ঢাকা ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
প্রান্তিক ধাপের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিলের সুবিধা পাবেন না বস্তিবাসী গাছ লাগান, সওয়াব কামান পাসপোর্ট ও বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে জটিলতা দূর, বাংলাদেশে টিভির পর্দায় দেখা যাবে ফুটবল বিশ্বকাপ মাস্টার বাড়ি কোরবানির চামড়া বিক্রিতে ধস বড়বাড়ি সীমান্তে ১০ নারী-পুরুষকে পুশইনের চেষ্টা কৃষি শব্দকোষ নড়াইলে দুপক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১৫ ঝিনাইদহের এসপি প্রত্যাহার টাঙ্গাইলে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে আবারও সংঘর্ষ ঝিনাইদহে গাছ থেকে ঝুলন্ত নারীর মরদেহ উদ্ধার জীবনধারা বদলান, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করুন সোনারগাঁয় মেঘনা টোলপ্লাজায় লরির ধাক্কায় আহত ৬ খবরের কাগজে পদোন্নতি-বাণিজ্যের প্রতিবেদন প্রকাশ: তদন্তে নেমেছে আইন মন্ত্রণালয় ফরিদপুরে হামে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২১ মেধাবীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রবণতা কী বার্তা দিচ্ছে পারিশ্রমিক না পেয়ে ম্যাচ বয়কট ব্রাদার্সের ক্রিকেটারদের অস্তিত্ব সংকটে হাঁড়িধোয়া নদী উত্তরবঙ্গ শিল্পোন্নত হোক দীনেশচন্দ্র সেন ও লোককাহিনির মঞ্চ-পরিবাহন মোস্তফা কামালের বিষাদ বসুধা স্বাধীনতার অবিনাশী ছাত্র ও যুব নেতৃত্ব চাকরি দিচ্ছে ওয়ালটন, রয়েছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি: জীবনযাত্রা হবে আরও ব্যয়বহুল বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ক্ষুধা লাগলে মায়ের চিতায় ছুটে যান ৩ ভাই নওগাঁ সীমান্তে ১৭ জনকে পুশইনের চেষ্টা বিএসএফের নেইমারকে ছাড়াই খেলবে ব্রাজিল সুন্দর পুরুষ
Nagad desktop

পালাবদল মালাবদল

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম
পালাবদল মালাবদল
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

লবণহাটিতে আবার মজুমদারদের দিন ফিরে এসেছে। এবার পালাবদল মালাবদলে নতুনদের মধ্যে বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনা, তা জোরেশোরে শুরু হওয়ার পথে। এ সময় কী করবেন বর্ণচোরাদের বন্যায় ভেসে যাওয়া প্রবীণ এ্যান এক্সপার্ট হেড মাস্টার সর্বজনাব শহীদুল সরকার গংরা?...

করাতোয়ার তীরঘেঁষে একটি গ্রাম। নাম তার লবণহাটি। সেই গ্রামের এক সময়ের সুশীল শিশু শহীদুল সরকার আইএ পাসের পর প্রথম জীবনে স্থানীয় হাইস্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছিলেন। গ্রামগঞ্জে তখন কার্লমার্কস-চর্চা জোরেশোরে সবে শুরু হয়েছে। ওস্তাদ-সাগরেদরা উঠতি আঁতেল প্রকৃতির সে সময় সেরখানেক ফিদেল কাস্ত্রো, আধা কেজি পরিমাণ ট্রটস্কি, পরিমাণমতো টিটো, মাও সেতুং ও মার্টিন লুথার কিং, চার চা-চামচ চৌচেস্কু ইত্যাদির অধ্যয়নে সময় কাটাত। শহীদুল গাঁওগেরামের অর্থনীতির আলোচনায় বামঘেঁষা আঁতেলভাবই শুধু প্রকাশ করত, তা নয়। লেখালেখীর পাঁয়তারাও ছিল তার। মাস্টার ডিগ্রির পর তার বড় শখ ছিল লবণহাটি হাইস্কুলের হেড মাস্টার হওয়ার কিন্তু স্কুলে হঠাৎ করে তো কেউ হেড মাস্টার হতে পারে না এবং তখন দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নীতি-নৈতিকতায় এত অধঃপতন সাধিত হয়নি যে, কেউ তদবির-তেলেসমাতিতে, এমনকি বিশেষ ক্ষমতা বলে হেড মাস্টার কেন কয়েক বছর পড়িয়ে প্রভাষক কিংবা সরাসরি অধ্যাপক হতে পারতেন। তাই তিনি হঠাৎ হোমরা-চোমরা হওয়ার জন্য গ্রামের চৌধুরীবাড়ির বড় কেরানির চাকরিতে নাম লেখালেন। গোটা গ্রামে তখন চৌধুরী পরিবারের প্রতিপত্তি যেমন ছিল, একই সঙ্গে নিবু নিবু অবস্থায় ছিল গ্রামেরই আরেক প্রধান পরিবার মজুমদারদের প্রভাব।

বড় চৌধুরী হরিচরণ বাবু হঠাৎ হার্টফেল করলেন। সর্বেসর্বা ক্ষমতাধরের এমন অন্তর্ধানে চৌধুরীপাড়ায় তো বটেই, মোকামে মড়ক লেগেছে ঠাহর হলো। সবাই হতভম্ব। এমন অবস্থায় মজুমদারদের মুখে চন্দন। কমল মজুমদার তার প্রভাব-প্রতিপত্তির পসার সাজানো শুরু করেছেন। চৌধুরীদের দহলিজ থেকে মজুমদারদের দস্তরখানায় পাত্র নিলেন শহীদুল। তার এই রাতারাতি ভোল পাল্টানোয় সবাই আশ্চর্য হলো বৈকী। পালাবদলে শুধু শহীদুল একা নন, তার বন্ধুবান্ধব বেশ কয়েকজন ইতোমধ্যে কমল মজুমদারের সভায় স্থান করে নিয়েছে। মজুমদাররা গ্রামের উন্নয়নের নামে বেশ কিছু কর্মসূচি হাতে নিলেন। গ্রামের উন্নতি কীভাবে হবে, কীভাবে লবণহাটির মানুষ সহজে সুপেয় পানি পাবে, বিদ্যুৎ পাবে, গোলা ভরা ধান পাবে, পুকুর ভরা মাছ পাবে। আরও কত কী স্বপ্ন দেখা ও দেখানো শুরু হয়ে গেল। মজুমদাররা কর্মসূচি নিলেন গ্রামের যত খানাখন্দ, পুকুর-পুষ্করণী, খালবিল সব খনন করে সেখানে সুপেয় পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা। খনন করা খাল ও পুকুরপাড়ে লাগোনো শুরু হয়ে গেল ফল, ফসল, পাট ও ধান। সঙ্গে শুরু হলো মাছ চাষের আর্ট ও গান। এসব কাজেকর্মে কমল মজুমদার আর শহীদুল হঠাৎ করে যেন পরস্পরের ভাবশিষ্য ও হরিহর আত্মা হয়ে গেলেন। রাতদিন খাল খনন কাজে শহীদুল এমনভাবে নিজেকে জড়ালেন যেন মনে হচ্ছিল মজুমদারদের এমন ভক্ত কুশিলব ভূ-ভারতে আর জন্মায়নি। চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। তাতে শহীদুলের পসারও বাড়তে লাগল। তরতর করে পেয়ে গেলেন পদোন্নতি। তিনি হোমরাচোমরা হয়ে মাঝে মধ্যে আশপাশের বড় বড় বিদ্যালয়েও বক্তৃতা দিতে যান। মোটামুটি একজন বুদ্ধিদীপ্ত কামলার পর্যায়ে উঠে গেলেন তিনি।

