কিন্তু তার মন্ত্রিসভাতেই সদস্য হয়েছেন এমন ১২ জন, যারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক পরিবার থেকে এসেছেন।

প্রথমত উল্লেখ্য, বাংলাদেশের কিছু বুদ্ধিজীবীও নরেন্দ্র মোদির সরকারের প্রতি নরম মনোভাব নিয়ে চলতেন। তাদেরও হঠাৎ ধারণা হয়েছিল- কংগ্রেস নয়, মোদির সরকারই পারবে বাংলাদেশের নতুন বন্ধু হয়ে উঠতে। কিন্তু মোদির শপথগ্রহণের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয় কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া, রাহুল এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সঙ্গে। সেই আবেগঘন মুহূর্তের ছবি গণমাধ্যম মারফত গোটা বিশ্ব দেখেছে। সেই ছবি প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলাদেশের সেই বুদ্ধিজীবীরা এখন কী বলবেন, সেটাই জানার।

বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের মধ্যে যে বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে গোটা ভারতবর্ষের বুদ্ধিজীবীদের একাংশ মনে করছেন- মোদি নামেই প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তিনি দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে পারবেন না। ফলে সরকার কতদিন টিকবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। 

এদিকে মোহন ভাগবত মোদির সমালোচনা করলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির প্রশংসা করেছেন। তার দাবি, স্বাধীনতার পর মমতা ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত আরএসএস পশ্চিমবঙ্গে একটিও শাখা সংগঠন তৈরি করতে পারেনি। কিন্তু মমতার সরকার আসার পর থেকে আরএসএস পশ্চিমবঙ্গে ১৮ হাজার শাখা খুলতে পেরেছে।

ওয়াকিবহাল মহলের খবর হলো, মহারাষ্ট্রের নাগপুরের মতোই আরেকটি আরএসএস সদর দপ্তর খুলতে চাইছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। তিনিও একজন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী। যেহেতু মোদির প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন ভাগবত, তাই প্রবল অস্বস্তিতে পড়েছে বিজেপি। প্রকাশ্যে না বলা হলেও, বিজেপির সদর দপ্তরেই শোনা যাচ্ছে, ভাগবত ভুল কিছু বলেননি। তিনি প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের মতো পথ দেখাতে চেয়েছেন।

এ নিয়ে কংগ্রেসের কটাক্ষ- যাকে নিয়ে এই কথা বলা, তিনি কি আদৌ শুনবেন? নিজেকে সংশোধন করবেন?
অনেকেই মনে করছেন, এতদিন বিজেপি শক্তিশালী থাকায় সেভাবে মুখ খোলেনি সঙ্ঘ নেতৃত্ব। এবার ভোটের পরই স্পষ্ট, বিজেপির সেই সংখ্যার জোর আর নেই। তারা এখন শরিকনির্ভর। সে কারণেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে শুরু করেছে আরএসএস। এমনকি ভোটের পরই প্রকাশ্যে নাম না করে মোদি সরকারের সমালোচনা করে সঙ্ঘকর্মীদের ক্ষোভ সামনে তুলে ধরেছেন মোহন ভাগবত।

নাগপুরে সঙ্ঘের একটি সভায় এই বোমা ফাটিয়েছিলেন মোহন ভাগবত। তার পরামর্শ ছিল- শত্রু নয়, বিরোধীদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে হবে। তার মতে, বিরোধীরা অন্য ভাবনা তুলে ধরেন। তাই রাজনীতিতে বিরোধীদের গুরুত্ব দিতে হবে। মোদি সরকারের প্রথম দুটি পর্বে সংখ্যাধিক্যের জোরে বিরোধী মতকে শুধু অগ্রাহ্য করাই নয়, গুঁড়িয়ে দেওয়ার মনোভাব দেখা দিয়েছে। বিগত সরকারের শেষদিকে মোদি যেভাবে বিরোধীদের নির্বিচারে সাসপেন্ড করে বিনা আলোচনায় বিল পাস করিয়েছেন, তা বিজেপির অনেক নেতাই ভালোভাবে নেননি। এবার প্রতিপক্ষকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলে বুঝিয়ে দিয়েছেন, এভাবে বিরোধীদের ওপর বুলডোজার চালানো সঙ্ঘ সমর্থন করে না।

