ঢাকা ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩, রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
খোকসায় বন্ধুজন এর বর্ষাবরণ ও ফল উৎসব আইসিইউতে নতুন আতঙ্ক: ওষুধ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ায় বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যু পতিত সরকার জনমিতিক বোঝা দিয়ে দেশ থেকে পালিয়ে গেছে: উপদেষ্টা তিতুমীর ঢাকার বাস ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে উদ্যোগ, ৩২ রুটে সমঝোতা ইউরেনিয়ামকে নিরাপদ রাসায়নিক যৌগে রূপান্তর ব্যাকটেরিয়ার মালয়েশিয়ান ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের সঙ্গে পঞ্চগড়ের ব্যবসায়ীদের মতবিনিময় পঞ্চগড়ে ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বে আব্দুল হাই ও সুলতান মাহমুদ আশুলিয়ায় জিম্মি উদ্ধার অভিযানে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি সিরিয়ায় দুই বাসের ভয়াবহ সংঘর্ষে নিহত ৩৫ কুষ্টিয়ায় পুকুরে গোসলে নেমে কলেজ ছাত্রের মৃত্যু ছাত্র আন্দোলন নিয়ে নীরব, বিশ্ব ঐতিহ্য নিয়েই পোস্ট মোদির সফল অস্ত্রোপচার করল হিউম্যানয়েড রোবট জয়পুরহাটে বন্দুক ও শর্ট গানের কার্তুজ উদ্ধার পরিচ্ছন্ন চট্টগ্রাম গড়ার প্রত্যয়ে কর্ণফুলীতে র‍্যালি শিক্ষামন্ত্রী গেছেন, এবার সরকার যাবে: রাহুল গান্ধী কক্সবাজারে ইয়াবাসহ আওয়ামী লীগ নেতা আটক সাংবাদিকতায় টিকে থাকতে প্রযুক্তিতে দক্ষ হতে হবে: পিআইবি মহাপরিচালক চট্টগ্রামে লরিচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত বাগমারায় বিএনপি নেতার বাড়িতে ককটেল হামলা চট্টগ্রামে নালায় ১৩২০ গুলির খোসা উদ্ধার, তদন্তে পুলিশ নৌপথে চাঁদাবাজি বন্ধের দাবিতে হরিরামপুরে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত ডেঙ্গুতে আরও ১ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ৪৩৯ অরবিটাল বুস্টার পুনরুদ্ধারে চীনের বড় সাফল্য আসছে রেঞ্জ রোভারের নতুন ইলেকট্রিক জিটি কুবিতে প্রবেশে ফয়জুল করিম অনুমতি পেলেও বাধার মুখে নেতাকর্মীরা চট্টগ্রামে পরিত্যক্ত অবস্থায় আমেরিকার তৈরি অস্ত্র উদ্ধার স্যামসাংয়ের নতুন গ্যালাক্সি ওয়াচ দ্বিতীয় দিনে আরও ১টি ড্রোন ভূপাতিত করল রোমানিয়া শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ জমা ২৭ জুলাই: চিফ প্রসিকিউটর

পালাবদল মালাবদল

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম
পালাবদল মালাবদল
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

লবণহাটিতে আবার মজুমদারদের দিন ফিরে এসেছে। এবার পালাবদল মালাবদলে নতুনদের মধ্যে বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনা, তা জোরেশোরে শুরু হওয়ার পথে। এ সময় কী করবেন বর্ণচোরাদের বন্যায় ভেসে যাওয়া প্রবীণ এ্যান এক্সপার্ট হেড মাস্টার সর্বজনাব শহীদুল সরকার গংরা?...

করাতোয়ার তীরঘেঁষে একটি গ্রাম। নাম তার লবণহাটি। সেই গ্রামের এক সময়ের সুশীল শিশু শহীদুল সরকার আইএ পাসের পর প্রথম জীবনে স্থানীয় হাইস্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছিলেন। গ্রামগঞ্জে তখন কার্লমার্কস-চর্চা জোরেশোরে সবে শুরু হয়েছে। ওস্তাদ-সাগরেদরা উঠতি আঁতেল প্রকৃতির সে সময় সেরখানেক ফিদেল কাস্ত্রো, আধা কেজি পরিমাণ ট্রটস্কি, পরিমাণমতো টিটো, মাও সেতুং ও মার্টিন লুথার কিং, চার চা-চামচ চৌচেস্কু ইত্যাদির অধ্যয়নে সময় কাটাত। শহীদুল গাঁওগেরামের অর্থনীতির আলোচনায় বামঘেঁষা আঁতেলভাবই শুধু প্রকাশ করত, তা নয়। লেখালেখীর পাঁয়তারাও ছিল তার। মাস্টার ডিগ্রির পর তার বড় শখ ছিল লবণহাটি হাইস্কুলের হেড মাস্টার হওয়ার কিন্তু স্কুলে হঠাৎ করে তো কেউ হেড মাস্টার হতে পারে না এবং তখন দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নীতি-নৈতিকতায় এত অধঃপতন সাধিত হয়নি যে, কেউ তদবির-তেলেসমাতিতে, এমনকি বিশেষ ক্ষমতা বলে হেড মাস্টার কেন কয়েক বছর পড়িয়ে প্রভাষক কিংবা সরাসরি অধ্যাপক হতে পারতেন। তাই তিনি হঠাৎ হোমরা-চোমরা হওয়ার জন্য গ্রামের চৌধুরীবাড়ির বড় কেরানির চাকরিতে নাম লেখালেন। গোটা গ্রামে তখন চৌধুরী পরিবারের প্রতিপত্তি যেমন ছিল, একই সঙ্গে নিবু নিবু অবস্থায় ছিল গ্রামেরই আরেক প্রধান পরিবার মজুমদারদের প্রভাব।

বড় চৌধুরী হরিচরণ বাবু হঠাৎ হার্টফেল করলেন। সর্বেসর্বা ক্ষমতাধরের এমন অন্তর্ধানে চৌধুরীপাড়ায় তো বটেই, মোকামে মড়ক লেগেছে ঠাহর হলো। সবাই হতভম্ব। এমন অবস্থায় মজুমদারদের মুখে চন্দন। কমল মজুমদার তার প্রভাব-প্রতিপত্তির পসার সাজানো শুরু করেছেন। চৌধুরীদের দহলিজ থেকে মজুমদারদের দস্তরখানায় পাত্র নিলেন শহীদুল। তার এই রাতারাতি ভোল পাল্টানোয় সবাই আশ্চর্য হলো বৈকী। পালাবদলে শুধু শহীদুল একা নন, তার বন্ধুবান্ধব বেশ কয়েকজন ইতোমধ্যে কমল মজুমদারের সভায় স্থান করে নিয়েছে। মজুমদাররা গ্রামের উন্নয়নের নামে বেশ কিছু কর্মসূচি হাতে নিলেন। গ্রামের উন্নতি কীভাবে হবে, কীভাবে লবণহাটির মানুষ সহজে সুপেয় পানি পাবে, বিদ্যুৎ পাবে, গোলা ভরা ধান পাবে, পুকুর ভরা মাছ পাবে। আরও কত কী স্বপ্ন দেখা ও দেখানো শুরু হয়ে গেল। মজুমদাররা কর্মসূচি নিলেন গ্রামের যত খানাখন্দ, পুকুর-পুষ্করণী, খালবিল সব খনন করে সেখানে সুপেয় পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা। খনন করা খাল ও পুকুরপাড়ে লাগোনো শুরু হয়ে গেল ফল, ফসল, পাট ও ধান। সঙ্গে শুরু হলো মাছ চাষের আর্ট ও গান। এসব কাজেকর্মে কমল মজুমদার আর শহীদুল হঠাৎ করে যেন পরস্পরের ভাবশিষ্য ও হরিহর আত্মা হয়ে গেলেন। রাতদিন খাল খনন কাজে শহীদুল এমনভাবে নিজেকে জড়ালেন যেন মনে হচ্ছিল মজুমদারদের এমন ভক্ত কুশিলব ভূ-ভারতে আর জন্মায়নি। চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। তাতে শহীদুলের পসারও বাড়তে লাগল। তরতর করে পেয়ে গেলেন পদোন্নতি। তিনি হোমরাচোমরা হয়ে মাঝে মধ্যে আশপাশের বড় বড় বিদ্যালয়েও বক্তৃতা দিতে যান। মোটামুটি একজন বুদ্ধিদীপ্ত কামলার পর্যায়ে উঠে গেলেন তিনি।