কমল মজুমদার চাপাডাঙ্গায় নানাবাড়ি বেড়াতে গিয়ে বর্ষণমুখর ভোরে খুন হলেন। এই অদৈব দুর্বিপাক-দুর্ঘটনায় মজুমদারবাড়িতে সবাই মুষড়ে পড়লেন। উপায়ন্তর না দেখে মজুমদার আমলে বাড়াবাড়ি করায় শহীদুল পিঠ বাঁচানোর জন্য এই সুবাদে মধ্যপ্রাচ্যে তীর্থযাত্রী হওয়ার বাসনা বা ফন্দি আঁটলেন। সেখানে তার এক সাগরেদকে ধরে চাকরি বাগিয়ে নেন শহীদুল। পালাবদলে পলাতক শহীদুল সেখানে তিনি তার পসার বাড়াতে চেষ্টিত হলেন। শহীদুল সরকার বরাবরই মেধাবী, চৌকশ, বাগ্মী ও বাক্যালাপে বেজায় শব্দ নির্মাণের শক্তি তার ছিল। সেসব চালবাজি খাটিয়ে প্রায় আট বছর মধ্যপ্রাচ্যে কাটিয়ে আবার গাঁয়ে ফিরলেন। এবার মনে হলো এ যেন খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন। গ্রামে তখন আবার চৌধুরী পরিবারের প্রভাব জাগতে শুরু করেছে। সবাই বিস্ময়ে একদিন দেখল কমল মজুমদারের কাছের কামলা খাটা সেই শহীদুল হঠাৎ করে চৌধুরীবাড়ির বড় আফামণির প্রেমে পড়ে গেলেন। হরিচরণ চৌধুরীর মেধাবী মেয়ে বিদেশে কূটকৌশল রপ্ত করে গ্রামে ফিরে এসেছে। ক্রমে ক্রমে সবার আফামণি গ্রামের মাথার মণি হওয়ার পথে। আপার ডাকসাইটে সহযোগী হওয়ার বাসনা শহীদুলের মধ্যে জেগে উঠল তীব্রভাবে। মোক্ষম এ সময়ে আপামণির নেক নজর লাভের আকাঙ্ক্ষায় শহীদুল গ্রামের সুবোধ ও সুশীলদের ‘শ্রীকৃষ্ণের বাঁশরী সুরে উতলা’ হতে উদ্বুদ্ধ করলেন। শেষমেষ কৃষ্ণরূপী শহীদুলের বাঁশরী শুনে সব সুশীল পালাবদলের বন্যায় গা ভাসাল। হ্যামিলনের সেই বাঁশিওলার মতো গাঁয়ের যত ছোটবড় মুটে-মজুর তার পিছু নিল। গাঁয়ের সবাই প্রমাদ গুনল। সুশীল সেবকদের মর্যাদা, মান্যিগণ্যি সব হাওয়ায় উড়ে গেল। হঠাৎ করে বড়ছোট জ্ঞান সকাল-বিকেলের পালাবদলে দুধ ও ঘোল-তেল আর ঘির মধ্যে একাকার হতে শুরু করল। বাড়ির লক্ষ্মী ঘরের লক্ষ্মী সুশীলদের এভাবে একূল-ওকূল বরণের খেলায় সবাই আঁতকে উঠল। এভাবে চৌধুরীরা যে তালুক পেল সেই তালুকে ভোল পাল্টানোয় পটিয়সী বসাক বাবু সর্বেসর্বা পরিকল্পনা বিশারদ হয়ে উঠলেন। ঘরের সৌন্দর্য যেসব ললনারা তার কথা শুনে জাতকুলের মান খেয়ে কৃষ্ণের বাঁশি শুনে বের হয়েছিল তাদের বেশ এনাম দিয়ে পুরস্কৃত করা হলো আর যারা তার কথা রাখেনি তাদের ঘরছাড়া করা শুরু হয়ে গেল। এ যেন গ্রাম্য ক্ষ্যামতা প্যাঁচালের উৎকোচের উদগ্র উদ্বাহু। যাই হোক, বছর পাঁচেক পর মজুমদারবাড়ির বড় বউ চৌধুরীবাড়ির আপামণির বিরুদ্ধে চেয়ারম্যান ভোটে দাঁড়িয়ে জিতে গেল। অবস্থা যা দাঁড়াল তাতে প্রথম বেকায়দায় পড়লেন শহীদুল নিজে। এখন কোথায় দাঁড়াবেন শহীদুল সরকার? বারবার পক্ষ ত্যাগ করায় ওস্তাদ বর্ণচোরাদের মতো শহীদুলের এবার এক ঘরে হওয়ার জোগাড়। কমল মজুমদারের সঙ্গে তার এক সময়কার সখ্যতার সূত্র ধরে তার কুলরক্ষা হলো না এবার। তিনি এ গাঁ-সে গাঁয় গা ঢাকা দিয়ে বেড়ান। কয়েক বছরের মাথায় বেজায় গোলমাল বেঁধে গেল গ্রামে। ফণি মণ্ডলের ছেলে ননিগোপাল হঠাৎ করে মাতাব্বরি নিয়ে নিল গ্রামের। তখন তার দাপট আর দেখে কে। সে প্রথমে এসে শহীদুলদের মতো বসন্তের কোকিলদের কাবু করতে একঘরে আটকাল। সে ঘরে শহীদুলকে যে কয়দিন যেভাবে রাখা হয়েছিল বাবু তার বর্ণনা করে একখান বই লিখে ফেললেন। তাকে কীভাবে কথায় কথায় ঠাট্টা-মশকরায় মাথায় ঘোল ঢেলে দিয়ে হেনস্থা ও অপমান করা হয়েছে, সেসব কথা সবাইকে বলার বাসনা থেকে তিনি বইটা ছাপার উদ্যোগ নিলেন। তবে তার মনে হলো এ কয়দিনে তার মাথায় নতুন অনেক বুদ্ধিও গজিয়েছে।

এসব হেনস্থায় একবার তার ধারণা হলো তার আদি স্বপ্ন শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়া উচিত। বারবার পালাবদল মালাবদলে ভোল পাল্টিয়ে তিনি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তা নিয়ে একখানা ভালো পাঠ্যপুস্তক রচনা করতে পারবেন তিনি। বাল্য ও কিশোরকালে এ্যান এক্সপার্ট হেড মাস্টারের যে নোট বই তিনি বা তেনারা পড়তেন তার এই বইও জিপিএ-ফাইভ না হলেও অন্তত প্রশ্ন ফাঁসরোধের দাওয়াই হিসেবে কাজে লাগতে পারে। এই বই একজন অভিজ্ঞ হেড মাস্টারের তাজ তার মাথায় পরাতে পারে। শহীদুল এটাও তবক নিলেন যে, কীভাবে টাকা-পয়সা নয়ছয় করা যায়, না আঁচিয়ে কামানো যায়, সরানো যায়, বাঁচানো যায়। শহীদুল মজুমদারের দিব্যচোখ খুলে গেল। ব্যস ইতোমধ্যে চৌধুরীরা আবার লবণহাটির প্রভু হয়ে উঠল। তারা শহীদুল সরকারের প্রতি মুখ ফেরালেন। তার জ্যোতি বেড়ে গেল।