কিন্তু তাতেও মোদির মানসিক পরিবর্তন হবে বলে মনে করে না কংগ্রেস। কংগ্রেস সাংসদ গৌরব গটস বলেছেন, আমার মনে হয় না, এরপরও নরেন্দ্র মোদি মোহন ভাগবতের কথায় কোনো গুরুত্ব দেবেন। বিহারের আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব বলেছেন, মোহন ভাগবত মুখ খুললেন বটে; কিন্তু অনেক দেরিতে।

এবারের নির্বাচনে কু-কথার ফুলঝুরি ছুটিয়েছেন অনেকেই। জাতপাত তুলে মন্তব্য করার জন্য নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধেও নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জমা পড়েছে। সঙ্ঘপ্রধান বলেন, ভোটে লড়ার সময় একটা মর্যাদা থাকা উচিত। সেই মর্যাদা পালন করা হয়নি। এক বছর ধরে অশান্ত হয়ে থাকা মণিপুর পরিস্থিতি নিয়েও সরব হয়েছেন ভাগবত।

কংগ্রেস নেতা কপিল সিবাল বলেছেন, আমাদের কথা শোনা তো মোদির ধাতে নেই। এবার মোহন ভাগবতের কথা তো অন্তত শুনুন।
প্রথমবার ক্ষমতায় আসার সময় থেকেই নরেন্দ্র মোদি-বাহিনীর কয়েকটা নির্দিষ্ট এজেন্ডা ছিল। তার মধ্যে ছিল- রামমন্দির নির্মাণ, কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা রদ, তিন তালাক বন্ধ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি পাস করানো; ‘এক দেশ এক ভোট’ নীতি চালু করা ইত্যাদি।

এর মধ্যে রামমন্দির নির্মাণ, কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ এবং তিন তালাকের মতো এজেন্ডা পূরণ হয়েছে। রামমন্দির তৈরি করেও উত্তরপ্রদেশে ভোটবাক্সে তার কোনো সুফল বিজেপি পায়নি। তারপরও আইনমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে প্রথম সাক্ষাৎকারেই অর্জুন মেঘওয়াল বলেছেন, নতুন সরকারের লক্ষ্যই হবে- ‘এক দেশ এক ভোট’ এবং ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’ লঘু করা। কিন্তু জোট সরকারের শরিক ও শক্তপোক্ত বিরোধীদের চাপে পড়ে তা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সন্দিহান রাজনৈতিক মহল। তারা এও মনে করছেন, নরেন্দ্র মোদি যত তাড়াতাড়ি জোটের নেতাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন, ততই ভালো। কিন্তু আদৌ কি তিনি তা করবেন? নাকি টিডিপি নেতা চন্দ্রবাবু নাইডু এবং জেডিইউ নেতা নীতিশ কুমারের সঙ্গে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হবে মোদির, সেটাই এখন দেখার।

লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক

শিক্ষা খাতে ব্যয় যথাসময়ে হতে হবে

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৪, ১১:০৩ এএম
আপডেট: ১৫ জুন ২০২৪, ১১:০৩ এএম
শিক্ষা খাতে ব্যয় যথাসময়ে হতে হবে
রাশেদা কে চৌধূরী

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেট প্রণয়নে সরকারের অনেক সদিচ্ছার অভিপ্রকাশ আমরা দেখেছি। বাজেট টাকার অঙ্কে বেড়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে শিক্ষার্থীপ্রতি বরাদ্দ বাড়েনি। উদাহরণস্বরূপ উপবৃত্তির কথা বলা যায়। উপবৃত্তি আগে যা ছিল তাই আছে। টাকার যে মূল্যমান তাতে সেটা কোথায় নেমে গেছে, সেটা আমাদের ভেবে দেখা দরকার। 

এখানে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। আমাদের নানা ধরনের কর্মসূচি আছে। সব জায়গায় একই কথা প্রযোজ্য যে, ইনফ্লেশানের বিচার করা। বাজেটে অনেক সদিচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। আরেকটি ব্যাপার হলো, আমরা যেটা বরাবর দেখেছি ইনফ্লেশান জিডিপির অনুপাতে বাড়েনি। এই সাইকেল থেকে আমরা কেন বের হতে পারছি না, জানি না। সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হলো, সরকার বলতে থাকে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই একই রকম অবস্থা। 