কমল মজুমদার চাপাডাঙ্গায় নানাবাড়ি বেড়াতে গিয়ে বর্ষণমুখর ভোরে খুন হলেন। এই অদৈব দুর্বিপাক-দুর্ঘটনায় মজুমদারবাড়িতে সবাই মুষড়ে পড়লেন। উপায়ন্তর না দেখে মজুমদার আমলে বাড়াবাড়ি করায় শহীদুল পিঠ বাঁচানোর জন্য এই সুবাদে মধ্যপ্রাচ্যে তীর্থযাত্রী হওয়ার বাসনা বা ফন্দি আঁটলেন। সেখানে তার এক সাগরেদকে ধরে চাকরি বাগিয়ে নেন শহীদুল। পালাবদলে পলাতক শহীদুল সেখানে তিনি তার পসার বাড়াতে চেষ্টিত হলেন। শহীদুল সরকার বরাবরই মেধাবী, চৌকশ, বাগ্মী ও বাক্যালাপে বেজায় শব্দ নির্মাণের শক্তি তার ছিল। সেসব চালবাজি খাটিয়ে প্রায় আট বছর মধ্যপ্রাচ্যে কাটিয়ে আবার গাঁয়ে ফিরলেন। এবার মনে হলো এ যেন খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন। গ্রামে তখন আবার চৌধুরী পরিবারের প্রভাব জাগতে শুরু করেছে। সবাই বিস্ময়ে একদিন দেখল কমল মজুমদারের কাছের কামলা খাটা সেই শহীদুল হঠাৎ করে চৌধুরীবাড়ির বড় আফামণির প্রেমে পড়ে গেলেন। হরিচরণ চৌধুরীর মেধাবী মেয়ে বিদেশে কূটকৌশল রপ্ত করে গ্রামে ফিরে এসেছে। ক্রমে ক্রমে সবার আফামণি গ্রামের মাথার মণি হওয়ার পথে। আপার ডাকসাইটে সহযোগী হওয়ার বাসনা শহীদুলের মধ্যে জেগে উঠল তীব্রভাবে। মোক্ষম এ সময়ে আপামণির নেক নজর লাভের আকাঙ্ক্ষায় শহীদুল গ্রামের সুবোধ ও সুশীলদের ‘শ্রীকৃষ্ণের বাঁশরী সুরে উতলা’ হতে উদ্বুদ্ধ করলেন। শেষমেষ কৃষ্ণরূপী শহীদুলের বাঁশরী শুনে সব সুশীল পালাবদলের বন্যায় গা ভাসাল। হ্যামিলনের সেই বাঁশিওলার মতো গাঁয়ের যত ছোটবড় মুটে-মজুর তার পিছু নিল। গাঁয়ের সবাই প্রমাদ গুনল। সুশীল সেবকদের মর্যাদা, মান্যিগণ্যি সব হাওয়ায় উড়ে গেল। হঠাৎ করে বড়ছোট জ্ঞান সকাল-বিকেলের পালাবদলে দুধ ও ঘোল-তেল আর ঘির মধ্যে একাকার হতে শুরু করল। বাড়ির লক্ষ্মী ঘরের লক্ষ্মী সুশীলদের এভাবে একূল-ওকূল বরণের খেলায় সবাই আঁতকে উঠল। এভাবে চৌধুরীরা যে তালুক পেল সেই তালুকে ভোল পাল্টানোয় পটিয়সী বসাক বাবু সর্বেসর্বা পরিকল্পনা বিশারদ হয়ে উঠলেন। ঘরের সৌন্দর্য যেসব ললনারা তার কথা শুনে জাতকুলের মান খেয়ে কৃষ্ণের বাঁশি শুনে বের হয়েছিল তাদের বেশ এনাম দিয়ে পুরস্কৃত করা হলো আর যারা তার কথা রাখেনি তাদের ঘরছাড়া করা শুরু হয়ে গেল। এ যেন গ্রাম্য ক্ষ্যামতা প্যাঁচালের উৎকোচের উদগ্র উদ্বাহু। যাই হোক, বছর পাঁচেক পর মজুমদারবাড়ির বড় বউ চৌধুরীবাড়ির আপামণির বিরুদ্ধে চেয়ারম্যান ভোটে দাঁড়িয়ে জিতে গেল। অবস্থা যা দাঁড়াল তাতে প্রথম বেকায়দায় পড়লেন শহীদুল নিজে। এখন কোথায় দাঁড়াবেন শহীদুল সরকার? বারবার পক্ষ ত্যাগ করায় ওস্তাদ বর্ণচোরাদের মতো শহীদুলের এবার এক ঘরে হওয়ার জোগাড়। কমল মজুমদারের সঙ্গে তার এক সময়কার সখ্যতার সূত্র ধরে তার কুলরক্ষা হলো না এবার। তিনি এ গাঁ-সে গাঁয় গা ঢাকা দিয়ে বেড়ান। কয়েক বছরের মাথায় বেজায় গোলমাল বেঁধে গেল গ্রামে। ফণি মণ্ডলের ছেলে ননিগোপাল হঠাৎ করে মাতাব্বরি নিয়ে নিল গ্রামের। তখন তার দাপট আর দেখে কে। সে প্রথমে এসে শহীদুলদের মতো বসন্তের কোকিলদের কাবু করতে একঘরে আটকাল। সে ঘরে শহীদুলকে যে কয়দিন যেভাবে রাখা হয়েছিল বাবু তার বর্ণনা করে একখান বই লিখে ফেললেন। তাকে কীভাবে কথায় কথায় ঠাট্টা-মশকরায় মাথায় ঘোল ঢেলে দিয়ে হেনস্থা ও অপমান করা হয়েছে, সেসব কথা সবাইকে বলার বাসনা থেকে তিনি বইটা ছাপার উদ্যোগ নিলেন। তবে তার মনে হলো এ কয়দিনে তার মাথায় নতুন অনেক বুদ্ধিও গজিয়েছে।

এসব হেনস্থায় একবার তার ধারণা হলো তার আদি স্বপ্ন শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়া উচিত। বারবার পালাবদল মালাবদলে ভোল পাল্টিয়ে তিনি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তা নিয়ে একখানা ভালো পাঠ্যপুস্তক রচনা করতে পারবেন তিনি। বাল্য ও কিশোরকালে এ্যান এক্সপার্ট হেড মাস্টারের যে নোট বই তিনি বা তেনারা পড়তেন তার এই বইও জিপিএ-ফাইভ না হলেও অন্তত প্রশ্ন ফাঁসরোধের দাওয়াই হিসেবে কাজে লাগতে পারে। এই বই একজন অভিজ্ঞ হেড মাস্টারের তাজ তার মাথায় পরাতে পারে। শহীদুল এটাও তবক নিলেন যে, কীভাবে টাকা-পয়সা নয়ছয় করা যায়, না আঁচিয়ে কামানো যায়, সরানো যায়, বাঁচানো যায়। শহীদুল মজুমদারের দিব্যচোখ খুলে গেল। ব্যস ইতোমধ্যে চৌধুরীরা আবার লবণহাটির প্রভু হয়ে উঠল। তারা শহীদুল সরকারের প্রতি মুখ ফেরালেন। তার জ্যোতি বেড়ে গেল।

এবার বয়োবৃদ্ধ বাবু ক্ষমতায় থাকার সুবাদে টাকা-পয়সা সরানোর ব্যবসায় নাম লেখালেন। গ্রামের বড় বড় ব্যববসায়ী কনট্রাক্টর ও সরল মানুষের টাকা নয়ছয় করার কাজে ও লেনদেনের ব্যবসায় বাবু বেশ বিশ্বস্ত ও এ্যান এক্সপার্ট হেড মাস্টার হয়ে উঠলেন। ঘরের টাকা-পয়সা, গহনাগাটি হাতিয়ে নেওয়ার কাজে তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একদিন তিনি সবাইকে পথে বসিয়ে ছাড়লেন। স্কুলের চাকরি পাওয়ার বয়স তার আর নেই, তথাপি সবাই তাকে এ্যান এক্সপার্ট হেড মাস্টার হিসেবে মান্যিগণ্যি করতে করতে গালমন্দ করতে শুরু করল। লবণহাটিতে আবার মজুমদারদের দিন ফিরে এসেছে। এবার পালাবদল মালাবদলে নতুনদের মধ্যে বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনা, তা জোরেশোরে শুরু হওয়ার পথে। এ সময় কী করবেন বর্ণচোরাদের বন্যায় ভেসে যাওয়া প্রবীণ এ্যান এক্সপার্ট হেড মাস্টার সর্বজনাব শহীদুল সরকার গংরা? 

লেখক: উন্নয়ন গবেষক ও বিশ্লেষক

অনিয়ন্ত্রিত বায়ুদূষণ, জনস্বাস্থ্যসংকট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৩:৫৮ পিএম
অনিয়ন্ত্রিত বায়ুদূষণ, জনস্বাস্থ্যসংকট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়
ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল

বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে পরিবেশ সুরক্ষাকে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সবুজায়ন বৃদ্ধি, জলাশয় সংরক্ষণ এবং শহরের উন্মুক্ত স্থানগুলোকে দূষণমুক্ত রাখার জন্য দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করতে হবে। আগামী দিনে এই নীরব ঘাতক দেশের জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকে এমন এক ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে, যা থেকে ফিরে আসা আর কখনোই সম্ভব হবে না।...