এবার বয়োবৃদ্ধ বাবু ক্ষমতায় থাকার সুবাদে টাকা-পয়সা সরানোর ব্যবসায় নাম লেখালেন। গ্রামের বড় বড় ব্যববসায়ী কনট্রাক্টর ও সরল মানুষের টাকা নয়ছয় করার কাজে ও লেনদেনের ব্যবসায় বাবু বেশ বিশ্বস্ত ও এ্যান এক্সপার্ট হেড মাস্টার হয়ে উঠলেন। ঘরের টাকা-পয়সা, গহনাগাটি হাতিয়ে নেওয়ার কাজে তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একদিন তিনি সবাইকে পথে বসিয়ে ছাড়লেন। স্কুলের চাকরি পাওয়ার বয়স তার আর নেই, তথাপি সবাই তাকে এ্যান এক্সপার্ট হেড মাস্টার হিসেবে মান্যিগণ্যি করতে করতে গালমন্দ করতে শুরু করল। লবণহাটিতে আবার মজুমদারদের দিন ফিরে এসেছে। এবার পালাবদল মালাবদলে নতুনদের মধ্যে বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনা, তা জোরেশোরে শুরু হওয়ার পথে। এ সময় কী করবেন বর্ণচোরাদের বন্যায় ভেসে যাওয়া প্রবীণ এ্যান এক্সপার্ট হেড মাস্টার সর্বজনাব শহীদুল সরকার গংরা? 

লেখক: উন্নয়ন গবেষক ও বিশ্লেষক

পাসপোর্ট ও বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৩:২১ পিএম
পাসপোর্ট ও বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে
ড. খলিলুর রহমান

যখন নাগরিকরা নিজেদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই ভয় করতে শুরু করে, তখন কোনো জাতি এগোতে পারে না। সরকার জনগণের সেবা করার জন্য–ভয় দেখানোর জন্য নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ মানুষের মধ্যে আস্থা, ন্যায়বিচার ও বিশ্বাস সৃষ্টি করা; আতঙ্ক ও সন্দেহ নয়।...
পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিকত্বের একটি মৌলিক অধিকার। পাসপোর্ট শুধু বিদেশ ভ্রমণের নথি নয়–এটি একজন নাগরিকের পরিচয়, জাতীয়তা এবং নিজের রাষ্ট্রের প্রতি তার বৈধ সম্পর্কের স্বীকৃতি। যখন কোনো সরকার রাজনৈতিক পরিচয়, সন্দেহ বা প্রশাসনিক পক্ষপাতের ভিত্তিতে এই অধিকার প্রয়োগ করে, তখন তা ন্যায়বিচার, সমতা ও গণতান্ত্রিক শাসনের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

গত রাতে আমার এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির ফোন পেলাম, যাকে আমি কয়েক দশক ধরে চিনি। তিনি সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে চার দশক ধরে দেশসেবা করে আসছেন। তিনি তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে নতুন বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার জটিলতা নিয়ে আমার সহায়তা চাচ্ছিলেন। তার অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি এমন একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার প্রতিফলন, যা ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অনির্বাচিত প্রশাসনের সময়ে ব্যাপকভাবে দেখা গিয়েছিল।

বিষয়টির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে যাওয়ার আগে একটি বাস্তবতা স্বীকার করা জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক সরকারগুলো কূটনৈতিক পাসপোর্টের মর্যাদা ও গুরুত্বকে ক্ষুণ্ন করেছে। অনেকে পেশাগতভাবে কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না কিংবা পেশাদার কূটনীতিক ছিলেন না, তাদেরও এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ঐতিহ্যগতভাবে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী কূটনীতিকদের জন্য সংরক্ষিত এই নথির গুরুত্ব ও মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত রাতে যিনি আমার সহায়তা চেয়েছিলেন, তিনিও কূটনৈতিক সেবার বাইরে থেকেও কূটনৈতিক পাসপোর্ট পেয়েছিলেন তার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য।

তবে কূটনৈতিক পাসপোর্টের অপব্যবহার সংশোধনের নামে কোনো নাগরিককে সাধারণ পাসপোর্ট থেকে বঞ্চিত করা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক, যার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি দণ্ড বা আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই, তার সমানভাবে পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এটি শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি সাংবিধানিক ও মানবাধিকারসংক্রান্ত প্রশ্ন।

দুঃখজনকভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এমন কিছু চর্চা গড়ে ওঠে, যা দেখে মনে হয়েছে পূর্ববর্তী সরকারে কাজ করেছেন বা একসময় কূটনৈতিক পাসপোর্ট ধারণ করেছেন এমন ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা কাজ করেছে। বহু সম্মানিত সরকারি কর্মকর্তা, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এক ধরনের অলিখিত সন্দেহ ও বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। আইন ও বিধিমালার ভিত্তিতে আবেদন মূল্যায়নের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচিতি ও ইচ্ছাকৃত প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছে।

আরও দুঃখজনক হলো, ড. ইউনূস ও তার অনির্বাচিত প্রশাসন সমাজে বিভাজন সৃষ্টির রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল। মানুষকে পাশাপাশি দাঁড়াতে উৎসাহিত করার পরিবর্তে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর প্রবণতা তারা উৎসাহিত করেছে।

আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে এসব চর্চার প্রভাব প্রত্যক্ষ করেছি এবং একজন ভুক্তভোগী। শত শত মানুষ পাসপোর্ট পেতে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব, জটিলতা ও অপমানজনক আচরণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে, যখন সাবেক কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের সাধারণ পাসপোর্ট প্রক্রিয়ায়ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অস্বাভাবিক সম্পৃক্ততা যোগ করা হয়। এতে বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ ও রাজনৈতিক নজরদারির সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, ড. ইউনূস ও তার ঘনিষ্ঠদের আমলে পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, যা একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হিসেবে সমালোচিত হয়েছিল। যদিও অনেক নাগরিক আমলাতান্ত্রিক হয়রানি কমার কারণে এটিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তবু ক্রমে অভিযোগ ওঠে যে, অতিরিক্ত শিথিলতা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে। এমনো অভিযোগ সামনে আসে যে, পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়াই বাংলাদেশে অবস্থানরত অনাগরিক বা বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে।

কানাডায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি দক্ষতা ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একটি পাসপোর্ট আন্তর্জাতিকভাবে রাষ্ট্রের সার্বভৌম নিশ্চয়তার প্রতীক। এর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হলে তার প্রভাব শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আজ বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের ভিসা নাকচ হওয়ার ঘটনা এর একটি অন্যতম নিদর্শন। শুধু ভিসা প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা নয়, দুর্বল যাচাই ব্যবস্থা প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশযাত্রা কঠিন করে তুলতে পারে এবং রাষ্ট্রকে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

ড. ইউনূসের অপশাসনের সময় আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় ছিল বিমানবন্দরে যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও অন্যায় আচরণ। অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ করে যারা আগে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ধারণ করেছেন বা সরকারি দায়িত্বে ছিলেন, তাদের অনেককে বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ, বিলম্ব এবং ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ ছাড়াই যাত্রীদের যাত্রা বিলম্বিত বা আটকে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

