সমকালীন বিষয়কে চিরকালীন করে তোলার প্রচেষ্টা ও সেই প্রচেষ্টার অনিন্দ্য উজ্বল দৃষ্টান্ত পাঠকের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার মহার্ঘ কাজটি ধারাবাহিকভাবে করে চলেছে ‘রোহিণী’। সম্পাদক পার্থপ্রতিম পাঁজার স্বতন্ত্র ভাবনায় ‘রোহিণী’র প্রতিটি সংখ্যাই হয়ে ওঠে বিশেষ সংখ্যা। রোহিণী ও হাতে গোনা কয়েকটি পত্রিকার ঔজ্জ্বল্য অবলীলায় মুছে দেয়, লিটল ম্যাগের চিরকেলে তকমা। বাজার চলতি বাণিজ্যিক পত্র-পত্রিকাগুলিকে প্রায়শই পিছনে ঠেলে দিয়ে ভাবনা-চিন্তা ও তার সম্যক বিন্যাসে ক্রমশ অগ্রণী ভূমিকা নিচ্ছে রোহিণী।
২০২৬ সালে যে নতুন বছরকে পেলাম আমরা, আপামর বাঙালির কাছে এই সালটির মহিমাই আলাদা। এক সঙ্গে চারজন বাঙালির প্রাণের মানুষ ও ইতালি তথা বিশ্বখ্যাত নাট্যকার ও নাট্যব্যক্তিত্ব দারিও ফো’র জন্মশতবর্ষ হচ্ছে এই সালে। যাঁরা জন্মেছিলেন ঠিক আজি হতে শতবর্ষ আগে। বাঙালির প্রাণের মানুষ এই চারজন হলেন, বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমার, বাংলার ক্ষণজন্মা কবি, যিনি তাঁর ক্ষণকালের জীবদ্দশায় সর্বহারার কবি আখ্যায় ভূষিত হয়ছিলেন, সেই কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও হাজার চুরাশির মা মহাশ্বেতা দেবী, ও অপরূপ গদ্যভাষার ভাস্কর ও ব্যতিক্রমী কবি মণীন্দ্র গুপ্ত। এঁদের জন্মশতবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলির মহার্ঘ ডালা সাজিয়েছেন পার্থপ্রতিম পাঁজা তাঁরই সম্পাদিত ‘রোহিনী’ পত্রিকায়। সেই মহিমা নিয়েই ‘রোহিণী’ পত্রিকা স্বাতন্ত্রে উজ্জ্বল ও ভাস্বর।
আবারও বলতে হয়, পত্রিকাকে বিষয়ভিত্তিক করে লিটল ম্যাগের ধারণাটাই আমূল বদলে দিয়েছে গুটিকয়েক পত্রিকা। ‘রোহিণী’ তার প্রথম সারিতে উঠে এসেছে। সেই রোহিণীই নতুন বছর ২০২৬-এর বইমেলা সংখ্যায় প্রথমার স্তম্ভে উঠে বিজয়ধ্বজা উড়িয়ে দিয়েছে। নিবিড় নিষ্ঠা, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও একাগ্র আন্তরিকতা দিয়ে কীভাবে পত্রিকাকে ঔজ্জ্বল্য এনে দিতে হয়, সম্পাদক পার্থপ্রতিম পাঁজা তর্জনী তুলে মহামান্য পাঠককে তা দেখিয়েও দিলেন।
উত্তমকুমারকে যত দেখা যায়, তত নতুন মনে হয়। তাঁর সম্পর্কে মানুষের জানার আকাঙ্খাও যেন ফুরাবে না। সম্পাদক সেই সত্যকে সম্যক অনুধাবন করে চিরনতুন মহানায়কের যারপরনাই অনাবিষ্কৃত দিকগুলি উন্মোচনের জন্য তেরোজন বিদগ্ধ ও বিশিষ্টজনকে কলম ধরিয়ে দিয়েছেন। এঁদের মধ্যে প্রথমেই রয়েছেন সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়। তিনি লিখছেন,... ইহলোকে তিনিই উত্তম। প্রমথেশ বড়ুয়া থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সকলেই ছদ্মবেশী দেবতা।...আসলে ইতিহাস ছাড়া উত্তমকুমারের স্থায়ী সঙ্গিনী কেউই নেই। না সুচিত্রা, না সুপ্রিয়া ও মাধবী, না অপর্ণা অথবা অরুন্ধতী। এভাবেই গোটা প্রবন্ধজুড়ে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় তাঁর গভীর মননশীল গূঢ় দ্যোতনায় চমৎকৃত করেছেন। ‘প্রেমিক উত্তম’ শীর্ষক মনোজ্ঞ লেখাটি লিখেছেন, শঙ্করলাল ভট্টাচার্য।