সরকারের সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ আমরা আইসিটিতে দেখেছি। আইসিটি মাধ্যমে তথ্য-উপাত্ত যেটুকুন পাওয়া যায়, বিশেষ করে সেখানে ডিজিটাল ল্যাব করা হয়েছে কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেখানে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত প্রশিক্ষক নেই। মফস্বল শহরগুলো পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু গ্রামগঞ্জে প্রত্যন্ত অঞ্চলে তা কতটুকু কার্যকর হচ্ছে তার কোনো নিরীক্ষণ নেই। এবারও যা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেটা কতটুকু কাজে লাগছে, সেটা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাবে। 

অনেক জায়গায় শিক্ষক প্রশিক্ষণের কথা বারবার বলা হয়েছে। এ প্রশিক্ষণগুলো শ্রেণিকক্ষে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, শিক্ষকরা যেটুকু প্রশিক্ষণ অর্জন করলেন, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশেষ করে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করতে গেলে সেটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, সে ক্ষেত্রে মনিটরিংয়ের অভাব থেকেই যাচ্ছে। 

মনিটরিং করতে গেলে সে ক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে সেগুলোর বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত করা। কীভাবে এটা করা যায়, সে ক্ষেত্রে আমরা কোনো দিকনির্দেশনা দিচ্ছি না। প্রতিবারের মতো আমরা যে বিষয়টি দেখেছি প্রতিবছরই টাকা ফেরত যায়। 

এবারও এডিপির পর্যালোচনায় সবচেয়ে বড় দুটি খাত মনে করা হয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। শিক্ষায় ১২ হাজার কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য ৪ হাজার কোটি টাকা। একটি প্রশ্ন এসেই যায় যে, বাজেট ব্যবহারে আমাদের কি দক্ষতা নেই? সেটার ব্যাপারে আমাদের করণীয় কী হবে? অথবা নির্দেশনা কোথা থেকে আসবে? 

মানবসভ্যতা বিনির্মাণের বড় দুটি প্রিয় পিলার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। সেখানে যদি আমরা যথাযথভাবে বাজেট ব্যবহার করতে না পারি, সেটা পর্যালোচনা করে দেখা দরকার কেন পারছি না। এখানেই প্রধানমন্ত্রী বারবার একটি কথা বলেন, আমরা কবে সক্ষম হব। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, এবারও শিক্ষা গবেষণায় তেমন বরাদ্দ হয়নি। 

বাংলাদেশের অর্জনের একটি জায়গা আছে, সেটা হলো কৃষি গবেষণায় আমরা ভালো ফল পেয়েছি। শিক্ষা গবেষণায় আমরা সেটা করে দেখাতে পারিনি। আমরা দেখেছি যে, শিক্ষা গবেষণায় তথ্য-উপাত্ত নিয়ে এসে পরিকল্পনা করে গবেষণা করলে সেটি বেশি ফলপ্রসূ হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এবার সিলেটে প্রায় ৩ লাখের মতো শিক্ষার্থী ফেল করল। কেন করল? প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। কিন্তু কীভাবে দেখবে? গবেষণা উপাত্ত সংগ্রহ না করে? বিষয়গুলো আমাদের ভাবতে হবে।

শিক্ষকদের বেতন এবং অবকাঠামো নির্মাণের পর্যাপ্ত ব্যয় বরাদ্দ হলেও সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয় না। যেখানে প্রয়োজন নেই, সেখানে ব্যয় করার কিছু নেই। কিন্তু যেখানে প্রয়োজন, সেখানে যেন এটা সঠিকভাবে হয়। 

মনে রাখতে হবে, যথাযথ ব্যয় যথাস্থানে যথাসময়ে। এ জন্য সঠিক মনিটরিং দরকার। তা ছাড়া শুধু বরাদ্দ দিলেই হবে না, বরাদ্দের ব্যবহার জানতে হবে। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করতে গেলে অগ্রসর মুখে যে বাজেট দরকার ছিল, সেটা এবারের বাজেটে অনুপস্থিত। নতুন শিক্ষাক্রম ব্যবহার বাস্তবায়ন করতে গেলে শুধু প্রশিক্ষণ দিলে হবে না, প্রশিক্ষণ যথাযথ ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সেই নিরীক্ষণ এবং গবেষণা আমাদের দেখতে হবে। আমি মনে করি, শিক্ষার মানের দিকে যথাযথ দৃষ্টি দিতে হবে। 