যে বাতাসকে আমরা জীবনের অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে গ্রহণ করি, সেই বাতাসে ভেসে বেড়ানো অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণা প্রতিনিয়ত আমাদের অজান্তেই কেড়ে নিচ্ছে হাজারো প্রাণ। এটি মানুষের তৈরি পরিবেশগত অবক্ষয়ের চরম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের ‘ক্লাইমেট চেইঞ্জ, এয়ার কোয়ালিটি অ্যান্ড হেলথ রিসার্চ ইউনিট’ কর্তৃক প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলোর বায়ুদূষণের যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি ও জরুরি সতর্কবার্তা। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পিএম২.৫ বা অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণাজনিত বায়ুদূষণের কারণে প্রতিদিন গড়ে ২৪২ জন মানুষ অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন। অর্থাৎ, বছরের হিসাবে শুধু দেশের প্রধান ছয়টি শহরেই প্রায় ৮৮ হাজার ২৪০ জন মানুষের অকালমৃত্যু ঘটছে এই দূষণের প্রভাবে।

দীর্ঘকাল ধরে বায়ুদূষণকে পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি দেশের সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। সূক্ষ্ম ধূলিকণা মানুষের শ্বাসনালি দিয়ে প্রবেশ করে সরাসরি ফুসফুস এবং পরে রক্তনালিতে পৌঁছে যায়। এর ফলে মানবদেহে বাসা বাঁধছে হৃদরোগ, স্ট্রোক, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ, চর্মরোগ এবং ফুসফুসের ক্যানসারের মতো মারাত্মক সব অসংক্রামক ব্যাধি। বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি ঘটছে হৃদরোগের কারণে, যার সংখ্যা বছরে প্রায় ৩৭ হাজার ৫১৯ জন। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে ৮ হাজার ৩৪৪ জন এবং ফুসফুসের ক্যানসারে ৮১১ জন মানুষ প্রতি বছর মারা যাচ্ছেন।

ফলে বায়ুদূষণ মানুষের আয়ু কমিয়ে দেওয়ার অন্যতম প্রধান অনুঘটক। প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ২৬০ জন মানুষের এই অকালমৃত্যু দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর এক বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই মৃত্যুর মিছিল দিন দিন দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের প্রধান শহরগুলোতে বায়ুদূষণজনিত অকালমৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং শিল্পকারখানার বর্জ্যের কারণে শহরের বায়ুমানের দ্রুত অবনতির ফল।

রাজধানী ঢাকা এ সংকটের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। মেগাসিটি ঢাকায় বছরে প্রায় ৬৮ হাজার ৭০৩ জন মানুষের অকালমৃত্যু সরাসরি পিএম২.৫ দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর বাইরে দেশের অন্যান্য প্রধান শহর চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট এবং বরিশালেও এই মৃত্যুর গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। ঢাকা শহরের বাতাসে দূষণের মাত্রা এতটাই তীব্র যে, এখানে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৪৮৪ জন অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এই বিপর্যয় দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকেও চরম ঝুঁকিতে ফেলছে। বায়ুদূষণের এই ভয়াবহ রূপ বেঁচে থাকা মানুষের কর্মক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

আবার, গবেষণায় যে অর্থনৈতিক চিত্র উঠে এসেছে, তা যেকোনো দেশের অর্থনীতির ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণাজনিত বায়ুদূষণের কারণে দেশে বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। দেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ। এই বিশাল অঙ্কের ক্ষতি দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশের সমান। একটি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় জিডিপির ৫ শতাংশ শুধু বাতাসের বিষাক্ততার কারণে ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয়।

বায়ুদূষণের ফলে যখন দেশের হাজার হাজার মানুষ হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যানসার কিংবা দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন, তখন পরিবার ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যয়ের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। আক্রান্ত ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তা দেশের নাগরিকদের সঞ্চয়কে গ্রাস করে এবং বহু পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়। এ ছাড়া, অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত এই বিপুল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসায় রাষ্ট্রকে তার স্বাস্থ্য বাজেটের একটি বড় অংশ বরাদ্দ রাখতে হয়, যা অন্য কোনো উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করা যেত। ফলে সামগ্রিক উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্থবির হয়ে পড়ছে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অর্থনৈতিক ক্ষতির আরেকটি কারণ হলো কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং উৎপাদনশীলতার সংকট। বায়ুদূষণের কারণে যখন প্রতিদিন গড়ে ২৪২ জন মানুষ অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন এবং লাখ লাখ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, তখন দেশের শ্রমবাজার থেকে একটি বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারিয়ে যাচ্ছে। একজন অসুস্থ মানুষ কর্মক্ষেত্রে তার পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে কাজ করতে পারেন না, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কলকারখানা, অফিস-আদালত এবং কৃষিক্ষেত্রের উৎপাদনশীলতার ওপর। অসুস্থতাজনিত ছুটির কারণে যেমন ব্যক্তিপর্যায়ে আয় কমে যায়, তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে উৎপাদন ব্যাহত হয়।

বায়ুদূষণের যে ভয়াবহ স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক ক্ষতির চিত্র গবেষণায় উঠে এসেছে, তা দেশের প্রচলিত ও দায়সারা গোছের পদক্ষেপ দিয়ে মোকাবিলা করা অসম্ভব। তবে আশার আলো দেখিয়েছেন গবেষকরা। সঠিক পরিকল্পনা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বায়ুর গুণগত মান নির্দেশিকা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই বিপুল অকালমৃত্যু এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির বড় অংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। বাতাসের এই অদৃশ্য বিষকে রুখে দিতে প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী, প্রমাণভিত্তিক নীতি গ্রহণ এবং তার কঠোর বাস্তবায়ন।

এ সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য সবার আগে প্রয়োজন দূষণের প্রধান উৎসগুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। নগরাঞ্চলে বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ। রাস্তাঘাট ও বহুতল ভবন নির্মাণের সময় ধূলিকণা বাতাসে ওড়া বন্ধ করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিয়মিত পানি ছিটানো বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সঙ্গে, দেশের কলকারখানা ও ইটভাটাগুলোকে আধুনিক পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা এবং শহরের পরিধির বাইরে স্থানান্তর করা অত্যন্ত জরুরি। পিএম২.৫ নির্গমন কমাতে জিরো-এমিশন বা পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা, যেমন বৈদ্যুতিক যান এবং উন্নত রেল ও মেট্রোরেল ব্যবস্থার সম্প্রসারণে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

বায়ুদূষণকে একটি জাতীয় জরুরি জনস্বাস্থ্যসংকট হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন এবং নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী বায়ুমান ব্যবস্থাপনা সেল গঠন করতে হবে। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, পরিবেশ আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ও আর্থিক জরিমানার বিধান কার্যকর করতে হবে। এ ছাড়া, দেশের প্রতিটি প্রধান শহরে বায়ুর মান সার্বক্ষণিক মনিটর করার জন্য আধুনিক মনিটরিং স্টেশন স্থাপন এবং সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত বায়ুমান সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন, যাতে তারা উচ্চ দূষণের দিনগুলোতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতে পারেন।

একটি বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে পরিবেশ সুরক্ষাকে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সবুজায়ন বৃদ্ধি, জলাশয় সংরক্ষণ এবং শহরের উন্মুক্ত স্থানগুলোকে দূষণমুক্ত রাখার জন্য দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করতে হবে। বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর জিডিপির ৫ শতাংশ ক্ষতি হওয়ার চেয়ে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি লাভজনক। সরকার, সুশীল সমাজ, গবেষক এবং সাধারণ জনগণের যৌথ ও সমন্বিত উদ্যোগই কেবল পারে আমাদের বাতাসকে আবার নির্মল ও শ্বাসযোগ্য করে তুলতে। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আগামী দিনে এই নীরব ঘাতক দেশের জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকে এমন এক ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে, যা থেকে ফিরে আসা আর কখনোই সম্ভব হবে না।

লেখক: চিকিৎসক, ছড়াকার ও কলামিস্ট
[email protected]

উচ্চ মূল্যস্ফীতিই অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩৮ পিএম
উচ্চ মূল্যস্ফীতিই অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ
ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম

কোনো দেশে যদি অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারীরা পর্যাপ্ত পরিমাণে বিনিয়োগ না করেন, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত সে দেশে বিনিয়োগের জন্য আগ্রহী হন না। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা যদি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেন, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মনে করেন দেশটিতে বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ আছে। তখন তারা বিনিয়োগের জন্য উৎসাহী হন।...

অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা। এর জন্য দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করা। অনেকেই আমদানি কমানোর কথা বলতে পারে। কিন্তু আমাদের মতো দেশে আমদানি কমালে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কারণ, আমদানি করা পণ্যের বড় অংশই শিল্পের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী উপকরণ। ফলে উৎপাদন ও সরবরাহ–উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যা সৃষ্টি হবে। কাজেই রপ্তানি আয় কীভাবে বাড়ানো যায়, সে জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। ইতোমধ্যে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সেও কিছুটা ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। এ ধারাটা অবশ্যই যেন বজায় থাকে সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সবকিছু মিলিয়ে গুরুত্বের ভিত্তিতে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করা যায়।

বর্তমান সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি একটি কঠিন ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। করোনা-পরবর্তী সময়ে বিশ্ব অর্থনীতি স্থিতিশীল হওয়ার আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। ফলে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা পলিসি রেট বৃদ্ধি করাসহ নানা ধরনের প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকও বেশ কয়েকবার মুদ্রানীতি পরিবর্তন করেছে। যদিও বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এজন্য আমাদের মুদ্রানীতিও রাজস্ব নীতির সমন্বয় সাধন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মূল্য বৃদ্ধি করে পণ্যের চাহিদা হয়তো কমানো যাবে। কিন্তু পণ্যের জোগান যদি একই সঙ্গে বৃদ্ধি না পায়, তাহলে মূল্যস্ফীতি কখনো কমবে না। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পেলে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কমে যায়। বিনিয়োগ কমে গেলে উৎপাদন কমে যাবে। আর উৎপাদন কমে গেলে কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি হবে না। সবার জন্য উপযুক্ততা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা না গেলে দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম কোনোভাবেই কাজে আসবে না। কাজেই মূল্যস্ফীতির অভিঘাত রক্ষার পাশাপাশি আমাদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের রপ্তানি বাড়াতে হবে। এসব নানা ধরনের অভিঘাত মোকাবিলায় আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সুশাসনের দিকে আরও অনেক বেশি নজর দিতে হবে।

মূল্যস্ফীতি বাড়লে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষগুলো খুবই অসুবিধার মধ্যে রয়েছে। মূল্যস্ফীতির হার যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, মজুরি বৃদ্ধির হার সেভাবে বাড়ছে না। মূল্যস্ফীতি আর মজুরি বৃদ্ধির এই পার্থক্যের কারণে সাধারণ মানুষ সংসারের ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক পরিবার তাদের খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। কেউবা তুলনামূলক কম পুষ্টিসম্পন্ন খাবার গ্রহণ করছে। অধিকাংশ দরিদ্র মানুষই এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। দেশের সাধারণ মানুষ প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছে। উচ্চ-মধ্যবিত্ত মানুষ হয়তো তাদের সঞ্চয় ভেঙে জীবনযাত্রার মানটা রক্ষা করতে পারে। কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর তো কোনো সঞ্চয় নেই। আমরা দেখছি, এই মানুষগুলোর জীবনমান ক্রমশই নিম্নমুখী হয়ে পড়ছে। এখানে আমাদের করতে হবে, তা হলো সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় যেসব প্রকল্প আছে, তা যেন সুষ্ঠুভাবে কার্যকর করা যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ভিডিপি, ভিডিএফ, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা–এদের অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম অভিযোগ আছে। প্রকৃতপক্ষে যারা পাওয়ার যোগ্য তারা পায় না। যারা পাওয়ার যোগ্য নয়, তারা পায়। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি কারচুপি হয়। এমনও দেখা যায় যে, খাদ্যসহায়তার কাজ কোনো কোনো মেম্বারের বাড়িতে হয়। সেখানে গুদামে রক্ষিত মালামাল অনেক সময় ধরাও পড়ে। এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে হবে। যারা এ ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত তাদের আইনের আওতায় নিয়ে এসে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দিনের পর দিন সাধারণ মানুষের জীবনমানের ওপর যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে আরও বিস্তৃত আকারে জনবান্ধব কর্মসূচি বা পদক্ষেপ নিতে হবে।

বর্তমানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি হ্রাসের প্রবণতা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। তবে চলতি অর্থবছরের সব পণ্যের আমদানি হ্রাস পাওয়াটা অর্থনীতির জন্য শুভ সংবাদ নয়। অপ্রয়োজনীয় বিলাসজাত পণ্যের আমদানি কমলে সেটা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তা ছাড়া সার্বিকভাবে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি মোটেও সন্তোষজনক নয়। আমরা জানি, বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত উপযোগী একটি দেশ। এখানে রয়েছে ১৭ কোটি ভোক্তার এক বিশাল বাজার। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় নানা ধরনের প্রতিবন্ধতার সম্মুখীন হয়ে থাকেন। অধিকাংশ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সেবামূলক প্রতিষ্ঠান থেকে বিনিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদন এবং সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার সম্মুখীন হতে হয়। ফলে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করতে হয়। নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পগুলো বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যেতে পারে না বলে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে উৎপাদিত পণ্য অনেক সময়ই উপযোগিতা হারায়। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নয়ন অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। আমি উল্লেখ করেছিলাম যে, মূল্যস্ফীতি অর্থাৎ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলছে। পণ্যের আমদানি শুল্কে ছাড় দিয়েও সেসব পণ্যের দাম কমছে না। এখানে প্রথম কথা হচ্ছে–পণ্যের দাম নির্ভর করে চাহিদার সরবরাহের ওপর। আমাদের চাহিদাও অনেকটা কমে গেছে মনে হচ্ছে। কেননা, ব্যাংকে ঋণের সুদহার বেড়েছে, সরবরাহ বাড়েনি। তা ছাড়া পণ্য সরবরাহে সমস্যা আছে। আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের পরও দাম কমছে না, বরং বাড়ছেই। এটি আমার অতীত অভিজ্ঞতায় দেখেছি। আমি একবার ভোজ্যতেলের ওপর আমদানি শুল্ক কমিয়ে দিলাম। দেখা গেল পরের দিন দাম বেড়ে গেছে। তখন এদের যে অ্যাসোসিয়েশন আছে, তাদের ডেকে বললাম, আপনারা যা করছেন তা ঠিক হচ্ছে না। আপনারা নিজেরাই আমদানি শুল্ক সমন্বয় করে দাম যেটা ন্যায্য হওয়া উচিত। সেই দামে আনুন। তা না হলে আমি অন্য ব্যবস্থা নেব। আপনাদের ব্যাংকঋণ দেওয়া বন্ধ করে দেব। অতীতে যে ঋণ আছে সেগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নেব। এসব বলার পর দাম কিছুটা কমেছিল। বর্তমানে নীতিনির্ধারক যারা আছেন তাদের এ ব্যাপারে অধিকমাত্রায় তৎপর হতে হবে।

এখনো সিন্ডিকেট আছে এবং তা ব্যাপকভাবেই আছে। এ মন্তব্য নিঃসন্দেহে গ্রহণযোগ্য। মাঝে মাঝে আমরা দেখি অপারেশন হয়। সেই অপারেশনে কয়জনকে ধরা হয়, কয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, সেটা নিয়ে আলোচনার বিষয় থাকতে পারে। মোটামুটিভাবে সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য আমি মনে করি, বর্তমানে যে আইন আছে ‘‌প্রটেকশন অব কনজ্যুমার লাইফ’–সে আইনের যথাযোগ্য বাস্তবায়ন জরুরি। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে এর মাত্রা বাড়ানো যেতে পারে। সাধারণ প্রান্তিক মানুষের জীবনযাপনের মান ফিরিয়ে আনতে এই শ্রেণির দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। এদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। অর্থনৈতিক কার্যক্রম সফল করতে হলে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে খুবই নাজুক অবস্থায় আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা চালাতে হবে। পণ্য পরিবহনকালে চাঁদাবাজি এখনো চলছে আগের মতোই। মার্কেটে মার্কেটে চাঁদাবাজি হচ্ছে। হয়তো চাঁদাবাজের বদল হয়েছে। কিন্তু চাঁদাবাজি বন্ধ হচ্ছে না। মূল্যস্ফীতির জন্য রাস্তায় রাস্তায় পণ্য চলাচলকালে চাঁদাবাজি অনেকাংশে দায়ী। বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেটের কারসাজি বন্ধে সরকারি বেসরকারি উভয়ক্ষেত্রেই কঠোর পদক্ষেপ করতে হবে। 

কোনো দেশে যদি অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারীরা পর্যাপ্ত পরিমাণে বিনিয়োগ না করেন, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত সে দেশে বিনিয়োগের জন্য আগ্রহী হন না। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা যদি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মনে করেন দেশটিতে বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ আছে। তখন তারা বিনিয়োগের জন্য উৎসাহী হন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ এখনো উন্নত এবং বিনিয়োগবান্ধব করতে পারিনি। বিনিয়োগ বৃদ্ধি করাটা বর্তমান সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। যদিও এই চ্যালেঞ্জ তাৎক্ষণিকভাবে সৃষ্টি হয়নি। আগে থেকেই অর্থনীতিতে এগুলো বিদ্যমান ছিল এবং এখনো আছে। রাষ্ট্রীয় খাতে যে বিনিয়োগ হয়, তা মূলত অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করে। আর ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ উৎপাদন বৃদ্ধি করে। তাই ব্যক্তি খাতের ওপর বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য জোর দিতে হবে। বিগত সরকারের সময় উদ্যোক্তা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজমান ছিল। ফলে বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও ‘ধীরে চলো’ নীতি অনুসরণ করছিলেন। আর কোনো দেশের উদ্যোক্তারা যদি নিজ দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিনিয়োগ না করেন, তাহলে সেই দেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে আসে না। অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ জিডিপির ২২-২৩ শতাংশে আটকে আছে। অথচ বাংলাদেশ যেভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করতে চাচ্ছে, তাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আহরণ ছাড়া কোনো উপায় নেই বলে মনে হয়। 

লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

অধ্যাপক আবদুল করিম: অনন্য মনীষা

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৯ এএম
অধ্যাপক আবদুল করিম: অনন্য মনীষা
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, দক্ষ শিক্ষা-প্রশাসক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ঐতিহাসিক, স্বনামধন্য এপিগ্রাফিস্ট, বরেণ্য ন্যুমিজমেটিস্ট এবং মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের গবেষক অধ্যাপক ড. আবদুল করিম পহেলা জুন ১৯২৮, শুক্রবার (১৩৩৫ বঙ্গাব্দের ১৭ জ্যৈষ্ঠ) চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে পিতা সৈয়দ ওয়াইজ উদ্দিন এবং মাতা সৈয়দা রাশিদা খাতুনের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন।
 
ছেলেবেলা থেকে তিনি ছিলেন অতিশয় মেধাবী। উচ্চ প্রাইমারি ও হাই মাদ্রাসা (দাখিল) পরীক্ষায় বৃত্তি লাভের পর চট্টগ্রাম ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে প্রবেশিকা ও আইএ পাস করেন মেধা বৃত্তি নিয়েই। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান তিনি। ১৯৪৯ সালে ইতিহাসে স্নাতক সম্মান এবং ১৯৫০ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে লেকচারার হিসেবে তার শিক্ষকতার জীবন শুরু করেন।
 
১৯৫১ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সময়েই মৌলিক গবেষণার জন্য ঢাকা ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুটি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের বিরল কৃতিত্ব তার। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সে সময়ের কিংবদন্তিতুল্য ঐতিহাসিক অধ্যাপক আহমদ হোসেন দানীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত তার গবেষণা কর্ম ‘সোশ্যাল হিস্ট্রি অব দ্য মুসলিমস ইন বেঙ্গল’-এর জন্য পিএইচডি ডিগ্রি দেন।
 
কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে ১৯৬০ থেকে ১৯৬২ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ’-এ অধ্যয়নকালে অধ্যাপক জে বি হ্যারিসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত তার অনবদ্য গবেষণাকর্ম ‘মুর্শিদ কুলী খান অ্যান্ড হিজ টাইমস’-এর জন্য তিনি দ্বিতীয় ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।
 
১৯৬২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিডার পদে উন্নীত হন। ১৯৬৬ সালে তিনি সদ্য প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে রিডার এবং বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান। তিনি ১৯৭০-৭২ ও ১৯৭৪-৭৬ দুই মেয়াদে আর্টস ফ্যাকাল্টির ডিন এবং নভেম্বর ১৯৭৫ থেকে এপ্রিল ১৯৮১ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর পুনরায় ইতিহাস বিভাগে যোগ দিয়ে ১৯৮৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
 
এরপর ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি ‘বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান’-এর মহাপরিচালক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৮৯-৯২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজে মুঘল ইতিহাসের আকর গ্রন্থ রচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সিনিয়র প্রফেসরিয়াল ফেলো নিযুক্ত হন। সেখান থেকে ফিরে ইতিহাস বিভাগে সুপারনিউমারি অধ্যাপক হিসেবে ১৯৯২ সালের জুন মাস থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এবং ২০০১ সালের নভেম্বর মাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম অধ্যাপক এমিরেটাস হিসেবে যোগ দিয়ে ২০০৭ সালের ২৪ জুলাই মৃত্যুর দিন পর্যন্ত সে পদে বহাল ছিলেন। 
 
অধ্যাপক আবদুল করিম (১ জুন ১৯২৮-২৪ জুলাই ২০০৭) 
 
অধ্যাপক করিম এশিয়াটিক সোসাইটির জীবন সদস্য ও সম্মানিত ফেলো। ১৯৬৪-৬৬ এর কাউন্সিলে তিনি ছিলেন সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারি। এশিয়াটিক সোসাইটি ১৯৯৬ সালে তাকে সোসাইটির নির্বাচিত ফেলো হিসেবে সম্মাননা দেয়। তার প্রধান গবেষণা কর্ম, উভয় অভিসন্দর্ভ এবং আকর গ্রন্থগুলো বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকেই প্রথম প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশে ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে প্রচলিত ধ্যানধারণা পদ্ধতি প্রক্রিয়ার বাইরে নবচেতনা ও মূল্যবোধের বিকাশধর্মী প্রবাহ প্রযত্ন দানের নিমিত্তে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি গঠনের তাত্ত্বিক উদ্যোক্তা ছিলেন অধ্যাপক করিম। তিনি ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৭ সাল অবধি ইতিহাস সমিতির সুযোগ্য সভাপতি ছিলেন। ইতিহাসের উপাদান হিসেবে মুদ্রাপাঠ ও পর্যালোচনায় তার অসাধারণ পাণ্ডিত্য ও পারঙ্গমতার স্বীকৃতি স্বরূপ ভারতের নিউমিজম্যাটিক সোসাইটি তাকে আকবর সিলভার পদকে এবং শিক্ষায় তার গৌরবদীপ্ত অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ১৯৯৫ সালের একুশে পদকে ভূষিত করেন। 
 
ইতিহাস চর্চায় অধ্যাপক আবদুল করিমের পরিমণ্ডল বাংলার মধ্যযুগ। তিনি যখন গবেষণা শুরু করেন তখন বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস ছিল প্রায় অনুদঘাটিত, অস্পষ্ট, অনুচ্চারিত, এককথায় অন্ধকারাচ্ছন্ন। বাংলার মুসলমানদের অন্ধকারাচ্ছন্ন ইতিহাসে আলোকসম্পাতের সুমহান ব্রত নিয়েই তিনি তার গবেষণা কর্মে ব্রতী হয়েছিলেন। মধ্যযুগের ইতিহাসের অপ্রতুল উৎস উপাদানের কারণে তিনি সুলতানি আমলের প্রাপ্ত মুদ্রা পাঠ ও বিশ্লেষণের মেথডোলজি অবলম্বন করেন।
 
তার নিরলস পরিশ্রমে, আন্তরিক প্রয়াসে পরিচালিত গবেষণায় এবং পরবর্তী সময়ে তাকে অনুসরণ করে অন্য গবেষকদের প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে বর্তমানে সে ইতিহাসে স্বচ্ছতা এসেছে, বাংলার মুসলিম আমলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ ও সভ্যতা সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞান আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এতদিনের ইতিহাস চর্চায় রাজনৈতিক তথা রাজা-বাদশাহদের উত্থানপতন, রাজ্য বিস্তার কিংবা খোয়ানোর খতিয়ানের সীমানা পেরিয়ে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনমানের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে ‘মানুষের ইতিহাস’ নির্মাণের পক্ষপাতী পথিকৃৎ ছিলেন তিনি।
 
পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের ভাবমণ্ডল থেকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে ইতিহাস চর্চাকে এই আধুনিকী তথা বিস্তৃতি ও বাস্তবমুখীকরণের প্রতি দায়বদ্ধতার কাণ্ডজ্ঞান থেকেই বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি সংগঠনে সক্রিয় সমর্থন জুগিয়েছিলেন তিনি। সূর্যের আলো ছোট-বড় নির্বিশেষে সব বৃক্ষরাজির ওপর যেমন আপতিত হয় নির্দ্বিধায় ও নিরপেক্ষতায়। তার মতে, ইতিহাস তেমনি হবে সবার সব পর্যায়ের জীবনবৃত্তান্তের বয়ান। ‘সত্যকে খুঁজিব, বুঝিব, গ্রহণ করিব এবং নির্ভয় নিরপেক্ষতায় তা প্রকাশ করিব’ এই ছিল ইতিহাসবেত্তা আবদুল করিমের গবেষক জীবনের মূলমন্ত্র। 
 
তিনি তার গবেষণার বিষয়বস্তু হিসেবে যে ক্ষেত্রকে বেছে নিয়েছিলেন সেখানে তার পদচারণা মোটেই সহজসাধ্য ছিল না। তথ্য-উপাত্তের নিদারুণ দুষ্প্রাপ্যতায় তাকে সেকেন্ডারি সোর্সের পরিবর্তে প্রাইম সোর্স হিসেবে মুদ্রা ও খোদাইকরা লিপি পাঠের মতো দুরূহ কর্মে ব্যাপৃত হতে হয়েছে। এজন্য আরবি, ফার্সি, উর্দু, চর্যাপদ, সংস্কৃত এমনকি ফ্রেঞ্চ ও ডাচ ভাষা রপ্ত করতে হয়েছে। তার এ প্রয়াস প্রচেষ্টায় তার গবেষণাকর্মের যে মর্যাদা, গুরুত্ব ও তাৎপর্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে তার পথিকৃৎ-নেতৃত্বদানের স্বীকৃতি মিলেছে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক জে বি হ্যারিসনের মন্তব্যে- ‘… Dr Karim will be in a position to inaugurate a series of local studies of the sort, which have so enriched British or European history. Here is a whole new field of studies of great interest in themselves and of special enthusiasm and insight to equip him well for leadership in such an enterprise.’
 