তাছাড়াও উত্তমকুমারকে নিয়ে কলম ধরেছেন, রতনকুমার নন্দী, সৈয়দ হাসমত জালাল, ঋতব্রত ভট্টাচার্য, রাজীব শ্রাবণ, শঙ্কর ঘোষ, সিদ্ধার্থ সিংহ, অরুণ অধিকারী, সুমন ভট্টাচার্য, অংশুমান চক্রবর্তী, দেবল চক্রবর্তী, উপগুপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়।
মহাশ্বেতা দেবীর জন্মশতবর্ষে কালি ও কলমে অর্ঘ্য দিলেন, বাঁধন সেনগুপ্ত, তপোধীর ভট্টাচার্য, তপন বন্দ্যোপাধ্যায়, সুমহান বন্দ্যোপাধ্যায়, বীরেন শাসমল, দেবাঞ্জন চক্রবর্তী, উমা মাজি মুখোপাধ্যায়, চৈতালী ব্রহ্ম,সালেহা খাতুন, প্রীতম চক্রবর্তী, অভিনব গুপ্ত, বাসুদেব মোশেল, অরিন্দম আচার্য, কালীপদ চক্রবর্তী, বিবর দত্ত, শঙ্খ অধিকারী, সৌরভকুমার ভূঞ্যা ও পার্থপ্রতিম পাঁজা।
বাঁধন সেনগুপ্ত তাঁর লেখায় বিজন ভট্টাচার্যর হাত ধরে খুকুদি অর্থাৎ মহাশ্বেতা দেবীর পরিসরে নিয়ে গেছেন পাঠককে। সত্তরের উত্তাল দিনেই লেখকের মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ঘটে। একটা জ্বলন্ত সময়কেও ছুঁয়ে হাজার চুরাশির মাকে প্রতিষ্ঠা দিয়ে গেলেন লেখক।
সুকান্ত ভট্টাচার্যকে নিয়ে কলম ধরেছেন, পবিত্র সরকার। তাঁর লেখায় কিছুটা বিতর্কের ধরণে তত্ত্বের কথা আছে। সুকান্তর বিভিন্ন কবিতায় অংশবিশেষ উল্লেখ করে তিনি সুগভীর তত্ত্বকথা বলেছেন। চন্দন নাথও তাঁর লেখায় সুকান্ত শুধুমাত্র ‘কবি’ হয়ে উঠতে চাননি। হয়ে উঠতে চেয়েছেন একজন সংগঠক।
১৯৪৬ সালে মেজো বউদি রেণু দেবীকে সুকান্ত তাঁর মনের কথা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি কবি বলে নির্জনতাপ্রিয় হব, আমি কি সেই ধরণের কবি? আমি যে জনতার কবি হতে চাই...কবির চেয়ে বড় কথা আমি কমিউনিস্ট।’
কবি চন্দন নাথের লেখার মতো এই একই প্রসঙ্গ ধরা পড়ে সোমঋতা মল্লিকের লেখাতেও। তবে সোমঋতা কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সর্বহারা ও সাধারণ মানুষের কবি হয়ে ওঠার আশ্চর্য ক্ষমতাকে বোঝাতে বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামকেও তাঁর প্রবন্ধের প্রতিপাদ্য বিষয় করেছেন। তাঁর প্রবন্ধের শিরোনামই তা বলে দেয়, ‘নজরুল ও সুকান্ত : বিদ্রোহের দুই স্বর’।
তিনি সুকান্তর কবিতার লাইনের উদ্ধৃতি দেওয়ার আগে নজরুলের কবিতার উদ্ধৃতি তুলে ধরে বলেছেন, নজরুল ও সুকান্তর ভাবনা কোথায় যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। দুই কবিই সোজাসাপটা ঝাপটা দিয়ে গেছেন তাঁদের কাব্যে। সাধারণ মানুষকে তা সততই আন্দোলিত করেছে। অনেকে নাক উঁচু করলেও স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘বিদগ্ধ বাগবিন্যাসের যেমন মূল্য আছে, সহজ, সরল, তীব্র ও ঋজু বাক্যের মূল্যও কিছু কম নয়...’