শিক্ষা শিক্ষার্থীর কোনোই কাছে আসবে না যদি না আমরা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারি। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, সিলেট বোর্ড ফলাফলের দিক থেকে এবার সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। দক্ষতা বিচক্ষণতা অনুযায়ী যথাযথ বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক যদি না থাকে, তাহলে কীভাবে হবে? একদিকে শিক্ষকসংকট, অন্যদিকে দক্ষ শিক্ষকের অভাব। দুটিই আমাদের খুবই দরকার।

বেতন-ভাতা বাড়িয়ে কিছু হবে না। অবকাঠামো পরিবর্তন-পরিবর্ধন দিয়েও হবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রকম কার্যকলাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেখানে আমাদের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ভীষণ রকম পরিলক্ষিত। শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আমরা দূষণমুক্ত রাখতে পারতাম কিন্তু পারিনি। আমি মনে করি, শিক্ষার মানের দিকে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। 

সিলেট বোর্ড কেন সবচেয়ে পিছিয়ে? প্রথমত, দক্ষ শিক্ষক নেই। দ্বিতীয়ত, দক্ষ শিক্ষক প্রশিক্ষণ নেই। শিক্ষকসংকট এবং একই সঙ্গে দক্ষ শিক্ষকের অভাব আমাদের দেশে দুটিই খুব প্রকট। তবে একই সঙ্গে আমি যে কথাটি বলতে চাই, শিক্ষকদের নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হতে হবে। সেটা কখনো বাজেট দিয়ে পূরণ হবে না। মানবিক মূল্যবোধ গড়তে পারিবারিক শিক্ষার অনেক বড় একটি ভূমিকা রয়েছে। 

প্রশিক্ষণের ওপর তা নির্ভর করবে। যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের ওপর নির্ভর করবে এবং প্রশিক্ষণের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধের বিষয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ সিলেবাসে কতটুকু আছে সেটিও দেখা দরকার। আমরা কেন কোনোটাই বাস্তবায়ন করতে পারছি না, সেটা দেখা দরকার। শিক্ষা জাতির ভিত নির্মাণ করে। কাজেই শিক্ষা খাতকে কখনোই দূষিত করা উচিত নয়। আজকাল আমরা শিক্ষক পাই না। 

শিক্ষকদের শিক্ষক মনে হয় না। আরেকটি বিষয়ে আমি উল্লেখ করতে চাই, শিক্ষকদের নানা ধরনের সরকারি কাজে ব্যবহার করা হয়। এ রকমও দেখা গেছে, ক্লাসরুমে শিক্ষক নেই। প্রশ্ন করে জানা গেছে, উপজেলা নির্বাচনে গেছে। এগুলো কেন হয় অথবা হচ্ছে আমাদের ভাবতে হবে। শুধু গার্মেন্ট শিল্প দিয়ে অথবা প্রবাসী আয় দিয়ে জাতির ভিত নির্মাণ করা সম্ভব নয়। 

দেখা যাচ্ছে, আমাদের গার্মেন্ট সেক্টরে ম্যানেজমেন্ট লেভেলে শিক্ষিত কর্মকর্তা নেই। শ্রীলঙ্কা, নেপাল এদের নিয়ে নেয়। প্রকৃতপক্ষে আমরা দেশে মেধা তৈরি করতে পারছি না। আমরা দক্ষ জনশক্তি করতে পারছি কি না, এই প্রশ্নটা আমাদের নিজেদের করা উচিত।

লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

মুজিবের জীবনচিত্র

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৪, ১১:০১ এএম
আপডেট: ১৫ জুন ২০২৪, ১১:০১ এএম
মুজিবের জীবনচিত্র
ড. পবিত্র সরকার

