অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হতো নির্জন পাহাড়ের টর্চার সেলে (কাচারি সেল)। যেখানে নেওয়ার পর চলত পাশবিক নির্যাতন। যাদের অর্থের জন্য অপহরণ করা হতো, তাদের মুক্তিপণ না দেওয়া পর্যন্ত চলত নির্যাতন।
আর যারা আরসার নির্দেশ মানে না, তাদের ওপর চলত ধারাবাহিক নির্যাতন ও হত্যার পরিকল্পনা। এভাবেই এক এক করে ৩৪টি ক্যাম্পে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসার) ছয় টর্চার সেলের সন্ধান পেয়েছে র্যাব।
এ ছাড়া রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) নামে আরেকটি সশস্ত্র গ্রুপ এখন আরসার বড় প্রতিপক্ষ। ২৩০ ইয়াবার আখড়ার নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও ক্যাম্পে দুই সশস্ত্র গ্রুপের আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে বাড়ছে নানা অপরাধ।
আরসার কাচারি সেলের প্রধান মো. ওসমান প্রকাশ সালমান মুরব্বিসহ দুজনকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য জানিয়েছেন র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, চারটি একনলা বন্দুক, দুটি এলজি, পাঁচ রাউন্ড ১২ বোর কার্তুজসহ বিপুল পরিমাণ টর্চার সেলের সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়েছে।
কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, গত এক বছরে র্যাবের অভিযানে অন্তত ৭২ জন আরসা কমান্ডার গ্রেপ্তার হয়েছে। যারা ক্যাম্পে আরসার বিভিন্ন শাখা-উপশাখার প্রধানের দায়িত্ব পালন করে আসছিল। অভিযানের মুখে কমে গেছে অস্ত্র পাচার ও অপহরণ বাণিজ্য। আরসাপ্রধান আতাউল্লাহর নির্দেশে বিভিন্ন ক্যাম্পের নেতৃত্বদানকারীদের হত্যার পরিকল্পনা, হামলা, ভয়ভীতি দেখাত সদস্যরা।
র্যাব কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘গ্রেপ্তার সালমান মুরব্বি ও তার সহযোগী ইউনূছকে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের পার্শ্ববর্তী একটি পাহাড়ি এলাকা থেকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে সালমান একাধিক হত্যা মামলার আসামি।’
কে এই সালমান মুরব্বি?
২০১৭ সালে বাংলাদেশের ক্যাম্পে আসার পর আরসার ওলামা কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য ও কমান্ডার মৌলভি মোস্তাক আহমদ ও মৌলভি আবু রায়হানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর আরসায় যোগ দেন সালমান। এরপর আরসার শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে অস্ত্র চালানোসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নেন। পর্যায়ক্রমে তিনি ১৩ নম্বর ক্যাম্পের ব্লক জিম্মাদার, হেড জিম্মাদার, পরে আরসার ওলামা বডির নেতৃত্ব লাভ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করে আরসাপ্রধান আতাউল্লাহ জুনুনী ও সেকেন্ড ইন কমান্ড ওস্তাদ খালেদের নির্দেশবার্তা পৌঁছে দিতেন। বিনিময়ে পেতেন মোটা অঙ্কের টাকা।
এ ছাড়া সাধারণ রোহিঙ্গা বিচারের নামে নির্যাতন, ভিন্নমতাদর্শীদের টর্চার সেলে নির্যাতন ও টার্গেট কিলিংয়ের পরিকল্পনা করতেন। এসব করে পববর্তী সময়ে আরসার টার্গেট কিলিংয়ের প্রধান বনে যান সালমান মুরব্বি।
এ ছাড়া তার নেতৃত্বে আরসার ৩০-৩৫ জন সদস্য রয়েছেন। তারা কুতুপালং ক্যাম্প ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় খুন, অপহরণ, ডাকাতি, মাদক, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। এসবের জন্য মিয়ানমার থেকে দুর্গম সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে অস্ত্র আনা-নেওয়া করেন সালমান। এমনকি মিয়ানমার থেকে মাদক আনার ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা শিবির ও সংলগ্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের থেকে চাঁদা নিতেন তিনি। কেউ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে গুলি করে হত্যা করতেন।
আরসার বিশেষ কাচারি সেলের ৬ প্রধান
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের মুখে আরসার কার্যক্রমে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে ৩৩ রোহিঙ্গা শিবিরকে ছয়টি জোনে বিভক্ত করে কাচারি সেল করেছে তারা। যেখানে নিয়ে চলে অমানবিক নির্যাতন, মুক্তিপণ বাণিজ্যসহ নানা অপরাধ। গ্রেপ্তার সালমানের নেতৃত্বে এসব সেলের প্রধান হিসেবে রয়েছেন মাস্টার কামাল, মাস্টার ইউনূছ, জাফর আলম, মৌলভি যুবায়ের, মাস্টার আবুল হাশিম, মাস্টার সলিম। যারা বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গা ও স্থানীয় লোকজনের অপহরণ করে টর্চার সেলে পৈশাচিক নির্যাতন চালাতেন এদের মধ্যে মোহাম্মদ ইউনূছ (২৪) ২০১৭ সালে আরসার সামরিক শাখার প্রধান ছমি উদ্দিনের মাধ্যমে আরসায় যোগ দেন।