এর চেয়েও উদ্বেগজনক ছিল গণমাধ্যমের কিছু অংশের ভূমিকা। বিমানবন্দরের এসব ঘটনার পর কিছু যাত্রীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও চাঞ্চল্যকর সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনসমক্ষে সন্দেহভাজন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অনেক শিরোনাম ও প্রতিবেদন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে নিরপেক্ষ তথা উপস্থাপনের চেয়ে ব্যক্তি বিশেষকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রবণতা বেশি ছিল। এটি শুধু পেশাগত নীতির পরিপন্থী নয়; বরং সমাজে ভয় ও বিভাজনের সংস্কৃতি তৈরি করে।

যখন নাগরিকরা নিজেদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই ভয় করতে শুরু করে, তখন কোনো জাতি এগোতে পারে না। সরকার জনগণের সেবা করার জন্য–ভয় দেখানোর জন্য নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ মানুষের মধ্যে আস্থা, ন্যায়বিচার ও বিশ্বাস সৃষ্টি করা; আতঙ্ক ও সন্দেহ নয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন বহু নাগরিকের মধ্যে স্বস্তি ও নতুন আশার সঞ্চার করেছে। নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের প্রত্যাবর্তনকে অনেকে ড. ইউনূসের অনির্বাচিত প্রশাসনের বিতর্কিত চর্চাগুলো থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। এটি উৎসাহব্যঞ্জক যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এসব বিষয়ে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সাবেক কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের প্রতি তুলনামূলক মানবিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ এবং বিমানবন্দরে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি কমানোর উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার।

বিশেষ করে ব্যক্তিগতভাবে আমি সন্তুষ্ট যে, এই উন্নয়নগুলো বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে হচ্ছে, যিনি ঘটনাচক্রে আমারই সিভিল সার্ভিস ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা ও নাগরিক মর্যাদার গুরুত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন। কার্যকর শাসনের জন্য শুধু ক্ষমতা নয়; প্রয়োজন প্রজ্ঞা, সংযম ও মানবিকতা।

তবে সংস্কার অর্ধেক পথে থেমে থাকলে চলবে না। বাংলাদেশ এখন এমন একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও অধিকারভিত্তিক পাসপোর্ট ও অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে। এ ধরনের ব্যবস্থার জন্য কয়েকটি মৌলিক নীতি জরুরি।

প্রথমত, রাজনৈতিক পরিচয়, পেশাগত পটভূমি বা অতীত সরকারি সম্পৃক্ততা নির্বিশেষে সব নাগরিককে সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
তৃতীয়ত, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে পেশাদারত্ব ও সংযমের সঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়া কোনো যাত্রী হয়রানির শিকার না হন।

চতুর্থত, বাংলাদেশি পাসপোর্টের মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় পূর্বের যথাযথ যাচাই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অ-নাগরিকরা পাসপোর্ট না পায় বা পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে অপব্যবহার রোধ করা যায়, আবার প্রকৃত নাগরিকরাও হয়রানির শিকার না হন।
সবশেষে, গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা চরিত্র হননের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

সম্ভবত ড. ইউনূসের অনির্বাচিত প্রশাসনের সবচেয়ে ক্ষতিকর উত্তরাধিকার ছিল নাগরিকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি। তাদের সবচেয়ে বড় মেটিকুলাস ডিজাইন ছিল সমাজে মানুষকে সহনাগরিক নয়, প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শেখানো। তবে এটি স্বস্তিদায়ক যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সময় সেই বিভাজনের রাজনীতি ধীরে ধীরে অবসানের দিকে যাচ্ছে। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য স্বাভাবিক; কিন্তু সন্দেহ, প্রতিশোধ ও সংঘাতনির্ভর শাসনব্যবস্থা জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরূকরণের জন্য বড় মূল্য দিয়েছে। এখন দেশের প্রয়োজন পুনর্মিলন, প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। নাগরিকদের উচিত জাতি গঠনের কাজে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো, মুখোমুখি সংঘাতে নয়।

যেকোনো সরকারের দায়িত্ব শুধু আইন পরিচালনা নয়; সামাজিক আস্থা ও জাতীয় সংহতি রক্ষা করাও। যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা উভয়ই।

এখন জাতির প্রত্যাশা বাংলাদেশ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাবে; যেখানে নাগরিক অধিকার সম্মানিত হবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ থাকবে এবং প্রশাসন দলীয় স্বার্থের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থে কাজ করবে।

পরিশেষে, পাসপোর্ট কখনোই রাজনৈতিক অস্ত্র হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত সেই প্রতীক, যা প্রতিটি বাংলাদেশির নাগরিকত্ব, মর্যাদা ও সমঅধিকারের প্রতিনিধিত্ব করে।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব

মেধাবীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রবণতা কী বার্তা দিচ্ছে

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
মেধাবীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রবণতা কী বার্তা দিচ্ছে

যোগ্যতার মূল্য আছে, গবেষণার সম্মান আছে, চাকরির নিরাপত্তা আছে এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ আছে। যে রাষ্ট্র তার মেধাবীদের ধরে রাখতে পারে, সে রাষ্ট্র ভবিষ্যৎকে ধরে রাখতে পারে। আর যে রাষ্ট্র তার সেরা মেধাগুলোকে হারায়, সে রাষ্ট্র একসময় বুঝতে পারে, সবচেয়ে বড় ক্ষতি অর্থনীতির নয়, সম্ভাবনার।...

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আজকাল একটি নতুন দৃশ্য খুবই পরিচিত। একসময় যেখানে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন ছিল বিসিএস ক্যাডার হওয়া, ব্যাংকার হওয়া কিংবা দেশের কোনো বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়া, সেখানে এখন অনেকের প্রধান লক্ষ্য বিদেশে উচ্চশিক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে প্রায় প্রতিদিনই আমি রিকমেন্ডেশন লেটার লিখি। কেউ যুক্তরাষ্ট্রে আবেদন করছে, কেউ কানাডায়, কেউ অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, জাপান বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। শিক্ষার্থীদের আলোচনায় এখন গবেষণা প্রস্তাবনা, স্কলারশিপ, আইইএলটিএস, জিআরই, পাবলিকেশন এবং অধ্যাপকদের ই-মেইল যোগাযোগের বিষয়গুলোই বেশি স্থান পায়।

এটি একদিকে আশাব্যঞ্জক। কারণ বাংলাদেশের তরুণরা এখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করছে। একই সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে– এই মেধাবী তরুণদের বড় অংশ যদি স্থায়ীভাবে বিদেশে থেকে যায়, তাহলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী হবে?

একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো ওই রাষ্ট্রের দক্ষ ও সৃজনশীল মানবসম্পদ। সেই মানবসম্পদের সবচেয়ে যোগ্য অংশ যখন দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করে, তখন বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি জাতীয় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।অনেকে মনে করেন বিদেশে যাওয়ার মূল কারণ উন্নত শিক্ষা। বাস্তবে বিষয়টি আরও জটিল। বাংলাদেশের অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী মনে করে যে তাদের ভবিষ্যৎ এখানে যথেষ্ট নিরাপদ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো ফলাফল করেও চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রক্রিয়া দীর্ঘ, অনিশ্চিত এবং প্রতিযোগিতামূলক। দক্ষতা ও যোগ্যতার পাশাপাশি নানা অদৃশ্য বাস্তবতাও কাজ করে বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে।

সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, ওএসডি সংস্কৃতি কিংবা পদোন্নতির অনিশ্চয়তা অনেকের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। বেসরকারি খাতেও উচ্চশিক্ষিত গবেষক বা বিশেষজ্ঞদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ এখনো সীমিত। ফলে একজন শিক্ষার্থী যখন দেখে যে, বিদেশে তার দক্ষতার মূল্য অনেক বেশি, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই সেই পথ বেছে নিতে চায়।

আরও একটি বড় কারণ হলো গবেষণার পরিবেশ। বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিভাবান শিক্ষক ও শিক্ষার্থী থাকলেও গবেষণা তহবিল, আধুনিক ল্যাবরেটরি, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার সহায়তা এবং গবেষণাভিত্তিক ক্যারিয়ার কাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়। অন্যদিকে, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পূর্ণ স্কলারশিপ, গবেষণা অনুদান, স্বাস্থ্যসেবা এবং উচ্চমানের গবেষণা সুবিধা প্রদান করছে। ফলে সিদ্ধান্তটি অনেক সময় আবেগের নয়, বাস্তবতার হয়ে ওঠে।

আজকের উন্নত দেশগুলোও একসময় মেধা পাচারের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। ১৯৭০ ও ’৮০-এর দশকে ভারত থেকে বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে চলে যান। একসময় একে ভারতের জন্য বড় ক্ষতি মনে করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ভারত তথ্যপ্রযুক্তি খাত, গবেষণা অবকাঠামো এবং উদ্যোক্তা পরিবেশ উন্নত করে। ফলে বিদেশে থাকা ভারতীয় মেধাবীদের একটি অংশ দেশে বিনিয়োগ শুরু করে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে এবং জ্ঞান স্থানান্তরে ভূমিকা রাখে।

চীন আরও দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করে। বিদেশে পিএইচডি সম্পন্ন করা গবেষকদের দেশে ফিরিয়ে আনতে তারা বিশেষ গবেষণা অনুদান, উচ্চ বেতন, আবাসন সুবিধা এবং স্বাধীন গবেষণার সুযোগ দেয়। এর ফলে হাজার হাজার বিজ্ঞানী দেশে ফিরেন আসেন এবং চীনের প্রযুক্তিগত উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করেছে। তারা বুঝেছিল, মেধাবীদের বিদেশযাত্রা থামানো সম্ভব নয়; কিন্তু দেশে ফিরে আসার জন্য আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কী? বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ‘সিলেকটিভ ব্রেইন ড্রেইন’। অর্থাৎ সবার আগে দেশ ছাড়ছে সবচেয়ে মেধাবী, গবেষণামুখী এবং আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতাসম্পন্ন তরুণরা। যখন একজন অসাধারণ গবেষক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, চিকিৎসক বা নীতিনির্ধারণী দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি বিদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যান, তখন দেশ কেবল একজন নাগরিককে হারায় না; বরং ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনাকেও হারায়।

একজন বিজ্ঞানী হয়তো একটি নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারতেন। একজন অর্থনীতিবিদ হয়তো নতুন নীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখতে পারতেন। একজন শিক্ষক হয়তো শত শত শিক্ষার্থীকে অনুপ্রাণিত করতে পারতেন। তাদের অনুপস্থিতি সরাসরি দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব গভীর।
তাহলে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সরকারের কী করা উচিত? এর উত্তর যদি সাজাতে চাই তাহলে এভাবে দেখা যেতে পারে– প্রথমত, মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যেখানে একজন তরুণ বিশ্বাস করবে যে তার পরিশ্রম ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন হবে। দ্বিতীয়ত, গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় গবেষণায় ব্যয় এখনো অত্যন্ত কম। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা অনুদান, আধুনিক গবেষণাগার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সুযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, বিদেশফেরত মেধাবীদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। দেশে ফিরে আসা গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের জন্য দ্রুত নিয়োগ, গবেষণা তহবিল এবং কর সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ তৈরি করতে হবে। যাতে একজন শিক্ষার্থী বুঝতে পারে যে গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশেও সফল ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। পঞ্চমত, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। চাকরির নিরাপত্তা এবং পেশাগত স্বাধীনতা মানুষের সিদ্ধান্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিদেশে যাওয়া কোনো অপরাধ নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রয়োজনীয়। জ্ঞান অর্জনের জন্য পৃথিবীকে জানার বিকল্প নেই। তবে প্রশ্ন হলো, বিদেশে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কি দেশের কল্যাণে ব্যবহার করা হচ্ছে? সবাই দেশে ফিরে আসবে– এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু বিদেশে থেকেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা করা, শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেওয়া, প্রযুক্তি বিনিয়োগ করা কিংবা নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা করা সম্ভব।
বাংলাদেশ আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের তরুণরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি মেধাবী, বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং বেশি বৈশ্বিক। এটি আমাদের শক্তি। কিন্তু সেই শক্তি যদি ক্রমাগত দেশের বাইরে স্থায়ীভাবে চলে যায়, তাহলে উন্নয়নের গতি একসময় বাধাগ্রস্ত হবে।
মেধা পাচার রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় সীমান্ত বন্ধ করা নয়, বরং সুযোগ সৃষ্টি করা। তরুণদের এমন একটি বাংলাদেশ উপহার দিতে হবে যেখানে তারা অনুভব করবে– যোগ্যতার মূল্য আছে, গবেষণার সম্মান আছে, চাকরির নিরাপত্তা আছে এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ আছে। যে রাষ্ট্র তার মেধাবীদের ধরে রাখতে পারে, সে রাষ্ট্র ভবিষ্যৎকে ধরে রাখতে পারে। আর যে রাষ্ট্র তার সেরা মেধাগুলোকে হারায়, সে রাষ্ট্র একসময় বুঝতে পারে, সবচেয়ে বড় ক্ষতি অর্থনীতির নয়, সম্ভাবনার।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

স্বাধীনতার অবিনাশী ছাত্র ও যুব নেতৃত্ব

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:২৪ পিএম
স্বাধীনতার অবিনাশী ছাত্র ও যুব নেতৃত্ব

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো বিস্ফোরণ নয়, এর পেছনে আছে তিল তিল করে গড়ে তোলা জনসমর্থণ, যার পেছনে আছেন মুখ্য নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং তার আদর্শে দীক্ষিত মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব ত্যাগী ছাত্র ও যুবনেতারা। সদ্য প্রয়াত তোফায়েল আহমেদসহ মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব ছাত্র ও যুব নেতৃত্ব সে কারণেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ অংশ...

