একসময়ের জনপ্রিয় গৃহসামগ্রীর মধ্যে অন্যতম ছিল মৃৎশিল্পের তৈজসপত্র। দুই যুগ আগেও খুব কম বাড়িই ছিল যেখানে মৃৎশিল্পের তৈজসপত্র ছিল না। সহজলভ্য থাকায় নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল মাটির তৈরি নানা গৃহসামগ্রী। এককালে কদর ছিল মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, কলস, সরা, বাসনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় তৈজসপত্রের। আধুনিকতার ছোঁয়ায় দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে এসব মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য। প্লাস্টিক, মেলামাইন আর অ্যালুমিনিয়ামের ভিড়ে মাটির জিনিসের তেমন চাহিদা নেই বললেই চলে। তাই জীবন ও জীবিকার জন্য পেশা বদলাচ্ছেন লক্ষ্মীপুরের মৃৎশিল্পের কারিগর ও ব্যবসায়ীদের অনেকে।
ক্রেতার অভাবে বংশপরম্পরায় চালিয়ে যাওয়া পেশা ছেড়ে তাদের কেউ দিচ্ছেন চা ও মুদি দোকান, কেউ দিনমজুরি বা কৃষিকাজে নিয়োজিত হচ্ছেন। কেউ বা সহায়-সম্বল বিক্রি করে শ্রমিক হিসেবে দেশের বাইরে পাড়ি দিচ্ছেন।
দেখা গেছে, জেলায় যে কয়জন মৃৎশিল্পের কারিগর ও ব্যবসায়ী রয়েছেন তারা আজও বংশপরম্পরায় চালিয়ে যাওয়া পেশায় কোনো রকমে টিকে আছেন। তবে আর কতদিন তারা এই পেশায় টিকে থাকতে পারবেন তা জানাতে পারেননি।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চন্দ্রগঞ্জ বাজারের মৃৎশিল্পী ও মাটির পণ্য বিক্রেতা সহোদর ভাই সদর উপজেলার দেওপাড়া গ্রামের মৃত শশী কুমার পালের ছেলে কানুলাল পাল ও সুনীল কুমার পালের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, যতই দিন যাচ্ছে ততই এই শিল্পের কদর কমে যাচ্ছে। একসময় দিন-রাত মাটির জিনিস তৈরি করেও ক্রেতার চাহিদা মিটানো যেত না। আর এখন সারা দিনের বিক্রি দিয়ে পরিবার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বয়স হয়ে যাওয়ায় অন্য কোনো পেশায় কাজ করার ক্ষমতা নেই তাদের। তাই পৈতৃক সূত্রে পাওয়া এই পেশা এখনো ধরে রেখেছেন তারা।
কানুলাল পাল জানান, একসময় ধনী-গরিব সব শ্রেণি ও পেশার মানুষ মাটির আসবাবপত্র ব্যবহার করত। পরবর্তী সময়ে অ্যালুমিনিয়ামের জিনিস বাজারে এলেও মাটির তৈরি আসবাবপত্রের ওপর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। কিন্তু পরে প্লাস্টিক, চীনা মাটি, স্টিল, লোহা এবং মেলামাইনের আসবাবপত্র বাজার দখলে নিতে শুরু করলে মাটির জিনিসের দুর্দিন নেমে আসে।
সুনীল চন্দ্র পাল জানান, একসময় তারা নিজ বাড়িতে অর্ধশতাধিক রকমের তৈজসপত্র তৈরি করলেও এখন হাতেগোনা ৫-৬ রকমের জিনিস সীমিত পরিসরে তৈরি করে যাচ্ছেন। চাহিদানুযায়ী অবশিষ্ট মালামাল তারা টাঙ্গাইল থেকে কিনে নিয়ে আসেন।
তিনি জানান, তাদের বাড়ির অধিকাংশ যুবকই জমিজমা বিক্রি করে বিদেশে শ্রমিক হিসেবে পাড়ি দিয়েছে। তার এক ছেলে কসমেটিকসের দোকান দিয়েছে। অপর ছেলে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন।
কানুলাল পাল জানান, তাদের বাড়িসহ আশপাশের বাড়িগুলো মিলিয়ে একসময় শতাধিক পরিবার মৃৎসামগ্রী তৈরিতে জড়িত থাকলেও এখন তাদের পরিবার ছাড়া আর কেউ এই পেশায় নেই। তার ছেলেরাও এখন এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। বর্তমানে তাদের বেচাবিক্রির মধ্যে মাটির তৈরি কিছু খেলনাসামগ্রী, দইয়ের পাতিলসহ ৭-৮ ধরনের জিনিস রয়েছে।
তিনি জানান, এক ট্রাক মাল টাঙ্গাইল থেকে আনলে বিক্রি করতে বছর পার হয়ে যায়। একদিকে আগের তুলনায় জিনিসের দাম দুই-তিন গুণ বেশি, অন্যদিকে মাটির জিনিসের চাহিদা কমে যাওয়ায় চরম সংকটে দিন যাচ্ছে তাদের।
কাঁচামালের দাম বেশি হওয়ায় এবং আয় কমে যাওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে জেলার মৃৎশিল্পীরা। তাই এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতার প্রত্যাশা করছেন তারা।
এমএ/