গবেষণার ফলাফল উপস্থাপনার ক্ষেত্রেও অধ্যাপক আবদুল করিমের যুক্তি ও পর্যালোচনানির্ভর রচনাশৈলীও ছিল স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর। এশিয়াটিক সোসাইটির অনবদ্য অবদান ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ১৭০৪-১৯৭১’ শীর্ষক তিন খণ্ডের প্রকাশনায় তিনি সম্পাদকীয় বোর্ডের সম্মানিত সদস্য তো ছিলেনই, তিনি প্রথম খণ্ড (রাজনৈতিক ইতিহাস)-এ ‘সুবাহ বাংলা: সরকার ও রাজনীতি’ এবং দ্বিতীয় খণ্ড (অর্থনৈতিক ইতিহাস)-এ ‘মুগল রাজস্ব ব্যবস্থা’ শীর্ষক দুটি প্রবন্ধ নিবেদন করেন। সুবাহ বাংলা প্রবন্ধটির প্রারম্ভেই তার গবেষণালব্ধ ফলাফল ও বিধিতব্য বিশ্লেষণে যাওয়ার যৌক্তিকতা স্পষ্ট করা হয়েছে এভাবে–
 
‘সম্রাট আকবর কর্তৃক বাংলার একাংশ বিজয়ের পর সুবাহ বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যবাদী শাসনব্যবস্থায় একটি প্রশাসনিক একক হিসেবে গড়ে উঠে এবং ১৮ শতকের শেষ নাগাদ পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। এ সময় সুবাহ বাংলার ভৌগোলিক অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ প্রশাসন এবং কেন্দ্রের সাথে এর সম্পর্কের লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটে। সাম্রাজ্যের কেন্দ্রের অধীনে একটি প্রশাসনিক একক হিসেবে এ সুবাহর কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা শুরুর পূর্বে এর ভৌগোলিক সীমানা পরিবর্তনের বিবরণ প্রদান করা প্রয়োজন, কারণ আঞ্চলিক পরিবর্তন অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ও সুবাহর সাথে কেন্দ্রের সম্পর্কের ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে।’ 
 
ইতিহাস চর্চা ও গবেষণায় নিমগ্ন এই অজাতশত্রু শিক্ষাবিদ শিক্ষা প্রশাসক হিসেবে এবং ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলেন আদর্শ স্থানীয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েই সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের হাউস টিউটরের দায়িত্ব পেয়েছিলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন ইতিহাস বিভাগের প্রধান হিসেবে, প্রথম ছাত্রাবাস আলাওল হলের প্রভোস্ট, দুদফায় আর্টস ফ্যাকাল্টির ডিন এবং সুদীর্ঘ ছয় বছর উপাচার্যের দায়িত্ব তিনি পালন করেছিলেন ঈর্ষণীয় দক্ষতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে।
 
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নতুন বিভাগ খোলার ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য। তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার দ্রুততা, ক্ষমতা ও প্রজ্ঞায় তার সহকর্মী-সহযাত্রীরা বরাবরই বিমুগ্ধ হতেন। মতপার্থক্য, সংঘাত ও সংঘর্ষ সমাধানের সহজপথ যেন তার করায়ত্তে থাকত। অপূর্ব স্মরণশক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্ট তার নখদর্পণে থাকায় তার ফাইল ওয়ার্ক অপূর্ব ছিল বলে তার সহকর্মীদের সাক্ষ্য রয়েছে। অর্ধশতাব্দীর অধিককালে অগণিত ছাত্রের প্রতি তার অকৃত্রিম ও আন্তরিক আচরণের বর্ণনা সকৃতজ্ঞতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। 
 
লেখক: সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান

ছাত্র বিক্ষোভের নতুনমাত্রা দিল্লির রাজপথ থেকে লোকসভায়

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ১১:২৩ এএম
দিল্লির রাজপথ থেকে লোকসভায়
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

প্রতিদিন সকাল থেকেই দিল্লির আন্দোলনকারীদের ভিড় বাড়ছে। তাদের এক দফা দাবি–কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। এদিকে ছাত্র-যুবদের ওপর পুলিশের হামলার প্রতিবাদে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে ধর্ণায় বসেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এবং সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি জানান। নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। গোটা ভারতে ছাত্র ও রাজনৈতিক বিক্ষোভ ধর্মঘট আজ।...

হাসপাতালে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষাবিদ ও সমাজসৈনিক সোনম ওয়াংচুক। অন্যদিকে, দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাসসহ বিভিন্ন দমনমূলক পদক্ষেপ উপেক্ষা করে আন্দোলনকারীরা রাজপথে অবস্থান করছেন। সংসদ অভিযান চালানোর ঘোষণাও দিয়েছেন তারা। এদিকে সময়ের সঙ্গে আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও জনসমর্থন বাড়ছে। দিল্লির পাশাপাশি কলকাতা, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর, চেন্নাই, পুনেসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে ছাত্র-যুবদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের বিভিন্ন শহরেও সংহতি কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। সর্বত্রই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পদত্যাগের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।

প্রতিদিন সকাল থেকেই দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের ভিড় বাড়ছে। তাদের এক দফা দাবি–কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। আন্দোলনের প্রভাব নিউইয়র্ক ও লন্ডনসহ বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। এদিকে ছাত্র-যুবদের ওপর পুলিশের হামলার প্রতিবাদে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে ধর্ণায় বসেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এবং সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি জানান। নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। গোটা ভারতে ছাত্র ও রাজনৈতিক বিক্ষোভ ধর্মঘট আজ।

অনশনরত ওয়াংচুকের প্রতি সংহতি জানিয়ে আমেরিকার একটি ‘অ্যাডভোকেসি গ্রুপের’ সদস্যরা নিউইয়র্ক এবং সান হোসে শহরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। ‘হিন্দুস ফর হিউম্যান রাইটস’ নামক ওই গ্রুপের সদস্যরা জমায়েত করেন নিউইয়র্কের ইউনিয়ন স্কয়ার এবং সান হোসে শহরে মহাত্মা গান্ধী মূর্তির সামনে। সেই জমায়েত থেকে উঠেছে ধর্মেন্দ্রর ইস্তফার দাবি। শুধু নিউইয়র্ক বা সান হোসেতে নয়, লন্ডন এবং ডাবলিনেও একইভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন ওই গ্রুপের সদস্যরা।

নিটে প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে চলতি সপ্তাহের শুরু থেকেই সিজেপির সংসদ অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল দিল্লি। পুলিশের লাঠি-কাঁদানে গ্যাসের বাধা কাটিয়ে সোমবার দুপুরে সংসদ ভবনের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন বিক্ষোভকারীরা। তবে শেষপর্যন্ত সংসদে পৌঁছাতে পারেননি তারা। সিজেপি এবং বিরোধী নেতৃত্বের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে দমনমূলক আচরণ করেছে পুলিশ। সেই আচরণের প্রতিবাদে মঙ্গলবার পথে নামেন রাহুল, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, উদ্ধব ঠাকরেরা। প্রথমে মোদির বাসভবনে কংগ্রেসের বিক্ষোভ, পরে রাহুলদের আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া, রাতে পুলিশকে লক্ষ্য করে যন্তর মন্তরে ইট, পাথর ছোড়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার পারদ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এই আবহেই লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল কেন্দ্রের কাছে পাঁচ দফা দাবিও জানিয়েছেন। 

আটক অবস্থায় ভিডিও বার্তায় রাহুল গান্ধী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পদত্যাগ দাবি করেন। পাশাপাশি বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলার অভিযোগে দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার, সরকারের ক্ষমাপ্রার্থনা এবং সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার দাবি জানান তিনি। এদিকে শুরু থেকেই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছেন তৃণমূলের মহুয়া মৈত্র। যন্তর মন্তরে ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করার পর মঙ্গলবারও তাকে দিল্লির রাজপথে বিক্ষোভে অংশ নিতে দেখা যায়।

দিল্লিতে ছাত্র-যুবদের ওপর পুলিশের হামলার প্রতিবাদে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে ধর্ণায় বসার আগে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রাহুল গান্ধী শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে দেশবাসীকে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তার ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা যাবে না। এদিন কংগ্রেস সাংসদদের পাশাপাশি কেরল ও কর্ণাটকের কংগ্রেস নেতৃত্বও ধর্ণা-বিক্ষোভে অংশ নেন।