বাংলাদেশের বয়স যখন ৫৪ বছর অতিক্রম করেছে, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবাই তখন মৃত্যুবরণ করেছেন, সামরিক নেতৃত্বের প্রায় সকলে গত হয়েছেন, শীর্ষ যুব ও ছাত্র নেতৃত্বের অধিকাংশ এরই মধ্যে পৃথিবী ছেড়েছেন এবং জাতীয় রণাঙ্গনে জীবন বাজি রাখা মুক্তিবাহিনীর বীর যোদ্ধারা একে একে পৃথিবী ছেড়ে যাচ্ছেন। জাতীয় গণমাধ্যমে তাদের মৃত্যুর খবর খুব একটা আসে না, কিছু মিলে ফেসবুকসহ সমাজ মাধ্যমে। ভাবছিলাম মুক্তিযুদ্ধের যে রণাঙ্গন বন্ধুরা বিদায় নিচ্ছেন তাদের নিয়ে কিছু লিখি। কিন্তু হয়ে ওঠেনি। ঠিক সে সময় ১ জুন ২০২৬ মৃত্যুবরণ করলেন তোফায়েল আহমেদ। এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটল ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেই ছাত্র ও যুব নেতৃত্বের যারা পাকিস্তানের প্রবল প্রতাবশালী সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের পরাজয় ঘটিয়ে বাঙালি নবজাগরণে সুবিশাল ভূমিকা রাখার কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন।
উনিশ শ ষাটের দশক, একদিকে সামরিক শাসন, চলছে ধর্মের নামে শাসন ও শোষণ, অন্যদিকে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বাড়ছে বৈষম্যের দেয়াল! এককথায় বাঙালিকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানানো হয়েছে: কোথাও মর্যাদা নেই; সংস্কৃতিতে আধিপত্ত!, চাকরি, অর্থনীতি, সেনাবাহিনী সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে বাঙালি। ভয়ংকর সেই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন শেখ মুজিব ও তার সহযোগীরা। সঙ্গত কারণে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিদ্যাপীঠ উত্তপ্ত, সে আগুনে ঘি ঢালার কাজ করে চলেছেন যুব ও ছাত্রনেতারা। বলতেই হবে ছাত্রলীগ বা ছাত্র ইউনিয়নের সেদিনের রাজনীতি তখন শুধু মিছিল-মিটিং ছিল না, ছিল জাতিকে মুক্ত করার, সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রজ্ঞাবান প্রতিশ্রুতি। 
১৯৬৬ থেকে ধারাবাহিক আন্দোলন পরিক্রমায় পূর্ব পাকিস্তান উত্তপ্ত, বাঙালি জনগোষ্ঠী অধিকার-সচেতন হয়ে উঠতে থাকে। বাঙালি গণমানুষের এই মানোজাগতিক উত্তরণ ঘটে মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬-দফা উপস্থাপনের পর থেকে। এখনকার রাজনীতিতে শ্রমিক সমাজের ভূমিকা নেই বললেই চলে। কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে শ্রমজীবী মানুষ ছিল রাজপথের অন্যতম প্রধান শক্তি। আর ছিল দেশ জাগানিয়া অপ্রতিরুদ্ধ ছাত্র সমাজ–যারা গণমানুষকে সামনে এগিয়ে নিয়েছে, প্রগতিশীলতার পথ দেখিয়েছে। 
ষাটের দশকের গণ-আন্দোলনের উত্তাল সময়ে যে কয়েকজন বলিষ্ঠ ছাত্রনেতা আবির্ভূত হয়েছেন তোফায়েল আহমেদ তাদের অন্যতম শীর্ষ– ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান নায়ক তিনি। আমরা যারা সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, তারা তাকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। সেই বিস্ময়কর গণ-অভ্যুত্থানে পাকিস্তানি শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া তেজস্বী কণ্ঠ তিনি। 
অনলবর্ষি এই ছাত্র নেতা দ্বীপাঞ্চল ভোলা থেকে উঠে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ ছাত্র নেতৃত্বের অধিকারী হয়েছিলেন, ডাকসুর ভিপি হয়ে আইয়ুব খানের মসনদ গুঁড়ো করার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মূল নেতা হিসেবে রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র পর্বে অন্যতম প্রধান সংগঠক হন তিনি, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর একান্ত আস্থাভাজন থেকে রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড পরবর্তী-সময়ে অনেক বিপন্নতা গেছে তার, এরপর বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বের সরকারে মন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। রাজনৈতিক জীবনের একপর্যায়ে এসে দলীয় রাজনীতিতে তিনি কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন শোনা যায়। কিন্তু আদর্শচ্যুত হয়েছিলেন এ কথা কেউই বলবেন না। ১৯৭০ থেকে শুরু করে প্রায় সকল জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে ৯ বার জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন তোফায়েল, জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে গেছেন তিনি। 
১৯৭০-এ অনুষ্ঠিত হলো যৌথ পাকিস্তানের প্রথম ও শেষ সাধারণ নির্বাচন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ব্যাপক বিজয় ঘটল, কিন্তু ইয়াহিয়া বা সেনাবাহিনী কোনো বাঙালির হাতে পাকিস্তানের ক্ষমতা ছাড়বে না, তারা ষড়যন্ত্র আঁটতে থাকল। এল ৭ মার্চের রমনার রেসকোর্স ময়দান, বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন, তোমরা ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো; বললেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। সারা বাংলা জেগে উঠল। এবং দুর্গ গড়ার কাজটা সারলেন সে সময়ের দলীয় নেতৃত্ব ও যুব ও ছাত্র নেতারা। তারা সারা দেশ চষে বেড়ালেন, প্রতিটি জেলায়, প্রতিটি থানায়, প্রতিটি কলেজে গিয়ে ছাত্র-যুবকদের প্রস্তুত হতে বললেন, প্রয়োজনে অস্ত্র ধরতে বললেন। 
সে কারণে বলি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো বিস্ফোরণ নয়, এর পেছনে আছে তিল তিল করে গড়ে তোলা জনসমর্থণ, যার পেছনে আছেন মুখ্য নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং তার আদর্শে দীক্ষিত মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব ত্যাগী ছাত্র ও যুবনেতারা। 
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী যখন অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিরস্ত্র বাঙালির ওপর, বঙ্গবন্ধু যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন এবং তাকে বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে সেদিনের পশ্চিম পাকিস্তানে নেওয়া হলো, বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ বহু জায়গায় বিদ্রোহ করল শুরু হলো ছাত্রজনতার স্বতঃস্ফূর্ত গণপ্রতিরোধ; এই গণবিদ্রোহের মানসিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল সেদিনের যুব ও ছাত্র নেতাদের হাতে। শুধু তাই নয়, তারা ব্যাপক ভূমিকা রাখলেন স্বশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের নানা স্তরে। কারণ মুক্তিযুদ্ধ শুধু মারণাস্ত্রে হয়নি, হয়েছে মানুষের মনের অস্ত্রে, যে মনকে তৈরি করেছেন মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আপসহীন নেতৃত্ব, আর তার বিষ্ফোরণ ঘটেছে যুব ও ছাত্র নেতাদের অবিনাশী ত্যাগে। 
রাজনীতির উত্থান-পতন বা নানা পথ-পরিক্রমায় অনেক নাম আসে, হারিয়েও যায়। কিন্তু ইতিহাসের কিছু নাম থাকে অবিনশ্বর, যা সময়ের ধুলোয় হারায় না, প্রবল চেষ্টাতেও সে নাম মুছে দিতে পারে না কেউ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে সে নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে আরও কিছু নাম ছিল যুব ও ছাত্র নেতৃত্বের–সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক এবং সদ্য প্রয়াত তোফায়েল আহমদ–ইতিহাসে তারা চিরস্মরণীয়। এই নায়করা ছিলেন স্বাধীনতাপূর্ব ছাত্র-যুবসমাজের হৃদয়ের স্পন্দন, বঙ্গবন্ধুর ডাকে যে জনজোয়ার তৈরি হয়েছিল, সেই জোয়ারে বৈঠা হাতে জাতিকে তারা এগিয়ে নিয়েছিলেন।


