খাগড়াছড়িতে চলছে শান্তি পরিবহনের একচ্ছত্র আধিপত্য। এই পরিবহনের বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। চালক ও স্টাফদের অসদাচরণ, চেয়ারকোচ গাড়িতে যত্রযত্র যাত্রী ওঠানামা ও পণ্য পরিবহন, খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম রুটে একচেটিয়া যাতায়াত ব্যবস্থা, গাড়ি চালানো অবস্থায় চালকের ধূমপান, বেপরোয়া গতির ফলে দুর্ঘটনার কবলে পড়া, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো-এমন অভিযোগের পাহাড় রয়েছে এই পরিবহনটির বিরুদ্ধে।
জানা যায়, ১৯৯০ সালে ‘খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি’ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় শান্তি পরিবহনের পথচলা। তখন খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি সড়কে চলতো এই পরিবহনের হাতেগোনা কয়েকটি মিনিবাস। ২০০৩ সালে খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সড়কে চারটি চেয়ার কোচ সংযোজনের মাধ্যমে পরিবহনটির নবযাত্রা শুরু হয়। ২০০৪ সালে খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নাম পরিবর্তন করে ‘খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপ’ নামকরণ করা হয়। এরপর একে একে এই গ্রুপে যুক্ত হতে থাকেন নবীন পরিবহন ব্যবসায়ীরা। ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে সংগঠনের কলেবর। বাড়তে থাকে নতুন পরিবহনের সংখ্যা।
বর্তমানে খাগড়াছড়ি থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি ছাড়াও ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ, বরিশাল, রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম ও সিলেটসহ ৫০টির বেশি জেলায় নিয়মিত যাতায়াত করছে শান্তি পরিবহনের চেয়ার কোচ।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য মতে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এখন তাদের নিয়মিত চলাচল করা পরিবহনের সংখ্যা আছে ১৮০টি। এর মধ্যে চেয়ার কোচ ১৪০টি এবং মিনিবাস রয়েছে ৪০টি। এরমধ্যে প্রতিদিন ২২টি নৈশকোচ যাতায়াত করছে খাগড়াছড়ি-ঢাকা রুটে। এই পরিবহনে চালক, সুপারভাইজার, সহকারী এবং কাউন্টারের কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে অন্তত আড়াই হাজার মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। এর বেশির ভাগই খাগড়াছড়ির বাসিন্দা।
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের সংগঠন হওয়ায় নিজেদের খেয়াল খুশিমতো পরিবহন পরিচালনা করছেন তারা। সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি ও অভিযোগের কথা কেউই আমলে নিচ্ছে না। তবে এমন পরিবহন চায় না যাত্রী সাধারণ। তাদের চাওয়া নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও সৌহার্দপূর্ণ আন্তরিক সেবা।
চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী মাসুদ রানার বাড়ি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলায়। শান্তি পরিবহনের নিয়মিত এই যাত্রী বলেন, ‘খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সড়কে শান্তি ছাড়া আর কোনো পরিবহন চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে না। একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণেই যাত্রীসেবার মান উন্নত হচ্ছে না। সব ধরনের পরিবহনকে এই সড়কে চলাচলের অবাধ সুযোগ দেওয়া হলে প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি হবে। যাত্রীরাও ভালো সেবা পাবেন।’
খাগড়াছড়ি সদরের বাসিন্দা মো. ফরহাদ মিয়া বলেন, ‘প্রায়ই দেখা যায় অদক্ষ ড্রাইভার দিয়ে গাড়ি চালায় এই পরিবহনটি। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় হতাহতদের কখনো হাসপাতালে গিয়ে খোঁজখবরও নেয় না পরিবহন সংগঠনটির নেতারা। এমনকি চিকিৎসার জন্য কোনো রকম সহায়তাও দেওয়া হয় না।’
দীঘিনালা উপজেলার বাসিন্দা আফিফা আফনান বলেন, ‘শান্তি পরিবহনের চালক ও স্টাফদের ব্যবহার খুবই অশালীন। এ ছাড়া গাড়ি চলা অবস্থায় চালক সিটে বসেই ধূমপান করেন। এটি নারী যাত্রীদের জন্য বেশ অস্বস্তিকর ব্যাপার।’
সজীব আহমেদ নামে আরেক যাত্রী বলেন, ‘চেয়ার কোচ বাস হওয়া সত্ত্বেও ট্রাকের মতোই এ পরিবহনে মালামাল নেওয়া হয়। এমনকি যাত্রীদের সঙ্গে কোনো পণ্য থাকলে সেটার জন্যও জোর করে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করেন তারা।’
গ্রিন লাইন পরিবহনের কেন্দ্রীয় মহাব্যবস্থাপক আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘আমরা খাগড়াছড়ি থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত যাত্রীসেবা চালু করতে চেয়েছিলাম। প্রায় দেড় বছর আগে জেলা আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি (আরটিসি) অনুমতিও দিয়েছিল। তবে খাগড়াছড়ি পরিবহন মালিক গ্রুপের নানামুখী বাধার কারণে এখন পর্যন্ত তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি।’
ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) সুপ্রিয় দেব বলেন, ‘শান্তি পরিবহনের যেসব গাড়ি খাগড়াছড়ি রুটে চলাচল করছে তার মধ্যে কয়েকটি গাড়ির ফিটনেস নেই। চলতি বছরে ফিটনেস, রুট পারমিট ও টেক্স টোকেনসংক্রান্ত অসংগতির কারণে এই পরিবহনের বাস ও চালকদের বিরুদ্ধে ৩০টিরও বেশি মামলা হয়েছে।’
খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায় দাশ বলেন, ‘এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পরিবহনে কিছু সংকট ও সমস্যা আছে। যাত্রীদেরও কিছু অভিযোগ, অনুযোগ রয়েছে। তবে চাইলেই এক দিনে সব সমস্যার সমাধান করা যায় না।’
বিআরটিএ খাগড়াছড়ি সার্কেলের সহকারী পরিচালক ওমর ফারুক বলেন, ‘শান্তি পরিবহনের বেশিরভাগ বাসই ঢাকা থেকে রেজিস্ট্রেশন নেওয়া। চালকদের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যেসব চালক মাদকাসক্ত হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে তাদের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে না।’
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক ও জেলা আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির সভাপতি মো. সহিদুজ্জামান বলেন, ‘খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রামসহ অন্য রুটেও সব কোম্পানির বাস চলাচল করতে পারবে। এর আগে যেসব পরিবহন কোম্পানি এসব রুটে বাস চলাচলের অনুমতি পেয়েছিল বা অনুমতির জন্য আবেদন করেছিল, তাদের শিগগিরই এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হবে।’
এমএ/এআর