স্বয়ং সম্পাদক পার্থপ্রতিম পাঁজাও একটি অভিনব বিষয় তুলে ধরেছেন তাঁর মননশীল প্রবন্ধে। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলা ভাষায় প্রথম পথনাটকের পতাকাবাহী : সুকান্ত ভট্টাচার্য’। নিঃসন্দেহে বিষয়টি অভিনব। সুকান্ত ভট্টাচার্য কবিতা ও তাঁর বিদ্রোহী মন-চেতনার প্রসঙ্গ এলেও এই দিকটি মনে হয় অনাবিষ্কৃতই ছিল। সেই দিকটি উন্মোচিত হল সম্পাদকের কলমের আলোয়।
কবি ও চিত্রশিল্পী শ্যামল জানা লিখেছেন, প্রগতিশীল চেতনার উল্লেখযোগ্য কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাছাড়া সুকান্তকে নিয়ে কলম ধরেছেন, আনসার উল হক, ইমানুল হক, হাননান আহসান, নির্মল করণসহ ঊনিশজন।
কবি মণীন্দ্র গুপ্তকে নিয়ে কলম ধরেছেন, শ্যামলকান্তি দাশ, সুমন গুণ, পূর্বা মুখোপাধ্যায়, অংশুমান কর, গৌতম মণ্ডল, তাপস রায়, সুদীপ্ত মাজি, প্রবীর মণ্ডলসহ পনেরজন কবি। শ্যামলকান্তি দাশ একগুচ্ছ কবিতা লিখেছেন কবি মণীন্দ্র গুপ্তের কথা মনে রেখে। সুমন গুণ লিখেছেন, মণীন্দ্র গুপ্ত : আসক্ত পৌরুষ। অংশুমান কর লিখেছেন, মণীন্দ্র গুপ্তর কবিতায় কাহিনির ব্যবহার। গৌতম মণ্ডল লিখেছেন, অস্তিত্ব ও অনুচ্চার: মণীন্দ্র গুপ্তর কবিতায় নিবিড় পাঠ।
জন্মশতবর্ষের শেষ ব্যক্তিত্ব ইতালির বিশ্বখ্যাত নাট্যকার দারিও ফো। শুরুতেই স্বয়ং দারিও ফো-র বক্তৃতা সরাসরি শোনার ব্যক্তিগত অনন্য অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন বাংলাদেশের প্রণম্য নাট্য ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। তারপর দারিও ফো: থিয়েটারের জীবন্ত ম্যাজিশিয়ান লিখেছেন চন্দন সেন।
প্রবীর গুহ লিখেছেন, দারিও ফো থিয়েটার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রান্তরে নিয়ে গেলেন। সৌমেন্দু ঘোষ লিখেছেন, এক বিস্ময়কর নাট্যজন: দারিও ফো। বাংলাদেশের আর এক স্বনামধন্য নাট্য ব্যক্তিত্ব আবদুস সেলিম লিখেছেন, দারিও ফো ও ফ্র্যাঙ্কা রামে দম্পতির যৌথ নারীবাদ, নাট্যযুদ্ধ বিষয়ে। দারিও ফো’কে নিয়ে কলম ধরেছেন, সৌমিত্রকুমার চ্যাটার্জী ও কৃশানু ব্যানার্জীও।
৫৪৪ পাতার এই পত্রিকাটি অবশ্যই ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখার মতো। পরিচ্ছন্ন ও ঝকঝকে ছাপা। সুন্দর একটি প্রচ্ছদ এঁকেছেন শুভঙ্কর রায়। অলঙ্করণও করেছেন শুভঙ্কর। একটি মননশীল সম্পাদকীয় লিখেছেন পার্থপ্রতিম পাঁজা।
‘রোহিণী’
সম্পাদক: পার্থপ্রতিম পাঁজা
প্রকাশক: রোহিণী নন্দন, কলকাতা-১২
দাম: ৪৯৯ টাকা।