ঘড়ির কাঁটায় তখন বুধবার বেলা সাড়ে ১২টা। রাজধানীর ধানমন্ডিতে ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনের কোথাও নেই তিল ধারণের ঠাঁই। অগ্রগণ্য শিল্পীরা গাইছেন ‘তুমি যে সুরের আগুন ছড়িয়ে দিলে’, ‘আমি মারের সাগর পাড়ি দেব’, ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ ‘মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি’সহ রবিঠাকুরের একগুচ্ছ গান। কদিন আগেও ছায়ানটের আসরগুলোতে যে গান আনন্দের ফোয়ারা বইয়ে দিত, সেই গানগুলোই কত বিমর্ষ শোনাল চৈত্রদুপুরে। কারণ সেই আসরের মধ্যমণি সন্জীদা খাতুনের নিথর মরদেহ আনা হয়েছে ছায়ানট প্রাঙ্গণে। কদিন পরেই বাংলা নববর্ষ। তারই প্রস্তুতি হচ্ছিল ছায়ানট প্রাঙ্গণে। এমন সময় শান্তি পারাবারে তরণী ভাসালেন সন্জীদা খাতুন; সবার প্রিয় ‘মিনু আপা’।
স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘর থেকে সন্জীদা খাতুনের লাশ যখন ছায়ানটে নিয়ে আসা হলো, তখন মধ্যদুপুর। সংস্কৃতি অঙ্গনের মহারথীদের পাশাপাশি তরুণ সংস্কৃতিকর্মীরাও চোখভরা জল নিয়ে হাজির ছায়ানট প্রাঙ্গণে। শেষবার ‘প্রিয় মিনু আপা’কে দেখবেন বলে দূরের জেলা থেকে ছুটে আসে খুদে শিল্পীরাও।
ছায়ানট প্রাঙ্গণে কথা হয় সন্জীদা খাতুনের নাতনি সায়ন্তনী তিশার সঙ্গে। গত সপ্তাহে সন্জীদা খাতুনকে যখন স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হলো, এইচডিইউ ইউনিটের শয্যায় শুয়ে ‘প্রিয় নানু’ তাকে কী কথা শুনিয়েছেন তাই শোনালেন তিনি। দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা জানিয়ে গেছেন নাতনিকে। সন্জীদা খাতুন বলেছিলেন, ‘আমার অনেক দুশ্চিন্তা হচ্ছে। কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি কিছুই বুঝতে পারছি না। বাংলাদেশটা তো এমন ছিল না। কী হয়ে গেল?’ তখন তাকে শান্ত করতে তিশা কোনো প্রিয় গানের কথা স্মরণ করতে বলেন। তখন রবীন্দ্রনাথের ‘ঝরা পাতা গো আমি তোমারই দলে...’ গানটির কথা মনে করেন সন্জীদা খাতুন। তিশার কথা শেষ হতেই সাউন্ড বক্সে বেজে ওঠে সন্জীদা খাতুনের কণ্ঠ, তিনি গাইছেন ‘ঝরা পাতা গো’। এই গানে যেন পিনপতন নীরবতা নেমে আসে ছায়ানট ভবনে। শোকার্ত কাফেলা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ততক্ষণে গোলাপ, বেলিসহ নানা রঙের ফুলে ঢেকে যায় কফিন। ছেলে পার্থ তানভীর নভেদ আর মেয়ে রুচিরা তাবাসসুম তখন দূরে দাঁড়িয়ে দেখছেন সব আয়োজন।
সাবেক সংসদ সদস্য ও শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি আরমা দত্ত বলেন, ‘সন্জীদা খাতুন বাঙালি সংস্কৃতির জন্য আজন্ম কাজ করেছেন। তিনি সারা পৃথিবীতেই বাঙালিকে উঁচু স্থানে নিয়ে যেতে কাজ করেছেন। আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পথ ধরে তিনি আলো বিলিয়েছেন। সেই আলোয় আমরা আলোকিত হয়েছি।’ রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘সন্জীদা খাতুন এক বর্ণাঢ্য জীবন কাটিয়েছেন। শুদ্ধ সংগীতের প্রসারে সারা দেশে কাজ করেছেন। অসংখ্য মানুষের মধ্যে বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে কাজ করেছেন। যারা তার সংস্পর্শে এসেছেন, তারা আলোকিত হয়েছেন।’ নাট্যজন ম. হামিদ বলেন, ‘সংস্কৃতি আশ্রয়ে সন্জীদা খাতুন মানবিকতার বিকাশ ঘটিয়ে মূল্যবোধ জাগ্রত করার দীক্ষা দিয়েছেন; শিখিয়েছেন দেশ ও নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসতে। অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটিয়ে প্রকৃত বাঙালি হওয়া শিখিয়েছেন।’ অভিনেতা তারিক আনাম খান বলেন, ‘সন্জীদা খাতুনকে অনুসরণ করেই আমরা শিল্প-সংস্কৃতির পথ চিনেছি। শিল্পকে নিছক বিনোদনের বাইরে সমাজ পরিবর্তনের দর্শন হিসেবে ভাবতে শিখেছি। শিল্পের আলোয় সত্য ও ন্যায়ের পথ চিনেছি। এ কারণেই তিনি এ দেশের সংস্কৃতি ভুবনের পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব।’
দুপুর ১টার দিকে সন্জীদা খাতুনের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের বাংলা বিভাগে। তিনি এই বিভাগে দীর্ঘদিন অধ্যাপনায় যুক্ত ছিলেন। এখানে তাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান, বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ শিক্ষক সৈয়দ আজিজুল হক, আখতার কামাল, কবি দিলারা হাফিজ। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘পরিপূর্ণ এক সফল জীবনকে আলিঙ্গন করেছেন সন্জীদা খাতুন।’ সৈয়দ আজিজুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নির্মাণে তার ভূমিকা অনন্য। বাংলাদেশের প্রগতি ধারা নির্মাণ করে তিনি নিজেকে এক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তিনিই যে আমাদের মহীরূহ।’
পরে বুধবার বেলা আড়াইটায় লাশ নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। এখানে নাগরিকদের শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের কাজটি তত্ত্বাবধান করেন খ্যাতিমান অভিনেতা ঝুনা চৌধুরী, গণসংগীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট ও আবৃত্তিশিল্পী রফিকুল ইসলাম। এ পর্বে শ্রদ্ধা জানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, নৃত্যাঞ্চল, মণি সিংহ-ফরহাদ ট্রাস্ট। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সিপিবি ও ঐক্য ন্যাপ নেতারা শ্রদ্ধা জানান।
সন্জীদা খাতুনের মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক না জানানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। তিনি বলেন, ‘সন্জীদা খাতুনের মতো মানুষের মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক জানানো না হলে সেটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। রাষ্ট্র তাকে মনে না রাখলেও তিনি বেঁচে থাকবেন এ দেশের মানুষের হৃদয়ে। বেঁচে থাকবেন আপন কাজ ও দর্শনের মাঝে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের চেয়ারপারসন তামান্না রহমান বলেন, ‘মিনু আপার দুটি গুণের কথা বলব। একটি তার সাংগঠনিক দক্ষতা, অন্যটি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অবিচল থাকা, তার দৃঢ়তা। এ গুণ দুটি তিনি আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত করে গেছেন।’
সন্জীদা খাতুনের পুত্রবধূ ও ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা জানান, বুধবার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সন্জীদা খাতুনের লাশ রাখা হয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মরচুয়ারিতে। তার লাশ কোথায় দাফন করা হবে, এ বিষয়ে পারিবারিক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে ছায়ানট জানাবে দেশবাসীকে।