অস্ত্র চালনা, মার্শাল আর্ট ও রণকৌশলে সিদ্ধহস্ত ইউনূছ ২০১৮ সালে ক্যাম্প-১৫তে আরসার হেড জিম্মাদার ও টর্চার সেলের সদস্য হন। সেখান থেকে তাকে বিশেষ সদস্যের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কারণ তিনি নির্যাতনে বেশ পারদর্শী। যা অন্য কোনো সদস্য পারেন না। ইউনূছের নেতৃত্বে সাত-আটজনের একটি ‘নেট গ্রুপ’ রয়েছে। যারা নিয়মিত ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে শীর্ষ নেতাদের রিপোর্ট দিতেন।
বড় অস্ত্র সোশ্যাল মিডিয়া
র্যাব বলছে, এই সন্ত্রাসীগোষ্ঠী নিজেদের শক্তি জানান দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় ভারী অস্ত্রের ছবি ব্যবহার করছে। এই অস্ত্রগুলো মিয়ানমার থেকে তারা নিয়ে আসে। সন্ত্রাসী কার্যক্রম শেষে আবার অস্ত্রগুলো সীমান্তের পাহাড়ি অঞ্চল কিংবা মিয়ানমারে তাদের সদস্যদের কাছে রেখে আসে।
র্যাব কর্মকর্তা খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘আরসার প্রধান আতাউল্লাহ জুনুনীর ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অব্যাহত অভিযানে এই সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর সাংগঠনিক কার্যক্রম অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে চলে গেছে।’
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যানুযায়ী, অপহৃত ভুক্তভোগীর পরিবার পর্যন্ত পৌঁছানো এবং টাকার লেনদেনে মিডিয়াম্যান (মধ্যস্থতাকারী) হিসেবে কাজ করেন কিছু স্থানীয়। র্যাব তাদের তালিকা করেছে। শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ক্যাম্পে ২৩০ ইয়াবার আখড়া
রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে ইয়াবা বিক্রির অন্তত ২৩০টি আখড়া রয়েছে। চাঁদার বিনিময়ে আখড়ার সুরক্ষা দেন আরসা, আরএসওসহ পাঁচ-ছয়টি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর সদস্যরা। আখড়া থেকে সুবিধাজনক সময়ে ইয়াবা ও আইসের চালান সরবরাহ হয় কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ মাদকের চালান আনে নবী হোসেন ও মুন্না বাহিনী।
রোহিঙ্গা নেতারা জানান, কয়েক বছর আগেও আরসার সহযোগিতায় বালুখালী আশ্রয় শিবিরের মাদকের কারবার নিয়ন্ত্রণ করত নবী হোসেনের বাহিনী। বছর দুয়েক ধরে আরসাকে বাদ দিয়ে আরএসওর সহযোগিতায় মাদকের কারবার চালাচ্ছে নবী হোসেন বাহিনী। উখিয়ার মধুরছড়া, লম্বাশিয়া, ময়নারঘোনা আশ্রয় শিবিরও নিয়ন্ত্রণ করে আরসা। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এখন আরসা ও আরএসও মুখোমুখি অবস্থানে। চাঁদার দাবিতে অপহরণের ঘটনাও ঘটছে অহরহ। এতে সাধারণ রোহিঙ্গারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
কেন বাড়ছে অপরাধ?
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির আছে ৩৩টি। প্রায় আট হাজার একর বনভূমির ওপর গড়ে তোলা এই আশ্রয় শিবিরগুলোতে বসবাসকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১২ লাখ। এর মধ্যে আট লাখ এসেছে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরের কয়েক মাসে।
শরণার্থীদের নিরাপত্তায় আশ্রয় শিবিরের চারদিকে লাগানো হয় কাঁটাতারের বেড়া। স্থাপন করা হয় ৩০টির বেশি পর্যবেক্ষণ চৌকি। তার পরও প্রায় প্রতিদিন আশ্রয় শিবিরগুলোতে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটছে। গত আট মাসে নিহত ৫৬ রোহিঙ্গার মধ্যে ১৭ রোহিঙ্গা মাঝি (নেতা), ২১ আরসা সদস্য, ৩ আরএসও সদস্য ও ১ জন স্বেচ্ছাসেবক রয়েছেন। খুন হওয়া অন্যরা সাধারণ রোহিঙ্গা।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য হুমকি হতে পারে আরসা
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আরসাসহ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অপরাধ কার্যক্রম নতুন কিছু নয়। এটি আমাদের এ অঞ্চলের জন্যই হুমকি। তাদের দ্রুত সার্ভিল্যান্সে আনা জরুরি। না হয় পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।’
তিনি বলেন, ‘এই ঘটনাগুলো ফোর্সিং করে ব্যবস্থা নিতে। বিষয়টি কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদনেও বলেছে। রোহিঙ্গাদের যদি পুনরায় প্রত্যাবাসন না করা হয় তাহলে আজকে আরসা, কাল আরেক গোষ্ঠী- এভাবে ক্যাম্প ঘিরে সন্ত্রাসবাদের সৃষ্টি হবে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই ছাড় দেওয়া যাবে না।’
এমএ/এআর