ঊনসত্তর-সত্তররের ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত আরও কয়েকজন শীর্ষ ছাত্র নেতাকে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমাদের। আ স ম আবদুর রব ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর ভিপি, শাজাহান সিরাজ ছিলেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, নূরে আলম সিদ্দিকী ছিলেন ডাকসুর জিএস, আবদুল কুদ্দুস মাখন ছিলেন ছাত্রলীগের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা, যাদের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছিল ছাত্রসমাজের যৌথ কমান্ড– ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’। এদের মধ্যে একমাত্র আ স ম আবদুর রব আজো আছেন, বাকি তিনজন গত হয়েছেন। বাস্তবতা হচ্ছে, তারা সবাই শেষ পর্যন্ত একপথে হাঁটেননি, পথ ভিন্ন ও মত ভিন্ন হয়েছিল, সঙ্গত অসঙ্গত নানা কারণে, কেউ কেউ আবার অভিযুক্তও হয়েছিলেন নানা পর্বে। কিন্তু ইতিহাসের মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব যে মাঠে তারা বিচরণ করেছেন, সে ইতিহাস মিথ্যা হয়ে যায় না।
মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আহমেদ, কামরুজ্জামান– এদের একনিষ্ঠ নেতৃত্বে এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সহায়ক দেশ ভারতের সমর্থনে মুজিবনগর সরকার তখন যুদ্ধ পরিচালনায় সক্রিয়; হাজারও তরুণ প্রশিক্ষিত হচ্ছে, যুদ্ধ সেক্টরগুলো সবল হচ্ছে, মুক্তিবাহিনী সুসংগঠিত হচ্ছে; সে সময়ে এই যুব ও ছাত্রনেতারা যুব তারুণ্যকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। যে কারণে মুষ্টিমেয় কিছু বিপথগামী ছাড়া গোটা তারুণ্য সেদিন এক হয়েছিল স্বাধীনতার প্রশ্নে। 
সদ্য প্রয়াত তোফায়েল আহমেদসহ মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব ছাত্র ও যুব নেতৃত্ব সে কারণেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ অংশ, তারা সবাই পরবর্তী সময় এক পথে থাকেননি ঠিক, কারও কারও পদক্ষেপ বিতর্কেরও ঊর্ধ্বে ছিল না, কিন্তু স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর প্রশ্নে তাদের ভূমিকা ছিল অবিচল।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক

পাসপোর্ট ও বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম
পাসপোর্ট ও বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে
ড. খলিলুর রহমান

যখন নাগরিকরা নিজেদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই ভয় করতে শুরু করে, তখন কোনো জাতি এগোতে পারে না। সরকার জনগণের সেবা করার জন্য–ভয় দেখানোর জন্য নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ মানুষের মধ্যে আস্থা, ন্যায়বিচার ও বিশ্বাস সৃষ্টি করা; আতঙ্ক ও সন্দেহ নয়।...

পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিকত্বের একটি মৌলিক অধিকার। পাসপোর্ট শুধু বিদেশ ভ্রমণের নথি নয়–এটি একজন নাগরিকের পরিচয়, জাতীয়তা এবং নিজের রাষ্ট্রের প্রতি তার বৈধ সম্পর্কের স্বীকৃতি। যখন কোনো সরকার রাজনৈতিক পরিচয়, সন্দেহ বা প্রশাসনিক পক্ষপাতের ভিত্তিতে এই অধিকার প্রয়োগ করে, তখন তা ন্যায়বিচার, সমতা ও গণতান্ত্রিক শাসনের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

গত রাতে আমার এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির ফোন পেলাম, যাকে আমি কয়েক দশক ধরে চিনি। তিনি সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে চার দশক ধরে দেশসেবা করে আসছেন। তিনি তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে নতুন বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার জটিলতা নিয়ে আমার সহায়তা চাচ্ছিলেন। তার অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি এমন একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার প্রতিফলন, যা ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অনির্বাচিত প্রশাসনের সময়ে ব্যাপকভাবে দেখা গিয়েছিল।

বিষয়টির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে যাওয়ার আগে একটি বাস্তবতা স্বীকার করা জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক সরকারগুলো কূটনৈতিক পাসপোর্টের মর্যাদা ও গুরুত্বকে ক্ষুণ্ন করেছে। অনেকে পেশাগতভাবে কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না কিংবা পেশাদার কূটনীতিক ছিলেন না, তাদেরও এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ঐতিহ্যগতভাবে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী কূটনীতিকদের জন্য সংরক্ষিত এই নথির গুরুত্ব ও মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত রাতে যিনি আমার সহায়তা চেয়েছিলেন, তিনিও কূটনৈতিক সেবার বাইরে থেকেও কূটনৈতিক পাসপোর্ট পেয়েছিলেন তার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য।

তবে কূটনৈতিক পাসপোর্টের অপব্যবহার সংশোধনের নামে কোনো নাগরিককে সাধারণ পাসপোর্ট থেকে বঞ্চিত করা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক, যার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি দণ্ড বা আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই, তার সমানভাবে পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এটি শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি সাংবিধানিক ও মানবাধিকারসংক্রান্ত প্রশ্ন।

দুঃখজনকভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এমন কিছু চর্চা গড়ে ওঠে, যা দেখে মনে হয়েছে পূর্ববর্তী সরকারে কাজ করেছেন বা একসময় কূটনৈতিক পাসপোর্ট ধারণ করেছেন এমন ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা কাজ করেছে। বহু সম্মানিত সরকারি কর্মকর্তা, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এক ধরনের অলিখিত সন্দেহ ও বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। আইন ও বিধিমালার ভিত্তিতে আবেদন মূল্যায়নের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচিতি ও ইচ্ছাকৃত প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছে।

আরও দুঃখজনক হলো, ড. ইউনূস ও তার অনির্বাচিত প্রশাসন সমাজে বিভাজন সৃষ্টির রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল। মানুষকে পাশাপাশি দাঁড়াতে উৎসাহিত করার পরিবর্তে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর প্রবণতা তারা উৎসাহিত করেছে।

আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে এসব চর্চার প্রভাব প্রত্যক্ষ করেছি এবং একজন ভুক্তভোগী। শত শত মানুষ পাসপোর্ট পেতে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব, জটিলতা ও অপমানজনক আচরণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে, যখন সাবেক কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের সাধারণ পাসপোর্ট প্রক্রিয়ায়ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অস্বাভাবিক সম্পৃক্ততা যোগ করা হয়। এতে বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ ও রাজনৈতিক নজরদারির সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, ড. ইউনূস ও তার ঘনিষ্ঠদের আমলে পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, যা একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হিসেবে সমালোচিত হয়েছিল। যদিও অনেক নাগরিক আমলাতান্ত্রিক হয়রানি কমার কারণে এটিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তবু ক্রমে অভিযোগ ওঠে যে, অতিরিক্ত শিথিলতা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে। এমনো অভিযোগ সামনে আসে যে, পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়াই বাংলাদেশে অবস্থানরত অনাগরিক বা বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে।

কানাডায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি দক্ষতা ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একটি পাসপোর্ট আন্তর্জাতিকভাবে রাষ্ট্রের সার্বভৌম নিশ্চয়তার প্রতীক। এর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হলে তার প্রভাব শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আজ বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের ভিসা নাকচ হওয়ার ঘটনা এর একটি অন্যতম নিদর্শন। শুধু ভিসা প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা নয়, দুর্বল যাচাই ব্যবস্থা প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশযাত্রা কঠিন করে তুলতে পারে এবং রাষ্ট্রকে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

