বাঙালির মননের এবং বাংলাদেশের জাতিসত্তার প্রতিভূ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বাঙালির ব্যক্তি মানসের সকল ভাবানুভূতি, প্রেম-ভালোবাসা, আনন্দ-বেদনা, অর্জন-বিসর্জন, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, আন্দোলন-সংগ্রাম, দুর্যোগ-দুর্বিপাক এবং জাতীয় ক্ষেত্রে বড় বড় যে সব অর্জন ও প্রাপ্তি রয়েছে তার প্রধান প্রেরণাদাতা কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি আমাদের রণ-সংগীতের রচয়িতা। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছেন। তার কবিতা, সংগীত, গল্প, প্রবন্ধ এবং অনুবাদ কর্ম শুধু সাহিত্য কর্ম হিসেবে নয়, অনিঃশেষ উদ্দীপনা ও পরম প্রেরণা হিসেবে বিরাট ভূমিকা পালন করছে।
১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে এক অতি দরিদ্র পরিবারে কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন। দারিদ্র্যের কারণে বারবার তার পড়াশোনা বিঘ্নিত হয়। মক্তবে পড়াশোনাকালে ওই মক্তবেই শিক্ষকতা করেন। পাশাপাশি মুয়াজ্জিনের চাকরি করেন। অর্থ উপার্জনের জন্য লেটো গানের দলে যোগ দেন। সেখানে গান লিখেন, অভিনয় করেন। স্কুলের গণ্ডি পেরোবার আগেই ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। সেনাবাহিনীতে থাকার সময় সাহিত্যিক হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে। করাচি থেকে কলকাতায় ফিরে কবি ও লেখক হিসেবে তিনি সুনাম অর্জন করেন। বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের পর তার সুখ্যাতি ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমে তিনি পরিচিতি পান কবি, সংগীতজ্ঞ, ছোট গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সম্পাদক, সুরকার, বংশীবাদক, গায়ক এবং অভিনেতা হিসেবে। অগ্নিবীণা, বাঁধনহারা, বিষের বাঁশি, প্রলয়োল্লাস, ধূমকেতু ইত্যাদি তার প্রধানস্থানীয় গ্রন্থের পাশাপাশি গান, তিনটি উপন্যাস, ১৯টি ছোট গল্প এবং পাঁচটি প্রবন্ধগ্রন্থ রচনা করেন।
তিনি তার সুগঠিত স্বাস্থ্য, ডাগর চোখ, বাবরি চুল, আত্মভোলা বোহেমিয়ান স্বভাব এবং প্রাণখোলা হাসির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। ধূমকেতু পত্রিকায় ১৯২২ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর তার ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে ব্রিটিশ সরকার নজরুলকে একই সালের ২৩ নভেম্বর গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে রাজদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। ১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারি আত্মপক্ষ সমর্থন করে তিনি জবানবন্দি দেন। এটি বাংলা সাহিত্যে রাজবন্দির জবানবন্দি নামে মর্যাদা লাভ করে। ব্রিটিশ সরকার তাকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। এর প্রতিবাদে তিনি অনশন করেন। জেলখানায় থাকা অবস্থায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘বসন্ত’ নাটকটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। এই খুশিতে জেলে বসে তিনি আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কবিতাটি রচনা করেন।
শৈশবে ধর্মীয় শিক্ষায় দীক্ষিত হলেও তিনি বড় হয়েছেন ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক সত্তা নিয়ে। যেখানে তিনি অনাচার, অবিচার, শোষণ ও নির্যাতন দেখেছেন, সেখানেই তিনি তার প্রতিবাদের কলম ধরেছেন। গেয়েছেন সাম্য ও মানবতার গান। তিনি যেমন বিদ্রোহী কবি ছিলেন, তেমনি ছিলেন প্রেমের কবি। নিজেই তার এ দ্বৈতসত্তার কথা তিনি উচ্চারণ করেছেন- মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আরেক হাতে রণ-তূর্য। প্রেম ও দ্রোহের পাশাপাশি মানবেন্দ্রীয়র যত রকম অনুভূতি আছে, সব রকম অনুভূতি নিয়ে তিনি সাহিত্য রচনা করেছেন।
কাজী নজরুল ইসলাম প্রকৃত অর্থে ছিলেন প্রতিভাধর সৃষ্টিশীল কবি। রবীন্দ্র যুগে তিনি নতুন একটি স্বতন্ত্র কাব্যধারা সৃষ্টি করেছিলেন। তিনিই প্রথম আরবি ও ফারসি শব্দযোগে বাংলা কবিতায় নতুন প্রাণপ্রবাহ সৃষ্টি করেছেন। তিনি প্রথম কবি যিনি শ্যামা সংগীত রচনা করেছেন, আবার ইসলামিক গজল রচনা করেছেন। তাকে ছাড়া মুসলমানের রোজা শুরু হয় না, ঈদ শুরু হয় না। আবার হিন্দুদের কীর্তন তাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মূলত দ্রোহ ও প্রেমের পাশাপাশি বাঙালি নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। তা সত্ত্বেও তিনি ধর্মান্ধ হিন্দু ও মুসলমানদের দ্বারা বারবার আক্রান্ত হয়েছেন। তাকে কাফের ফতোয়া দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি আসলে হিন্দু মুসলমান জাতির মহামিলন কামনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘কেউ বলেন আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের, আমি বলি ও দুটোর কোনোটাই না। আমি শুধু হিন্দু মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে নিয়ে হ্যান্ডশেক করানোর চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাবলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।’
১৯৪২ সালে তিনি স্নায়বিক অসুস্থতায় মারাত্মক আক্রান্ত হন। ফলে আকস্মিকভাবে তার সক্রিয়তার অবসান ঘটে। ১৯৭২ সালে কলকাতা থেকে তাকে ঢাকায় আনা হয়। ১৯৭৬ সালে তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। তাকে অভিষিক্ত করা হয় বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে। ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডিলিট ডিগ্রিতে ভূষিত করে। দেওয়া হয় একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পুরস্কার। ভারত সরকার তাকে পদ্মভূষণ খেতাবে ভূষিত করে। ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র ঢাকায় তার জীবনাবসান ঘটে।
মূলত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি, জাতিসত্তার কবি, প্রাণের কবি, সার্বভৌম এবং ভালোবাসার কবি। বাংলা সাহিত্যকে তিনি অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছেন। আজ ৫০তম প্রয়াণ দিবসে কবির প্রতি সহস্র প্রণতি ও প্রতীতি রইল।