কিন্তু এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ‘বরফ গলেনি’। সূত্রের খবর, রাহুলরা চারটি দাবিতে অটল। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার পাশাপাশি, পুলিশি অত্যাচারের দায় স্বীকার করে মোদি সরকারের ক্ষমাপ্রার্থনা, সংসদে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর বিবৃতি এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতি নিয়ে সংসদের বাদল অধিবেশনে আলোচনার দাবি জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতৃত্ব। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই দাবি মানার বার্তা দেয়নি মোদি সরকার।

প্রসঙ্গত, মেডিকেল প্রবেশিকায় (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকে সংসদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সোমবার অশান্ত হয়েছিল দিল্লি। পুলিশের লাঠি-কাঁদানে গ্যাসের বাধা কাটিয়ে সোমবার দুপুরে সংসদ ভবনের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন বিক্ষোভকারীরা। নিরাপত্তার কারণে সংসদের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সোমবার থেকেই সংসদের বাদল অধিবেশন শুরু হয়েছে। সংসদ ভবনে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন দলের সাংসদরা। উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীসহ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরাও।

এই পরিস্থিতিতে আপসের পথ খুঁজছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু জেদি যুব-জনতার অদম্য ক্ষোভের আঁচ থেকে বাঁচার রাস্তা খুঁজে পাচ্ছেন না। ককরোচ জনতা পার্টির সংসদ অভিযানের পরের দিন নিট-কাণ্ড নিয়ে অবশেষে মুখ খুলেছেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল দিল্লিতে এনডিএর এক সভায় বলেছেন, প্রশ্নফাঁস মহাপাপ। তা রোখা গোটা দেশের দায়িত্ব।

এনডিএ সংসদীয় দলের ‘মঙ্গল মিলন’ বৈঠকের পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু প্রধানমন্ত্রী মোদির বক্তব্য উদ্ধৃত করে এ কথা জানান। তিনি বলেন, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দোষীদের সর্বোচ্চ কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এর পাশাপাশি সাংসদদের বার্তাও নিয়েছেন মোদি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শিশুদের উসকানি দেবেন না, ওদের সঠিক পথ দেখান।’ সংসদের লাইব্রেরি ভবনের জিএমসি বালাযোগী অডিটোরিয়ামে এনডিএ সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ভুল পথে চলে যাওয়া খুব সহজ। কিন্তু সঠিক পথে ফিরে আসা অনেক বেশি কঠিন। তাই তাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব আমাদের। সেটাই আমাদের কর্তব্য।’

দিল্লিতে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে একে একে প্রতিবাদে সরব হচ্ছেন বলিউডের শিল্পীরাও। যারা শামিল হচ্ছেন না, নেটিজেনদের কাছে তারা তীব্র কটাক্ষের শিকার হচ্ছেন। মুখ খুললেন গায়ক অরিজিৎ সিংও। মঙ্গলবার সকালে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডল এক্স-এ অরিজিৎ লেখেন, ‘এবার তো আপনারা ছাত্রছাত্রীদের মারধরও করছেন। আপনাদের কি একটুও লজ্জা করছে না?’

নিজের পোস্টে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের দিকে সরাসরি আঙুল তুলেছেন গায়ক। তিনি লেখেন, ‘হ্যালো নেতা, মন্ত্রী। হ্যালো দিল্লি পুলিশ। আপনাদের লজ্জা করছে না? এসব কী চলছে। নিজেদের কি ভগবান ভেবে নিয়েছেন নাকি?’ ‘হু অ্যাম আই’ নামে এক্স প্রোফাইল থেকে পোস্ট করে তিনি লেখেন, ‘সবকিছু মনে রাখা হবে। মনে রাখবেন, পরিবর্তনই একমাত্র শাশ্বত’। এর আগে শাবানা আজমি, নাসিরুদ্দিন শাহ, প্রকাশ রাজ, হুমা কুরেশি, স্বরা ভাস্বর, হৃতিক রোশন, সোনাক্ষী সিনহার মতো বলিউডের শিল্পীরা দিল্লিতে অনশনরত সোনাম ওয়াংচুক ও তার সহযোগী ছাত্রছাত্রীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কয়েকদিন আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টে সোনাম ওয়াংচুকের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন অরিজিৎ।

রাজনীতি নিয়ে নিজের অবস্থান জানাতে কখনো পিছিয়ে থাকেননি শাবানা আজমী। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, অন্যায় বা দমননীতির অভিযোগ উঠলে প্রকাশ্যে মত জানাতে দ্বিধা করেননি তিনি। সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের আবহেও সেই অবস্থানেই দেখা গেছে প্রবীণ অভিনেত্রীকে।
রবিবার দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির অবস্থান-বিক্ষোভে যোগ দেন শাবানা। পরের দিন সংসদ অভিযানে নামা আন্দোলনকারীদের প্রতিও সমর্থন জানান। আন্দোলনের সময় কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন ৭৫ বছরের অভিনেত্রী। পরে জানা যায়, হাঁপানির সমস্যাই তার শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণ।

নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে ঘিরে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন এখন আর শুধু শিক্ষাক্ষেত্রের ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই। দিল্লির রাজপথ থেকে লোকসভার ভেতর: আন্দোলন ধীরে ধীরে রাজনৈতিক চরিত্র নিচ্ছে। বিরোধী দলগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণ, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে ধর্ণার চেষ্টা এবং তার পরেই কৃষকদের নতুন কর্মসূচি; সব মিলিয়ে বাদল অধিবেশনের শুরুতেই কেন্দ্রীয় সরকারকে একাধিক ফ্রন্টে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।

সোমবার ককরোচ জনতা পার্টির সংসদ অভিযান ঘিরে যে সংঘর্ষের ছবি সামনে এসেছে, তা আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগকে হাতিয়ার করে বিরোধীরা সরাসরি কেন্দ্রকে নিশানা করেছে। মঙ্গলবার সেই ইস্যুতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের অদূরে অবস্থান-বিক্ষোভের প্রস্তুতি নেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জন খড়েগ, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী শিবিরের নেতারা। সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদবও সেখানে যোগ দেন। শেষ পর্যন্ত পুলিশ তাদের আটক করলেও বিরোধীদের রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট: ছাত্র আন্দোলনের প্রশ্নে সরকারকে রক্ষণের সুযোগ দেওয়া হবে না।

এই অবস্থায় কংগ্রেসের কৌশলও লক্ষণীয়। প্রথমে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্ত ও সংসদে আলোচনা; এই দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তারা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, পুলিশি ভূমিকার জন্য সরকারের ক্ষমাপ্রার্থনা এবং সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর বিবৃতির দাবিও তুলেছে। অর্থাৎ একটি শিক্ষাগত ইস্যুকে প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে পরিণত করার চেষ্টা করছে বিরোধী শিবির।

লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক

প্রথম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা শিক্ষানীতি নাকি শিশু বিকাশের বিরুদ্ধ নীতি!

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩১ পিএম
শিক্ষানীতি নাকি শিশু বিকাশের বিরুদ্ধ নীতি!
দীপু মাহমুদ

প্রথম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা পুনর্বহালের প্রশ্নে তাই আমাদের একটি মৌলিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা কি শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে একটি শিশুকে পরিবর্তন করতে চাই, নাকি একটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের উপযোগী করে শিক্ষাব্যবস্থাকেই পরিবর্তন করতে চাই?...

প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা পুনর্বহালের আলোচনা মূলত একটি শিক্ষানীতিগত প্রশ্ন। কিন্তু বিষয়টি কেবল ভর্তি পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে শিশুবিকাশ, স্নায়ুবিজ্ঞান, শিক্ষা মনোবিজ্ঞান এবং শিক্ষায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রশ্ন। ফলে এই সিদ্ধান্তের মূল্যায়নও হওয়া উচিত রাজনৈতিক বা আবেগপ্রসূত অবস্থানের ভিত্তিতে নয়; বরং গবেষণালব্ধ জ্ঞান, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থের আলোকে। শৈশব মানুষের মস্তিষ্ক নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রারম্ভিক শৈশব সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞান গত তিন দশকে আমাদের ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। আগে মনে করা হতো, এই সময়ের মূল কাজ শিশুদের যত দ্রুত সম্ভব পড়াশোনায় অভ্যস্ত করা। কিন্তু বর্তমান গবেষণা বলছে, জীবনের প্রথম কয়েক বছর মূলত মানুষের মস্তিষ্কের স্থাপত্য নির্মাণের সময়। এই সময়েই ভবিষ্যৎ শেখা, চিন্তা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, ভাষা, সামাজিক আচরণ এবং সৃজনশীলতার ভিত্তি তৈরি হয়।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Center on the Developing Child-এর গবেষণা দেখায়, জন্মের পর থেকে প্রায় ছয়-সাত বছর বয়স পর্যন্ত একটি শিশুর মস্তিষ্ক অত্যন্ত দ্রুত বিকশিত হয়। জীবনের প্রথম কয়েক বছরে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০ লাখ নতুন স্নায়ু সংযোগ তৈরি হতে পারে। মানুষের জীবনে আর কোনো সময় মস্তিষ্কের মৌলিক স্থাপত্য এত দ্রুত গড়ে ওঠে না।