প্রথমেই বলে রাখি, আমি পেশাদার চলচ্চিত্র সমালোচক নই, ফলে সিনেমার শিল্পগত উৎকর্ষ নিয়ে বলবার যোগ্যতা আমার নেই। কিন্তু কোনো ছবি দেখে যদি ভালো লাগে, বিশেষত এই ছবিটা, তা হলে সে কথা পাঠকদের জানাতে ইচ্ছে হয়। সম্প্রতি কলকাতার বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের আমন্ত্রণে নন্দনে গিয়ে শ্যাম বেনেগাল পরিচালিত ‘মুজিব, এ নেশন ইন দ্য মেকিং’ ছবিটি দেখার সুযোগ হলো। 

এটি সম্বন্ধে অনেক শুনেছি। শুনেছি আমাদের প্রধানমন্ত্রী মোদিজি স্বয়ং প্রস্তাব করেছিলেন যে, ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় শেখ মুজিবের একটি জীবনচিত্র তৈরি করা হোক। সুখের বিষয় যে, ফিল্ম করপোরেশন অব ইন্ডিয়া আর বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে এই তিন ঘণ্টার ছবিটি তৈরি হয়েছে। দুই দেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার এ এক উজ্জ্বল নিদর্শন এবং মুক্তিযুদ্ধের সহযোগিতার চেতনা এভাবে অব্যাহত থাকা খুব জরুরি।   

শ্যাম বেনেগাল অবশ্যই ভারতের বর্ষীয়ান আর খ্যাতিমান পরিচালক, তবু তথ্যচিত্র বলতেই দর্শকের মনে একটা ভয় জাগে। এই রে, নিশ্চয়ই একগাদা খবর, স্থিরচিত্র, বক্তৃতা, বাণী এসব থাকবে। আর তিন ঘণ্টার মতো দৈর্ঘ্য, সেটাও মনে একটু ভয় ধরায়। 

কিন্তু এই বৃদ্ধের যেটা দেখে ভালো লাগল যে, বেনেগাল পুরো ছবিটাকে একটা সুগঠিত চলচ্চিত্র বা ফিচার ফিল্মের মতোই নির্মাণ করেছেন। আর তাকে সাহায্য করেছে মুজিবের স্বভাবত বিচিত্রকর্ম ও উত্থান-পতনময় নাটকীয় জীবন, যা একই সঙ্গে নানা সময়ে বিপুল মহত্ত্বকে স্পর্শ করেছে, সেই সঙ্গে মর্মান্তিক বেদনাকেও। আমার মতো অপেশাদার সমালোচকদের মতের সঙ্গে না-ও মিলতে পারে। 

বলা বাহুল্য, এখনকার আখ্যান, তা লিখিতই হোক, নাটকে বা চলচ্চিত্রেই হোক, সময়ক্রম মেনে তৈরি হয় না। সেখানেই ইতিহাস আর গল্পের তফাত, বিবরণ আর প্লটের তফাত। বেনেগাল শুরুই করেছেন বিজয়ী মুজিবকে দিয়ে, যিনি পাকিস্তানের কারাগার থেকে লন্ডন হয়ে দেশ ফিরছেন একটি বিশাল বিমানে। 

বিমানটি আকাশে দর্শকের মুখে উড়ে আসছে বিশাল আকাশের পটভূমিকায়, মধ্যে যাত্রী মুজিব ও তার সঙ্গীরা। স্বাধীন বাংলাদেশর স্রষ্টা ফিরছেন মুক্ত স্বদেশে, পাকিস্তানের কারাগার তাকে ধ্বংস করতে সাহস পায়নি, ফলে পূর্ণ মহিমায় তাকে প্রথমেই পাই। 

তার ভূমিকাভিনেতা আরিফিন শুভ তার ব্যক্তিত্বের এই নানা মাত্রা, ছাত্রদের মুখপাত্র থেকে ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দী অনুচর (যাকে তিনি ‘লিডার’ বলতেন), মওলানা ভাসানীর সহযোগী থেকে নিজের বাংলাদেশের একচ্ছত্র নেতা হয়ে ওঠার ধাপগুলো সযত্নে নির্মাণ করেছেন। 

