পরিবেশ সুরক্ষায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)।
বুধবার (২২ নভেম্বর) সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে বীচ ক্লিনিং অভিযান পরিচালনা করে সংস্থাটি। এতে অংশগ্রহণ করেন বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা। এসময় অসচেতন পর্যটকদের যত্রতত্র ফেলে যাওয়া চিপস, আইসক্রিম, চকলেটসহ নানা খাদ্যপণ্যের প্লাস্টিকের মোড়ক, পানীয়র বোতল, কাগজসহ নানা বর্জ্য কুড়িয়ে চটের ব্যাগে নেওয়া হয়। যা পরে ধ্বংস করা হবে। ক্লিনিং কর্মসূচীর পর এক পথসভার মাধ্যমে ব্যবহার্য প্লাস্টিকের জিনিসের উৎপাদন ও দৈনন্দিন ব্যবহার বন্ধের আহব্বান জানানো হয়।
একইসাথে সৈকতে স্থাপিত খাবার, কসমেটিকস ও অন্যান্য পণ্যের দোকানিদের বীচে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য ছুড়ে না ফেলতে সচেতন করা হয়। বেলার চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সমন্বয়ক মুনীরা পারভীন এর পরিচালনায় এসময় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সালেহ আহম্মদ চৌধুরী, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. ওয়াহেদুল আলম মাষ্টার, বেলার ফারমিন এলাহী, মো. ইয়াছিন, তমিজ উদ্দিন আহমেদ, আবু সিদ্দিক। শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, তাজওয়াক হোসাইন, মুনতাহা আক্তার, জেসমিন আক্তার মাওয়া, মুনতাসিন, মিনহাজ, মো. আব্দুল্লাহ জাহেদ রিয়াদ, মো. নেজাম উদ্দিন প্রমুখ।
এসময় বক্তারা বলেন, প্লাস্টিক সাধারণত দুই ধরণের। একটি পুনরায় ব্যবহারযোগ্য এবং অন্যটি পুনরায় ব্যবহারযোগ্য নয়। যা পুনরায় ব্যবহার করা যায় না সেটিই একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক। সেসব প্লাস্টিক আমরা একবার ব্যবহারের পর ফেলে দেই সেগুলো বেশি ক্ষতিকর। এ ধরণের প্লাস্টিকের মধ্যে পানির বোতল, পলিথিন/প্লাস্টিক ব্যাগ, মোড়ক, প্লাস্টিক বক্স, স্ট্র, কফি স্ট্রিরার, প্লাস্টিকের থালা ও কাপ, চামচ, খাবারের প্যাকেট উল্লেখযোগ্য।
বিশ্বে প্রতিবছর ৩০০ মিলিয়ন মেট্রিক টনেরও বেশী প্লাস্টিক উৎপাদিত হয় এবং উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্যরে প্রায় অর্ধেকই একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক। ২০৫০ সাল নাগাদ ১২ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য বিশ্বব্যাপি প্রাকৃতিক পরিবেশে জমা হবে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রে মাছের চেয়ে প্লাস্টিকের উপস্থিতি বেড়ে যাবে বলে বিজ্ঞানীদের অভিমত (ইউনেপ, ২০১৮)।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এর গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী পদ্মা নদীর মাধ্যমে প্রায় ৩০০ ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য বঙ্গোপসাগরে যাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের (২০২১) তথ্য অনুযায়ী শুধু ঢাকাতেই মাথাপিছু প্লাস্টিকের ব্যবহার ২২.২৫ কেজি এবং ঢাকার প্রতিদিনের প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ ৬৪৬ টন যা সমগ্র বাংলাদেশের বর্জ্যের ১০%। প্লাস্টিক দূষণ এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের অব্যবস্থাপনার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দেশ হিসেবে বিশ্ব ব্যাংকের তথ্যে উঠে এসেছে। রাজধানীর চারপাশের চারটি (বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা) নদীতে প্রায় ৩০ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য পাওয়া গেছে যার অর্ধেকই পাওয়া গেছে বুড়িগঙ্গায়। কক্সবাজারে পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন ১৩০ টন আর্বজনা হয় যার ৩০% প্লাস্টিক যার আবার ৭৮% ই একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক।
গতবছর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের মাছ বিষয়ক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের মিঠা পানির প্রায় ১৫ প্রজাতির মাছের দেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের অপর আরেকটি গবেষণায় ৫টি চিনির ব্রাণ্ডে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ গবেষণা অনুযায়ী শুধু চিনি গ্রহণের মাধ্যমেই বছরে ১০.২ টন মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা দেশের মানুষের দেহে প্রবেশ করছে। দেশে উৎপাদিত প্রতি কেজি লবনেও ২ হাজার ৬৭৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মিলেছে।
প্লাস্টিক দূষণের এ ভয়াবহতা থেকে পরিত্রানের উদ্দেশে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ও ১০টি সমমনা বেসরকারি সংস্থা দেশে ক্ষতিকর প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে পলিথিন/প্লাস্টিক ব্যাগের উপর বিদ্যমান আইনি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধের দাবিতে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে একটি জনস্বার্থমূলক মামলা (নং ১৪৯৪১/২০১৯) দায়ের করে। ২০২০ সালের ৬ জানুয়ারি ওই মামলার প্রাথমিক শুনানী শেষে হাইকোর্ট বিভাগ পলিথিন-প্লাস্টিক ব্যাগের উপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা কার্যকর এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ধারা ৬ক বিধান অনুযায়ী একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতাকে আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ও আইনী কার্যকারিতাবিহীন ঘোষণা করে রুল জারি করেন।
জারিকৃত এ রুলে ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ সালের মধ্যে দেশে এক বার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে এবং এসবের নিরাপদ বিকল্প চালু করার জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। সেইসাথে আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের সকল হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকপণ্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ ও সকল উপকূলীয় অঞ্চলে পলিথিন/প্লাস্টিকের ব্যাগ বহন, বিক্রয়, ব্যবহার, বিপণন নিষিদ্ধ করতে নির্দেশ প্রদান করেন। আদালত দেশব্যাপী নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ, কারখানা বন্ধ এবং যন্ত্রপাতি জব্দকরণের মাধ্যমে পলিথিন-প্লাস্টিক ব্যাগের উপর বিদ্যমান আইনী নিষেধাজ্ঞা পূর্ণ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সরকারকে নির্দেশ প্রদান করেন।
আদালতের আদেশের প্রেক্ষিতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ২১ জুন, ২০২১ তারিখের গেজেট প্রজ্ঞাপণে দেশের ১২ টি উপকূলীয় জেলার (বাগেরহাট, বরগুনা, ভোলা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, খুলনা, লক্ষীপুর, নোয়াখালী, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও সাতক্ষীরা) ৪০টি উপজেলা এবং চট্টগ্রাম মহানগরীর ৮টি এলাকায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে ৩ বছর মেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এ প্রজ্ঞাপণে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক হিসেবে ওয়ান টাইম কাপ, গ্লাস, প্লেট ও অন্যান্য তৈজসপত্র, জুসের স্ট্রসহ আরও অন্যান্য পণ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বৃহত্তর স্বার্থে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ও অন্যান্য সমমনা সংগঠন কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিনে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পন্য বন্ধ ও নিয়ন্ত্রণে সরকার, হোটেল-মোটেল-লঞ্চ মালিক ও ট্যুর অপারেটর, পন্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানদের সাথে নিয়ে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ও আদালতের নির্দেশাবলী এবং সরকারের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছু কাজ হাতে নিয়েছে।
এআর