ড. ইউনূসের অপশাসনের সময় আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় ছিল বিমানবন্দরে যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও অন্যায় আচরণ। অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ করে যারা আগে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ধারণ করেছেন বা সরকারি দায়িত্বে ছিলেন, তাদের অনেককে বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ, বিলম্ব এবং ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ ছাড়াই যাত্রীদের যাত্রা বিলম্বিত বা আটকে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

এর চেয়েও উদ্বেগজনক ছিল গণমাধ্যমের কিছু অংশের ভূমিকা। বিমানবন্দরের এসব ঘটনার পর কিছু যাত্রীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও চাঞ্চল্যকর সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনসমক্ষে সন্দেহভাজন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অনেক শিরোনাম ও প্রতিবেদন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে নিরপেক্ষ তথা উপস্থাপনের চেয়ে ব্যক্তি বিশেষকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রবণতা বেশি ছিল। এটি শুধু পেশাগত নীতির পরিপন্থী নয়; বরং সমাজে ভয় ও বিভাজনের সংস্কৃতি তৈরি করে।

যখন নাগরিকরা নিজেদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই ভয় করতে শুরু করে, তখন কোনো জাতি এগোতে পারে না। সরকার জনগণের সেবা করার জন্য–ভয় দেখানোর জন্য নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ মানুষের মধ্যে আস্থা, ন্যায়বিচার ও বিশ্বাস সৃষ্টি করা; আতঙ্ক ও সন্দেহ নয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন বহু নাগরিকের মধ্যে স্বস্তি ও নতুন আশার সঞ্চার করেছে। নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের প্রত্যাবর্তনকে অনেকে ড. ইউনূসের অনির্বাচিত প্রশাসনের বিতর্কিত চর্চাগুলো থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। এটি উৎসাহব্যঞ্জক যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এসব বিষয়ে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সাবেক কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের প্রতি তুলনামূলক মানবিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ এবং বিমানবন্দরে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি কমানোর উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার।

বিশেষ করে ব্যক্তিগতভাবে আমি সন্তুষ্ট যে, এই উন্নয়নগুলো বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে হচ্ছে, যিনি ঘটনাচক্রে আমারই সিভিল সার্ভিস ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা ও নাগরিক মর্যাদার গুরুত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন। কার্যকর শাসনের জন্য শুধু ক্ষমতা নয়; প্রয়োজন প্রজ্ঞা, সংযম ও মানবিকতা।

তবে সংস্কার অর্ধেক পথে থেমে থাকলে চলবে না। বাংলাদেশ এখন এমন একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও অধিকারভিত্তিক পাসপোর্ট ও অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে। এ ধরনের ব্যবস্থার জন্য কয়েকটি মৌলিক নীতি জরুরি।

প্রথমত, রাজনৈতিক পরিচয়, পেশাগত পটভূমি বা অতীত সরকারি সম্পৃক্ততা নির্বিশেষে সব নাগরিককে সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।

তৃতীয়ত, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে পেশাদারত্ব ও সংযমের সঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়া কোনো যাত্রী হয়রানির শিকার না হন।

চতুর্থত, বাংলাদেশি পাসপোর্টের মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় পূর্বের যথাযথ যাচাই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অ-নাগরিকরা পাসপোর্ট না পায় বা পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে অপব্যবহার রোধ করা যায়, আবার প্রকৃত নাগরিকরাও হয়রানির শিকার না হন।

সবশেষে, গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা চরিত্র হননের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

সম্ভবত ড. ইউনূসের অনির্বাচিত প্রশাসনের সবচেয়ে ক্ষতিকর উত্তরাধিকার ছিল নাগরিকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি। তাদের সবচেয়ে বড় মেটিকুলাস ডিজাইন ছিল সমাজে মানুষকে সহনাগরিক নয়, প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শেখানো। তবে এটি স্বস্তিদায়ক যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সময় সেই বিভাজনের রাজনীতি ধীরে ধীরে অবসানের দিকে যাচ্ছে। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য স্বাভাবিক; কিন্তু সন্দেহ, প্রতিশোধ ও সংঘাতনির্ভর শাসনব্যবস্থা জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরূকরণের জন্য বড় মূল্য দিয়েছে। এখন দেশের প্রয়োজন পুনর্মিলন, প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। নাগরিকদের উচিত জাতি গঠনের কাজে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো, মুখোমুখি সংঘাতে নয়।

যেকোনো সরকারের দায়িত্ব শুধু আইন পরিচালনা নয়; সামাজিক আস্থা ও জাতীয় সংহতি রক্ষা করাও। যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা উভয়ই।

এখন জাতির প্রত্যাশা বাংলাদেশ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাবে; যেখানে নাগরিক অধিকার সম্মানিত হবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ থাকবে এবং প্রশাসন দলীয় স্বার্থের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থে কাজ করবে।

পরিশেষে, পাসপোর্ট কখনোই রাজনৈতিক অস্ত্র হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত সেই প্রতীক, যা প্রতিটি বাংলাদেশির নাগরিকত্ব, মর্যাদা ও সমঅধিকারের প্রতিনিধিত্ব করে।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব

বৃদ্ধার করুণ মৃত্যু মানবিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভয়াবহ সংকটে

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১১:২৮ এএম
মানবিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভয়াবহ সংকটে
মনিরা রহমান

এই ঘটনা আমাদের সমাজের মানবিক মূল্যবোধের গভীর অবক্ষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে। এখানে অর্থনৈতিক সংকট, শিক্ষার অভাব বা সামাজিক অক্ষমতার কোনো অজুহাত নেই। সন্তানরা শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও যদি একজন অসুস্থ, বয়স্ক মায়ের খোঁজ না নেন, তাহলে প্রশ্ন ওঠে মানবিকতা ও পারিবারিক দায়বদ্ধতার জায়গায় এসব কী ঘটছে!

শিশু অবস্থায় যেমন মা-বাবা সন্তানের যত্ন নেন, তেমনি বার্ধক্যে মা-বাবার দেখাশোনা করা সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। সাত দিন ধরে একজন মা মৃত অবস্থায় পড়ে থাকলেন, কেউ ফোনও করল না, এটি এক ধরনের চরম অবহেলা, যা সামাজিক অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। এ ধরনের সামাজিক অপরাধ দমনে আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ জরুরি।

বর্তমানে সমাজে সহমর্মিতা ও পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে। আমরা একের পর এক সহিংসতা, নির্মমতা ও ট্রমার মধ্যে বসবাস করছি, যার প্রভাব মানুষের মানসিকতা ও আচরণে পড়ছে। ফলে অনেকেই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছেন এবং অন্যের কষ্টের প্রতি সংবেদনশীলতা হারাচ্ছেন।

এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্তানরা মানসিক ও সামাজিক বিকাশের প্রক্রিয়াগত গবেষণার বিষয় হয়ে গেছেন। কারণ, মানুষ কীভাবে এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে নিজের মায়ের প্রতিও ন্যূনতম সহমর্মিতা থাকে না, বোঝা জরুরি। এ ছাড়া পরিবার, শিক্ষা ও সমাজে নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের চর্চা বাড়ানো এবং প্রবীণদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয়ভাবে জবাবদিহি ও কার্যকর সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

- মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং নির্বাহী প্রধান, ওয়েলবিং ফাউন্ডেশন