পাশাপাশি চলেছে তার ব্যক্তিগত জীবনের নির্মাণ। বাড়িতে আশ্রিতা ফজিলাতুন্নেছার সঙ্গে তার বিবাহ ও সংসার, যে সংসার পরে আর ব্যক্তিগত থাকবে না, তার জাতীয় ভূমিকার সঙ্গে মিশে যাবে। ফজিলতের অতি মিষ্টি কিশোরী মুখটা পরবর্তী নময়ে পরিণত ফজিলতেও সঞ্চারিত হয়েছে এবং বিবাহের দৃশ্যটিও অতি চিত্তাকর্ষক। এখানে বাংলাদেশের গ্রাম-প্রকৃতির অতি মনোরম দৃশ্যাবলিকে কাজে লাগিয়েছেন পরিচালক, বিশেষ করে নদীতে নৌকা করে তার নির্বাচনি প্রচারের বিষয়টি। 

কোনো আখ্যানকেই অনাবশ্যকভাবে দীর্ঘ করেননি, কিন্তু ‘স্পেকটাকল’-এর সঙ্গে অন্তরঙ্গ সহজ জীবনযাত্রাকে চমৎকার গ্রন্থন করেছেন। মুজিবের জনসভাগুলোতে লোকের ভিড় ক্রমশ বিশাল আকার ধারণ করেছে এবং ’৭১-এর ৭ মার্চের ভাষণটি তার পূর্ণ মহিমায় চিত্রায়িত হয়েছে। আজকাল হয়তো নতুন প্রযুক্তির সহায়তায় এগুলো করা তত কঠিন নয়। 

মুজিবের রাজনৈতিক জীবনে যাদের বৃহৎ ভূমিকা ছিল, ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, জুলফিকার আলী ভুট্টো, ইয়াহিয়া খান, সব চরিত্রেই অভিনেতার নির্বাচন চমৎকার, অর্থাৎ সবাই তাদের চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন। 

একটি দৃশ্যে বেলেঘাটায় গান্ধীজির আবির্ভাবও ছাপ রেখে যায়, ইন্দিরা গান্ধীর মুহূর্ত কয়েকের ক্লোজআপও। এর মধ্যে সোহরাওয়ার্দী একটু আলাদা হয়ে আসেন, তার ব্যক্তিত্বের কোমল-কঠিনের নানাস্তরীয় বিন্যাসে এবং মুজিবের প্রতি তার অকৃত্রিম স্নেহে। 

মৃত্যুর আগে লন্ডনে মুজিবকে তার সিগারেট খাওয়া থেকে নিবৃত্ত করার জন্য একটি পাইপ উপহার দেওয়ার ঘটনাটি খুবই হৃদয়গ্রাহী। তেমনই হৃদয়গ্রাহী বাংলার গ্রামে স্বাধীনতার প্রচারের সময় এক গ্রামবৃদ্ধার রান্নাঘরে মুজিবের হাতে কিছু পয়সা তুলে দেওয়া, তা নিতে মুজিবের দ্বিধা কিন্তু বৃদ্ধার আহত বেদনা দেখে তা গ্রহণ করা। 

তার গার্হস্থ্য জীবনের স্নেহমমতাময় একটি প্রবল বন্ধনকেও পরিচালক খুব সুন্দরভাবে গেঁথেছেন, সন্তানদের সঙ্গে খেলা ও খুনসুটি আর এই গাঢ়বদ্ধতা অন্তিমের বীভৎস হত্যাকাণ্ডকে আরও দুঃসহ ও মর্মান্তিক করে তোলে। শেখ হাসিনার বিয়ের উপাখ্যানটিও সুন্দর, তার ড. ওয়াজেদের সঙ্গে বিবাহের প্রস্তাব ‘কবুল’ করা থেকে। 

একটি কল্পিত ছোট এপিসোড, স্ত্রী-কন্যার আশ্রয়স্থলে এক পাঠান সৈনিকের ঘটনা, ছবিতে মানবিক আবেদন যোগ করেছে। শান্তনু মৈত্রের সংগীত পরিচালনা ও গানগুলো ছবিটির আবেদনে শক্তি দিয়েছে।  