কিন্তু এই স্নায়ু সংযোগগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে না। এগুলোর বিকাশ নির্ভর করে একটি শিশুর দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার ওপর। নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ, স্নেহপূর্ণ সম্পর্ক, খেলাধুলা, গল্প শোনা, ভাষাগত যোগাযোগ, প্রশ্ন করার সুযোগ, অনুসন্ধিৎসা, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং বয়সোপযোগী আনন্দময় শিক্ষা—এসব অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কের স্নায়ুপথকে শক্তিশালী করে। বিপরীতে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, ভয়, অনিরাপত্তা বা অতিরিক্ত মানসিক চাপ শেখার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে এবং মনোযোগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এই কারণেই হার্ভার্ডের গবেষকরা ‘Serve and Return Interaction’-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। একটি শিশু যখন কোনো প্রশ্ন করে, কোনো কিছুর প্রতি কৌতূহল প্রকাশ করে, কথা বলে বা খেলায় অংশ নেয় এবং প্রাপ্তবয়স্করা তার প্রতি অর্থবহ সাড়া দেন, তখন সেই পারস্পরিক যোগাযোগই মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। অর্থাৎ প্রারম্ভিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য তথ্য মুখস্থ করানো নয়; শেখার উপযোগী মস্তিষ্ক গড়ে তোলা।

এই অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ইউনেসকো প্রাথমিক শিক্ষায় ‘School Readiness’ ধারণাকে গুরুত্ব দেয়। এর অর্থ শিশুকে বিদ্যালয়ের উপযোগী করার চেয়ে বিদ্যালয়কে এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে বিভিন্ন বিকাশগত বৈচিত্র্য নিয়ে আসা প্রত্যেক শিশু সেখানে শেখার সমান সুযোগ পায়। একই বয়সের দুজন শিশুর ভাষাগত, বৌদ্ধিক কিংবা সামাজিক বিকাশে পার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়; বরং সেটিই মানব বিকাশের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। ইউনিসেফও শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে শিক্ষানীতির কেন্দ্রীয় নীতি হিসেবে বিবেচনা করে। প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বিদ্যালয়ের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করা, আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা এবং শেখার আনন্দ সৃষ্টি করা। অল্প বয়সেই উচ্চ-প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করার ক্ষেত্রে তাই সংস্থাটি সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে।

অন্যদিকে OECD-এর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, খেলাভিত্তিক শিক্ষা, অনুসন্ধানমূলক কার্যক্রম এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে শেখা শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাগত সাফল্য, সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতার সঙ্গে ইতিবাচকভাবে সম্পর্কিত। বিপরীতে খুব অল্প বয়সে প্রতিযোগিতামূলক বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ মূল্যায়নের মাধ্যমে শিশুদের বাছাই করার দীর্ঘমেয়াদি সুফলের পক্ষে শক্ত গবেষণালব্ধ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই গবেষণাগুলোর সম্মিলিত বার্তা স্পষ্ট–প্রারম্ভিক শৈশব মানুষের সম্ভাবনা বাছাই করার সময় নয়; সেই সম্ভাবনা বিকাশের সময়।

উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা কী বলে?
এই বৈজ্ঞানিক উপলব্ধির প্রতিফলন দেখা যায় বিশ্বের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থাগুলোতে। ফিনল্যান্ডে সাত বছর বয়সের আগে আনুষ্ঠানিক বিদ্যালয় শিক্ষা শুরু হয় না। কানাডা, নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ সরকারি বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য প্রতিযোগিতামূলক লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয় না। কোথাও স্থানীয় বিদ্যালয়ে সরাসরি ভর্তি করা হয়, কোথাও ভৌগোলিক এলাকার ভিত্তিতে ভর্তি হয়, আবার কোথাও আবেদনকারী আসনের চেয়ে বেশি হলে লটারির মতো স্বচ্ছ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। কিন্তু ছয় বা সাত বছর বয়সী একটি শিশুকে লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করা এসব দেশের মূলধারার শিক্ষানীতির অংশ নয়। এর কারণও বৈজ্ঞানিক।

ছয় বছরের একটি শিশুর সক্ষমতা স্থির নয়; এটি দ্রুত পরিবর্তনশীল। একটি শিশু জানুয়ারিতে যে দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি, কয়েক মাস পর সেটি সহজেই অর্জন করতে পারে। একই বয়সের দুজন শিশুর মধ্যে বিকাশগত পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তাই একটি নির্দিষ্ট দিনের পরীক্ষার ফলকে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ শিক্ষাগত সক্ষমতার নির্ভরযোগ্য সূচক হিসেবে বিবেচনা করার পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

ভর্তি পরীক্ষা কি সত্যিই মেধা যাচাই করে?
ভর্তি পরীক্ষার পক্ষে সবচেয়ে প্রচলিত যুক্তি হলো—এর মাধ্যমে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা সম্ভব। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে–ছয় বছরের একটি শিশুর পরীক্ষার ফল কি কেবল তার ব্যক্তিগত সক্ষমতার প্রতিফলন? বাংলাদেশের বাস্তবতা বলছে, তা নয়। একটি শিশুর ফলাফলের সঙ্গে তার পারিবারিক পরিবেশ, অভিভাবকের শিক্ষা, অর্থনৈতিক সামর্থ্য, কোচিং সুবিধা, প্রস্তুতির সুযোগ এবং সামাজিক পুঁজি নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। ফলে ভর্তি পরীক্ষা প্রায়শই একটি শিশুর অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার চেয়ে তার পারিবারিক সুযোগ-সুবিধার প্রতিফলন হয়ে ওঠে। এ দেশের অভিজ্ঞতা আরও দেখিয়েছে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা শুরু হলেই তার চারপাশে গড়ে ওঠে কোচিং, গাইডবই, মডেল টেস্ট এবং বাণিজ্যিক প্রস্তুতির বাজার। প্রথম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষাও এই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে–এমন ধারণার পক্ষে কোনো বাস্তবভিত্তিক যুক্তি নেই।

প্রকৃত সংকট কোথায়?
এ কথা স্বীকার করতেই হবে, লটারি পদ্ধতিও আদর্শ সমাধান নয়। কিন্তু লটারি বাতিল করলেই ভর্তি পরীক্ষা আদর্শ হয়ে যায় না। বাংলাদেশের মূল সমস্যা ভর্তি পদ্ধতি নয়; মূল সমস্যা মানসম্মত বিদ্যালয়ের সীমিত সংখ্যা। যদি কয়েকটি বিদ্যালয়ের প্রতিই অভিভাবকদের আস্থা কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে ভর্তি পরীক্ষা, লটারি কিংবা অন্য যেকোনো পদ্ধতিই শেষ পর্যন্ত একই ধরনের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করবে। উন্নত দেশগুলো এই সমস্যার সমাধান করেছে ভর্তি পরীক্ষা চালু করে নয়; বরং বিদ্যালয়গুলোর মানের বৈষম্য কমিয়ে। তাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ একটি নির্দিষ্ট বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার ওপর নির্ভর করবে না। বাংলাদেশের শিক্ষানীতিরও মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই পথেই অগ্রসর হওয়া।

নীতিনির্ধারণের আসল প্রশ্ন
প্রথম শ্রেণির একটি শিশুকে ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু প্রতিটি বিদ্যালয়কে মানসম্মত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা কঠিন। নীতিনির্ধারণের প্রকৃত পরীক্ষা এখানেই। প্রথম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা পুনর্বহালের প্রশ্নে তাই আমাদের একটি মৌলিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা কি শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে একটি শিশুকে পরিবর্তন করতে চাই, নাকি একটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের উপযোগী করে শিক্ষাব্যবস্থাকেই পরিবর্তন করতে চাই? আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান, শিশুবিকাশ গবেষণা এবং বিশ্বের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার অভিজ্ঞতা একই দিকেই নির্দেশ করে। প্রারম্ভিক শৈশব প্রতিযোগিতার নয়; বিকাশের সময়। একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে প্রশ্নপত্রের সামনে নয়, নিরাপদ সম্পর্ক, কৌতূহল, খেলা, ভাষা, অনুসন্ধান এবং আনন্দময় শিক্ষার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।

সুতরাং প্রথম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক নয়। এটি একটি রাষ্ট্রের শিক্ষাদর্শের প্রশ্ন। আমরা শিক্ষাব্যবস্থাকে শিশুর উপযোগী করে গড়ে তুলতে চাই, নাকি শিশুকেই একটি অসম শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাধ্য করতে চাই।

লেখক: কথাসাহিত্যিক