চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীতে বেড়েছে ডাকাত ও চোরাকারবারিদের তৎপরতা। তেল পাচার ও যাত্রীবাহী নৌযানে ডাকাতির ঘটনা অনেক বেড়েছে। ডাকাতের কবলে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এতে শঙ্কিত হয়ে পড়ছেন ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীরা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় গত কয়েক মাসে বিপুল পরিমাণ চোরাই তেল জব্দ করা হয়। ইতোমধ্যে অপরাধ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকায় বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্রসহ বেশ কয়েকজন ডাকাত ও চোরাকারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে নৌপুলিশ।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো এবং বাণিজ্যিক নদীবন্দর হওয়ায় চাঁদপুর থেকে পার্শ্ববর্তী শরীয়তপুর, লক্ষীপুর, মুন্সীগঞ্জসহ কয়েকটি জেলার মানুষ যাতায়াত এবং ব্যবসায়ীরা মালামাল নিয়ে নদীতে চলাচল করেন।
চাঁদপুর লঞ্চঘাটে নারায়ণগঞ্জগামী যাত্রী জসিম চৌধুরী বলেন, ‘যখন-তখন ডাকাতির ঘটনা ঘটে। দুই-তিন মাস আগে বড় ধরনের ডাকাতি হয় লঞ্চে। তখন থেকে কিছুদিন লঞ্চে যাওয়া-আসা বন্ধ করে দেই। আমাদের কাছে ব্যবসার টাকা থাকে, ডাকাতির ভয়ে থাকি। নদীপথ আমাদের কাছে অনিরাপদ মনে হয়।’
চাঁদপুর বড় স্টেশন এলাকার নৌকার মাঝি রফিক সরদার বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে ডাকাতি বেশি হয়। এখন চরাঞ্চলে পানি থাকে, তারা সহজেই ডাকাতি করে চরের ভেতরে লুকিয়ে থাকে। আমরা দর্শনার্থীদের শুধু সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ট্রলারে করে ঘুরাই।’

চাঁদপুর সদর উপজেলার রাজ রাজেস্বর ইউনিয়নের তাফজ্জল হোসেন বলেন, ‘সন্ধ্যায় মালামাল নিয়ে ট্রলারে আমরা নদীতে নামি না। নদীপথে অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়েছে। সব মালামাল দিনেই পরিবহন করি। সন্ধ্যায় নদীপথে মালামাল নিতে গিয়ে অনেক সময় ডাকাতদের কবলে পড়তে হয় ব্যবসায়ীদের।’
তেল পাচার প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাহাজের এক শ্রমিক বলেন, ‘জাহাজে মালামাল নিয়ে দূর-দূরান্তে যাওয়ার সময় ইঞ্জিনে তেল লোড থাকে। এ ছাড়া ড্রামে বিপুল তেল থাকে। জোয়ারের সময় স্রোতের মধ্যে জাহাজ চালালে তেল কম খরচ হয়। জোয়ার বা ভাটার বিপরীতে আমরা জাহাজ নোঙর করে রাখি। এতে জাহাজের তেল খরচ হয় না। বেঁচে যাওয়া তেল স্থানীয় ছোট-বড় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। মাাঝে মাঝে ১০ হাজার, মাাঝে মাঝে ৩০-৪০ হাজার টাকার তেল বিক্রি করা হয়ে থাকে।’
চাঁদপুর শহরের কয়লাঘাট এলাকার মালবাহী জাহাজের ম্যানেজার অমিত রায় জানান, ‘মূলত বাল্কহেড, টেংকার ও মালবাহী জাহাজে ডিজেল পেট্রোল বেশি থাকে। এর মধ্যে জাহাজের স্টাফরা ডিজেল বিক্রি করে দেয়। তেলের অধিকাংশ ড্রাম সিলগালা থাকে। তারা ড্রাম খুলে তেল নামিয়ে সিলগালা কপি করে রেখে দেয়। বাজার মূল্য থেকে ডিজেল ও পেট্রোল ৩০-৪০ টাকা কমে বিক্রি করে সিন্ডিকেটরা। এসব তেল নদীপাড়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী কিনে থাকে। তারা ওই তেল কিনে বিভিন্ন ট্রলার, জেলে নৌকা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বাজারমূল্যে বিক্রি করে।’
চাঁদপুর অঞ্চলের নৌপুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘ইতিপূর্বে নদীতে ডাকাতির ঘটনায় সম্প্রতি আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্রসহ ডাকাতদের আটক করেছে নৌপুলিশ। কিছুদিন আগে পদ্মা নদীর মুন্দীগঞ্জ এলাকায় ডাকাতদলের বড় একটি গ্রুপকে দেশি ও আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছি। আগে নদীতে জাহাজ থামিয়ে তেল বিক্রি করে দিত চক্ররা। এখন কোন জাহাজ কারণ ছাড়া থামাতে পারে না। এখন নদীপথ অনেকটাই নিরাপদ। আমরা সার্বক্ষণিক টহল অব্যাহত রেখেছি।’
নৌপুলিশ প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম খবরের কাগজ-কে বলেন, ‘নৌপথ দস্যুমুক্ত, ডাকাতমুক্ত ও চাঁদাবাজমুক্ত ও নিরাপদ করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে নৌপুলিশ। ইতোমধ্যে অনেক চাঁদাবাজ ও ডাকাতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নদীপথে মালবাহী পণ্য, ব্যবসায়ী ও যাত্রীরা নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে, সে লক্ষ্যে নৌপুলিশ কাজ করে যাচ্ছে।’