পরিচালক বা দুই চিত্রনাট্যকার কাউকে বিশুদ্ধ ভিলেইন করে দেখাননি, ইয়াহিয়া খানকেও না। অতিনাটকীয়তা তিনি এড়িয়েছেন, কারণ তিনি জানতেন, আখ্যানেই যথেষ্ট নাটক তৈরি হবে এবং যুদ্ধের ‘স্পেক্টাক্ল... নিচে যুদ্ধ, গেরিলাদের ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়া, আকাশে পরপর ফাইটার প্লেন ধ্বংস, নিচে ট্যাংক ধ্বংস, আগে কিছু দাঙ্গার দৃশ্য, গণহত্যা আর অগ্নিকাণ্ডে পাকিস্তানি সেনার বর্বরোচিত ধ্বংসলীলা, বিশ্বস্ততার সঙ্গে চিত্রিত হয়েছে।  

অবশ্যই শেষে জিয়া আর তার বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা ও অবিশ্বাস্যতা অন্য সব ঘটনাকে তুচ্ছ করে দেয়। যে মুজিব বলেছিলেন, ‘আমি বাঙালি, কোনো বাঙলি আমাকে মারতে এগিয়ে আসবে না’ বা এ ধরনের কিছু, তাকেও মরতে হলো শুধু বাঙালি নয়, তার বিশ্বস্ত সহকর্মীদের হাতে। শুধু তাকে নয়। 

গর্ভবতী নারী থেকে একাধিক নারী, শিশু সন্তান, সন্তান আর আত্মীয় বন্ধু, গৃহকর্মী- সবাইকে একে একে নৃশংস গুলির সামনে লুটিয়ে পড়তে হলো, এই দৃশ্য চোখে দেখা যায় না। জানি না, জেলখানায় তার সহকর্মীদের হত্যা আর মিরপুরে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা দেখানো হলো না কেন? সম্ভবত একই ধরনের দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হতো বলে?  

এই উপমহাদেশে একই ধরনের বিশ্বাসঘাতকতার পুনরাবৃত্তি ঘটল। নিরস্ত্র মানুষকে মারছে মানুষ, কখনো তার অতি ‘বিশ্বস্ত’ অনুচররা। গান্ধীজি, ইন্দিরা গান্ধী, শেখ মুজিব। এর মধ্যে শেখ মুজিবের সঙ্গে প্রাণ গেল তার স্ত্রী-পুত্রদের, আরও বহু লোকের। রবীন্দ্রনাথের ‘নারীঘাতী শিশুঘাতী কুৎসিত বীভৎসা’ কথাটা বারবার মনে পড়ে।  

আমি আমার বৃদ্ধ বয়সে তিন ঘণ্টা এই ছবি থেকে অন্যমনস্ক হতে পারিনি। ভারতে ও অন্যত্র, সাধারণ মানুষের জন্য কি এটিকে দেখানোর ব্যবস্থা করা যায় না? 

লেখক: ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য: এক সমৃদ্ধ পৃথিবীর চাবিকাঠি

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৪, ১০:৫৭ এএম
আপডেট: ১৫ জুন ২০২৪, ১০:৫৭ এএম
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য: এক সমৃদ্ধ পৃথিবীর চাবিকাঠি
ড. মতিউর রহমান

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বলতে বোঝায় বিভিন্ন সংস্কৃতির সমাহার। এটি ভাষা, ধর্ম, রীতিনীতি, পোশাক, খাবার, শিল্পকলা, সাহিত্য, ঐতিহ্য- এসবের বৈচিত্র্যকে নির্দেশ করে। বিশ্বে বিভিন্ন দেশ, জাতি, জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। এসব সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়া ও মেলবন্ধনে তৈরি হয় সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। 

মানুষের দীর্ঘ ইতিহাসজুড়ে, সংস্কৃতির বৈচিত্র্য আমাদের পৃথিবীকে রঙিন করে তুলেছে। ভাষা, রীতিনীতি, পোশাক, খাবার, ধর্ম, শিল্প- এসবের মধ্যে দিয়েই ফুটে ওঠে বিভিন্ন সংস্কৃতির অনন্য বৈশিষ্ট্য। কেবল আনন্দ ও সৌন্দর্যই নয়, বরং এই বৈচিত্র্য আমাদের জীবনে এনে দেয় আরও অনেক কিছু।

বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় আমাদের জ্ঞানের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে। নতুন ধারণা, রীতিনীতি ও জীবনধারার সংস্পর্শে এসে আমরা নিজেদের চিন্তাভাবনাকে আরও প্রসারিত করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, জাপানের চা অনুষ্ঠানের রীতিনীতি আমাদের শৃঙ্খলা ও মনোযোগের গুরুত্ব শেখায়। 

মাসাইদের যাযাবর জীবনধারা আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের ধারণা দেয়। অন্য সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা আমাদের মধ্যে সহিষ্ণুতা ও গ্রহণযোগ্যতার ভাব জাগ্রত করে। আমরা বুঝতে পারি যে, বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের মানুষ বাস করে এবং তাদের নিজস্ব রীতিনীতি ও বিশ্বাস রয়েছে। ইসলামের রমজান মাসের রোজা, হিন্দুদের দীপাবলি উৎসব, খ্রিষ্টানদের বড়দিন- এসব বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান আমাদের একে অপরের ধর্ম ও রীতিনীতি সম্পর্কে জানার এবং সম্মান করার সুযোগ করে দেয়। 

বিভিন্ন সংস্কৃতির জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার মিশ্রণ উদ্ভাবনের জন্য অনুপ্রেরণা জোগায়। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা- এসব ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ একসঙ্গে কাজ করে নতুন আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের জন্ম দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে চীনা ঔষধি ও ভেষজের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। 

বাংলাদেশ, মুক্তির স্বর্ণালি সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল একটি দেশ, যেখানে বহু শতাব্দীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছে অপূর্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। ভৌগোলিক অবস্থান, ঐতিহাসিক প্রভাব, ধর্মীয় বিশ্বাস- এসবের মিশ্রণে বাংলার সংস্কৃতি পেয়েছে এক অনন্য রূপ। বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতির মূল চাবিকাঠি। 

সাহিত্য, কবিতা, গান, নাটক, শিল্পকলা- সবকিছুই বাংলা ভাষায় সমৃদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়- এসব বিখ্যাত সাহিত্যিকের অমূল্য রচনা বাংলা সাহিত্যকে করে তুলেছে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। পর্যটনশিল্পের বিকাশে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন সংস্কৃতির ঐতিহ্য, স্থাপত্য, খাবার ও অন্যান্য আকর্ষণ বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এর ফলে বৃদ্ধি পায় দেশের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ।

বাংলাদেশে প্রধান ধর্ম হলো ইসলাম। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান- এসব ধর্মের মানুষও এখানে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে। বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব- ঈদ, পূজা, বড়দিন- সবার জন্যই আনন্দের উৎসব। বাংলার প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব লোকাচার ও রীতিনীতি রয়েছে। পয়লা বৈশাখ, নববর্ষ, দুর্গাপূজা, ঈদ- এসব উৎসব বাঙালির জীবনে আনন্দ ও উৎসাহের সঞ্চার করে। 

বাঙালি খাবারের জন্য বিখ্যাত। ভাত, মাছ, মাংস, তরকারি- এসব নিয়ে তৈরি হয় বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার। ইলিশ মাছ, রসগোল্লা, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি- বাংলার এসব খাবার বিশ্বজুড়ে পরিচিত। বাংলার শিল্পকলাও সমৃদ্ধ। জামদানি, মসলিন, শাড়ি, লুঙ্গি, তাঁতের কাজ- এসব শিল্পকর্ম বাংলার ঐতিহ্য বহন করে। বাংলার সংগীত ও নৃত্যের ঐতিহ্যও অতুলনীয়। শাস্ত্রীয় সংগীত, লোকসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি- এসব সংগীতের ধারায় বাঙালির মন ভরে ওঠে। 

নৃত্যের মধ্যে কথক, ভরতনাট্যম, ধামালি নৃত্য উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আমাদের জাতীয় সম্পদ। এই বৈচিত্র্যকে লালন-পালন করে আমরা গড়ে তুলতে পারি একটি সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও সুন্দর বাংলাদেশ। আমাদের সবার উচিত আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে লালন-পালন করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা।

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ফলে আমাদের পৃথিবী হয়ে ওঠে আরও সমৃদ্ধ ও সুন্দর। আমাদের উচিত এই বৈচিত্র্যকে লালন-পালন করা এবং এর সুফলগুলো ভোগ করা। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা গড়ে তুলতে পারি একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বিশ্ব যেখানে সব সংস্কৃতি সমানভাবে সমাদৃত হবে।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী
[email protected]